Saturday, April 20, 2019
Sunday, July 8, 2018
Wednesday, March 7, 2018
বোহেমিয়ান ডায়েরী ( শেষ পর্ব) / মে-২০১৬
সোহাগী প্রাগের টানে
(সানন্দা বিশেষ ভ্রমণ সংখ্যায় প্রকাশিত)
ভিয়েনা থেকে ব্রুনো হয়ে প্রাগে পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেল। হোটেলে মালপত্র রেখে ডিনার খেয়েই শুরু হল আমাদের বোহেমিয়ান ট্রিপের অন্যতম সফর "নাইট ওয়াক ইন দ্যা সিটি অফ প্রাগ"। মনে মনে বলি কোথায় ? এ যে দেখি পড়ন্ত বিকেল গো! সাত তাড়াতাড়ি ডিনার খেয়েই ছুট? আকাশে তখনো কটকটে রোদ। বাতাসে যেন বসন্তের রেশ। প্রথমে বাসে চড়ে নামা হল পাহাড়ের মাথায় স্ট্রাহভ মনাষ্ট্রি দেখতে। মনাষ্ট্রিতে আবার বিয়ার ব্রুয়ারি! ভাবা যায়? সেখান থেকে দুর্গ শহর প্রাগের অতি সুন্দর একটা ভিউ পাওয়া যায়।এই ভিউপয়েন্টে গিয়ে সেন্ট নরবার্টিনের বেত্তান্ত শোনা হল স্থানীয় গাইডের মুখে।
স্ট্রাহভ মনাস্ট্রিতে সেন্ট নর্বার্টিনের রেলিক্স রাখা রয়েছে। আছে প্রকান্ড লাইব্রেরীতে বিশাল বইয়ের সম্ভার আর ব্যাসিলিকায় ফ্রেসকো এবং ভার্জিন মেরীর মোটিফ থেকে সবকিছুই সযত্নে সংরক্ষিত। রাখা রয়েছে প্রকান্ড এক অর্গ্যান যা বাজিয়ে মোত্জার্ট বলেছিলেন এমন বড় ও সুন্দর অর্গ্যান তিনি আর কোনোদিনো বাজাননি।
পশ্চিম ইউরোপ যেমন জার্মাণিক, পূর্ব ইউরোপের প্রাগ শহরে প্রধানতঃ স্লাভিক ট্রাইবদের বাস। চেক ভাষায় প্রাগের নাম প্রাহা। যার অর্থ হল "ford" বা "rapid" । আক্ষরিক অর্থে ভ্লাতাভা নদীর ব্রিজের ওপর দিয়ে পেরোতে হয় এই অঞ্চল যেখানে নদীর গভীরতা অত্যন্ত কম। মানুষ ও ঘোড়াও সেই তিরতির করে বয়ে চলা অগভীর নদীর মধ্যে দিয়ে অনায়াসে এককালে পেরিয়ে চলত । এখন সেখানে ছোট্ট ব্রিজ হয়েছে। তবে প্রাহা নামটির উত্সমূল জেনে বেশ লাগে।
এবার পিটার শোনায় চেক কিংবদন্তীর কড়চা। বুদ্ধিমতী ও জ্ঞানী স্লেভিক রাজকন্যা লিবিউসে অসাধারণ ভবিষ্যদ্বাণী করতেন । পাহাড়ের মাথায় তিনি আর তার স্বামী রাজপুত্র প্রেমিস্ল শান্তিপূর্ণভাবে রাজ্য শাসন করত। একদিন পাহাড়ের মাথায় উঠে, ভ্লাতাভা নদীর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে তিনি বললেন, অদূর ভবিষ্যতে এই শহর হয়ে উঠবে পূর্ব ইউরোপের শ্রেষ্ঠ শহর। খ্যাতির শিখরে পৌঁছবে তার শিল্প-কলা-কৃষ্টির উত্কর্ষতায়। একজন মানুষ তাঁর দৃষ্টিপথেই একটি বিশাল দুর্গ বানিয়ে চলেছিল। রাণী বললেন আর ঐখানেই সেই চরম শহরায়ণের সব লক্ষণ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এবং ফলেও গেল তাঁর কথা। তাই তো এই শহর চেক রিপাব্লিকের রাজধানী শহর যার নাম প্রাহা।
