Friday, February 28, 2014

পরবাসেঃ পর্ব ২ - নয়নভোলানো নিউ অরলিন্স

আমেরিকার অনেক নাম করা শহর যেমন নিউইয়র্ক, সান ফ্রানসিসকো, ওয়াশিংটন ডিসি, শিকাগো, বস্টন, লস এন্জেলেস নিয়ে আমরা অনেক গল্প, ভ্রমণকাহিনী, পড়ে থাকি । এই শহর গুলি আমাদের না ঘোরা হলেও নামগুলির সাথে আমরা অত্যন্ত পরিচিত । কেউ আমেরিকা যাচ্ছে শুনলেই আমাদের এই সব চিরাচরিত শহর গুলির কথা প্রথমেই মাথায় আসে । কিন্তু আজ আমি এমন একটি শহরের নাম করব তা অনেকের কাছেই অচেনা । আমেরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পোর্ট আর পাঁচমিশেলি ঐতিহ্যবাহী বহু পুরোনো এই শহরটির নাম নিউ-অর্লিন্স । লুইসিয়ানা স্টেটের বন্দর শহর । মিসিসিপির মোহানায় অবস্থিত এই শহরে আমার যাবার অভিজ্ঞতা এবং সৌভাগ্য হয়েছিল ১৯৮৯ সালে । ডালাস শহর থেকে গাড়ি করে এক ভোরে আমরা পাড়ি দিয়েছিলাম নিউ-অর্লিন্সের দিকে । টেক্সাস স্টেট আর লুইসিয়ানা স্টেটের মধ্যবর্তী ইন্টারস্টেট হাইওয়ে ধরে মাজদা ৬২৬ গাড়ি নিয়ে আমাদের যাত্রা হল শুরু । সাথে এক থার্মোস কফি, কেক, কুচো নিমকি আর আইসবক্সে "কোল্ড-কাট" (স্যান্ডুইচ এর মাংসের স্লাইস ), ব্রেড আর কয়েকটা কোক ক্যান । ডালাস থেকে নিউঅর্লিন্স প্রায় ৮০০ কিলোমিটার । রাস্তাঘাট ভাল, পথে ছোট বড় ফুড জয়েন্টেরও অভাব নেই কিন্তু স্টুডেন্টের পকেটমানিতে কথায় কথায় রেস্তোরাঁয় থামতে হলে নিউঅর্লিন্সে পৌঁছে মেমেন্টো কেনার সামর্থ্য হবে না তাই খাবার দাবার খানিকটা নিয়ে যাওয়া এই আর কি । গাড়ি করে লংড্রাইভে যেতে যেতে দেখেছি আমেরিকার রাস্তাঘাটের বৈচিত্র্য । এই দেশের মানুষগুলিও সর্বদা প্রাণ দিয়ে নিজের দেশকে আরো সজীব, আরো সুন্দর করার ব্রতে ব্রতী । এত পরিচ্ছন্নতা, এত পরিকল্পনাময় পরিকাঠামো দেখে বারবার মনে হয়েছে ভগবানের নিজের দেশ বোধ হয় এটি । তাই বোধ হয় এত সুন্দর । তাই নিউ অর্লিন্স যাবার সময়ও বারেবারে মনে হয়েছে
"তোমার গান গাওয়া শেষে রেখে যেও তব হাতের কোমল স্পর্শ
আমি আবার ফিরে আসব হেথায় পেরিয়ে আলোকবর্ষ"

টেক্সাসের ধূসর, রুক্ষ প্রকৃতির শুষ্কতা ছেড়ে লুইসিয়ানার সবুজ প্রকৃতির আদ্রর্তা নিয়ে চললাম । গাড়ি ছুটে চলল হাইওয়ে দিয়ে, বাজতে লাগল রবিঠাকুরের গান "পথ দিয়ে কে যায় গো চলে" যত এগোই তত মনে হয় সবুজে-নীলে মিশে প্রকৃতি একাকার । গ্রামের পথ, ভুট্টার ক্ষেত, আখের ক্ষেত, ছোট ছোট খাল-বিল আর বক, সারস তো চললই আমাদের সাথে । ঘন্টা দুয়েক চলার পর একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার চলা ।হাতে একটা ম্যাপ নিয়ে পাশের ড্রাইভার ভদ্রলোকটিকে পথ দেখাতে দেখাতে চললাম |তখন মার্চ মাস, গরম একদম নেই । বাতাসে হালকা ঠান্ডার রেশ । শেষ বসন্তের একটুকু ছোঁয়া । রাস্তার ধারে বড় বড় গাছেদের পাতা ঝরে গিয়ে নতুন কচি পাতা । কোনো গাছে পাতা নেই ফুল সর্বস্ব । কত রঙ তাদের... কখনো হলুদ, কখনো বেগুনী । বাদাম গাছের মত কোনো একটা গাছ কমলা রঙের কচি পাতাদের উদ্ধত গ্রীবা মেলে ধরেছে আকাশের সীমায়, কখনো পেরোলাম গাছেদের সুশীতল ছায়াময় এভিনিউ । আমেরিকার বসন্ত বোধ করি সব জায়গায় একই রকম । আরো নীল, ঘন নীল, কচি কলাপাতা সবুজ, গাঢ় সবুজ । মনে হল দোল খেললাম প্রকৃতির সাথে ।

বেলা গড়িয়ে দুপুর সূর্য যখন মাথার ওপর একটা রিক্রিয়েশন এরিয়ায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে স্যান্ডুইচ বানালাম ।রাস্তার ধারেই টেবিল ও বেঞ্চ পাতা; টয়লেটের ব্যাবস্থাও আছে সেখানে |গাছের ছায়ায় বসে সারলাম দুপুরের খাওয়া । পাশের একটা গ্যাস স্টেশনে তেল ভরে আবার শুরু করলাম যাওয়া । ইতিমধ্যে টেক্সাসকে ফেলে লুইসিয়ানা ঢুকে পড়েছি । প্রকৃতিগত দিক থেকে কিছু বৈচিত্র চোখে পড়ল; এখানে প্রকৃতি টেক্সাসের মত শুষ্ক ও রুক্ষ নয় বরং জলাভূমির আধিক্য থাকায় অনেক আদ্রর্তার ছোঁয়া পেলাম । নদীর দেশে এসেছি মনে হল । নদীর পাড়, সেতু সবকিছুর রক্ষণাবেক্ষণ দেখে নিজের দেশের জন্য বড় মায়া হতে লাগল । সবশুদ্ধ প্রায় ন' ঘন্টা লাগল নিউঅর্লিন্স পৌঁছতে । বিকেল প্রায় তিনটে তখন ।

পৌঁছলাম সাউথ-ইস্টার্ন লুইসিয়ানার অন্যতম শহর নিউ অর্লিন্সে । ভারতবর্ষে গ্রেট ব্রিটেনের ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি যেমন রাজত্ব করতে এসে কোলকাতায় গড়েছিল তাদের রাজধানী ঠিক তেমনি ৭ই মে, ১৭১৮ সালে ফ্রেঞ্চ মিসিসিপি কোম্পানি আমেরিকায় এসে নিউঅর্লিন্স শহরের গোড়াপত্তন করেছিল । তারপর নেপোলিয়ান এই শহরের আশপাশের এলাকা লুইসিয়ানা স্টেট হিসেবে আমেরিকাকে বিক্রি করেন ১৮০৩ সালে । আমেরিকার দক্ষিণে অবস্থিত বলে ক্রীতদাস প্রথা বহু যুগ ধরে চালু ছিল এখানে তাই জনসংখ্যার বেশিরভাগই কৃষ্ণাঙ্গ । তবে শহরে পা দিয়েই মনে হল প্রাচীন ঐতিহ্যের ছোঁয়া এখানে, পুরোণো বাড়িদের, পুরোণো ট্রামেদের সারি | ফুটপাথ ঘেঁষা গথিক স্টাইলের স্থাপত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা স্বমহিমায় । কেমন একটা মন কেমন করা পুরোণো গন্ধ পেলাম, আমেরিকার অন্য শহর গুলিতে গিয়ে যা পায়নি । ঠিক আমাদের নিউমার্কেট, এস্প্ল্যানেডের গলি আর কলেজ স্ট্রীট কফি হাউসের মাদকতার স্পর্শ অনুভব করলাম । তবে পরিচ্ছন্নতা দেখে আবার কেঁদে উঠল প্রাণ.. পুরোণো কলকাতার জন্যে ।






ডিউক অফ অর্লিন্স, ফিলিপ-ডি-অরলিন্সের এর নামে এই শহরের নাম হয় La Nouvelle-Orleans বা নিউ অর্লিন্স । বিশাল চওড়া তরঙ্গায়িত মিসিসিপি নদীর দুকূল জুড়ে অবস্থিত এই শহরের পশ্চিম জুড়ে রাজকীয় হ্রদ লেক পনচার্ট্রেনের নীল জলরাশি, আর দক্ষিণে গাল্ফ অফ মেক্সিকো । অমেরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নিউঅর্লিন্স | অফশোর এবং অনশোর পেট্রোল এবং ন্যাচারাল গ্যাস উতপাদনের ঘাঁটি ও অমেরিকার পঞ্চম বৃহত বন্দর এটি । ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে আমাদের কোলকাতায় যেমন এক সময় ফরাসী, ওলন্দাজ সহ বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছিল নিউ অর্লিন্সে এসে ঠিক তেমন মনে হল । এই শহরটি আমেরিকার এক অনন্য শহর যেখানে নানা মত, নানা পরিধানের মাঝে বিবিধ ভাষা এবং সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটেছে । আর বহুমুখী ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হয়ে নিউঅর্লিন্স বাকি আমেরিকা থেকে যেন বিছিন্ন । নতুন আমেরিকার শপিংমলের গন্ধ আছে এখানে , আছে মোড়ে মোড়ে পিত্জা জয়েন্ট বা বার্গার পয়েন্ট, আছে এক্সপ্রেস ওয়ের চাকচিক্য কিন্তু তার সঙ্গে ঘুরে বেড়ায় প্রাচীন যুগের প্রেতাত্মারা । ইওরোপীয় সংস্কৃতির অনন্দাধারা ব‌ইছে সেখানে ।

একটি মোটেলে গিয়ে উঠলাম । মালপত্র রেখে স্নান করে বিকেল বিকেল বেরিয়ে পড়লাম শহর দেখতে ।প্রথমেই দেখলাম লাল রঙয়ের ঝকঝকে ট্রাম একখানা । ফুটপাথ থেকে নেমে ট্রাম স্টপেজে গিয়ে উঠে পড়লাম ট্রামে । ওখানে বলে স্ট্রীটকার । পাঁচমিনিটের মধ্যে ট্রাম আমাদের নিয়ে গেল নিউ অর্লিন্সের সেন্ট্রাল বিজনেস পয়েন্ট জ্যাকসন স্কোয়ারে । যথারীতি ডালহৌসি স্কোয়ারের মত ব্যস্ত রাজপথ । অফিস পাড়া বা ডাউনটাউন নিউঅর্লিন্স । সন্ধ্যে হয়ে এসেছে তখন । নিউইয়র্কের মতই নিরাপত্তাহীনতার ভয় অনুভব করলাম। পথের ক্লান্তি রয়েছে সাথে তাই সেখানে বেশিক্ষণ না থেকে ফিরে এলাম আবার ট্রামে করে । রাতে হোটেলে ফিরে ডিনার খেয়ে ঘুমোলাম । পরদিন ব্রেকফাস্ট সেরে প্রথমেই গেলাম "vieux carre"। নিউ অর্লিন্সের প্রাণকেন্দ্র ; পুরোণো নিউঅর্লিন্সের ফ্রেঞ্চকোয়ার্টার ছিল এককালে, তাই ফরাসী ঐতিহ্য বহমান এখনো রাস্তার মাঝে

