Wednesday, June 7, 2017

হায়াদ্রাবাদ

দৈনিক যুগশঙ্খে প্রকাশিত দুটি ভ্রমণকাহিনী

http://jugasankhasuppli.zohosites.com/files/TRAVEL/CF%2025_24%20May%2C%202017.pdf

http://jugasankhasuppli.zohosites.com/files/TRAVEL/CF%2023_10%20May%2C%202017.pdf 

দৈনিক যুগশঙ্খ ২৪শে মে ২০১৭  







দৈনিক যুগশঙ্খ ১০ই মে ২০১৭

Saturday, February 11, 2017

বীরভূমের টেরাকোটা মন্দিরে


শীত পড়লেই মন উসখুশ! আমার রূপসী দক্ষিণবাংলায় গ্রীষ্মে তো বেড়ানোই দায়। তাই অমৃত কমলার ভোর গড়িয়ে পৌষের রোদ গায়ে মেখে প্রতিবার‌ই বেরিয়ে পড়া আর কি! কত কিছুর স্বাদ নেওয়া, কত অজানা অচেনা দ্রষ্টব্য নিয়ে তারিয়ে তারিয়ে লেখা এখনো বাকী। বীরভূম এমনি একটি জেলা যেখানে দেখবার শেষ নেই। তার বোলপুর সার্কিটটা ভাল করে দেখতেই সপ্তাহখানেক সময় লেগে যাবে। আর কলকাতা থেকে গেলে শান্তিনিকেতনকে বেস করাই ভাল। সারাদিন ধরে ঘুরে এসে শান্তির বিশ্রাম নিয়ে আবারো পরদিন ঘোরা যায়। প্রচুর ট্রেন ছাড়ে কলকাতা থেকে।  আর শান্তিনিকেতন থেকে গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া যেতেই পারে। আর নিজের গাড়ি থাকলে তো কথাই নেই। 
শীত এলেই পৌষমেলার টানে কত হুজুগে  মানুষ প্রতিবছর শান্তিনিকেতনে পৌঁছে যান। কিন্তু তার সিকিভাগ মানুষজন‌ও কোলাহল মুক্ত পরিবেশে শীতকে উপভোগ করতে বোলপুর শহর ছেড়ে কিছুটা দূরে যাবার কথা ভাবতেও পারেন না। পৌষমেলা দেখে নিয়েও কিন্তু শান্তিনিকেতন থেকে অতি অনায়াসেই পৌঁছানো যায় জয়দেব প্রসিদ্ধ কেন্দুলি হয়ে ঘুরিশা আর মৌখিড়া গ্রামদুটিতে। ইলামবাজারের চৌপাহাড়ি জঙ্গল এর মধ্যে দিয়ে শীতের সকালে প্রথমে হাজির হয়েছিলাম অজয় নদের ধারে কেন্দুলি বা কেন্দুবিল্ব গ্রামে।

গীতগোবিন্দ প্রসিদ্ধ কবি জয়দেবের জন্মস্থান এই কেন্দুলি গ্রাম। মকরসংক্রান্তিতে মেলা বসে জমিয়ে। আউল-বাউল-বৈষ্ণব কীর্তনিয়া দূরদূরান্ত থেকে হাজির হন এখানে। উন্মুক্ত পরিবেশে গান-উৎসব  হয় মহা সমারোহে। জয়দেবের আরাধ্য রাধাবিনোদের টেরাকোটা মন্দিরটির পাশাপাশি কদম্বখন্ডীর ঘাটে রাধামাধবের বিগ্রহপ্রাপ্তির গল্প আজো মুখে মুখে ফেরে। অজয় নদে পুণ্যস্নান করেন অগণিত মানুষ। কবি জয়দেবের ভিটের ওপরেই রাধাবিনোদের নবরত্ন টেরাকোটা মন্দিরটি আজো নজর কাড়ে। মন্দিরের গায়ে রামরাবণের যুদ্ধ থেকে দশাবতার আর গর্ভগৃহে রাধাবিনোদের যুগলমূর্তিটি জয়দেবের আরাধ্য বলে এখনো মানুষের বিশ্বাস। বর্তমানে আর্কিওলজিকাল সোশ্যাইটির তত্ত্বাবধানে রেখাদেউল রীতিতে নির্মিত এই মন্দির । কুলেশ্বর ঘাটের কাছে কুলেশ্বর শিবমন্দিরে  কবির সিদ্ধাসন এর প্রস্তরখন্ডটি আজো রয়েছে।  প্রকান্ড এক মহীরুহ। মাটীতে টুকটুকে লাল বটফলের গালিচা আর গাছের ওপর থেকে অসংখ্য ঝুরি নামা দেখে বোঝা যায়  মূল বৃক্ষটি বট।  তার ফোকরের মধ্যে দিয়ে উঠেছে একটি পাকুড়গাছ । আর সবচেয়ে আশ্চর্য্যের ব্যাপার হল বট ও পাকুড়ের মধ্যিকারের ব্যাবধানে প্রকৃতির ইচ্ছেয় আরো দুটি বড়গাছের মধ্যস্থতায় তালের আঁটি পড়ে একটি শালপ্রাংশু তালগাছ সকলকে ছাড়িয়ে আকাশ ছুঁতে চেয়েছে। এই বট-পাকুড় আর তাল গাছের ত্রহ্যস্পর্শে বাঁধানো শানের বেদীতে গিয়ে বসলাম খানিক।  কিছুদূরেই অজয়নদের রুক্ষ ও শুষ্ক নদীবিছানা। বালির বুক চিরে একটু একটু জল। রোদের আলো পড়ে সেইটুকুই চিকচিক করে ওঠে। আদিগন্ত শুকনো চরাচর। গাছপালাও কম। জনবসতিও বিরল। অজয়নদের তীরে এই ঘাটটি নতুন করে বাঁধিয়ে সংস্কার করা হয়েছে । এরই নাম কদম্বখন্ডীর ঘাট।

এবার পা বাড়ালাম ঘুরিশার দিকে।
ইলামবাজার থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরে এই গ্রাম।  শাল, সোনাঝুরির এভিনিউ এর মধ্যে দিয়ে "পায়ের মোড়" পেরিয়ে প্রথমে খোঁজ নিলাম ঘুরিশা গ্রাম পঞ্চায়েতের। কারণ হাতের মুঠোর গুগ্‌ল ম্যাপ এর দিশা অন্ততঃ তাই বলছিল।  তারপর ঘুরিশা ইস্কুল মোড় পেরুতেই চোখে পড়ল তিনোর বাসস্ট্যান্ড। স্থানীয় মানুষেরা বলল, পুরাতন মন্দির এই পথে। ব্যাস গাড়ি ঘুরিয়ে সেই পথে। স্থানীয় মানুষেরাই পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল ঘুরিশার বিখ্যাত রঘুনাথজী মন্দিরে।  বাংলার চারচালার স্টাইলের টেরাকোটার অপরূপ মন্দিরটি। বহু পুরণো বোঝাই যায়। সে সময় ইলামবাজার ছিল বাংলার অন্যতম বিজনেস সেন্টার। নীলকর সাহেব এবং আখচাষের হেতু চিনি উত্পাদন কেন্দ্র হিসেবে বেশ নামডাক ইলামবাজারের। ঘুড়িশা গ্রামে হত ন্যায়শাস্ত্রের চর্চা।  রঘুনাথ ভট্টাচার্য ( মতান্তরে, রঘুনাথ আচার্য ) এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আনুমানিক  সপ্তদশ খ্রিষ্টাব্দে । এটি প্রধানতঃ রামচন্দ্রের মন্দির।  মন্দিরের মধ্যে রামচন্দ্রের স্বর্ণমূর্তিটি মারাঠা বর্গীদস্যুরা লুঠ করে নিয়ে চলে যায়। তাদের  আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই মন্দির ।  এরপর স্থানীয় শ্রী রামময় পঞ্চতীর্থ ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরটিকে সংস্কার করে গর্ভগৃহে পশুপতি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।  মূল মন্দিরটি বেশ উঁচুতে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। মন্দিরের দুটি প্রবেশপথ। চার দেওয়ালের টেরাকোটার অভিনব স্থাপত্য দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়।  এই পোড়ামাটির পৌরাণিক শিল্পকর্ম যে কত নান্দনিক হতে পারে আর তার বিচিত্র কারুকার্য যে কোনো ভ্রমণপিপাসু মানুষকে আকর্ষণ করবে। অনেকটা যেন বিষ্ণুপুর টেরাকোটা মন্দিরের স্টাইল সেই পোড়ামাটির কাজে। 





