Sunday, May 22, 2016

বোহেমিয়ান ডায়েরী (পর্ব ৫)

পোল্যান্ডে দ্বিতীয় দিনে ওয়ার'স  ( Warsow) 


পিয়ানিষ্ট Chopin  এর স্মৃতি বিজড়িত পার্কে 


পোলিশ ভাষায়  Warszawa বলে।  পোল্যন্ডের বর্তমান রাজধানী। অন্যতম বৃহত শহর।  বার্লিন থেকে পজনান হয়ে ওয়ার'স যাবার পথে ঘন সবুজ জঙ্গল চলল আমাদের সাথে।  পথে পড়ল ওডার ( Oder )নদী। পোলিশ ভাষায় Odra. চেক রিপাবলিক থেকে উত্পন্ন হয়ে এই নদী  পোল্যান্ড ও জার্মাণীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।  

যথারীতি বাস থামল কিছু পরেই।  টয়লেট সেরে নিয়ে বাসে ওঠার মুখে চোখে পড়ল টিউবওয়েল। এই ওয়ার'স পোলিশ ফ্লিন্ট, জুয়েলারী, এম্বার, পটারী উত্পাদনে বিখ্যাত।  আবার সেই সকালে মন ভারি হয়ে গেল ওয়ার'স ঘেট্টো (ghetto) এল। ট্যুর ম্যানেজার পলের মুখে বিভীষিকাময় ওয়ার'স বৃত্তান্ত শুনতে শুনতে হাজির হলাম ওল্ড টাউনে।  


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ( ১৯৩৯, থার্ড সেপ্টেম্বর) হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করল এবং রাশিয়ার সাথে একটি গুপ্ত চুক্তি থাকার ফলে রাশিয়ার সাহায্য নিয়ে  পোল্যান্ডকে দুভাগে ভাগ করে পশ্চিমদিকটা জার্মাণি দখল করেছিল আর পূর্বদিকটা দখল করেছিল রাশিয়া। একমাস ভয়ানক যুদ্ধের পর ওয়ার'স ধ্বংস হলে পোল্যান্ড আত্মসমর্পণ করল।      হিটলারের মতে স্লাভিক জাতি অর্থাত রাশিয়ান, পোলিশ...এরা মানুষের মধ্যে পড়েনা এবং জু (jew) বা ইহুদীরাও এদের দলে। অতএব দেশ খালি করে জু এবং পোলিশদের যেনতেনপ্রকারেণ হত্যা করে সেখানে জার্মাণ জাতির বসতি কায়েম করার উদ্দেশ্যে বর্তী হল নাতসী পার্টির নেতা হিটলার।   অনেকগুলি কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্প তৈরী হল যেখানে সবল পুরুষ নাগরিকদের রাখা হত ক্রীতদাসের মত যেখানে তারা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করত। আর দুর্বল, নাবালক ও মহিলাদের মেরে ফেলা হত। ওয়ার'স তে বহু ইহুদীদের একত্র জড়ো করা হয়েছিল এই কারণে। সেই জায়গার নাম হল ঘেট্টো। এই অমানবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে ওয়ার'স তে দুবার সামরিক উত্থান করার চেষ্টা হয়েছিল। একবার ইহুদীরা সেই চেষ্টা করে। আরেকবার পোলিশ হোম আর্মিরা এই চেষ্টা করে। কিন্তু জোশেফ স্ত্যালিনের নেতৃত্বে রাশিয়া নিষ্ক্রিয়তার সাহায্য নিয়ে হিটলারের নাত্সীরা এই দুই উত্থানকে নির্মমভাবে অবদমিত করে এবং ওয়ার'স ঘেট্টোর প্রতিটি বাড়ি ধ্বংস করে ও প্রত্যেক মানুষকে খুন করে ওয়ার'স তে শ্মাশানের শান্তি ফিরিয়ে নিয়ে অঅসে। ওয়ার'স সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় কিন্তু পরবর্তীকালে সেই ওল্ড টাউনকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পুণরায় নির্মাণ করা হয়(  Reconstruction)  এবং এই পুনঃনির্মাণ এত‌ই নিখুঁত যে ওল্ড টাউনকে  UNESCO হেরিটেজ সাইট রূপে ঘোষিত করা হয়েছে।  
ইউরোপে ওয়ার'স এর নাম করলেই যার কথা সর্বাগ্রে মনে পড়ে তিনি হলেন বিখ্যাত পিয়ানিষ্ট শপিন ( Chopin) বিশাল সবুজ এক প্রাঙ্গণের মধ্যিখানে রাখা এই শিল্পীর স্থাপত্য। তিনি যেন বাতাস থেকে সুর হাতড়ে তাকে ছন্দে আরোপিত করেছিলেন হাতের যাদুতে। কি চমত্কার শপিনের অবয়বটি। হাঁটতে হাঁটতে হাজির হ‌ই পুনঃনির্মিত ওয়ার'স এর টাউন স্কোয়ারে। থরেথরে সাজানো পথ রেস্তোঁরা। ঢুকে পড়ি একটি তেমনি ছাতার নীচে।  সুন্দরী পোলিশ মেয়ে হাসিমুখে আতিথেয়তা জানায়। ইউরোপে জল বুঝি কেউ খায়না। আবারো গলা ভেজাই স্থানীয় পোলিশ বিয়ার Perla তে। ঠান্ডায় ক্লান্তি নিমেষে উধাও হয়ে বেশ ছুটির আমেজ অনুভূত হয় দুপুরবেলায়। হরেক কিসিমের চিজ দিয়ে বোঝাই মস্ত এক চিজ প্ল্যাটারে কামড় দি আমরা। কিছুপরেই একফালি গ্রিলড চিকেন আসে। মাছভাতের তৃপ্তি হয়ত নেই কিন্তু অন্য আরো কিছু আছে যা মনে ধরে রাখার মত। ওয়ার'স পুরোণো শহরে আর রয়েছে সেন্ট জন'স ক্যাথিড্রাল, রয়্যাল প্যালেস। আর পোলিশ কিং জ্যান সোবেইস্কির বাসস্থান উইলানোউ প্যালেসটিও দেখবার মত।  

খাবার খেতে খেতে পিয়ানো একর্ডিয়ানে রাজকাপুরের মেরা নাম জোকারের  সুর ভেসে আসল কানে।  শুধু এখানেই নয় অনেক জায়গায় রাস্তার ধারে অনামা আর্টিষ্টের একর্ডিয়ানে  এই সুর আমাকে আপাততঃ তাড়িয়ে নিয়ে চলল ওয়ার'স এর অলিগলিতে। আর দেখলাম ঘোড়ারগাড়ি।    




3 comments:

  1. প্রতিটা পর্বই পড়ছি। বেড়িয়ে আসাও হচ্ছে চমৎকার। চরৈবেতি!

    ReplyDelete