এই শহরই নাকি জ্যাজ মিউজিকের পীঠস্থান বলে জনপ্রিয় । বিখ্যাত জ্যাজ শিল্পী লুই আমস্ট্রং এখানকারই লোক জানলাম । পথে ঘাটে অণুরণিত হচ্ছে জ্যাজ টিউন । রাস্তার ধারে বাদ্যশিল্পীর জ্যাজ অনুশীলন, বিশালকার স্যাক্সোফোন নিয়ে সঙ্গীত চর্চা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম । এ শহরের আকাশে বাতাসে জ্যাজ; আমি জ্যাজের কিছুই বুঝি না কিন্তু কৃষ্ণকায় এই মানুষগুলির সঙ্গীতচর্চায় নিষ্ঠা দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হলাম ।

চোখে পড়ল ক্ষুদে চিত্রশিল্পীদের শিল্পকলা ; রাস্তার ফুটপাথে ছবি আঁকার, রঙ, তুলি নিয়ে বিছিয়ে বসেছে । যেমন আমাদের ব‌ইমেলা প্রাঙ্গনে বসে ছবি এঁকে বিক্রি হয় কত সুন্দর ছবি । দাড়িওয়ালা এক শিল্পী কিছু দূরে তার ইজেল নিয়ে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে ছবি এঁকে চলেছে । ফ্রান্সের পথে পথে এমন হয় জানতাম কিন্তু এ শহরে দেখে বড় ভাল লাগল ।

ফুটপাথের ধারে প্রাসাদোপম অট্টালিকার আধুনিক বুটিকে রূপান্তকরণ যেন অমুক নং বালিগঞ্জ প্লেস বা তমুক নং ল্যান্সডাউন টেরেসে নামজাদা ডিজাইনার বুটিক! ঐতিহ্যময় বাড়িগুলির এত সুন্দর রক্ষণাবেক্ষণ দেখে মনে হল এরা সত্যি গড়তে জানে বেশি ভাঙতে জানে কম । নয়নভোলানো সব আর্টগ্যালারি দেখলাম । এ শহর যে শিল্প-গীত-বাদ্য-কলার সনাতন পীঠস্থান সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই । মজার শহর নিউঅর্লিন্স; সকলে নিজের খেয়ালখুশিতে চলে । কোনো সময়ের অভাব নেই, নেই কোনো একঘেয়েমি । কোনোবাড়ির পোর্টিকোতে গীটারে জ্যাজ বাজায় তরুণ, কোথায় আবার বিউগল বাজিয়ে ভিক্ষা চাইছে যুবক, কোথাও আবার একর্ডিয়ানে সুর তুলতে ব্যস্ত কোনো শিল্পী । মনে হল ল্যাটিন কোয়ার্টার "Vieux Carre" আজও ফরাসীয়ানায় অমলিন।

সুন্দর বাঁধানো ফুটপাথ, রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ি, সাবেকি স্ট্রীটল্যাম্প আর টুকটুকে লাল ট্রামগাড়ি সব মিলিয়ে এ শহর বারেবারে মনে করিয়ে দিল আমাদের তিলোত্তমার কথা.... একদা ভারতের রাজধানী পুরোণো কলকাতার কথা । গেলাম সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারে । সেন্ট পিটার্স ক্যাথিড্রাল দেখলাম । বাকি আমেরিকার মত প্রোটেস্ট্যান্ট বাইবেল বেল্ট নেই এখানে । প্রধানত ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী এ শহরের মানুষ । এই শহর বিখ্যাত তার প্রাচীন ঐতিহ্যময়তায় । ফ্রেঞ্চ আর স্প্যানিশ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক বলে বিখ্যাত "mardi gras" ফেস্টিভাল এখানে হয় জানলাম । সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারেও নামা-অনামা কত শিল্পীর চিত্র প্রদর্শনী চলছে, যেন পারি শহরের পুরোনো সাবেকিয়ানা ব‌ইছে নিউঅর্লিন্সের কোণায় কোণায় ।

গেলাম ফুর্তির পাড়া, হুল্লোড় পট্টি ব্যস্তময় বুরবন স্ট্রীটে । রাস্তার ধারের একটা পাবে ঢুকে এখানকার বিশেষ পানীয় "মার্গারিটা" খেলাম । মেক্সিকোর "ব্লু আগাভে" নামক ক্যাকটাস জাতীয় গাছ থেকে তৈরী পানীয় "টেকিলার" সাথে আরো অনেক কিছু মিশিয়ে বানানো হয় এক অসাধারণ পানীয় যার নাম "মার্গারিটা"। লাঞ্চ সারলাম বুর্বন স্ট্রীটের এক পুরোণো রেস্তোরাঁয় । সেদিন প্লেটে সুসজ্জিত কেজুন রাইস আর ক্র-ফিস কারি নিয়ে পৌঁছে গেছিলাম পার্কস্ট্রীটের চাইনিস রেস্তোরাঁয়, এক নস্টালজিয়ায়.... লুইসিয়ানার খাবারে ক্রেওল এবং কেজুন এই দুই অভিনব ঘরানার সংমিশ্রণ ঘটেছে। কেজুন এবং ক্রেওল হল ফ্রেঞ্চ কুইসিনের অপভ্রংশ যার সাথে মিশেছে ইওরোপিয়ান, মেডিটারেনিয়ান, লোকাল রেড ইন্ডিয়ান এবং আফ্রিকান ধারা । কেজুন হল লুইসিয়ানার আদি বাসিন্দার শহুরে খাবার আর ক্রেওল হল পরে আসা কিছু ফরাসীদের এক গ্রাম্য এবং কিছুটা মশলাদার খাবার । গাল্ফ অয়েষ্টার, স্টীমড বা বয়েল্ড ক্র-ফিশ, রেড বিনস আর স্মোকড রাইস হল এই দুই মিশ্র খাবারের প্রধান অঙ্গ । ক্র-ফিশ আমাদের বাগদা চিংড়ির মত কিন্তু লবস্টার বা কাঁকড়ার মত দাঁড়া আছে । ট্রাইবাল কুইজিন তো কি ! সার্ভ করার ধরণ ধারণে সাহেবিয়ানার স্পর্শ । সবশেষে খেলাম এখানকার অথেন্টিক সুইট ডিশ "প্রালিন"। এটি এক প্রকার মিষ্টি, ক্যান্ডি জাতীয়, যা তৈরী হয় ব্রাউনসুগার, পাউডার্ড হোয়াইট সুগার, ক্রিম, মাখন আর "পেকন" বা আখরোটের মত একটি শুকনো ফল দিয়ে ।

গেলাম নিউঅর্লিন্সের কলেজ পাড়ায় । সেন্ট চার্লস এভিনিউতে দুটি বিখ্যাত কলেজ দেখলাম । লয়োলা এবং টিউলেন ইউনিভার্সিটি । রাস্তায় একটা আর্ট এন্ড কিউরিও শপে গিয়ে কিনলাম বিখ্যাত নিউঅর্লিন্স শহরের মুখোশ , পোর্সেলিনের তৈরি এই মাস্ক ব্যবহৃত হয় "মার্ডি গ্রা" ফেষ্টিভালে ।


এবার গেলাম মিসিসিপি দেখতে । ভূগোল পড়ার সাক্ষী হয়ে চিরকাল যে আমাকে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে তাকে স্বচক্ষে দেখে আত্মহারা হয়ে গেলাম । নদীর ওপর রিভার ক্রুজের ব্যবস্থা রয়েছে । খুব একটা ব্যয় বহুলও নয় । আমরাও চড়লাম এক মস্ত প্যাডেল স্টীমারে । মিসিসিপি বক্ষে ভেসেছিলাম সেদিন ; আমার ভূগোল ব‌ইয়ের ইতিহাস সামনে দিয়ে বয়ে চলল ।

স্রোতের সুর তুলে নীলঘাগরার কুঁচি লুটিয়ে, জাহাজের ডেকে বসে দেখেছিলাম সূর্যাস্তের লাল রঙ; ওপারের সেন্ট পিটার্স ক্যাথিড্রালও সাক্ষী হয়ে দেখেছিল সে বিকেলের সূর্যাস্তের লাল-কমলার কত খেলা!

মিসিসিপিকে বিদায় জানাতে বড় কষ্ট হয়েছিল মনে মনে বলেছিলাম, "ঠিক এমন করেই থেকো তুমি যেমন আজ আছো, তোমার আকাশ আমার আকাশের চেয়েও নীল দেখে যাচ্ছি, তোমার জলের রং আমার চোখের তারায় ধরে নিয়েছি ; সেদিন দেখেছি পড়ন্ত সূর্য়ের লাল-কমলার খেলা,জলের ওপরে সেই ছায়া আর তার ওপরে আমাদের ছবি তা তুমিও কিন্তু রেখো সুন্দর করে.. নিউ অর্লিন্সকে বলেছিলাম যদি তুমি হারিয়ে যাও একদিন ! যদি কোনো বিধ্বংসী ঝড় এসে তোমায় গ্রাস করে নেয়, তুমি হয়ত তলিয়ে যাবে কিন্তু আমার মনের ক্যানভাসে তুমি বেঁচে থাকবে নয়নভোলানো হয়ে..”

২৯শে আগস্ট ২০০৫ এর এক বিধ্বংসি সাইক্লোন, গাল্ফ অফ মেক্সিকো থেকে উড়ে এসে আছড়ে পড়ে। কুখ্যাত এই সাইক্লোন এখানে "হারিকেন ক্যাটরিনা" নামে পরিচিত। এর আঘাতে মিসিসিপি নদীর বাঁধ ভেঙে যায় এবং সমুদ্রের জলের উচ্ছ্বাসে সারা নিউ অর্লিন্স শহর গভীর জলে নিমগ্ন হয় । ১০০০ এরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায় অসংখ্য বাড়িঘর ভেঙে পড়ে এবং ব্যাবসা বাণিজ্যের বিপুল ক্ষতি হয় । পাঁচ বছর আগে ঘটে যাওয়া এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব এখনো মুছে যায়নি নিউ অর্লিন্স থেকে, তার অর্থনীতি থেকে ও শহরের মানুষের মন থেকে । "vieu carre" তে হয়ত এখনো বাজছে সেই জ্যাজ টিউনের সুর কিন্তু এ এক করুণ বিরহের সুর কারণ এখানকার দুটি ফর্চুন ৫০০ কোম্পানির মধ্যে একটির আজ কোনো অস্তিত্ব নেই ..ঝড়ের ধাক্কায় কাবু হয়ে সে নিজেকে বেচে দিয়েছে দূর দেশের অন্য কোম্পানির মালিককে।

ইচ্ছামতী ই-পত্রিকায় প্রকাশিত 

Tuesday, February 11, 2014

ডালাস ডায়েরীঃ পর্ব ১


সালটা ছিল ১৯৮৯ । মার্চ মাস ।

সুদূর ডালাসে পাড়ি দেওয়া হল । আমেরিকার দক্ষিণ পশ্চিমের টেক্সাস স্টেটে অবস্থিত ডালাস । বহু প্রতীক্ষিত বায়ুপথে ভ্রমণ..
বিমানবন্দর থেকে একে একে চোখের বাইরে চলে গেল মা, বাবা আর ভাইয়ের ছলছল চোখ ।
জীবনে প্রথম বায়ুপথে হারিয়ে যাওয়া । দমদম থেকে দিল্লী । সেখানে বন্ধুবান্ধবের সাথে গেটটুগেদার । মধ্যরাতে দিল্লী এয়ারপোর্টে গিয়ে আবার উড়ানে জার্মানি । সেখান থেকে আরো দূরে আটল্যান্টা ।
এয়ারপোর্টে ফ্রেস হয়ে বিধ্বস্ত জামাকাপড় বদল করে ছোট্ট এক ফ্লাইটে আটল্যান্টা থেকে সোজা ডালাস পৌঁছালাম বিকেলবেলায় । ইউটিডালাসের ম্যনেজমেন্ট স্কুলের পিএইচডি স্টুডেন্টরা সব এসেছে.. একপাল অপরিচিত মুখ সাদরে অভ্যর্থনা করল ডালাস এয়ারপোর্টে । ভারতীয় স্টুডেন্টদের একাধিক গরীব রথ বরণ করে ঘরে তুলছে আমাকে ... সে এক অভিনব অভিজ্ঞতা ।
অবশেষে পৌঁছলাম ডালাস ক্লিফব্রুক কন্ডোমিনিয়ামের এপার্টমেন্টে । ঘুমে তখন দুচোখ বুঁজে আসছে । অথচ বন্ধুদের হল্লা আর হুল্লোড়ের খামতি নেই । গরম ভাত থেকে শুরু করে পঞ্চব্যঞ্জন রেঁধে রেখেছে বাঙালী বন্ধু পত্নী । আমি তখন জেটল্যাগ সর্বস্ব । তবুও হাসিমুখে আলাপ পর্ব সেরে চলতে হল সকলের সাথে ।