শীতের সকালে প্রত্যন্ত এক গ্রামের মেঠো পথ ধরে চলেছি। গ্রামের মানুষেরা হাঁ করে তাকিয়ে আছে  আমাদের দিকে, ভাবে এই গ্রামের প্রাচীন মন্দিরের টানে গাড়ি চেপে শহরের মানুষ আসে ?  আর সেই মন্দিরগাত্রের টেরাকোটার মণিমুক্তো নিয়ে তাদের তো কোনো হেলদোল নেই! একজন ছেলে তার বন্ধুটিকে জিগেস করেই বসল, কি আছে রে মন্দিরে? আমি ঝটিতি জবাব দিলাম, সোনাদানা, হীরে জহরত। ছেলেটি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে র‌ইল আমার দিকে।  এ পাশে ফুলুরি-জিলিপির দোকান ওপাশে অঘ্রাণের ধান ঝাড়াই হয়ে  পৌষের রোদে সোনা হয়ে পড়ে রয়েছে। রাজহংসী কম্বুকন্ঠ ঘুরিয়ে আড়ে আড়ে চাইল অপরিচিতের দিকে। তারপরেই ধীর পায়ে নেমে গেল পুকুরের জলে। চলেছিলাম মরাই ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর সারিসারি বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে।  ধান কাটার পর্ব শেষে। এবার আসন্ন নবান্নের দিকে তাকিয়ে থাকা। এই আমার বাংলা।  বাগাল ছেলের অমলিন হাসি, গামছা গায়ে তণ্বী তনয়াদের দলে দলে পুকুর স্নান  আর হাঁস চরা থৈ থৈ পান্না পুকুরকে সঙ্গী করে এগুতে থাকি আমরা।  মাইলের পর মাইল খেতি জমিতে আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপির ফলন দেখতে দেখতে আরো এগুতে থাকি। খেজুরগাছে হাঁড়ি বাঁধা তখন। এখন এ গ্রামের ধান বুলবুলিতেও আর খায়না আর বর্গীরাও আসেনা লণ্ডভণ্ড করতে।  মন্দিরের প্রধান প্রবেশপথটি যথারীতি পুবদিকে। প্রবেশদ্বারের মাথা অর্ধচন্দ্রাকৃতি। সুচারু হাতে পোড়ামাটিতে খোদাই করা রয়েছে  ষাঁড়ের পিঠে বেশ লম্বা শিবমূর্তি। এর ঠিক ডানদিকে রাজহংসের পিঠে চতুরানন ব্রহ্মা আর বাঁদিকে গরুড়াসনা বিষ্ণু। বেশ ক্ষতিগ্রস্ত সব কারুকাজ। তবে এখনো অনেকটাই রয়েছে দেখবার মত। এছাড়াও রয়েছে ছিন্নমস্তা এবং অপরূপ এক কালীমূর্তি। কেউ মনে করেন এটি নরমুন্ডের মালা পরিহিতা চামুন্ডা কালী। এছাড়াও দশমহাবিদ্যা, দশাবতার, শিব-পার্বতী, লক্ষ্মী ও সরস্বতী মূর্তিগুলি বেশ স্পষ্ট।  কোথাও আবার টেরাকোটার প্যানেলে রাম-রাবণের যুদ্ধ, কোথাও বা বিষ্ণুর অনন্তশয্যা, রাধাকৃষ্ণের রাসলীলা চমত্কার ফুটে উঠল চোখের সামনে।  
এবার আরো এগিয়ে চলি স্থানীয় মানুষদের জিগেস করতে করতে। প্রত্যন্ত এই গ্রামে শহরায়নের ছাপ বেশ স্পষ্ট। মোবাইল ফোনের রমরমা মাটির দেওয়ালের বিজ্ঞাপনে। হাওয়ায় উড়ছে 3G, 4G কিন্তু যুবক যুবতীদের কাছে সে কনসেপ্ট এখনো অধরা। প্রকৃতি লুটেপুটে খাচ্ছে ধুলোমলিন ঘুড়িশা গ্রামের দারিদ্য। সামান্য চাষাবাদ, গরু, হাঁসমুরগী প্রতিপালন এই মানুষদের জীবিকা। তবুও হাসিমুখে উত্তর দেয় কথার। গোবর লেপতে লেপতে, ধান ঝাড়তে ঝাড়তে মেয়েরা বলে, "এই তো সামনেই, আরেকটু যান, গোপাল, লক্ষী-জনার্দন মন্দিরটা দেখতে পাবেন"
এঁকেবেঁকে ধানের গোলায় ধাক্কা খেতেই চেয়ে দেখি সুউচ্চ নবরত্ন মন্দিরের চূড়া। হিন্দুরীতি মেনে এটিও পুবমুখী মন্দির। এটিতে নিত্যপুজো হয়। আর এর অবস্থা আগেরটির চেয়ে একটু ভাল মনে হল। বহু প্রাচীন মন্দির। ১৭০০ সালের।
এ মন্দিরের সংস্কার হয়েছে দেখলেই বোঝা যায়। বসেছিলেন এক বয়স্ক মহিলা। মাসীমা বলেই তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। হাসিমুখে তিনি উত্তর দিলেন প্রশ্নের। বললেন, আমার শ্বশুরমশাই বর্ধমানের মানুষ ছিলেন। তিনি এর দেখভাল করতেন। নিত্য পুজোপাঠের ব্যাবস্থা তখন থেকেই দেখে আসছি। উনি থাকলে আপনারা আরো তথ্য পেতেন। মূল মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা বর্ধমানের এক গন্ধবণিক ক্ষেত্রনাথ দত্ত। ব্রিটিশ আমলে ইলামবাজারের নামকরা লাক্ষা ব্যাবসায়ী ছিলেন।  উঁচু প্ল্যাটফর্মে গিয়ে তখন আমরা একে একে টেরাকোটা প্যানেলের ছবি তুলেই চলেছি। কি অপূর্ব নান্দনিক সেই কারুকার্য। মন্দিরের তিনটি আর্চ করা প্রবেশপথ গিয়ে পড়েছে এক বারন্দায়। তারপরে মূল মন্দিরের গর্ভগৃহ।   গোপাল, লক্ষ্মী আর জনার্দণের বিগ্রহ আছে। বৃদ্ধা বললেন, জানিয়ে এলে ভোগের ব্যাবস্থা করতে পারতাম।  এই নবরত্ন মন্দিরের দেওয়ালে টেরাকোটার কাজ দেখলেই বোঝা যায় এটি বৈষ্ণব মন্দির। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ তাঁদের পার্শ্বদদের সাথে নৃত্যরত। এছাড়াও রাধাকৃষ্ণ ও রয়েছে। তবে আর্চ করা খিলানের মাথায়  শাক্ত ধর্মাবলম্বীর ছোঁয়া। টেরাকোটায় ফুটে উঠেছে ত্রিপুরাসুন্দরী, ষোড়শীর ন্যায় কালীর দশমহাবিদ্যার রূপ।  এছাড়াও রয়েছে রাম, সীতা, গণেশ। মঙ্গলকাব্যে বর্ণিত শ্রীমন্ত বণিকের কমলেকামিনী ও ব্রিটিশ সৈন্য নিয়ে সদলবলে যুদ্ধযাত্রা।  বৃদ্ধা জানালেন, গর্ভগৃহে প্রতিনিয়ত শালগ্রাম শিলা, গোপাল, ত্রিপুরাসুন্দরী, গণেশ এবং মঙ্গলচন্ডীর পুজোপাঠ হয়।
ডিজিটাল ক্লিকে মুখর নবরত্ন মন্দিরের টেরাকোটার দেওয়াল। নেমে দাঁড়াতেই গায়ে কষে সর্ষের তেল মাখতে মাখতে শীতের রোদ পোহাচ্ছিলেন বৃদ্ধার এক আত্মীয়। তিনি বললেন, ফেরবার সময় মনসার থানে মাথা ঠেকিয়ে যাবেন কিন্তু। সাপখোপ নিয়ে বেঁচে থাকত মানুষ সেসময়। এখন জঙ্গল কেটে সাফ। তবুও মা মনসার দোর ধরে আমরা পড়ে আছি এ গ্রামে। এগিয়ে গেলাম। মনসা মন্দিরটি আরো প্রাচীন। তার নাটমন্দিরে এক জেলে দম্পতি মাছ ধরবার জাল বুনছে । মন্দির বন্ধ। বেশ ভগ্নপ্রায় তার অবস্থা। এখন অরণ্যমেধ যজ্ঞে সামিল গ্রামের মানুষ। পালিয়েছে সাপ। আর মা মনসা তার আগেই স্বর্গবাসী  হয়ত। তবুও মানুষের বিশ্বাস যায়না ম'লে। 
এরপর আমাদের গন্তব্য ইলামবাজারের দক্ষিণে আরেকটি গ্রাম মৌখীড়ায়। বর্ধমান-বীরভূম সীমান্তে ইলামবাজার থেকে যার দূরত্ব মাত্র মাইল তিনেক।  আবার গুগ্‌লম্যাপ। আবার স্থানীয় পুছতাছ। ওদিকে পাশের দ্বারন্দা গ্রামে বনলক্ষ্মীর তপোবনে  আমাদের দুপুরের খাওয়ার ব্যাবস্থা করা আছে। অতএব ফোন ঘোরাও। ওপ্রান্ত থেকে বনলক্ষ্মীর উত্তর, দেরী হলেও আসুন । আপনাদের, গরম ভাত আর চিংড়ির মালাইকারী  রেডি থাকবে। অগত্যা চলো লেটস গো টুওয়ার্ডস মৌখীড়া। ইলামবাজারের এত কাছে মন্দিরপ্রধান গ্রাম মৌখীড়া?  সেখানেও আঠারোশো খ্রীষ্টাব্দের প্রাচীন সব মন্দির। গ্রামের রাস্তায় প্রবেশ করলেই দেখতে পাওয়া যায় ভগ্ন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ।  