আবারো পায়ে হেঁটে প্রাগের ওল্ড টাউন স্কোয়ারে ঘোরা। এই প্রাগ আমাদের নিয়ে গেল ফিজিক্স বইয়ের পাতায়। জোহান কেপলার ও টাইকো ব্রাহের জ্যোতির্বিদ্যার অনেক কিছু আবিষ্কার ঘটেছিল এখানে। পথের ধারে দুজনার স্ট্যচুটি প্রমাণস্বরূপ আজো সেখানে। দুই দিকপাল জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহে আর জোহানেস কেপলার আসেন প্রাগে। টাইকো ব্রাহে ছিলেন উত্কৃষ্ট পর্যবেক্ষক আর কেপলার ছিলেন গণিতজ্ঞ। এই প্রাগেই টাইকো ব্রাহে কেপলারকে তাঁর সহকর্মী করলেন। আকাশে হঠাত টাইকো দেখতে পেলেন অদ্ভূত সুপারনোভা। কেপলার তা থেকে অঙ্ক কষে সূত্র তৈরী করলেন। হয়ত একে অপরের পরিপূরক ছিলেন কিম্বা তাঁদের মধ্যে ছিল চরম ইগোর দ্বন্দ। কিন্তু সেই মূহুর্তে আমার কাছে এঁদের গল্প শোনা মানেই আমার ফিজিক্স বইয়ের সেই ছবিদুটিতে মনে মনে প্রণাম জানানো আর প্রাগের রাস্তায় এঁদের স্ট্যাচু দেখে আকুলিবিকুলি প্রাণ।
এরপর সেন্ট নিকোলাস চার্চ। কোবলস্টোনের ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় এদের সবকিছু সংরক্ষণই এত সুন্দর? এরা দুটি বিশ্বযুদ্ধের পরেও তো এরা নিজেদের অনেক ভেঙেচুরে আবারো গড়ে তুলেছে। আর সর্বোপরি রেখেছে কি চমত্কার!
রাস্তা পেরোই ট্রামলাইনের ওপর দিয়েই। কি অপূর্ব এই স্ট্রীটকারের মায়াবী নেটওয়ার্ক। সারা শহরের অলিগলি রাজপথ থেকে ক্রিসক্রস ভাবে রঙীন সুন্দর সুন্দর ট্রাম চলে যাচ্ছে অনবরত। আর এরা কত সুন্দরভাবে এই যানটিকে ব্যাবহার করে সেটাই দেখবার। প্রাগের ট্রামের নেটওয়ার্ক চেক রিপাবলিকের মধ্যে সর্বোত্তম এবং সবচেয়ে বৃহত।
রাস্তায় হাঁটি অবলীলায়। জেব্রাক্রসিংয়ে পা দিয়ে, ট্র্যাফিক লাইট মেনেই। আর চোখে পড়ে অসাধারণ রেনেসাঁ স্থাপত্য। মনে মনে ভাবি সমগ্র ইউরোপটাই কি এত সুন্দর! কাকে দেখি আর কার থেকে মুখ ঘোরাই? এবারে গাইডের ধারাভাষ্যে কান পাতি আর শুনি প্রাগের লেসার( Lesser) টাউনের কথায়। এই লেসার টাউন স্কোয়ারের ল্যান্ডমার্ক হল রাজকীয় সেন্ট নিকোলাস চার্চ। ওল্ড টাউন স্কোয়ারের কেন্দ্রবিন্দুতে এই চার্চ । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চেক আর্মির ঘাঁটি ছিল এই নিকোলাস চার্চ। চার্চটির সংরক্ষণের জন্য এই সেনাবাহিনীর নিরলস পরিশ্রম আর সেই সাথে নামীদামী স্থপতিদের শিল্পকলায় ভরে উঠেছিল চার্চের অন্দর ও বাইরের মহল। সেন্ট নিকোলাস চার্চটি একাধারে গীর্জা অন্যধারে ক্লাসিকাল কনসার্টের অন্যতম প্রেক্ষাগৃহ বা মঞ্চ।