আমেরিকার মাটিতে পা দিয়েই মনে হল ঈশ্বরের আশীর্বাদ ধন্য এই দেশ, কত সুন্দর সৌজন্যবোধ মানুষের, সুন্দরের সত্য পূজারী তারা,
তারা কত রুচিশীল, সত্যিই তারা গড়তে জানে নিজেদের আর ভালবাসে তাদের দেশকে, রক্ষা করতে পারে ভগবানের সৃষ্টিকে, আর নিজেদের সৃজনশীলতাকে বিকশিত করে, উজাড় করে দিতে পারে বিশ্বের দরবারে;
তুমি বলবে কৃত্রিমতা এ শতাব্দীর অভিশাপ কৃত্রিমতা যদি উন্নতি ঘটায় তাহলে বাধা কোথায়? বিজ্ঞান যদি কাজের বন্ধু হয় তাহলে আপত্তি কিসে ? সৃষ্টিসুখের উল্লাসে আমরা বাঁচিনা একটু সহজ করে, সাবলীল ভাবে!
আসলে যে দেশের নাগরিকের চিন্তাধারা সুস্থ, যারা সভ্যতায় পরিপুষ্ট, বিধাতাপুরুষ বোধ হয় দুহাত তুলে তাদের আশীর্বাদ করেন..
প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য্যে, প্রাকৃতিক জলবায়ুর মিষ্টতায় সে দেশের মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে রোজ আমরা প্রণাম জানাতাম নিজের দেশমাতৃকাকে ।

এর মধ্যে দেশের মানুষগুলোর জন্য মন কেমন করলেই চিঠি লিখছি ফাঁকে ফাঁকে । তবে বেড়ানোর আনন্দে দখিনের খোলা জানলায় সব ওলটপালট । ফাগুণের ওমে শীত লুকোল শুকনোপাতায় । পলাশের হাসিতে শীত-ফুলেরা মুখ ঢেকেছে চুপিসাড়ে । শিমূল, অশোকের হট্টমেলায় ডালেডালে কাঁচা সবুজের ছোঁয়া । মাতাল বসন্তে রঙীন প্রকৃতি ।

ভোরবেলা কিচেনের ব্লাইন্ডস সরিয়ে ক্লিফব্রুক কন্ডোমিনিয়ামসের পার্কিং লটে তাকিয়ে থাকা সার সার গাড়ির ছাদে দুধসাদা বরফের চাদর ..তার সাথে সূর্যের আলোর মাখামাখি !
দুপুরবেলা বান্ধবীদের সাথে শপিংমলের হাতেখড়ি, একরাশ বিদেশী পারফিউমের গন্ধ নিয়ে ফিরে আসা, বিকেল হলেই নতুন জলখাবার তৈরী আর প্রতীক্ষা...
তারপর রোজ চোখ রেখেছি অপার বিস্ময়ে, কখনো ডালাস ডোমের মাথায় গরম কফি হাতে, টেক্সাস ও ওকলাহোমার বর্ডারে অসাধারণ টেক্সোমা লেকের জলের ধারে । কখনো টাইলার রোজ গার্ডেনের গোলক ধাঁধায়, কখনো নেচে উঠেছে প্রাণ টার্নার ঝোরার ধারে, গুহার ভেতর .. গেয়ে উঠেছে মুক্তির আনন্দে, নেচে উঠেছে ঝোরার জলের ছন্দে...


এল বি জে এক্সপ্রেস ওয়ের ওপর দিয়ে লং ড্রাইভে ছুটেছি কত কত বার আমার স্টুডেন্ট স্বামীর সেকেন্ডহ্যান্ড দুধসাদা মাজদা ৬২৬ গাড়িতে, হৈ হৈ করে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে উইকএন্ডট্রিপ !হঠাত প্ল্যান করেই "চলো লেটস গো" বলে বেরিয়ে পড়া আর কি !
প্রতি সপ্তাহান্তে এমন ছোটখাটো বেড়ানোর সাথে ছিল ভারতীয় বন্ধুমহলের কারোর একজনের বাড়িতে আয়োজিত পটলাক পার্টি । দারুণ আইডিয়া । বিদেশে এসে শিখেছিলাম । যার বাড়িতে পার্টি হবে সে ভাত/রুটি বানানোর দায়িত্বে থাকবে আর অন্যেরা যে যার ইচ্ছেমত ডিশ বানিয়ে আনবে । কেউ আবার পেপারপ্লেট, চামচ আর কোল্ডড্রিংক্সয়ের ভার নিত । দারুণ মজা হত এমন পার্টিতে । একঘেয়ে মেনু নয় কিন্তু পট লাক (potluck) অর্থাত কোন্‌ পটেতে কি আছে সেটা খাবার সময় খুলে দেখবার । আর সবচেয়ে বড় কথা হল যিনি পার্টির জন্য বাড়িতে সকলকে ডেকেছেন তাঁর ওপর অযথা চাপও পড়লনা ।

ডালাসে যেখানে ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অবস্থিত তার নাম রিচার্ডসন । যেন শহুরে গ্রামের মাদকতা সেই অঞ্চলে ।

(University of Texas @ Dallas )
রথযাত্রা দেখেছিলাম ডালাসে । ডালাস থেকে অনেকটা দূরে ইস্কনের কালাচাঁদজীর মন্দিরে রথের রশি টেনে কিছুটা স্বদেশের জন্য ব্যাকুলতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলাম ।লুচি আর পাঁচমেশালী একটি তরকারী সহযোগে ভোগপ্রসাদও পেয়েছিলাম।

এরপর মনে পড়ে ৪ঠা জুলাইয়ের সেই লঙ উইকএন্ডের কথা । আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস । ডালাসের সাবার্বে একটি খোলা মাঠের ওপর বিকেল থেকে জমায়েত হল কয়েক হাজার মানুষ । তারপর সন্ধ্যের ঝুলে একে একে আকাশে ফুটে উঠতে লাগল রঙ বেরঙের ফায়ারওয়ার্কস । আতস বাজি, আলোর বাজি এত সুন্দর ভাবে পরিবেশন আর কোথাও দেখিনি । ব্যাবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি নেই । সুষ্ঠুভাবে প্রায় তিন চার ঘন্টা বাজি পোড়ানো হল সেই মাঠের ওপর । কিন্তু কোনো বিশৃঙ্খলা চোখে পড়ল না । অথচ বৈচিত্র্যময়তায় ভরা সেই দীপাবলীর রাত যেন আনন্দে ভরপুর হয়ে উঠল । ফায়ারওয়ারক্স দেখে সে রাতের প্রোগ্রাম ছিল দল বেঁধে সকলে মিলে পিত্জা হাটে পিত্জা খেতে যাওয়া । তখন ভারতবর্ষে প্রবেশ করেনি পিত্জা হাট । তাই আমি অপার বিস্ময়ে গোগ্রাসে গিলেছিলাম সেই লোভনীয় ইটালিয়ান খাদ্য । তবে ভারতবর্ষের পিত্জা হাট কিন্তু চিজ ছড়ানোর ব্যাপারে আমেরিকার পিত্জা হাটের মত এখনো অত জেনারাস হতে পারেনি সেটাই বড় দুঃখ আমার । ঠাটবাট সব ঠিকই র‌ইল কিন্তু কোয়ালিটি একটু নিকৃষ্ট হয়ে গেল ।

সে ফাগুনের এক ভোরে আমরা প্ল্যান করে বায়ুপথে পাড়ি দিলাম ডালাস থেকে নিউইয়র্ক । আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নামে জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে অবতরণ হল । কি ঝকঝকে এয়ারপোর্ট আর কেমন সুন্দর সব ব্যবস্থা । এখানে সব কিছুর মেন্টেন্যান্স দেখলে অপার মুগ্ধতায় তাকিয়ে থাকতে হয় । এমনটিই থাকে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ।
নিউইয়র্কে এক বন্ধুর বাড়িতে কিছুদিনের জন্য আস্তানা বেঁধে সারাটাদিনের জন্য যাওয়া হল ওয়াশিংটন ডিসি ।
একটা গাড়ি নিয়ে রাজধানী শহর ওয়াশিংটন ডিসির রাজপথে.. অর্থাত যা কিনা বর্তমান রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার অফিস । ১৯৮৯ এ সেই সময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন জর্জ বুশ । হোয়াইট হাউস বা প্রেসিডেন্টের অফিসকে এখানে ক্যাপিটল বলে ( capitol)



ডিসির রাজপথ হোয়াইট হাউসের রাজকীয় শুভ্রতায় কি অসাধারণ শন্তিময়তা, বাইরের সবুজ লনে কি সুন্দর সজীবতা সাথে গেরুয়া মরশুমি ফুলের একরাশ উচ্ছ্বাস দেখে বিহ্বল হয়ে গেলাম ।
এই তিন রঙ মনে করিয়ে দিল আমার ধন্যধান্যপুষ্পে ভরা নিজের দেশের কথা । মনে মনে প্রনাম জানালাম ত্রিরঙা জাতীয় পতাকাকে।
ক্যাপিটল হিলের কাছে লিংকন মেমোরিয়াল চির শুভ্রতায় জ্বাজ্জল্যমান এব্রাহাম লিংকনের স্মৃতি নিয়ে । সেখান থেকে ন্যাশানাল মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে । সেই বহু বিতর্কিত এবং অভিশপ্ত হোপ ডায়মন্ড দেখে অবাক হতে হয় । ঘন নীল হীরে । কোনোদিনো দেখিনি এর আগে । 



(Smithsonian Museum of air and space)
ন্যাশানাল গ্যালারি অফ আর্ট থেকে এয়ার এন্ড স্পেস মিউজিয়ামে ঝুলন্ত ছোট বড় কত কত উড়োজাহাজের মডেল, আর তার বিবর্তন ।
তার মধ্যে থেকেই উঠে এল স্মৃতির মণিকোঠা থেকে রাইট ব্রাদার্সের হাতে তৈরী প্রথম প্লেনের মডেল । ক্লাস নাইনের ফিসিক্স ব‌ইয়ের সেই ছবি আজ ত্রিমাত্রিক মডেল হয়ে ঝুলছে চোখের সামনে..অরিভিল এবং উইলবার রাইট এই দুই ভাই সর্বপ্রথম আকাশের বুকে হাওয়া কাটিয়ে ত্রিমাত্রিক এরোপ্লেনের মডেল তৈরী করেছিলেন । মনে মনে ভাবলাম সার্থক হয়েছে ওয়াশিংটন আসা ।

সাময়িক বাকরূদ্ধতা !
ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশানাল গ্যালারী অফ আর্ট এ এসে পৌঁছালাম । বহু প্রতিক্ষীত ভাবনালোকের রূপসাগর ..
ডুব দিলাম সেই রূপসাগরে..
ইম্প্রেশানিস্ট, স্যুরিয়ালিস্টিক সবরকমের পেন্টিংয়ের সাথে হাতেখড়ি হল ! বিদেশের নামী সব শিল্পীর দামী সব তৈলচিত্র ।
Matisse, Rennoir, Claude Monet, Van Gogh, Paul Gauginর গল্পে মাত হয়ে গেছিল আর্ট গ্যালারির প্রতিটি করিডোর !
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হোল Da Vinciর আর এক বিরল সৃষ্টি দেখে যা মোনালিসার থেকে কোন অংশে কম নয় ।মোনালিসার হাসি নেই তাতে কিন্তু সেই ভয় মিশ্রিত গাম্ভীর্য্য..
অনবদ্য লাগল সেই আর্ট গ্যালারী পরিদর্শন । আরো চোখ জুড়িয়ে গেল ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা দেখে ।
বিদায়ের সময় মনে মনে বলে উঠলাম, বিদায় ওয়াশিংটন!
ডিসি তুমি দিগবসনা, সবুজ আঁচল শুভ্ররাজবেশে ছড়িয়ে দিয়েছো নীলের দিগন্তে , সৌন্দর্য তোমার অলংকার, রাজকীয়তা তোমার মজ্জাগত, নিয়ম শৃঙ্খলা তোমার সহজাত,
বেঁচে থাকো ডিসি তোমার অমলিন স্বর্গীয় রাজকীয়তা নিয়ে, আর সর্বকালের অহংকার নিয়ে । রাজধানী হবার যোগ্যতা তোমার মধ্যে পূর্ণমাত্রায় । 



Friday, December 6, 2013

বিরিয়ানি, মুক্তো এবং পুজোর হায়দ্রাদাদে..