“It is an object very dear to my heart and I cannot help welcoming any endeavours towards its realisation”
চলেছি আর বারেবারে মনে করছি রবিঠাকুরের কথাগুলি। আমার রূপসীবাংলায় সে যুগে দলে দলে ক্রাফটসম্যান ছিলেন আর কিছু মানুষ ছিলেন এদের অকুণ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। এই সব শিল্পীদের দিয়ে তাঁরা তৈরী করেই চলতেন একের পর এক মন্দির। এ যেন কারিগরের চাঁদের হাটে বাংলার গ্রাম উঠত জেগে।  আর ছড়িয়ে পড়ত টেরাকোটার শিল্পকর্ম এভাবেই। অতএব ইট, চুন, সুরকি, বালি আর প্লাসটার। ফুটিয়ে তোলো তিরিশ কিম্বা পঞ্চাশ ফুট লম্বা মন্দিরের গায়ে সেই অভিনব পোড়ামাটির মোটিফ।  পয়সার অভাব নেই। শিল্পীর হাতের কাজ যেন শ্রেষ্ঠত্বের দাবী রাখে। তখন বাংলায় বিত্তবানদের বাস। জমিদার, রেশম  ব্যাবসায়ী, কায়স্থ, ব্রাহ্মণ, পানের বরজের মালকিন, কয়লার ব্যাবসায়ী, সকলের সম্মিলিত ধনদানে পরিপূর্ণ হয়ে উঠুক বাংলার গ্রামের পর গ্রাম।  ঠিক তেমনি এক গ্রামের সন্ধান পাওয়া গেল সেদিন। নাম কালিকাপুর। সেখানকার দুর্গাবাড়ি আজো সুপ্রসিদ্ধ। নামী বাংলা ছায়াছবির শ্যুটিং স্পট। একদা নীলকুঠি পাড়া। আজো একরের পর একর তাদের জমি, প্রাসাদ, কুঠিবাড়ি সব পরিত্যক্ত, চাবি বন্ধ। আর সেই চত্ত্বরেই উন্মুক্ত প্রান্তরে জোড়া মন্দির। আবারো অভিনব স্থাপত্য তার গায়।  নীলকর সাহেবদের আধিপত্য এখনো অমলিন মন্দিরের গায়ে। প্রায় এক ফুটেরো বেশী লম্বা সারে সারে মেম সাহেবের প্রতিকৃতি মূর্ত হয়ে রয়েছে মন্দিরের গায়ে। তার সঙ্গে আমাদের সব ধর্মীয় দেবদেবীরাও রয়েছে যথারীতি। পৌরাণিক কাহিনীও বর্ণিত দেওয়াল গাত্রে।



জমিদার পরমানন্দ রায় এর পুত্র কৈলাস রায় এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। সেদিনকার মত মৌখীড়ার মন্দির দেখে এবার বনলক্ষ্মীর পথে দ্বারন্দা গ্রামে। সেখানে খেতের রাঁধুনিপাগল চাল, খেজুরের গুড়ের পিঠে, আচার, নতুন কলাই ডালের বড়ি আর হস্তশিল্প পর্ব সমাধা হতেই দেরীতে লাঞ্চ সেরেই সেদিনের মত ঘরে ফেরার গান। ভাগ্যি ভগবান কপালে প্রান্তিকে একটুকরো মাথা গোঁজার স্থান রেখেছিলেন। তাই বেলাবেলি টুক করে ঢুকে পড়েছিলাম সেখানে।  অর্থাৎ সব মিলিয়ে জমে যায় শীতের ছুটি, কেনাকাটির দুপুর, গ্যাস্ট্রনমিক ফুর্তি!  আর গ্রাম বাংলার মন্দিরময়তা আর তার সারে সারে টেরাকোটার ছবি তুলে রাখে  আমার মন ক্যামেরা। কলমে বেঁচে থাকে বাংলার ঐতিহ্য।

Sunday, January 8, 2017

অঘ্রাণে সাগরস্নানে

উত্তরবঙ্গ সংবাদ রংদার রোববার ৮ই জানুয়ারি ২০১৭

       সামনেই আমাদের পৌষ সংক্রান্তি। পৌষ পার্ব্বণের পাশাপাশি সাগরসঙ্গমে স্নানে সামিল হন দেশের বহু মানুষ। সেখানে গঙ্গা গিয়ে মিশেছে সাগরের সাথে। কোলাহলময়তা পছন্দ না হলে, পুণ্যিলাভের আশা মাথায় রেখে  শুধু নির্মল আনন্দ আর নির্জন সৈকত খুঁজতে কলকাতার কাছেই এমন সুন্দর উইকএন্ড ভ্রমণ এ সামিল হওয়া যেতেই পারে। সেই নিয়ে পৌষ সংক্রান্তির প্রাক্কালে । 

Saturday, November 19, 2016

বিচিত্র রূপসী বাংলা

কসময়ের  মশলা আর মসলিনের বাংলা এখন পাহাড়, অরণ্য, মন্দির, নদী, সমুদ্রে পরিবেষ্টিত  বৈচিত্র্যময় পর্যটনের রূপসী বাংলা । তারই মায়ায় ছুটে চলি আমি। শুধু তারিয়ে তারিয়ে সেই রূপ দেখব বলে আর ফিরে এসে তাকে নিয়ে লিখব বলে। 
বেড়াতে যাবার আগেই প্রতিবার ভাবই রাজ্যেই কোথাও একটা যাব কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতা আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় রাজ্যের বাইরে।    আমাদের রাজ্যে D আছে কিন্তু C নেই। D মানে ডেষ্টিনেশন, D মানে ডাইভার্সিটি। কিন্তু C এর অভাব। এই মূহুর্তে মনে হচ্ছে আমার রাজ্য এ একটা C জ্বলজ্বল করছে সেটা হল cheap কিন্তু এর সাথে বাকী C গুলো absent. we can compromise on COST but in lieu of that expect convinience and comfort । কিন্তু ট্র্যাভেলিংয়ের সবকটি প্যারামিটার কি পাই আমরা? অথচ উত্তরে হিমালয়, ডুয়ার্স থেকে দক্ষিণে সাগরদ্বীপ,  সুন্দরবন,  পশ্চিমে পুরুলিয়ার অযোধ্যাপাহাড়, গড়পঞ্চকোট থেকে পূর্বে  মেদিনীপুরের কুরুম্ভেরা ফোর্ট কিম্বা গনগনির মাঠ? কত কত সুন্দর জায়গা এ রাজ্যে, শুধু ট্যুরিজমের ইন্ফ্রাস্ট্রাকচার নেই।  

লাটাগুড়ির কুয়াশামাখা অরণ্য

তবুও গ্রীষ্মে যাই উত্তরবাংলায় তো শীতে ঝাঁপ দি সাগরের বুকে। 
হিমালয়ের কোলে অপূর্ব পাহাড়ি গ্রামে যাই, দুটিপাতা-একটি কুঁড়ির স্বর্গরাজ্যে। রোদের কণা লুটোপুটি খায়  চা-পাতায়।  দিগন্তের নীল আর  সবুজের মাখামাখি  দেখে  মনে পড়ে রবিঠাকুরকে... আলোর নাচন পাতায় পাতায়, এই তো ভালো লেগেছিল । 
গরুমারায় জিপ সাফারি। ভোর হতে না হতেই ময়ূরের ঘুম ভাঙানিয়া কর্কশ ডাক শহুরেদের কানে মিষ্টি লাগে ।  জিপের ধারালো হাওয়ায় আবার শীতকে নতুন করে পাওয়া ।  জঙ্গলমহল থেকে বেরিয়ে আসা  বাইসন, হরিণ অথবা  মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া সবুজ পায়রা,  ঠোঁটসর্বস্ব ধনেশ পাখি!  ডিজিটাল ক্যামেরায় ক্লিক, ক্লিক! ভীতু বনমোরগের পেছনে ছুটতে ছুটতে দেখি গন্ডার! কি রাজকীয়! আমার রূপসী বাংলার ঐশ্বর্য্য এরা। 

 
শঙ্করপুরের সমুদ্র তটে

শীতের রোদের গনগনে আঁচে ছুটে যাই সাগরের দিকে । সুন্দরবনের নোনা জল ছুঁই আর আমার মনখারাপের সব ঢেউগুলো আছড়ে পড়ে সেখানে। বাংলাকে আমি যেন নতুন করে পাই তখন। সুন্দরবন নামটিতে  যতটা সৌন্দর্য্য ঠিক ততটাই সুন্দর তার ভৌগোলিক চেহারা। সেখানে মানুষের প্রতিনিয়ত  ডাঙায় বাঘ আর জলে কুমীর নিয়ে  বেঁচে থাকা । চরাচর জুড়ে নোনাজলের ঐশ্বর্য্য যার অনন্ত, অসীম জলরাশির মাঝে লুকিয়ে থাকে অগণিত সজীব আর সবুজ। গল্পকারের ভাষায় যা হয়ে ওঠে মূর্ত, ভ্রমণপিপাসুর কলমে যা হয়ে ওঠে আরো প্রাণবন্ত। কালের স্রোতে তার ভূগোল পুরোনো  হয়না এই বায়োডাইভার্সিটির অন্যতম নিদর্শনে ।
সুন্দরবনের জল-জঙ্গলের কাব্য
কাজের চাপে শীত ফুরায়।  ভাবতে ভাবতেই দোল ফুরোয় । অমৃত কমলার মিঠে রোদ, উলকাঁটার দুপুর গড়িয়ে সেদিন চৈত্রমাস।   চৈত্রের গনগনে আগুণ দুপুরবেলা । কখনো পাতাঝরার টুপটাপ আর পলাশ-শিমূলের শুকনো ডালে কোকিলের  ডাক ।   মনে পড়ে অক্ষয়কুমার বড়ালের মধ্যাহ্নের ছবি । নিথর চৈত্র ফাগুনে  তালদিঘীতে রাজহংসীর মাথা ডুবিয়ে দুপুরস্নানের ফাঁকে গেঁড়ি গুগলি দিয়ে মধ্যাহ্নভোজন। সিঁদুরে ল্যাটেরাইট মাটিতে পা দিয়েই গনগনির মাঠ। ওদিকেই শিলাবতী নদীর বিছানা পাতা । শীতে অনেকটাই শুষ্কতা শিলাইয়ের বুকে । আবার ভরাবর্ষায় রূপ দেখাবে সে । লালমাটির খেয়ালে কি বিচিত্র সৃষ্টি হয়েছে।  যেন পাহাড়ের গায়ে কে খোদাই করে রেখেছে গ্রামবংলার চালাঘর, মন্দির, বারান্দা, কুঠিবাড়ি, সাধুসন্ত , বারান্দা । যেন কালের স্রোতে ধুয়ে গিয়েও ক্ষয়ে যায়নি  । অথচ এটা কৃত্রিম নয় । এ হল বাংলার গ্র্যান্ডক্যানিয়ন।  

বাঙলার গ্র্যান্ড ক্যানিয়, গনগনি 
কোনোবার বসন্তের ভোরে ছুটে গেছি লালমাটির দেশে।  সকালের মিষ্টিরোদ এসে পড়েছে  শালবনের মাথায়, বসন্তের কচি সবুজপাতায় । চেনাপথ যেন আরো নবীন সজীবতায়  । সজনে গাছ তার ভর-ভরন্ত রূপ নিয়ে, সজনেফুলের গন্ধ মেখে পলাশ তার লাল নিয়ে । পৌঁছে গেছি সত্যজিত রায়ের প্রিয় শুটিং স্পট মামাভাগনে পাহাড়ে। নীল এক আকাশের নীচে একসাথে কত জীবন্ত পাহাড়ের শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান। কেউ যেন একটা বিশাল অঞ্চল জুড়ে, অগোছালো করে  রেখে দিয়ে গেছে কত কত পাথর, নানা আকৃতির কত কত নাম না জানা পাহাড় হয়ে উঠেছে সেগুলো । ছোট, বড়, মেজো, সেজো, ন', রাঙা,  ফুল, কুট্টি, আন্না  !
 সত্যজিত রায়ের প্রিয় শ্যুটিং স্পট, মামাভাগ্নে পাহাড়
ভোরের গোলাপী কুয়াশা দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই পাঞ্চেত পাহাড়ের গায়ে গড়পঞ্চকোটপাহাড়ে ট্রেকিং। নামের উত্সমূলে পঞ্চকোট পাহাড়। পুরাণের পাঁচটি চূড়াবিশিষ্ট শেখর পর্বত।   শাল-মহুয়া-পলাশ-আকাশমণির জঙ্গল পরিবেষ্টিত পাহাড়ের মাথায় নদীর ঝোরা আর অতি প্রাচীন রঘুনাথজীর  মন্দির ।  নীচে প্রবেশদ্বারেই দুয়ারবাঁধ তোরণ, পোড়াইঁটের পঞ্চরত্ন মন্দির,  রাসমন্দির, রাণিমহল সবকিছুই ছিল একসময়,  সব মিলিয়ে যার নাম গড়পঞ্চকোট । 
গড়-পঞ্চকোটের কালের দলিল
এই মন্দিরের প্রতি আমার একটু দুর্বলতা আছে। প্রাচীন মন্দিরের ঐতিহ্যময়তা, গঠনশৈলী আর এদের ঘিরে পুরোণো কিংবদন্তী আমাকে টেনে নিয়ে চলে মেদিনীপুরের পাথরা গ্রামে কিম্বা কুরুম্ভেরা দুর্গে। মেদিনীপুর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে এই পাথরা গ্রাম । যেখানে মন্দির যেন আজো কথা বলে ওঠে। মন্দিরময় পাথরা গ্রামে রয়েছে চৌত্রিশটি এমন পুরোণো মন্দির।  মেদিনীপুরের পথ, পাথরার রাস্তা খুব ভাল । ধান খেতের সবুজ চলল আমাদের হাত ধরে । পেরোলাম মাইলের পর মাইল আলুর খেত, গাঁয়ের বীথিপথ। শীতের শুকনো ঝরাপাতাদের পেছনে ফেলে রেখে চললাম কোকিলের ডাক শুনতে শুনতে । ইউক্যালিপটাস, সোনাঝুরি, কদম, সেগুন আর বাঁশ ঝাড়ের সারি ।
পরিত্যক্ত ভাঙা মন্দির পেরিয়ে কাঁসাই নদী দেখা গেল আর বাঁদিকে এল সেই মন্দিরময় পাথরা গ্রাম ।
মন্দিরময় পাথরা