রামকৃষ্ণ সারদা মঠের দুর্গাপুজো
এবার  কোলকাতার ভীড়ভাট্টা ছেড়ে হায়দ্রাবাদে পুজো কাটাতে  চাইল মন । 
দিন কয়েকের মত শিকেয় তোলা র‌ইল মহানাগরিক কোলাহল । কিন্তু তেলেঙ্গানা পৃথকীকরণের জের আর ধেয়ে আসা ঘূর্ণাবর্তের আশঙ্কায় আহ্লাদে আটখানা হতে পারলাম না ।   একটু মনখারাপও হোল তবুও  ভালো লাগল ছুটির আনন্দে ।  ছুটি যেমনই হোক  আর পুজোর ছুটি  সব ছুটির থেকে অন্যরকমের । তবে খুব মিস করছিলাম  ঢাকের শব্দ ।  এবছর আশ্বিনের শারদপ্রাতে অকাল শ্রাবণের চোখরাঙানি এ শহরকেও তাড়া করে চলেছে । বৃষ্টি শরতের মুখে একরাশ কালি ঢেলে দিয়েছে ।  মনখারাপের বাঁধ ভেঙে কবিতায় পেয়ে বসল আমায় ।


দুর্গা তোমার দুচোখ জুড়ে বৃষ্টি কেন বলো ?
দুর্গা তোমার দৃষ্টি সুদূরে আঁধারে কিম্বা আলো ।
দুর্গা তোমার ঘামতেল আজ বিষণ্ণতার ছোঁয়া
ধুলোমুঠি শাড়ি মলিন আঁচল তবুও শিউলি ধোয়া ।
...

ছোটবেলায় ষষ্ঠীর ভোরে  মা'কে দেখতাম স্নান সেরে এসে প্রত্যেক দরজার মাথায় তেল-হলুদ-সিঁদুরের ফোঁটা দিতে । মা দুর্গাষষ্ঠীর ব্রতকথা পড়ে হাতে প্রসাদ দিতেন ।  সুদূরে বসে সেই স্মৃতি রোমন্থন ছাড়া আর কোনো উপায় নেই । সেই শুভসূচনার সাথে সাথে মায়ের আগমনের শুরু হয়ে যেত  । হোটেলের জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বাচ্চাদের স্কুল যাওয়ার তাড়া । অফিসকাছারি যাবার কর্মব্যস্ততা ।  কোলকাতার সাথে কোনো তুলনা নেই এ শহরের পুজোর । হোটেলের ব্রেকফাস্ট ব্যুফেতে গিয়ে নিরামিষ ফলাহার সেরে নিলাম ষষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে ।
হোটেলের টেলিভিশনে ডিটিএইচ পরিষেবার মাধ্যমে আকাশবাণী কলকাতা পেয়ে দিব্যি খুশি হলাম । একে একে পুরোণোদিনের গান আর কলকাতার পুজোর আপডেট পেতে থাকলাম । প্যান্ডেল হপিং না করেই সেলেবদের খুচরো গসিপ আর বাংলা গান এর চেয়ে ভালো ছুটি কাটানো কিসে হতে পারে ? মাঝেমধ্যে ডিডিবাংলায় পুজো পরিক্রমা দেখে দুধের সাধ ঘোলে মেটালাম । আমার মনের ছুটির ঘন্টা আর ঢাকের বাদ্যি ততক্ষণে কোলকাতাকে এনে দিয়েছে চোখের সামনে । মায়ের আমন্ত্রণ, অধিবাস, বোধন চলছে ।
 সপ্তমীর শারদপ্রাতের সূচনায়  মনখারাপের মেঘ জমেছে । কলাবৌ স্নানের কোনো লক্ষণ নেই এ শহরে । হয়ত বা হচ্ছে তার প্রস্তুতি দূরে কোথাও , বহু দূরে । মনে পড়তে লাগল ঢাক, শাঁখের আওয়াজ.. ন'টি উদ্ভিদ চারা দিয়ে তৈরী কলা-বৌকে স্নান করিয়ে,  লাল পাড় সাদা শাড়ী পরিয়ে   মা দুর্গারূপে পুজো করা ।  
 গোলকুন্ডা ফোর্ট


   
                                                হুসেন সাগরের বুদ্ধমূর্তি
আমারা  ছিলাম   হায়দ্রাবাদের হাইটেক সিটির কাছে কোন্ডাপুরে । সেখান থেকে সপ্তমীর দিন গেলাম হুসেন সাগর নামে এক বিশাল লেকে । কি পরিচ্ছন্ন! হুসেনসাগর হায়দ্রাবাদ ও সেকেন্দ্রাবাদ এই দুই যমজ শহরকে পৃথক করে রেখেছে । 
 আর সেখানে ঐ বিশাল জলাশয়ের মধ্যে একটি অভিনব বুদ্ধমূর্তি দেখতে যাওয়া হল লঞ্চে করে । তারপর গোলকুন্ডা ফোর্ট ও চারমিনার ।
হায়দ্রাবাদের কোন্ডাপুর থেকে কোঠ্ঠা গুদাম জংশন পেরিয়ে গাচ্ছিবৌলি, নেহেরু আউটার রিং রোড দিয়ে ছুটে চললাম আমরা দুর্গ শহর গোলকুন্ডার দিকে ।   ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কাকাতীয় রাজবংশের হাতে তৈরী এই অভিনব দুর্গ ভারতের অন্যতম স্থাপত্য । কুতুবশাহী রাজাদের হাতে ক্রমাগত শ্রীবৃদ্ধি ঘটে এই দুর্গের । সাত কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা পুরো গোলকুন্ডা ফোর্টটি । এখানেই একদিন ছিল সেই ঐতিহাসিক কোহিনূর হীরে । পুরোটা ঘুরে দেখতে গেলে পুরোটা দিন লেগে যাবে । 

                                                            চারমিনার
 সপ্তমীর দিন আমাদের বাড়িতে খুব রান্নাবান্না হত ।   বিশেষ আমিষ পদ.. মাছের মাথা দিয়ে ডাল, ফুলকপি দিয়ে ভেটকি মাছ, চিংড়ির মালাইকারি, আরও কত কি! সেই  স্মৃতি নিয়ে পৌঁছে গেলাম   হায়দ্রাবাদের সবচেয়ে পুরোণো রেস্তোঁরা প্যারাডাইসে । বিরিয়ানি   রায়তা ও কাবাব দিয়ে সপ্তমীর ভোজ সারা হল ।

সন্ধ্যের ঝুলে ডোমালগুডায় রামকৃষ্ণ সারদা মঠের দুর্গাপুজো দেখতে গেলাম । সন্ধ্যারতির পর পোহা প্রসাদ পেলাম ।

                                      হায়দ্রাবাদ বাঙালী এস্যোসিয়েশানের দুর্গাপুজো
 এবার পাশেই ইন্দিরা পার্কের উল্টোদিকে  হায়দ্রাবাদ বাঙালী এস্যোসিয়েশানের ৭২বছরের পুরোণো পুজো দেখতে গেলাম ।  ওখানকার পুজোতে গিয়ে পুরোণো বন্ধুবান্ধবের সাথে দেখা হয়ে যাওয়াটা একটা বিরাট প্রাপ্তি ।   বাঙালী যেখানেই থাকুক ঠিক চেষ্টা করে যায় তার সাহিত্য-কলা-কৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখতে ।বিরিয়ানি আর মুক্তার শহর  হায়দ্রাবাদও তার ব্যাতিক্রম নয় ।  সেখানেও এক আকাশের নীচে সব বাঙালী মানুষ  গান, নাচ, নাটকের মধ্য দিয়ে দুর্গাপুজোকে পালন করছে । তবে এদের কোনো পুজোতেই কোলকাতার মত অনিয়ন্ত্রিত ভীড় নেই বা অহেতুক সেলিব্রিটি প্রদর্শনের হিড়িক নেই । আর নেই থিম পুজোর জাঁকজমক ।  কোলকাতার এক একটি বারোয়ারি পুজো এখন ‘স্পনসর্ড’ পুজো— কোনও এক কোম্পানির সম্পত্তি, কোনও একটি টেলিভিশন চ্যানেল তাদের কিনে নিয়েছে ওই পাঁচটি দিনের জন্য। প্রতিযোগিতার মাপকাঠিতে মা আসেন একটা প্যাকেজে! সেরা প্যান্ডেল, সেরা প্রতিমা, সেরা দর্শক শ্রীমতি, সেরা আরও কত কিছুর ভিড়ে কিন্তু আসল পুজো একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। সরে যাচ্ছে পুজোর মূল, অনাদি আবেদন। শুধু বেঁচে র‌ইল স্থান-কাল-পাত্র ভেদে মহাষ্টমীতে সেরা পোষাকটি পরে অঞ্জলি দেওয়া । সারা বছরের মত মায়ের কাছে বাঙালীর যত কিছু চাওয়া  । "রূপং দেহি, জয়ং দেহি, যশো দেহি"... ইত্যাদি আরো কত কিছু ।

মহাষ্টমীর ভোরে স্নান সেরে নিয়ে  হায়দ্রাবাদেও নতুন শাড়ি । তারপর আবার রামকৃষ্ণ সারদা মঠের দুর্গাপুজোয় সামিল হলাম ।ঠিক বেলুড়মঠের মত একচালার হলুদ মূর্তি মা সহ তাঁর পরিবারের । মূল মন্দিরে  ঠাকুর রামকৃষ্ণ  টুকটুকে লাল দক্ষিণি পট্টবস্ত্রে, মা সারদা টুকটুকে লাল জরিপাড় মাহেশ্বরী শাড়িতে ও স্বামী বিবেকানন্দ গেরুয়া রঙের কাঞ্জিভরম ধুতিতে ।    চন্ডীপাঠের সকাল । মন্ত্রমুগ্ধ আবহ । স্তোত্রপাঠের পর  আরতি, পুষ্পাঞ্জলি ।  সবকিছুই বেলুড়মঠের রীতি অনুসারে । কিন্তু ভীড় কম বলে আরো যেন কাছে পাওয়া সেই দুর্গাপুজোকে । কোলকাতার পুজোতে যেন অষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি বড্ড বেশি কৃত্রিম মনে হয় আজকাল । এরপর হোমযজ্ঞ । তারপর প্রসাদ বিতরণ । অভিনব ভোগপ্রসাদ । মাঠের ওপর পেতলের বিশাল হাঁড়িতে ঘিভাত বসেছে কাঠের জালে । আর সেই ঘিভাতের সাথে তেলুগু সবজী, চাটনী, পাঁপড়  ও মিষ্টি ডালপুরী । পরিতৃপ্তিতে ভরপুর মন ।  হোটেলে ফিরে এসে ডিডিবাংলায় সরাসরি বেলুড়মঠের সন্ধিপুজো দেখতে পেয়ে গেলাম ।
মনখারাপ হল তীব্র গতিতে ছুটে আসা ঘূর্ণিঝড়  পিলিন এর কথা শুনে । অন্ধ্র ও উড়িষ্যার উপকূলে ধেয়ে আসছে সেই ঘূর্ণাবর্ত । সে রাতে  অজানা আশঙ্কায় ঘুম এলনা দুচোখে ।
 বৃষ্টি কোলকাতাকে পুজোতে মুক্তি দেয়নি  কিন্তু শরতের আকাশের অনেকটা নীল দাক্ষিণাত্য মালভূমির এই শহরে  ধরা দিল । পিলিন অষ্টমীর রাতে ঊড়িষ্যার উপকূলে আছাড়ে পড়েছে এর‌ই মধ্যে । ততক্ষণে পিলিন শান্ত হয়েছে   অন্ধ্রে  । তবে ঊড়িষ্যায় বিপুল ক্ষতি করেছে । 

                                       সালার জাং মিউজিয়ামের বিখ্যাত ভেলড রেবেকা
 নবমীর সকালে এ শহরের আরো এক মুখ্য আকর্ষণ সালার-জাং মিউজিয়ামে ঘুরে ঘুরে থকে যাওয়া আর নবমীনিশিতে আবার মন উচাটন কোলকাতার ধুনুচিনাচের জন্য । আর সেই সোনার প্রতিমা ভাসানের সুর যেন বেজে উঠল কানে কানে ।

 মনে মনে গেয়ে উঠলাম " নবমীনিশি রে তোর দয়া নাই! এত করে সাধিলাম ..."