ছোট মন্দির, বড় মন্দির,  মন্দিরের ধ্বংস স্তূপ আর মন্দিরের সংলগ্ন গ্রাম, খেত খামার, ধানের গোলা, পুকুর কি নেই এখানে । নানান  ধরণের, নানান গড়নের । এক একটির ভাস্কর্য এক এক রকম ! তবে সবকটি মন্দিরই  বাংলার ট্র্যাডিশানাল চালাঘরের আদতে বানানো । মন্দিরময় পাথরা গ্রামটির মানুষজন যেন  যুগযুগ ধরে মন্দিরগুলিকে বুকে করে আগলে আসছে । মন্দিরের গায়ের লেখা থেকে জানা গেল  যে সেগুলি প্রায় ৫০০ বছরের পুরোণো।
খড়গপুর থেকে কেশিয়াড়ির পথ ধরে কিছুদূর গেলেই পড়বে বিশাল দুর্গময় কুরুম্ভেরা। বাইরে  বিশাল উঁচু প্রাচীর পরিবেষ্টিত দুর্গটি দশ ফুট উঁচু এবং বিশাল মাঠের মধ্যিখানে প্রায় ৩০ বিঘে স্থান জুড়ে এই দুর্গ ।
পাথর দিয়ে কেটে কেটে তৈরী । যেন চক মিলোনো রাজপ্রাসাদ ! একদিকে উঁচুতে নাটমন্দিরে তিনটি মন্দিরের গড়নে স্থাপত্য  রয়েছে ।
এর মধ্যে একটি শিব মন্দির আছে ।  ওড়িয়া লিপি থেকে জানা যায় ১৪৩৮-১৪৬৯ সালে তৈরী হয়েছিল এই ফোর্টটি । ছমছমে দুর্গপুরীর দুর্গের নাম "কুরুম্ভেরা"। গুগলম্যাপ দিশা দেখিয়ে দেয় অচেনা ও অজানা এই সব পথের। নিজের শহরের এত কাছে আর্কিওলজিক্যাল সোশাইটির দেখভালে এত সুন্দর মন্দির আর দুর্গ যে রয়েছে তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবেনা। 
কুরুম্ভেরা দুর্গ
আর আমার রূপসী বাংলার উইকএন্ডগুলোর কথা? ডায়মন্ডহারবারের গঙ্গার ধারে ফলতা কিম্বা বাসন্তী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সোজা ইছামতীর ধারে বিভূতিভূষণের স্মৃতিবিজড়িত টাকী? অথবা বসন্তের পাহাড়ে পলাশের আগুণ লাগা মুকুটমণিপুর কিম্বা মন্দারমণি বা শঙ্করপুরের  সমুদ্রসৈকতে ।  চব্বিশ ঘন্টার ফুরসত মিললে শঙ্করপুর বেশ উপভোগ্য। সাদাবালির চরে একলহমায় সমুদ্র তট দেখে পরখ করতে হয় নোনা জলের সাদাফেনায় ছুটে আসা জলের  রঙ,  ঢেউয়ের পরে ঢেউয়ের আনাগোনায় আছড়ে পড়া মুঠো মুঠো ঝিনুক, তারা মাছ, শঙ্কর মাছেরা, বালির চরে আসর বসায় ।  দলবেঁধে আসা বকের সারি উড়ে যায় ক্যাসুরিনার ফাঁক দিয়ে, খেয়ে যায় বাঁশপাতা মাছ সমুদ্রের তট থেকে, ঢেউ এসে নিয়ে যায় বিকেলের সূর্যাস্তের রং। সব মনখারাপের দুপুরগুলো আছড়ে পড়ে সেই ঢেউতে । ক্লান্ত  সূর্য তখন আপন মনে রঙ ছড়িয়ে চলে পূর্ব মেদিনীপুরের পশ্চিম আকাশের গায়ে। সন্ধ্যেবেলা ছমছমে সমুদ্রতটে শুধু ঢেউয়ের গর্জন । প্রতিদিন সূর্যের এই অবসর নেওয়ার মূহুর্তে ঝাউবনে  পাখ-পাখালির ঘরে ফেরার  কলরব আর বালির চরে ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার শব্দ,  নিঝুম নিসর্গকে নতুন করে পৌঁছে দেয় মনের আঙিনায় ।  সূর্যাস্তে শঙ্করপুর একরকম আর সূর্যোদয়ে অন্যরকম । 
প্রত্যূষে উত্তরদিকে তখনো জ্বলজ্বলে ধ্রুবতারা আর পশ্চিম আকাশে শুকতারা  । অন্ধকার ভোরে কত রকমের শাঁখ  ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে আসে আর আসে চিতি কাঁকড়ারা ছটফট করে ধেয়ে  । সমুদ্রের বুকে জন্ম নেয় নতুন ঢেউ আর তীরে এসে ভাঙে  । দেখতে দেখতে পুব আকাশের গায়ে রঙ ছেটাতে আসে ভোরের  বালক সূর্য । আকাশ চিরে চিরে লাল, নীল, গোলাপী রঙের দাগ আর লুকোচুরি খেলতে খেলতে সেই আবীর রঙা আকাশের কোল থেকে উঁকি মারে সে ।
রূপসীবাংলার গল্প এক বৈচিত্র্যময় রূপকথার মত। এ গল্প ফুরোয়না। কালেকালে আরো যেন রূপবতী হয় আমার বাংলা। থৈ থৈ তার রূপ লাবণ্য নিয়ে।
সুন্দরবনের কুমীর

 কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে যদিও তবুও প্রাণ কেঁদে ওঠে রূপসী, বৈচিত্র্যময়ী পর্যটনের বংলায় ভ্রমণের জন্য।

যেমন  
  • কলকাতা থেকে গাড়ি করে সাগরদ্বীপ যাওয়াটাও এখন সহজ হয়েছে। ডায়মন্ডহারবার রোড দিয়ে কাকদ্বীপ অবধি গিয়ে হার‌উড পয়েন্ট থেকে ফেরি নিতে হবে । সকল তীর্থযাত্রীরা সেই পয়েন্টে জমায়েত হন। এইস্থানকে লট-৮ এর ঘাটও বলে। জেটি পেরিয়ে স্টীমারে করে সাগরদ্বীপ পৌঁছতে সময় লাগে ৪৫মিনিটের মত। গাড়ি ওপারে গ্রাম পঞ্চায়েতের পার্কিং ফি দিয়ে রেখে চলে যাওয়া যায়। দুরাত্রি আমার মূল্যবান গাড়িটি থাকবে সেখানে অথচ সেই স্থানটি বেশ চিন্তার। সেই জায়গাটা আরেকটু সিকিওর্ড হলে ভাল হয়। কচুবেড়িয়া পৌঁছে এবার ভাড়ার গাড়ি করে গঙ্গাসাগর যেতে লাগে ঘন্টাখানেক।   
  •  ওয়েষ্ট সিকিমের এক প্রত্যন্ত গ্রাম ছায়াতাল খুব সুন্দর জায়গা। কিন্তু সেখানে পোঁছতে গিয়ে একটা দিন পুরো লস। অসম্ভব খারাপ পাহাড়ি রাস্তা। অথচ ছায়াতালে পৌঁছে মনে হল এমন একটি পাহাড়ে ঘেরা ফুলের স্বর্গ্যরাজ্য আছে জানতাম না।

  •  সেবার ভুটান ফেরত ডুয়ার্সের চিলাপাতার জঙ্গলে থাকব বলে বুকিং করে রেখেছিলাম। সেখানে পৌঁছে না ইলেকট্রিক, না জল। এবার প্যাকেজ ট্যুরের টাকাপয়সা দিয়ে রেখে এমন সার্ভিস অত্যন্ত  চিন্তার।
  •  লাভা লোলেগাঁওতে গিয়ে রিশপের আনন্দটাই মাটি। ২০০০ টাকার হোটেলগুলি আপ টু দ্যা মার্ক নয়। বেড শিট, towel, টয়লেট, এগুলোর সাথে কম্প্রোমাইস করা যায়না।
  •  লাটাগুড়ির নেওড়া ভ্যালি চা বাগানে গেলাম আরেকবার সেখানে সবকিছু ঠিক ছিল কিন্তু  ঘুরে বেড়ানোর গাড়ির ভাড়া নিয়ে বেশ দ্বিধা দ্বন্দে পড়েছিলাম। এয়ারপোর্টে নেমেও প্রতিবার মনে হয় ঠকে গেলাম না তো! কথাতেই বলে অতিথি দেব ভব! কিন্তু গন্তব্যে পা রেখেই এমন হলে খুব আপসেট হতে হয়।  অথচ এমন তো হবার কথা নয়।  
  •  বিভূতিভূষণের স্মৃতিবিজড়িত ইছামতি নদী দেখব বলে টাকী যাওয়ার প্ল্যান হল। কোনো বুকিংয়ের ব্যবস্থা করতে পারলাম না। অনলাইন কোনো ব্যাবস্থা নেই আর যে সাইটগুলি আছে সেগুলির ফোন নাম্বার অচল। অগত্যা নিজেরাই প্ল্যান করে আচমকা গিয়ে সেদিনই ফিরে এলাম।  অথচ কি মনোরম সেই নদীর ধার আর পরিবেশ সেখানে একরাত না থাকলেই নয়।  