নবমীর দুপুরে মাংস খাওয়ার রেওয়াজ সব বাঙালী বাড়িতে । কাবাব-বিরিয়ানি-তন্দুরীর শহরে তার জন্য হাপিত্যেশ নেই । অলিগলিতে মুখরোচক দোকান । ঐদিন এ শহরে নবরাত্রির সাজগোজ যেন একটু বেশিমাত্রায় নজরে এল । 
দশমীর দুপুর থেকে বাড়িতে শুরু হয়ে যেত নিমকী-নাড়ু আর ঘুগনীর তোড়জোড় । কত মানুষ আসবে বাড়িতে । কিন্তু এখন কোলকাতায় সেই রেওয়াজ যেন অনেকটাই স্তিমিত । দল বেঁধে যাওয়া হত বিজয়া করতে । প্রবাসে বসে আরো যেন এইগুলো পেয়ে বসে আমাকে । মনে হয় আমি যেন দলছুট এক কোলকাতাইয়া । তবে হাইটেক সিটি ছেড়ে যেতে যেতে কেবল মনে হতে লাগল আমার শহরের কথা । হায়দ্রাবাদ কোলকাতা দুই পুরোণো শহর । কিন্তু এ শহরে শুধু শিল্পের জোয়ার । শেষদিন খেতে গেছিলাম এক রেস্তোঁরায় । সেখানে বাঁকুড়ার এক বাঙালী যুবক হোটেলে কাজ করে । সে বলল তার দুঃখের কথা । দেশ ছেড়ে পুজোর সময় তার মোটেও ভালো লাগছেনা কিন্তু বাঁকুড়ায় পড়ে থাকলে তার সংসার চলবেনা  তাই কাজের জন্য দলে দলে ছেলেরা বাঁকুড়া ছেড়ে হায়দ্রাবাদে পাড়ি দিয়েছে .. সে জানাল ।   আবারো মনটা ভারি হয়ে গেল তার কথাগুলো শুনে ।
দুর্গাপুজো নিয়ে ব্যস্ত থাকুক কোলকাতার বাঙালী । যদি মাদুর্গা ভবিষ্যতে প্রসন্না হন তবে আমাদের এই শহরেও শিল্পের জোয়ার আসবে ।  সেই সুপ্ত বাসনা নিয়ে উঠে পড়লাম ট্রেনে ।  
আমাদের পরবর্তী  পিটষ্টপ ভাইজ্যাগ্-আরাকু ভ্যালিতে ।  ইষ্টকোষ্টের ধার ঘেঁষে  গোদাবরী এক্সপ্রেস ছুটে চলল । 

Monday, August 5, 2013

খোদিত পাষাণে, বুদ্ধের শরণে...



সে অনেক যুগ আগের কথা ।  মৌর্য সম্রাট অশোক  বুদ্ধ বিগলিত অন্তরে কেঁদে বললেন,  "বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি,   ধর্মং শরণং গচ্ছামি" । প্রচুর প্রভাবপ্রতিপত্তির অধিকারী হয়ে উড়িষ্যার ধৌলী পাহাড়ের গায়ে , দয়ানদীর তীরে হাজার হাজার মানুষের রক্তপাত ঘটতে দেখে সাম্রাজ্যবাদের উচ্চাশা ত্যাগ করে  শেষমেশ তিনি   বেছে নিলেন অহিংস রাজনীতির পথ । কলিঙ্গযুদ্ধের  এই ভয়াবহ পরিণতি তাঁকে   সম্পূর্ণ রূপান্তরিত করল অন্য সত্তায়; সত্ত্ব, রজ ও তম এই তিন গুণের মধ্যে তিনি শুধুমাত্র বেছে নিলেন সত্ত্বগুণকে । শরণ নিলেন গৌতমবুদ্ধের্, আশ্রয় নিলেন ধর্মের । সম্রাট অশোকের "চন্ডাশোক" থেকে "ধর্মাশোকে" উত্তরণ ঘটল ।


অশোক যখন উজ্জয়িনীর ভাইসরয় ছিলেন তখন বিদিশার সওদাগরের কন্যা বেদিশা মহাদেবী বা দেবীকে বিবাহ করেন । কলিঙ্গ যুদ্ধের মৃত্যুমিছিলের শোকে  ব্যাথিত, ক্লিষ্ট, অনুতপ্ত রাজার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তার এই স্ত্রী দেবী । তার দুখের ঘায়ে প্রলেপ দিয়ে মনের জালা জুড়িয়েছিলেন  এই দেবী। বৌদ্ধধর্মের আদর্শে তাঁকে অণুপ্রাণিত করেছিলেন । বিদিশা মধ্যপ্রদেশের একটি শহর। যার দশ কিমি দূরে অশোক স্থাপন করলেন অধুনা  বিশ্ব-হেরিটেজ মর্যাদা সম্পন্ন বৌদ্ধমন্দির যা সাঁচী স্তূপ নামে খ্যাত । সিন্ধুসভ্যতার সবচেয়ে সংরক্ষিত নিদর্শন এই সাঁচীস্তূপ । মধ্যপ্রদেশের  রাইসেন জেলায়, ভোপালের ৪৬ কিমি দূরে, বেতোয়া নদীর ধারে এই ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ মনুমেন্টটি এখনো রাজকীয়তায় পরিপূর্ণ ।  বৌদ্ধ স্থাপত্যের সর্বপ্রকার বৈচিত্র্য অর্থাত স্তূপ, মন্দির, স্তম্ভ, বিহার এবং চৈত্য সবকিছুই নিঁখুত ভাবে রয়েছে এখানে ।   



কয়েক একর জায়গা জুড়ে সাঁচী স্তূপ, মন্দির চৈত্য এবং স্তম্ভগুলি । সারাদিন লেগে যাবে ঘুরে ঘুরে দেখতে ।  কিন্তু সবগুলি স্থাপত্য সম্রাট অশোকের আমলে তৈরী হয়নি ।  বহুবছর ধরে গড়ে উঠেছিল সাঁচী । অশোক সাঁচীর মৃত্তিকায় কুড়িয়ে পেয়েছিলেন শান্তির টুকরো টুকরো কণা। সাঁচীর বাতাসে অনুভব করেছিলেন অহিংসার গন্ধ । উপাসনার আদর্শ স্থান, আরাধনায় দিব্যদৃষ্টি  হয়ত পেয়েছিলেন অশোক । কিম্বা নিছক শান্তির পরিমন্ডল তাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল কলিঙ্গযুদ্ধের রক্তপাত ।


বৌদ্ধধর্মের উত্থান ও পতনের সাথে সাথে সাঁচীস্তুপের অনেক সংযোজন, সংস্করণ এবং পরিবর্তন হয়েছে । অশোকের মৃত্যুর পর শুঙ্গবংশের রাজত্বকালে মৌর্য সাম্রায্যের শত্রু পুষ্যমিত্র শুঙ্গের দ্বারা অনেক ক্ষতিসাধন হয়েছিল সাঁচীর আদি স্তুপের । পরে তার পুত্র অগ্নিমিত্রের আমলে এই সাঁচীস্তুপের বিবিধ উন্নতিসাধন হয় । অগ্নিমিত্র নিজে বৌদ্ধধর্মের অনুরক্ত ছিলেন বলেই তা সম্ভব হয়েছিল ।  তিনি যেমন একাধারে এই স্তুপের  রক্ষণাবেক্ষণ করেন তেমনি ছোট বড় অনেক তোরণ এবং স্তূপ তৈরীও করেছিলেন ।  শুঙ্গবংশের পর সাতবাহনদের আমলে সাতবাহন রাজাদের চাঞ্চল্যকর স্থাপত্য কীর্তি সাঁচী স্তুপকে বিশেষ মাত্রা দেয় ।    স্তম্ভগুলিতে খোদাই করা ব্রাহ্মিলিপি থেকে অনেক কিছু জানা গেছে । সাঁচী শব্দটির উত্পত্তি সংস্কৃত এবং পালি শব্দ সাঁচ থেকে যার অর্থ হল to measure  বা মাপা। হিন্দীতে সাঁচীর অর্থ হল  Moulds of stones
প্রধান স্তূপটি যেটি অশোক তৈরী করেছিলেন সেটি বিশাল এবং রাজকীয় । অর্ধচন্দ্রাকৃতি এই বিশাল সাঁচীস্তূপটির ওপরে একটি  তিন প্রস্থ ছাতা যাকে বলে ছত্তাবলী রয়েছে  যা এক চতুষ্কোণ রেলিংয়ের  মধ্যে আবদ্ধ । কিছুদূর উঠে একটি বারান্দা বা মেধি যার বাইরে দিয়ে পাথরের বেষ্টনী । পাথর বিছানো মিছিল পথ বা প্রদক্ষিণ পথ রয়েছে মাটীতে যাকে ঘিরে আবার পাথরের বেষ্টনী ।