  •  সত্যজিত রায়ের অত্যন্ত প্রিয় শুটিং স্পট মামাভাগনে পাহাড়? ক'জন গেছেন জানিনা কিন্তু শান্তিনিকেতনের খুব কাছেই। এত সুন্দর একটি জায়গায় অগণিত পাহাড়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। আপনি অনলাইন খোঁজ চাইলে কেউ দিতে পারবেনা আপনাকে।

  •  তেমনি গড়বেতার কাছেই গনগনির মাঠ? পশ্চিমবাংলার ছোটখাটো গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। অথবা মেদিনীপুরের কেশিয়াড়ির পথ ধরে কুরুম্ভেরা দুর্গ? কিম্বা খড়গপুরের কাছেই মন্দিরময় পাথরা? এগুলো সব আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে  কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর না আছে রোড ম্যাপ না কেউ বলতে পারে হদিশ, কিম্বা যেতে কতক্ষণ লাগবে। আমাদের কর্মসূত্রে মেদিনীপুর থাকার সুবিধেয় উইকএন্ডে গুগলম্যাপ হাতে নিয়ে নাহয় পৌঁছাতে পেরেছি আর দিনে দিনে ফিরে এসেছি খড়গপুরে কিন্তু ট্যুরিষ্ট টানতে চাই প্রকৃত জনকারি। ইনফরমেশান । আর ট্যুরিস্ট না গেলে কি করে পরিচিত হবে এই প্রত্যন্ত স্থানগুলি। আমি ব্লগিং করি। আমার কাছে মেইল আসে। ফেসবুকে শেয়ার করি । সোশ্যালনেটের হাত ধরে কেউ কেউ  জানতে চান আর চলে যান কিন্তু ট্যুরিষ্ট ফ্রেন্ডলি না হলে, সাফিসিয়েন্ট ইনফরমেশান না থাকলে কি করে নতুন নতুন ট্যুরিস্ট যাবেন এখানে?

  • তেমনি শীত পড়লেই মনে হয় সুন্দরবনের কথা কিন্ত যাওয়া আসার পথ? কিছুটা হয়ত ভাল রাস্তা কিন্তু বেশ কিছুটা খারাপ থাকবেই বা কেন এখনো? এমন সুন্দর  জল-জঙ্গলের সহাবস্থান এর কথা মাথায় রেখে আমাদের ভাবা দরকার।  

  • গড়পঞ্চকোটের প্রাকৃতিক পরিবেশ ছেড়ে আসতে ইচ্ছে করছিল না ।  অথচ থেকে যাব বললে থাকার উপায় নেই কারণ ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লজে চেনা পরিচিতি না থাকলে থাকা যায়না। অগত্যা ফিরে আসতেই হয়েছে একদিনের মধ্যেই। রাস্তার ধারে হোটেলগুলির তেমনি দুরবস্থা। গেস্ট নিয়ে গেলে একদিকে গর্বে বুক ফুলে ওঠে অন্যদিকে লজ্জা করে সাধারণ ভাতের হোটেলে অতিথিকে আপ্যায়ন করতে। 

Monday, May 30, 2016

বোহেমিয়ান ডাযেরী ( পর্ব- ৪ )