প্রধান এই স্তূপের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম দিকে চারটি প্রবেশদ্বার বা তোরণ রয়েছে । প্রত্যেকটি তোরণ অসাধারণ সুন্দর পাথরের কারুকাজ করা । ওপরে জাতকের গল্প , গৌতম বুদ্ধের জীবন কাহিনী এবং স্থপতির নাম ব্রাহ্মি লিপিতে খোদাই করা ।  বুদ্ধের রেলিক্‌স বা দেহাবশেষ (অস্থিভস্ম)রাখা রয়েছে  স্তূপের নীচে । দক্ষিণ তোরণের বাঁদিকে লক্ষ্য করা যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লিপি যা পড়ে জানা যায় যে বিদিশার হাতীরদাঁতের কারুশিল্পীর স্থপতিদের দ্বারা তৈরী হয়েছিল এই স্থাপত্য ।  উত্তরের প্রবেশদ্বারে রয়েছে ধর্মচক্র যা আমাদের ভারতীয় জাতীয় পতাকার মধ্যে নীল রঙে আঁকা থাকে । সেখানে আরো দেখা যায় একটি বানরকে যে ধ্যানস্থ বুদ্ধকে মধু উত্সর্গ করছে । দেখা যায় বুদ্ধভক্ত সুজাতাকে যে পায়েস দান করছে । পূর্বদিকের প্রবেশদ্বারে পাথরে খোদাই করা গাছ এবং পশুপাখি পরিবেষ্টিত সিংহাসনারূঢ় বুদ্ধকে । পশ্চিম দিকের প্রবেশদ্বারে কুশীনগরে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ লক্ষ্য করা যায় ।  স্তম্ভের গায়ে পাথরের খোদাই যে কতটা নিপুণ এবং স্থপতির শিল্পীসত্তা যে কতটা উন্নতমানের তা চোখে না দেখলে বোঝা যায় না । এইভাবে কোনোটিতে  বুদ্ধের তাঁর শিষ্যদের বাণী প্রচারা, অরেকটিতে অশোকের বোধগয়া যাত্রা , আবার আরেকটিতে দোলাছত্রধারী জনতার মাঝে বুদ্ধের নিরঞ্জনা নদীতে গমন । আবার ছোটবেলায় ইতিহাস ব‌ইতে পড়া বুদ্ধের জন্মের কাহিনী, কপিলাবস্তুতে রাজা শুদ্ধোদনের রাণীর স্বপ্নে শ্বেতহস্তী দর্শন  আর সর্বপরি বুদ্ধের সিদ্ধিলাভের সময় ঐহিক সব প্রলোভনের কাহিনী সব ঐ পিলারগুলির গায়ে বিবৃত হতে দেখে মনে হল এতদিন ধরে যা আমরা পড়ে এসেছি এবং বিশ্বাস করে এসেছি কোনোটিই অসত্য নয়  ।  দক্ষিণ দিকের প্রবেশদ্বারে রয়েছে সেই ঐতিহাসিক অশোক স্তম্ভ যা ভারতের জাতীয় প্রতীক । সেই পাথরে নিখুঁত খোদাই করা চারমুখে চারটি সিংহের মুখ ।    আমার ইতিহাস ব‌ইয়ের পাতা আজ জীবন্ত আমার চোখের সামনে । এই অশোক স্তম্ভ এবং অশোকচক্রের সামনে দাঁড়িয়ে কেমন যেন গর্বিত মনে হল নিজেকে ।    খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর এই স্থাপত্যের চিহ্ন আমরা বহন করে চলেছি এখনো, অক্লেশে, ঐতিহ্যের সাথে, সম্মানের সঙ্গে ।
আমরা  ভোপাল থেকে সাঁচী পৌঁছলাম ঘন্টা দুয়েক পরে । পথে পেরোলাম কর্কটক্রান্তি রেখা । আমাদের যাত্রাপথকে তেরছা ভাবে কেটেছে সেই পথে । কেমন অভাবনীয় ভাবে এসে পড়লাম ঐ রেখার ওপর । এতদিন যার অস্তিত্ব ছিল ভূগোল ব‌ইয়ের পাতায়, মানচিত্রে  সেই ট্রপিক অফ ক্যানসারের ভারতীয় অংশ আমার পায়ের তলায় । ভারতের মাটি চিরে ঐ পথে রেখাটি চলে গেছে ।



পড়ন্ত রোদের আলোয় সাঁচীকে বড় উজ্জ্বল মনে হ'ল এবং প্রকৃতপক্ষে তা এখনো বৌদ্ধস্থাপত্যে ভাস্বর । সবুজ লন । একটা স্থানে ছোট ছোট জীব যেমন খরগোশ, হাঁস, পায়রা ছেড়ে রেখে দেওয়া হয়েছে ।তাদের পালন করা হচ্ছে ।   বৌদ্ধধর্মের অহিংসার একটি অন্যতম ধারা যা বহন করছে । সূর্যডোবার সেই মূহুর্তে সাঁচীস্তূপে দাঁড়িয়ে মনে হল সম্রাট অশোক সেই খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে কত প্রতিকূলতার মধ্যে এই সাঁচী পাহাড়ে পৌঁছেছিলেন আর অমন দৃষ্টিনন্দন একটি বৌদ্ধ মন্দির এবং স্তূপ তৈরি করার পরিকল্পনা করেছিলেন যা এখনো এই একবিংশ শতাব্দীতেও মানুষের মনে শিহরণ জাগায় ।

ভারত বিচিত্রা এপ্রিলসংখ্যা ২০১৩  

http://www.hcidhaka.org/bharat_bichitra.php

Sunday, July 21, 2013

মইস্যার মনসার থানে

নদীমাতৃক দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বৃহত জেলা মেদিনীপুর । সেখানে যেমন আছে নদীর জলে পুষ্ট সবুজ গভীর জঙ্গল ঠিক তেমনি আছে ঐ জঙ্গলের স্যাঁতস্যাঁতে জমিতে অগুন্তি সরীসৃপের পরিবার । ছোট বড় নদীর জল , ঝোপঝাড়ে বেড়ে ওঠা এই সরীসৃপদের মধ্যে বাংলার বিখ্যাত সব সাপেরা গড়ে তুলেছে এক সুন্দর ইকোসিস্টেম । তাদের খুব পছন্দের জায়গা পশ্চিমবাংলার এই স্থানটি । ঘন জঙ্গলের মধ্যে সূর্যালোক প্রবেশ করেনা, বানভাসি শ্রাবণ-ভাদ্রের থৈ থৈ নদীর দুকুল ছাপিয়ে জল ও চলে আসে সেই জঙ্গলে আর মনের সুখে দিন যাপন করে শঙ্খচূড়, কালনাগিনী, গোখরো, খরিস, চন্দ্রবোড়া সমেত আরো নানা অজানা সাপেরা । এদিকে এই বিশাল জেলায় আছে অঢেল চাষযোগ্য জমি । তাই কৃষকেরা রোজ মা মনসাকে স্মরণ করে ক্ষেতে যায় চাষ করতে । শীতে একটু আরাম । সাপেরা তখন হাইবারনেট করে, গর্তের নীচে শীতঘুম দেয় কিন্তু প্রচন্ড গরমের দাবদাহে বাইরে চলে আসে । বর্ষায় দেখায় উদ্দাম নৃত্য। চাষীবৌ কুঁড়ের ধারে পথ চেয়ে বসে ভাবে স্বামীর কথা । বর্ষার হাঁটুজলে ধানচারা লাগাতে গিয়ে যদি সাপে কাটে তার স্বামীকে ।
সে জানে সাপকে নাকি জ্বালাতন না করলে সে কিচ্ছু করেনা কিন্তু তার ল্যাজে পা পড়ে গেলে সে ভয়ানক রেগে যায় । আর বিষধর সাপ হলে তো আর কথাই নেই ! কৃষক যখন আর হাল দিতে পারেনা বৌ তার চেলেমেয়েকে নিয়ে মাঠে যায় । গিয়ে আবার ঐ এক চিন্তা ঘোরে মাথার মধ্যে । সেবার সাপে কেটেছিল গ্রামের একটা বাচ্চা ছেলেকে । ঝাড়ফুঁক করল ওঝা এসে । আয়ুর্বেদিক ডাক্তার এসে বিষ বের করে ওষুধ লাগিয়ে দিল । অনেক কষ্টে মা মনসার দয়ায় সে যাত্রায় বেঁচে গেল ছেলেটা । সন্ধ্যেবেলা কুঁড়েঘরের দাওয়ায় বসে মেয়েরা মনসার ভাসান গীত গাইল । এইভাবে কাটে সব চাষীদের জীবন । ওরা ধান বোনে আমাদের জন্য কিন্তু সেই ধান বোনার পেছনে কত ভয় মেশানো কাহিনী থাকে তা তো আমরা জানিওনা । সেবার ধানের গোলায় সাপ ঢুকে সে কি বিপত্তি । আরেকবার মাটির ঘরের চালে লাউয়ের মাচা থেকে লাউ আনতে গিয়ে একটা সবুজ লাউডগা তো বাচ্চা একটা চাষীবৌয়ের হাতে জড়িয়ে সে কি কান্ড! মেয়েটা তো ভয়েই অজ্ঞান । ভাগ্যি লাউডগা সাপের বিষ নেই ! একটু বেশি বৃষ্টি হলে ঘর-উঠোন যখন জলে জলময় হয় তখন দু-একটা জলঢোঁড়া ঢুকে পড়ে ঘরের মধ্যে । মাটির ঘরে না আছে ইলেকট্রিক না আছে পাকা ছাদ । বেশি বৃষ্টি হলে দু'একটা চিতি সাপকে চুপচাপ মশারীর দড়ির সাথে জড়িয়েও থাকতে দেখেছে ওরা । খোলস ছেড়ে সাপেরা যখন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ে তখন কত বিচিত্র রংয়ের খোলস দেখে গ্রামের লোকে । আবার সেই ভয় মনের মধ্যে পুষে রেখে দিনের পর দিন বুক বেঁধে কাটায় ওরা !
অথচ সাপের ভয় থাকলে কি হবে এই মেদিনীপুরই ছিল ভারতের ব্রিটিশ হটাও আন্দোলনের মুখ্য কেন্দ্র । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ক্ষুদিরাম বসুর মত মানুষের জন্মস্থান এই মেদিনীপুর । কংসাবতী, সুবর্ণরেখা, শিলাবতী প্রভৃতি নদীর জলে পুষ্ট, ধনধান্য-পুষ্প-ভরা এই জেলার মাটি । কুরুম্ভেরা, গোপগড়, কর্ণাগড়, ময়নাগড়, বর্গভীমা, খড়গেশ্বর, হিড়িম্বেশ্বরী, পাথরার মত মন্দিরময় । ঝাড়গ্রামের মত স্বাস্থ্যকর ট্যুরিষ্ট স্পট আছে এখানে । পূর্ব মেদিনীপুরে আছে দীঘার সমুদ্র সৈকত । বঙ্গোপসাগরের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে আরো আরো ট্যুরিষ্ট কেন্দ্র হয়েছে তাজপুর, মন্দারমণি আর চন্দনেশ্বরে ।
পশ্চিম মেদিনীপুরের জকপুরের কাছে এমন এক জঙ্গল আছে যাকে গ্রামের মানুষেরা মনসার জঙ্গল বলে । ঐ জঙ্গলের দক্ষিণ পাশে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তারিত এক গভীর খাল ছিল । বর্ষার সময় অতিবৃষ্টিতে ঐ খাল দিয়ে খড়গপুর সহ পশ্চিমের উঁচু জায়গায় বৃষ্টির জল হৈ হৈ করে বয়ে যেত পুব দিকে আর বন্যার আকারে জমেই থাকত সেখানে । শরতের কাশফুলের রমরমায় খালপাড় তখন মেতে উঠত পুজোর আনন্দে । এখানকার কৃষকেরা মনের আনন্দে ধানচাষ করে আরভাদু পরব উদ্‌যাপন করে মনের আনন্দে কিন্তু তবুও কোথায় যেন একটু অশান্তি সর্বক্ষণের ...ঐ সর্পকুলে বসবাসের জন্য । মা মনসাকে সর্বদা স্মরনে-মননে রাখে । শ্রাবণ-ভাদ্রের শনি-মঙ্গলবারে মনসার পুজো দেয় । শুধু সাপের কারণেই নয় মনসাকে তারা কৃষিদেবী রূপেও মানে । তাদের রুজি-রোজগার, সম্বচ্ছরের খোরাকি সব ঐ ধান চাষকে ঘিরে । পর্যাপ্ত বর্ষায় প্রচুর ধানে মাঠঘাট যাতে সবুজে ভরে ওঠে, তাই সমস্ত চাষীরা একজোট হয়ে ঐ জঙ্গলের কোনো এক ধারে মা মনসার আরাধনা করে চলে বছরের পর বছর ধরে । পাকা ধান তোলার সময় প্রত্যেকে এক আঁটি করে পাকা ধান মাথায় করে মা মনসার থানে রেখে এসে মা'কে মিনতি জানায়: "মা গো, আমরা ছাপোষা মানুষ, দিন আনি দিন খাই, পেটের দায়ে চাষ করছি, আমাদের অপরাধ মার্জনা কোরো, সম্বচ্ছর সন্তানদের দুধেভাতে রেখো, পরের বছর যেন আবার চাষ করে তোমাকে ফসল দিয়ে পুজো দিতে পারি মা "
প্রায় চারশো বছর আগে জকপুরের জমিদার যোগেশ্বর রায় একদিন ভোর রাতে মা মনসার স্বপ্নাদেশ পেলেন । তিনি স্পষ্ট দেখেন, চতুর্ভুজা মা মনসা হাত নেড়ে নেড়ে তাকে বলছেন, ঐ জঙ্গলেই মা আছেন । জমিদার যেন মায়ের পুজোর প্রচার করেন ।
ভয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়ে জমিদার কাঁপতে কাঁপতে ঘটি ঘটি জল খেয়ে স্ত্রীকে ডেকে বলেন সব কথা । মূহুর্তের মধ্যে কাকভোরে জমিদার বাড়িতে যে যেখানে ছিল হাজির হয়ে যায় । ঐ জঙ্গলের সাপের কথা সকলের জানা । মা মনসার থান বলে জঙ্গলে যে স্থানটিতে স্থানীয় মানুষ পুজো করে সেখানে এক মস্ত উইঢিপি । তার নীচে কিলবিল করে অসংখ্য সাপ । একথা সকলে প্রত্যক্ষ করেছে । সূর্যোদয়ের পরেই সেদিন জমিদার সদলবলে ঐ স্থানে গিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে মায়ের নিয়মিত পুজোর আদেশ দেন । ক্রমে কাঠুরেরা কুঠার আর হাঁসুয়া দিয়ে ভয়ে ভয়ে জঙ্গল কেটে কিছুটা সাফ করে ফেলে । মায়ের থানে আসার রাস্তাও কাটা হতে থাকে । চোখের সামনে তারা বিষধর সাপেদের রাস্তা এপার ওপার করতে দেখে । উইঢিপিটিকে কংক্রিটে মুড়ে দেওয়া হয় । পাশে একটি লাল পদ্ম বানানো হয় উইঢিপির মাটি দিয়ে । ঢাক, শাঁখ ও ঘন্টার ধ্বনিতে জঙ্গলের চির নীরবতাকে ভেঙে দিয়ে মনসার থানকে মর্যাদা দেন জমিদার যোগেশ্বর রায় । নারীপুরুষ নিজের হাতে মায়ের পুজো দেয় সেখানে । যেমন করে আমরাও পুজো করলাম ফুল, দুধ আর কলা কিনে । উইঢিপির ওপরেই দিধ ঢেলে সিঁদুর মাখিয়ে পুজো করা হল মা মনসা কে । ইচ্ছামত যা খুশি দাও । না দিলেও কেউ কিছু বলবেনা । পান্ডা বা পূজারীরও উপদ্রব নেই ।
বর্তমানে যে স্থানে মায়ের পুজো হয় সেই স্থানে আমরা গেছিলাম খড়গপুর থেকে ।
খড়গপুর থেকে NH-2 ধরে কোলকাতার দিকে গিয়ে জকপুর রেলষ্টেশনের দক্ষিণ পাশ দিয়ে ডুবগোহাল স্কুলের পাশ দিয়ে ম‌ইশ্যা গ্রামের ভিতর দিয়ে মনসা মন্দিরে যাওয়া যায় । খড়গপুর স্টশন থেকে লোকাল ট্রেনে জকপুর বা মাদপুর স্টেশনে নেমে ট্রেকার বা ভাড়ার গাড়িতে মন্দিরে যাওয়া যায় । কোলকাতা বা হাওড়া থেকে লোকালে মাদপুর বা জকপুর নেমে এক‌ইভাবে মন্দিরে আসতে হয় ।
পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সে এক এডভেঞ্চার! আমাদের হাতে গুগ্‌লম্যাপ । আমরা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গ্রামের সরু মেঠো লাল রাস্তার মধ্যে দিয়ে হঠাত আবিষ্কার করলাম ম‌ইশ্যা । গাড়ির কাঁচ নামাতেই বনফুলের সোঁদা গন্ধ নাকে এল । আর পাখপাখালির কিচিরমিচির । কোথাও একটু ধানজমি কোথাও আবার সর্ষে ক্ষেতের হলুদ । সজনেফুলের গন্ধ বাতাস চারিদিক আচ্ছন্ন করে রেখেছে । আমগাছে মুকুল এসেছে সবে । কুঁড়ে ঘরের লাগোয়া একফালি জমিতে কত কত আলু, ফুলকপি, টমেটো ! কি ভলো লাগে আমার এসব তারিয়ে তারিয়ে দেখতে ! সেই জমিদারের আমল থেকে ঐ মনসা থানে মা বিষহরির পুজো হয়ে আসছে । খোলা অকাশের নীচে ঐ উইঢিপির কুন্ডলী ও পদ্মফুলে সারা বছর ধরে পুণ্যার্থীরা ফুল চড়াতে আসেন শুধু কৃষির জন্য এবং সাপের দংশনে যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেই জন্য । কথায় বলে "বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর" তাই প্রতিবছর চৈত্রমাসের তৃতীয় মঙ্গলবারে এখানে মনসামায়ের মহাপূজা আর মেলা হয় । নিজের হাতে পুজো দেন দলে দলে পুণ্যার্থী । পশ্চিমবাংলায় গঙ্গাসাগরের মেলার পর এটি দ্বিতীয় বড় জনসমাগমের মেলা । সেই জমিদারের আমলে এই পুজোর রমরমা শুরু হতে থাকে । তারপর বৃটিশ সরকার মাদপুর থেকে জকপুর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করে। মায়ের থানে দাঁড়িয়ে রেললাইন এবং অনবরত ট্রেন যাওয়া আসা দেখা যায় । মন যেন হারিয়ে যায় কোথায় । সেই ট্রেনের বাঁশী আর মন্দিরের স্থান-মাহাত্ম্য মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় এক আকাশের নীচে ।
স্থানীয় মানুষ বৃটিশদের অনেক কাকুতি মিনতি জানিয়ে মায়ের থানের বেদীকে বাঁচিয়ে রেলের লাইন নির্মাণ করতে অনুরোধ জানিয়েছিল । সাহেবরা হেসে কুটিপাটি ! সেই কথা শুনে বলেছিল "হিন্দুডের ওয়াটার, স্কাই, ফায়ার, এসবের ডেব্‌টা আঠে । বাট্‌ স্নেকের ডেব্‌টা! হোয়াট ইজ দিস?" বলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছে । মানুষেরা সাহেবকে অনেক ভয় দেখাল এবং সম্মিলিত হয়ে বাধা দিল। তাদের বাধা তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার বাইরে থেকে আনা শ্রমিক দিয়ে বাহুবলের দ্বারা জঙ্গল পরিষ্কারের কাজ শুরু করে দিল । হাজার হাজার বিষধর সাপ জঙ্গলের মধ্যে থেকে উঁকিঝুঁকি দিতে দিতে অতঃপর সেই বৃটিশ ইঞ্জিনিয়ার সহ আরো অনেক উচ্চপদস্থ কর্মচারীকে দংশন করে তাদের প্রাণ নিল । এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকেরা প্রাণের ভয়ে ত্রিসীমানা ছেড়ে জীবন নিয়ে দৌড়ে পালাল । নতুন শ্রমিক এসে ক্রুদ্ধ হয়ে আগুন লাগিয়ে দিল জঙ্গলে । সর্পকুল বিনষ্ট হবে এই আশায় । কিন্তু বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে গেল তারা । তারপর জমিদার প্রজাদের সঙ্গে করে জঙ্গলের মধ্যে সরু রাস্তা কাটিয়ে অনায়াস যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দিলেন এবং আবার সশরীরে ফিরে এলেন প্রজাদের নিয়ে । মা মনসা নিজের মন্দিরে প্রবেশের পথ এইভাবে করে দিলেন । 

মেদিনীপুর সহ সমগ্র দক্ষিণবাংলার মানুষ পুত্রলাভের আশায়, বেকারের চাকুরীর আশায়, হারানো গরুর খোঁজে, মারণ ব্যাধির নিরাময়ে মায়ের থানে মানত করে যায় । মেলা ও মহাপুজোর দিন নানাপ্রকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পুজো কমিটি । স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবির, বস্ত্রদান, দুঃস্থ ছাত্রদের পুস্তকদানের মত উন্নয়ন মূলক কাজও করে থাকে এই পুজো কমিটি ।


ছোটদের ই-পত্রিকা ইচ্ছামতী গ্রীষ্মসংখ্যা ২০১৩ তে প্রকাশিত  


ময়নাগড় অভিযান



খড়গপুর থেকে ডেবরা হয়ে পূর্ব মেদিনীপুরের দিকে । কোলাঘাট অবধি ন্যশানাল হাইওয়ে ৬ ধরে সোজা চলেছিলাম শীতের ছুটির সকালে । তারপর গাড়ি থামিয়ে স্মার্টফোনের গুগ্‌ল ম্যাপ বাকী পথের দিশা দেখাল । কোলাঘাট থেকে হলদিয়ার পথ ধরলাম এবার । কাগগেচ্ছা গ্রাম হয়ে নিমতৌড়ি । সেখানে গিয়ে স্থানীয় পুছতাছ । বুঝলাম ময়নাগড় এসে গেছে । এতক্ষণ চলছিল হাইওয়ের ধারে হলুদ সর্ষে ক্ষেত, জলে ডোবা ধানক্ষেতে গুছগুচ্ছ ধানচারার ওপর মাঘের রোদ-কণার লুটোপুটি । এবার গ্রামের কুঁড়ের লাগোয়া সজনে ফুলের গন্ধে মম করা বাতাস, বাঁশঝাড় আর চিংড়ির আড়ত । খড়ের ছায়ার ঘেরা পানের বরজ ।


একটা নদীর ব্রিজ পেরোতেই লেখা স্বাগতম ১০০০ বছরের পুরোণো ময়নাগড়ে । গ্রামের নাম গড়সাফাত । মাঠের ওপর বিদ্যাসাগর পাঠাগারের সামনে গাড়ি রেখে এবার অভিযান ময়নাগড় ।


রাজবাড়ির বিশাল গেটের ওপরে লেখা রয়েছে ইতিবৃত্ত । ধর্মমঙ্গল কাব্যগ্রন্থে ময়নাচৌড়া বা ময়নাগড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়|

 রাঢ়বঙ্গের মহাকাব্য এই ধর্মমঙ্গলের প্রধান নায়ক ছিলেন রাজা লাউসেন। ইনি ছিলেন ময়নাগড়ের ধর্মরাজের প্রতিষ্ঠাতা । হিন্দুধর্মের তন্ত্রবিদ্যা এবং মহাযানী বৌদ্ধদের মতবাদের পাশাপাশি মুসলমান ধর্মের এক সুন্দর সমন্বয় ঘটেছিল এই অঞ্চলে । ময়নাগড় এই কিংবদন্তী পালরাজা লাউসেন নির্মিত গড় বা কেল্লার জন্য এককালে প্রসিদ্ধ ছিল । এখন সেই কেল্লার অবস্থান কেবলমাত্র ইতিহাসের পাতায় । এরপর অনেক জল গড়িয়েছে । পলাশীর যুদ্ধের পর ওয়ারেন হেষ্টিংসের আক্রমণে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয় ময়নাগড় । কিন্তু এই ধর্মরাজ্য স্থানান্তরিত হয়নি । কংসাবতী নদীর মধ্যে দ্বীপের মধ্যে দ্বীপ এই নয়নাভিরাম ময়নাগড় । এমনকি মধ্যযুগে মারাঠাদস্যু বর্গীর আক্রমণেও প্রাচীনতম দুর্গটির ক্ষতি হয়নি । ময়ানাগড়ের বৈশিষ্ট্য হল শান্ত পরিবেশের মধ্যে গাছগাছলি ঘেরা বিশাল নদীর পাড় । নারকেল গাছের ছায়ায় ছায়ায় হেঁটে হেঁটে বুঝলাম ওপারে অপূর্ব একটি মন্দির রয়েছে ।