OMG ! ও মা গো! এই বাহুবলী হোঁদল কুত্কুত পল' কে ঠেলে রোজ আমাকে বাসে উঠতে হবে? কিন্তু মৃদু হেসে পাশ কাটিয়ে বাসে উঠে পড়তেই তার কেতাদুরস্ত ট্যুর গাইড সুলভ অ্যাকসেন্ট আর স্মার্টনেস ক্ষণিকেই কলকাতাইয়ার মনে আঁচড় কাটল।
Guten Morgen meine Damen und Herren !
রোজ এইভাষাতেই শুনতে হবে নকি? না, না । জার্মাণীতে পলের জন্ম। আর আমাদের ট্যুর শুরু হল সেখানেই মানে ফ্র্যাঙ্কফুর্টে । তাই আপাততঃ পলের পাঞ্চজন্য ঘোষিত হল " গুড, মর্ণিং লেডিজ এন্ড জেন্টলম্যান" বলে। পরক্ষণেই বলল, " ক্যান ইউ হিয়ার মি?” বাসে যারা দূরে বসেছে তাদের জন্য। সবাই চুপচাপ ছিল এতক্ষণ। এবার সাতচল্লিশজনের সম্মিলিত চীত্কারে বাস যেন ভেঙে পড়ল...ইয়ে.....স্..স্..স্...স্"
পল নিজের কথা বলল। সে ৫০% জার্মাণ ও ৫০% সাউথ আফ্রিকান। হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট পড়ে এই পেশা স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছে। আর তার বিশালকার ভুঁড়িটির সৌজন্যে ইউরোপিয়ান বিয়ার ব্রুয়ারী। সেই অজস্র ঋণও স্বীকার করে ফেলল অনায়াসে, একমূহুর্তে । বাসের সাতচল্লিশজনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়া থেকে ট্যুরের রোজনামচায় রিয়েল সোশ্যালনেটের অ্যাডমিন হয়ে র‌ইল এই জার্মাণ যুবকটি।
বাসের সিটে বাই রোটেশান রোজ বসতে হবে আমাদের। যাতে আমাদের সকলের সাথে সকলের বন্ধন আরো মজবুত হয়। আর কে সামনে, কে পেছনে এই নিয়ে মারামারিও হবেনা। আমেরিকার এক বরিষ্ঠ নাগরিক এসেছেন। অশীতিপর বৃদ্ধ দম্পতি। হলুদ দাঁত বেশ ক্ষয়ে গেছে। মহিলাটির দুচোখের ছানি বেশ পেকে গেছে। গিয়েই বুঝি তুলে ফেলতে হবে। তাঁরা সফিষ্টিকেটেড সূত্রধর। আমি এঁদের নাম দিলাম মিষ্টার অ্যান্ড মিসেস ছুতোর। এঁরা বেশ নির্বিবাদী। আমি যতটা মাংস একা না খেতে পারি ওঁরা অবলীলায় খেয়ে নেন রোজ রোজ। আমার বাস থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে পায়ে ব্যাথা হয় কিন্ত ওঁরা তাঁদের নিরলস পা-গাড়ী টানতে বেশ সক্ষম। দুজনে বেশ হাত ধরাধরি করে হাঁটে। আমাদের মত মোটেও নয়। এবার আসি একজোড়া মা-মেয়ের কথায়। মা'টি আমেরিকান ষাটোর্দ্ধ সুন্দরী। এককালে ছিলেন হেডটার্নার বা সেক্সবম্ব যাই বল। এখনো ছিপছিপে অর্থাত স্লিম এন্ড ট্রিম। তার মেয়েটি কুড়ি বাইশের কিন্তু ফার্ষ্টফুডের আধিক্যে তার সারা দেহে স্নেহপদার্থের আধিক্যের দরুণ তর মায়ের চেয়ে তাকে বয়স্ক বলে মনে হয়। মায়ের চুল ছাঁটা আর মেয়ের চুল শনের মত স্ট্রেইট, ঘাড় ছাড়িয়ে কাঁধের ওপরে। মা সোজা হাঁটে, মেয়ে কোলকুঁজো। মায়ের শর্টস পরা পা দুটি যেন ঈষত ক্ষীণকায় কদলী বৃক্ষের মত আর মেয়ের দুটি ট্রান্সফ্যাটের সৌজন্যে বেশ বলিষ্ঠ এবং দুটিতে ঘর্ষণের কারণে তফাতে চলে। মা হাসে উচ্চৈঃস্বরে, মেয়ে শান্ত, গম্ভীর। হাসিঠাট্টায় তার বড়োএকটা হেলদোল নেই। মা বেশ ঝগড়ুটে, মেয়ে আপোষে মেনে নেয় সবকিছু। মেয়ের চোখমুখ দেখে নাম দিলাম হ্যারিপটারের মোর্নিং মাটল। মনে মনে বলি মেয়ের কি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে গেছে? তাই কি তার মা তাকে নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছে? সাধারণতঃ এই বয়সের ছেলেমেয়েরা বেড়াতে বেরিয়ে হেসে খলখল, গেয়ে কলকল করে। পাঁচজনের সঙ্গে আলাপ করে। আমার পুত্রটিতো তেমনি।
মা'টি অহোরাত্র মেয়ের ওপরে ছড়ি ঘোরাতে ব্যস্ত। এই বুঝি তার মেয়ে আমাদের পলের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করল, তার চোখ ঘুরছে সর্বদা। মেয়ের চুলের লকস চোখের ওপরে পড়লেই তিনি শশব্যস্ত হয়ে লকস জোড়াকে কানের পাশ দিয়ে ঠেলে দিচ্ছেন। কেন তুমি আজ হাঁটুর ওপরে শর্টসের সাথে এই জুতোজোড়া পরেছ অথবা ডিনারে পঙক্তি ভোজে বসেই কেন ব্রেডা টুকরোতে কামড় বসাচ্ছো...ঠিক যেন সেই রাজকুমারী সিনেমার মায়ের মত।
আরেক জোড়া অষ্ট্রেলিয়ান মা-মেয়েও রয়েছে। আশি ছুঁই ছুঁই বেরিল আর তার মেয়ে জেনিস। এই মা'ও তার মেয়ের তুলনায় খটখটে। মা স্লিম, মেয়ে বেশ নধর। বেরিল এর রোজ দুবেলা দু মাগ বিয়ার চাই-ই। বিয়ারেই তাঁর মোক্ষলাভ...তিনি একথা বিশ্বাস করেন। পাব এ গিয়ে বেরিল বুড়ির যা নাচ দেখেছি তা ভুলবনা। জেনিস নাচেনা কিন্তু দারুণ গায়। বলিরেখার আধিক্যে বেরিলের সর্বাঙ্গ কুঞ্চিত কিন্তু বেরিল মোটেও দমবার পাত্রী নন। আমি এই মা-মেয়ের নাম দিলাম বেড়ালমাসী ও ছানা। এক আমেরিকান ভদ্রলোক এসেছিলেন একা। তাঁর নাম উইলিয়াম। তিনি অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। আমার ছেলের সাথে বেশ দোস্তি হল তাঁর। তাঁর শ্বশ্রুগুম্ফসম্বলিত চোখমুখের হাবভাব দেখে মনে হযেছিল ক্রিমিনাল সাগার হিরো বুঝি কিন্তু আলাপে বেশ ভাল লাগল। নির্বিবাদী এই জেন্টলম্যান সার পৃথিবী চষে বেড়ান তবে ইনি সধবা না বিধবা না হতবান্ধবা তা বুঝতে পারিনি। বাই দ্যা ওয়ে আমার প্রত্যেকটি সালোয়ার স্যুট এনার খুব মন কেড়েছে। ইন্ডিয়ান ড্রেসের রংগুলি বেশ লেগেছে তাঁর।
আরো এক মা-মেয়ে ছিল। তবে সারাটা ট্রিপ তারা মুখ খোলেনি। এমনকি পাশে বসে খাবার সময়েও নয়। কি জানি আমরা বুঝি গাঁইয়া ভূত তাই আমাদের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করেনি তার। মা'টি রূপের দেমাকে মটমটান। আর মেয়েটি নিজেকে প্রিন্সেস ডায়না মনে করে। মায়ের শনের মত ব্লন্ড হেয়ার চোখের সামনে যেভাবে পড়ে থাকে তাতে অর্ধ নিমীলিত চোখ দুটিকে আলো আঁধারিতে ডাইনি বলে ভ্রম হবে। আমি এদের নাম দিলাম ডাইনি ও ডায়না। এরা বুঝি সবচেয়ে বেশী পোষাক এনেছিল। আর কমপক্ষে দশজোড়া করে ম্যাচিং জুতো এনেছিল সঙ্গে। বিশ্বাস করো, আমি গুনেছি।
লাসভেগাস থেকে এসেছিল এক চাইনিজ যুবতী। সে "একল চলোরে" পন্থায় বিশ্বাসী। একগন্ডা ভাইবোনের মধ্যে মানুষ হয়ে নিজেই ঘুরে বেড়ায় এখন। এর নাম সত্যি ডায়না। এর আমার কাঁথাস্টীচের স্কার্ফগুলো খুব পছন্দ হয়েছে। আমাকে বলল, তুমি শাড়ি পরবেনা? শুনে ভালোই লাগল। ছিলেন এক coptic ক্রিশ্চান দম্পতি। তারা ইজিপ্টের লোক। থাকেন শিকাগোতে।প্রথমদিন বুড়ো ভদ্রলোক আমাকে দেখেই বললেন, আর ইউ হিন্দু? আমি বললাম ইয়েস এন্ড প্রাউড টু বি হিন্দু। তার উত্তরে তিনি বললেন, আমাদের অনেক হিন্দু বন্ধুবান্ধব আছে। হিন্দুদের আমি খুব পছন্দ করি। আমি বললাম, তোমার কি দেখে মনে হল আমি হিন্দু? তিনি বললেন তোমার চোখ। শুনে ভালো লাগল। বলেই বললেন, আই লাভ হিন্দু কালচার, হিন্দু এটিকেট এন্ড দ্যা ওয়ে অফ লিভিং। আমি বললাম, একটা বিন্দু দিয়ে গ্রাফ টেনোনা জেন্টলম্যান।
এই ভদ্রলোকের সত্তরোর্ধ্ব স্ত্রী এসেছেন। বেশ সুন্দরী আর সাজপোষাক বেশ পাল্টে পাল্টে করেন। এনার হাতে একটি প্যাচ দেখে জিগেস করায় বললেন উনি ব্রেষ্ট ক্যানসার এ আক্রান্ত। রেডিয়েশান চলছে ঐ প্যাচের মাধ্যমে। তার জুয়েলারী, জুতো আর পোষাক বদল দেখে মনে হল "ক্যানসার? তো কি? আই ডোন্ট কেয়ার।" যেন ডায়রিয়া হয়েছে কিম্বা জ্বর। বেড়াতে গিয়ে তা হলেও আমরা ভয় পেয়ে যাই। ২৪x৭ রেডিয়েশান নিয়েও ওনার বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই। ফেসবুকে ছবি আপডেট করছেন, হোয়াটস্যাপে নাতিনাতনীর সঙ্গে কথা বলছেন, জুয়েলারী কিনে চলেছেন এখনো। এনাকে অহোরাত্র মনেমনে কুর্ণিশ জানিয়েছি আমি। মনে মনে বলেছি, এমনি থেকো মিসেস গুরগুইশ। টেক কেয়ার। ভালো থেকো!

Thursday, May 26, 2016

বোহেমিয়ান ডায়েরী পর্ব-৬


ক্র্যাকুফে দুরাত






 মাদের বোহেমিয়ান সফরের ষষ্ঠতম দিনে ওয়ার'স থেকে ক্র্যাকুফ ( Krakow, কিন্তু উচ্চারণ একেবারেই ক্র্যাকাও নয়) ।  যথারীতি হোটেলের ঘরে ইন্টারকমে পোলিশভাষায় সুন্দরী মেয়ে বলে উঠল" dzien-do-bry" যার অর্থ হল ওয়েক আপ বা সুপ্রভাত যাই বলো । চোখ রগড়িয়ে দেখি সাড়ে পাঁচটা বাজে। তাড়াতাড়ি স্নান সেরে নিয়ে হোটেলের ব্যুফে ব্রেকফাস্টের দিকে যাই। আবারো সেই ইউরোপিয়ান ব্রেকফাস্ট ব্যুফে। ফলের রস, দুধ সিরিয়াল, ফলের কুচি, টক দৈ, ডিম, সসেজ, হ্যাম, বেকন এর সাথে নানাবিধ পাঁউরুটির পসরা। এর মধ্যে সবচেয়ে সুস্বাদু সদ্য আভেন থেকে বেরিয়ে আসা ট্রে ভর্তি ক্রোয়েসেন্ট। ক্রেসেন্ট মুন বা বাঁকা চাঁদের আদলে তৈরী পাঁউরুটির এই শিল্পটি ইউরোপের অন্যতম বেকারী প্রডাক্ট।  আমার এইসব মাংসে আপত্তি। তাই বাকী সব দিব্যি চলল।  এবার কফিতে চুমুক দিয়েই দে ছুট। মালপত্র বাসে উঠে গেল। আবারো সাতচল্লিশজন। আবারো একসাথে দিনরাত্তিরের সংসার তাদের সাথে। বাসের সিট বদলিয়ে নেওয়া। অদলবদলে প্রাণের শান্তি, মনের আরাম।   কে সামনে, কে পেছনে নিয়ে ঝগড়া নেই। সেদিন ওয়ার'স থেকে প্রথম হল্ট হবে চেষ্টচোয়া (Czestochowa) । সেখানে এক জাগ্রত পোলিশ মনাস্ট্রিতে অতি জাগ্রত দেবী ব্ল্যাক ম্যাডোনা কে প্রণাম জানিয়ে পথ চলা। জায়গার নাম জাস্না গোরা ( Jasna Gora) চতুর্দশ শতাব্দীর অন্যতম তীর্থস্থান। পলের মুখে ব্ল্যাক ম্যাডোনার গল্প শুনতে শুনতে পথ চলা। 