কিন্তু সেখানে পৌঁছাব কি করে ? তখন বেলা গড়িয়ে দুপুর । নদীর ঘাটে দু একটা ডিঙি নৌকো বাঁধা কিন্তু মাঝি নেই একটাও । একটা বুড়ি নদীর জলে কি যেন ধুচ্ছিল তাকে শুধালাম । সে বাড়ি গিয়ে তার কোন এক আত্মীয়কে ডেকে দিল । সেই ছেলেটি আমাদের ডিঙিনৌকো করে ওপারে পৌঁছে দিল । জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটছি । রাজবাড়ীর প্রকান্ড ধ্বংসাবশেষের বারমহল পেরিয়ে চলেছি আমরা মন্দিরমহলে । প্রথমে তুলসীমঞ্চ পেরিয়ে রাধাকৃষ্ণ মন্দির । অপূর্ব বিগ্রহ । নিত্য পুজোপাঠ হয় । সকাল সকাল এসে বলে রাখলে ভোগপ্রসাদও পাওয়া যায় । মন্দিরের একপাশে সতীরাণীর ঘাট । ফলপাকড়ের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা মুগ্ধ করে । সেখান থেকে শিবমন্দির । টেরাকোটার অপূর্ব কাজ মন্দিরের গায় । ভেতরে স্বয়ংভূ শিবলিঙ্গ পাতাল থেকে প্রোথিত আর রংকিনীদেবীর বিগ্রহ যিনি এখানে ভদ্রকালী রূপে পূজিতা । মহাদেবের নাম লোকেশ্বর । মন্দিরের বাইরে একটি পাথরের নততলে গাঁথা রয়েছে সূর্যশঙ্খ । সূর্যের পুজো করার জন্য এই শাঁখে জল দেওয়া হত পূর্বে ।


কার্তিকমাসে রাশ পূর্ণিমার সময় এখানে সবচেয়ে বেশী ভীড় হয় । পাশের আরেকটি দ্বীপে নৌকায় করে দলবল নিয়ে রাধাকৃষ্ণ রাসলীলায় সামিল হন আর রাসমঞ্চে হাজির হন । প্রতিবছর রং, ধোয়া মাজার কারণে রাসমঞ্চটি বেশ ঝকঝকে । তখন এখানে বিশাল মেলা হয় । নয়াগ্রাম থেকে পটশিল্পীরা এসে পটচিত্রের পসরা বসিয়ে হাতের আঁকা শিল্পকর্মের সাথে গেয়ে শোনান তাদের ঘরাণার কাব্যগান । পাথরের ও বাঁশের কাজেরও বিক্রিবাটরা চলে । আশপাশের গ্রাম থেকে লাখ দুয়েক মানুষ এসে জড়ো হন এই উত্সবে ।


রাসপূর্ণিমার সময় নৌকোগুলিকে আলো দিয়ে অসাধারণ সাজানো হয় আর সেই আলোর ছায়া কাঁসাইয়ের জলে প্রতিফলিত হয়ে এক মোহময়তার সৃষ্টি করে । সংস্কৃতি উতসব হয় তখন এই ময়নাগড়ে ।


মন্দিরের বাইরে সিংহবাহিনীর প্রতিকৃতি আর দেওয়ালে টেরাকোটার সিপাই থেকে শুরু করে ঘোড়সওয়ার, ময়ূরপঙ্খী নৌকোর নিখুঁত শিল্পকর্ম যা কালের স্রোতে কিছুটা ম্রিয়মান কিন্তু তবুও ইতিহাসের সাক্ষ্যবহনকারী ।



আমাদের নৌকোর মাঝিই আমাদের গাইড হয়ে সব একে একে ঘুরে ঘুরে দেখালো । মন্দির দুটি দেখে সে আমাদের জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে গেল । কাঁটাঝোপের মধ্যে যেতেযেতে দেখি গাছের পাতায় পাখির বিষ্ঠায় সাদা আলপনা । মাঝি শুধালো ঝাঁকেঝাঁকে পরিযায়ী সামখোল পাখি প্রতিদিন সূর্যিডোবার প্রদোষে এসে নদীর জল খায় । সেই নদীর ধারে নেমে গেলে দেখা গেল দূরে পীরবাবার জাগ্রত দরগা ।

ফেরার পথে স্থানীয় হোটেলে দ্বিপ্রাহরিক ঝোল-ভাত । মেদিনীপুরের বিখ্যাত কালীবাংলা বা কালীঢল পান সহযোগে মধুরেণ সমাপয়েত হল ময়নাগড় অভিযানের উইকএন্ড ।

ছোটদের ই-পত্রিকা দিয়ালা একাদশ সংখ্যায় প্রকাশিত 

একছুট্টে রাজরপ্পা




মাঘের মিঠে রোদ পিঠে চড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম রাঁচী থেকে একটা গাড়ি নিয়ে রাজরপ্পার দিকে । রামগড় থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে আর রাঁচি থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে রামগড় ও চিতোরপুর রোডের ওপরেই রাজরপ্পা । হাজারিবাগ রোড ধরে খেলগাঁও দিয়ে চলতে লাগলাম । ন্যাশানাল হাইওয়ে ৩৩ এর ওপরে ঝকঝকে সাজানো আর্মি ক্যান্টনমেন্ট "দীপাটলি" এল । ছোটনাগপুর মালভূমির সবুজ পাহাড়ের গা ঘেঁষে আমাদের চলা । বেশ মনোরম জলবায়ু আর সবুজ প্রকৃতি । কিছুপরেই এল রামগড় ঘাঁটি । একটু চড়াই আবার সামান্য উতরাই পথ দিয়ে চলতে চলতে পালামৌ, বিভূতিভূষণ মনে পড়ছিল । গাড়ির কাঁচ খুলে নাম না জানা, অচেনা ফুলের বুনো গন্ধ নিতে নিতে ভাবছিলাম অধুনা ঝাড়খন্ডের এই অংশটির কথা । বৈচিত্র্যময় ঝাড়খন্ডের এই ভূখন্ডটির সম্পদ হল পাহাড়-মাটীর স্তূপের মধ্য দিয়ে অগুন্তি ছোট-বড় নদী আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নিঃশব্দে ঝরে পড়া ঝোরার কলকলানি । সেবার গেছিলাম রাঁচি থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে দশম ফলস । মনে পড়ছিল সেই কথা । কি অপূর্ব সেই রূপ ! সুবর্ণরেখা নদীর এক শাখা নদী কাঁচীর দশটি সাবলীল ধারা অবলীলায় ৪৪মিটার ওপর থেকে ঝরে পড়েছে একসাথে নীচে । এছাড়াও হুন্ড্রু, জোনহা, হিরণি, পাঁচ গাঘ ফলস, সীতা ফলস, কাঁকে ড্যাম, রাঁচি লেক ছোটনাগপুর মালভূমির এই অংশটি ঘিরে যেন এক ন্যাচারাল নবরত্নের মালা গেঁথে সাজিয়ে রেখেছে নিঁখুত ভাবে । আর সাঁওতাল মানুষের জীবনযাপন, ধামসা-মাদল, অনবরত ঝরে পড়ে থাকা বিশাল বিশাল ভুর্জ্যপত্রের ওপর লিখে রেখে যায় কত সময়ের দলিল। বছরের পর বছর ধরে যা পুরোণো হয়না । মহুয়ার ঝিম ধরা নেশার মত সেই গল্প উঠে আসে বারবার কত লেখকের কলমে, বীরসা মুন্ডার জীবন যুদ্ধে ।

এখানকার সবচেয়ে বড় নদী দামোদর । রাঁচি ও হাজারিবাগ মালভূমির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলের আরেক নদী ভৈরবী বা ভেরার সাথে মিলিত হয়েছে দামোদর আর সেই সঙ্গমেই রাজরপ্পা জলপ্রপাত । প্রায় ৯ মিটার উঁচু থেকে ভেরা নদীর অবিরত ধারা ঝরেছে দামোদরের বুকে । রাজরপ্পা শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের জন্যই নয় ছিন্নমস্তা বা ছিন্নমস্তিকার মন্দিরের জন্যও যথেষ্ট বিখ্যাত । সতীর দেহ ত্যাগের পর মহাদেবের তান্ডব নৃত্যে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন সতীর মস্তকটি না কি এখানে পড়েছিল তাই দশমহাবিদ্যার অন্যতম ছিন্নমস্তা মায়ের মন্দিরটি একান্ন সতীপিঠের একটি বলে অনেকেই দাবী করেন । সতীপিঠ হোক বা না হোক গাড়ি নীচে রেখে সামান্য চড়াই পাহাড়ী পথ ধরে মন্দিরের দিকে এগুতে লাগলাম আর কেমন যেন একটা এথান মাহাত্ম্য অনুভূত হল । বহুদিন আগে যখন এই রাস্তা হয়নি তখন নদী পেরিয়ে মন্দিরে আসতে হোত । এখন রাজরপ্পা বেশ অনেকটাই আধুনিক এবং ভেতরে প্রবেশ করে দেখি কঙ্ক্রিটের বাহুল্যে কিছুটা হলেও কৃত্রিম । তবে মা ছিন্নমস্তার মন্দির এবং রাজরপ্পা জলপ্রপাতটি ভুলিয়ে দেয় সবকিছু । ছিন্নমস্তার মন্দির বড় একটা দেখা যায়না তাই আমার এত আগ্রহ ছিল । অনেকটা কামাখ্যা মন্দিরের ঢঙে নির্মিত মূল মন্দিরটি । আর এই মন্দিরকে ঘিরে কালীর দশ মহাবিদ্যা রূপের অন্য গুলি অর্থাত তারা, কমলা, বগলা, ভৈরবী, ধূমাবতী, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, মাতঙ্গী প্রভৃতির মন্দির গুলি নির্মিত হয় অনেক পরে । মন্দির চত্বরে দর্শনার্থীদের বিশাল লাইন দেখে ঘাবড়ে গেলাম । কিন্তু কিছুপরেই অতি সুন্দর নিয়ম মেনে লাইন এগুতে দেখলাম আর একসাথে জনা কুড়ি মানুষকে পুজো দিতে সম্মতি দেওয়া হয় । কোনো পান্ডার উপদ্রব নেই । আর অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পুজো দেওয়া যায় । তাই গাড়ীর ড্রাইভারকে লাইন রাখতে বলে পুজোর ডালা কিনে নিয়ে ঘুরতে গেলাম নদীর ধারে । নৌকো করে ওপারে যাচ্ছে মানুষ । আর দুই নদীর সঙ্গমে রাজরপ্পা ঝোরার কলকলানি বড়ই দৃষ্টিনন্দন ।

তখন দুপুর একটা বাজে । সারি সারি শালগাছের মাথায় দুপুরের সূর্য সজাগ । আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু-এক ঘর সাঁওতাল বসতি । লাইন দিয়ে মা ছিন্নমস্তার মন্দিরে প্রবেশ করলাম এক গা ছমছমে অনুভূতি নিয়ে ; সিঁদুর লেপা পাথরের গায়ে খোদাই করা হয়ত মায়ের মুখ । অন্ধকারে দেখা গেলনা । তবে পুজো নিয়ে অহেতুক আড়ম্বর নেই । পূজারীর দাদাগিরিও নেই । সেটাই বেশ ভালো লাগল ।বহু দূর দুরান্ত থেকে মানুষ এসেছেন মনস্কামনা পূরণ করতে ছাগল সাথে করে । স্থানীয় সাঁওতাল মানুষেরা ছিন্নমস্তাকে অসম্ভব ভক্তি করে এবং তাদের মৃত মানুষের অস্থিভস্ম এই দামোদর নদীতে ফেলে । মন্দির থেকে নেমেই যেতে হয় কালভৈরবের কাছে । নারকোল ভেঙে জল ঢেলে শিবের প্রণাম হল । তারপর আবার দুই নদীর সঙ্গমস্থল পেরিয়ে পেছনপথ দিয়ে তীরে উঠে গাড়ির খোঁজ করা । 


কখন যাবেন : বর্ষাকালে গেলে ওয়াটার ফলস গুলির থৈ থৈ রূপলাবণ্য দেখা যায় । এছাড়া রজরপ্পা নভেম্বর থেকে মার্চ অবধি যাওয়াই শ্রেয় । কারণ গরমের সময় প্রচন্ড দাবদাহ চলে এই অঞ্চলে ।
কিভাবে যাবেন : হাওড়া থেকে রাঁচি-হাতিয়া এক্সপ্রেসে রাঁচি ও সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে রাজরপ্পা যাওয়া যায় ।
কোথায় থাকবেন : রাঁচি শহরে নামী দামী অজস্র হোটেল আছে । বিশেষ ছুটিতে গেলে আগে থেকে বুক করে যাওয়াই ভাল ।