পোলিশরা এই  ব্ল্যাক ম্যাডোনাকে আমাদের কালীর মত মানে।  ওরা বলে  Our lady of Czestochowa । এ দেবী নাকি অসাধ্য সাধন করেন। খুব জাগ্রত এখানে।  ব্ল্যাক ম্যাডোনা দেবীর এই পোলিশ অধিষ্ঠান জাসনা গোরা মনাষ্ট্রি হল পোল্যান্ডের অন্যতম ঐতিহাসিক মনুমেন্ট।  এখানে কুমারী মেরীর কোলে যীশু। কিন্তু এর সর্বাঙ্গ কালো। অর্থাত ইনি আমাদের কালীর মত কৃষ্ণকলি।   




গল্প শুনেই নেমে পড়ি জাসনা গোরা মনাস্ট্রিতে। অসাধারণ সুন্দর স্থাপত্য সেই চার্চের। প্রবেশ করি অন্দরমহলে। সেদিন শনিবার। কোনো মাস চলছিল। একপাল স্কুলপড়ুযা ব্যাসিলিকার ভেতরে সুসংবদ্ধ লাইনে প্রবেশ করছিল। তাদের সামনে ও পেছনে একজন করে সিষ্টার ছিলেন। আমরা ইশারায় সেই লাইনে ঢুকে পড়লাম। সিষ্টারের অনুমতি নিয়ে। তারপর ছবি তুলতে তুলতে সোজা পৌঁছে গেলাম ব্ল্যাক ম্যাডোনার প্রতিকৃতির সামনে। তারপর দিব্যি পুরোটা ঘুরে ফেললাম ঐ খুদে স্কুল পড়ুয়াদের পেছন পেছন। আমাদের মন্দিরের ছবি তোলার কোনো বিধিনিষেধ নেই এসব জায়গায়।   



পোলিশ কিংবদন্তী বলে বহুযুগ আগে পোল্যান্ডে ওয়ায়েল পাহাড়ের নীচে এক ভয়ানক ড্রাগন বাস করত। ক্র্যাকুফ স্শহরের কেউ তাকে মারতে পারছিলনা। সারা স্শহরের লোকজন সেই ড্রাগনের ভয়ে থরহরিকম্প।  লোকজন প্রায়শঃই তার তর্জন গর্জন শুনত । একদিন রাজা ক্রাক ঠিক শহরবাসীকে ধেঁড়া পিটিয়ে ঘোষণা করলেন  

"He who once and for all puts this dragon
Shall recieve my sceptre and my royal crown,
So come and defeat this most horrid beast

And win my daughters hand and a wedding feasts"

বহু দূর দূর থেকে রাজপুত্রেরা, সাহসী যোদ্ধারা সব পোল্যান্ডে এসে সেই ড্রাগনকে হত্যা করে রাজা ক্র্যাকের কন্যার সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হতে চ্চাইল। সারা শহর তীরধনুকে ছয়লাপ হল কিন্তু কেউ ড্রাগনকে মারতে পারলনা। অবশেষে একজন অল্পবয়সী মুচি সেই স্শহরে এসে জানাল সে ঐ ড্রাগনকে হত্যা করতে সক্ষম। তার যুদ্ধের কোনো স্সাজসরঞ্জাম ছিলনা। কেবল ছিল প্রখর বুদ্ধি, ছুঁচ ও সূতো। সে রাজপুরীতে প্রবেশ করেই রাজার সঙ্গে দেখা করতে চাইল।  রাজা ক্রাক তো হতবাক! ঐটুকুনি এক বালক মুচি কিনা ঐ বিশাল ড্রাগনকে মারবে? ছেলেটি বলল, আমার চাই ভেড়ার চামড়া, একটু গন্ধক আর একটু সর্ষেদানা। রাজা বলল, বেশ তাই হবে। স্থানীয় মানুষেরা জানলা দিয়ে ভয়ে ভয়ে দেখতে লাগল সেই ড্রাগন নিধন যজ্ঞ। সেই বিস্ময়কর মুচিবালকটি সেই ভেড়ার চামড়ার মধ্যে গন্ধক পাউডার আর সর্ষে ভর্তি করে সেটিকে কায়দা করে সেলাই করে দিল ছুঁচ-সুতো দিয়ে। ভোরবেলায় সূর্যোদয় হতেই সে ঐ গন্ধক আর সর্ষে ভর্তি বস্তা নিয়ে ড্রাগনের কাছে যাবার আয়োজন করল।  ড্রাগন জেগেই ছিল। সে খিদের তাড়নায় পাহাড়ের নীচে কিছুদূর এগুতেই একটা দেখল একটি ভেড়ার মৃতদেহ। সে সেই চামড়া বন্দী গন্ধক সব খেয়ে ফেলল। খেয়ে ফেলা মাত্র‌ই ড্রাগনের পেট ফেটে মৃত্যু হল।  রাজ্যের সব লোক তখন সেই ড্রাগন দেখতে গিয়ে আবিষ্কার করল পাহাড়ের নীচে ভিসটুলা নদীর কোনো অস্তিত্ব নেই। সালফারে বিস্ফোরণ হয়ে ড্রাগনের আগুণ নেভাতে নদীর  জল প্রায় শেষ।  


এই রোমাঞ্চকর পোলিশ কিংবদন্তী শুনতে শুনতেই পথে পড়ল ভিশটুলা নদী। বাস থেকে ক্লিক ক্লিক। আবারো চলা।  
ড্রাগনের গল্প শুনে এবার নেমে পড়া ক্র্যাকুফ মেইন টাউন স্কোয়ারে।  একর্ডিয়ানের সুর বাজছে কোথাও। কোথাও  করুণ সুরে ভায়োলিন। পুরণো শহরের অলিগলি হাঁটতে গিয়ে কেবলি মনে পড়ে নিজের শহরটাকে। কোথাও আবারো টুংটাং ঘোড়ারগাড়ির আওয়াজ।  কি রাজকীয় তাদের সাজপোষাক!  


মনে হয় আরো কি করে সুন্দর হয় সে! ক্র্যাকুফেও ট্রাম চলে অনবরত।



পথের ধারে ঘন্টি বাজিয়ে সেখানেও অনবরত ট্রাম চলে যায় নিঃশব্দে। কত দূষণ কম তাই। মানুষ ট্রামকে ব্যবহার করেও। ব্যস্ত রাস্তায় অনামা চিত্রশিল্পীর সুন্দর চিত্র প্রদর্শনীও হয়। 




মনে মনে ভাবি সেদিক থেকেও আমরা পিছিয়ে নেইকো মোটেও। রাস্তার মোড়ে মোবাইল পোষ্ট-অফিস ভ্যান। 


হলুদ পিটুনিয়া শীতের শেষ রেশটুকুনি মেখে তখনো এক এভিনিউ আলো করে দাঁড়িয়ে আছে।  


পথের ধারে রেস্তোঁরায় আবার সামান্য দ্বিপ্রাহরিক আহার সেরে নি। রেস্তোঁরায় টয়লেট সারতে গিয়ে দেখি প্রকান্ড কাঠকয়লার আঁচে মাংস ঝলসানোর পর্ব চলছে অহোরাত্র।  





শিল্প আর শিল্পীর সমাবেশকে আমার শহরও পাত্তা দেয় যথেষ্ট। আর গান-তাল-বাদ্য সেদিক থেকেও পিছিয়ে নেই সে। তাহলে অসুবিধে কোথায়? মানে কলকাতার রাস্তায় পোল্যান্ডকে নামিয়ে আনতে?  
দূরে বসে কলকাতাকে বলে উঠি..."dzien-do-bry"     

জাগো সুন্দরী! ভোর হয়েছে, দ্যাখো....