বাইরে থিকথিক করছে রেস্তোঁরা, পাব, দোকানপাট, ব্যুটিক আর প্রাগের বিখ্যাত মানুষ, ধনী লোকজনের ব্যারক স্টাইলের ঘরবাড়ি। ইন্টারন্যাশানাল এমব্যাসিগুলিও এখানে। এই ব্যারক স্টাইল হল অত্যন্ত সুন্দর স্থাপত্যে নির্মিত বাড়ি। জানলার নীচে খোদাই করা মানুষের মুখ, বাড়ির ছাদের প্যারাপেটে পরী কিম্বা প্রবেশ পথে জীবজন্তুর অসামান্য আর্কিটেকচার। পুরণো শহরের অনুপাতে অনেকটাই ছোট বলে এর নাম লেসার টাউন।
এবার একফালি অন্ধকার সুড়ঙ্গ দিয়ে আবারো বড় রাস্তায় গিয়ে পড়ি। পিটার মোবাইলে ডেকে নিলেন সেদিনের জন্য বুক করা আমাদের প্রাইভেট ট্রামের একটি কামরাকে। ম্যাজিকের মত ট্রাম এসে দাঁড়ালো সামনে। উঠে পড়লাম টুক করে। কি সুন্দর অনুভূতি। স্বপ্নের মত সেই সন্ধ্যেয় প্রাগের ট্রামে চড়া আর একটা গলির মুখে অবতরণ করে পাথরের রাস্তা দিয়ে এক বিয়ার ব্রুয়ারীর মধ্যে প্রবেশ করা। বোহেমিয়ান বিয়ার নাকি বিখ্যাত। তেমনি এক বিয়ার পাবে সেদিনের সান্ধ্য আড্ডা জমে গেল। বিশাল সুদৃশ্য কাটগ্লাসের মাগে বিয়ার হাজির হল সাথে টুকটাক । এককোণায় প্রৌঢ় বাজিয়ে চলেন একর্ডিয়ানে চেনাঅচেনা গানের সুর। আলো আঁধারিতে মায়াময় পরিবেশ। ঘন্টাখানেক পর পাব থেকে বেরিয়ে পড়ি সকলে মিলে। আবার পায়ে হেঁটে আলোকমালায় সজ্জিত রোমান্টিক প্রাগের রাজপথে উঁকি দি। পথ হয় গাইডের ধারাভাষ্যে গল্পমুখর।চোখ রাখি সেই বিখ্যাত জার্মাণ ইউনিভাসিটি অফ প্রাগে যেখানে এলবার্ট আইনস্টাইন থিওরিটিকাল ফিজিক্সে অধ্যাপনা করেছিলেন। পেরুতেই চোখ রাখতে হয় চারজন মিউজিশিয়ানের অনবদ্য স্ট্যাচুতে। প্রাগের বিখ্যাত স্থাপত্যগুলির একটি। চারজনের হাতে চারটি বাদ্যযন্ত্র। স্থপতির কল্পনায় বিশ্বের বৃহত্তম চারটি নদী আমাজন, মিসিসিপি, গঙ্গা এবং দানিয়ুব এর এক একরকম কলতান নাকি এই চার বাদ্যশিল্পী চোখ বন্ধ করে বাজিয়ে চলেছে । চার নৃত্যরত শিল্পীর চোখ বাঁধা। তাদের হাতে ম্যান্ডোলিন, ভায়োলিন, বাঁশী ও ট্রামপেট।
এবার গিয়ে উঠি ভ্লাতাভা নদীর ওপরে চার্লস ব্রিজের ওপরে। বিশাল চওড়া হাঁটার পথ। ব্রিজের ডাইনে বাঁয়ে সব পিলারের মাথায় দন্ডায়মান সারেসারে স্থাপত্য। রাজ পুরোহিত সেন্ট জন নেপোমুকের স্ট্যচুটির সামনে গিয়ে থামি।স্ট্যাচুর মাথার চারিপাশ দিয়ে একটি ধাতব রিংয়ে পাঁচটি সোনালী স্টার খচিত। ভ্লাতাভা নদীর ব্রিজের ঠিক ঐ স্থানটি থেকে তাঁকে নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন রাজা কারণ পুরোহিতের কাছে রাজা তাঁর রাণীর স্বীকারোক্তির কথা জানতে চেয়েছিলেন এবং পুরোহিত তা জানাতে চান নি। অতি জাগ্রত এই স্ট্যাচুটি ছুঁলে নাকি মনোস্কামনা পূর্ণ হয়। স্থানীয় মানুষ ব্রিজের গায়ে ছোট ছোট তালা লাগিয়ে দেয়, অনেকটা আমাদের ঠাকুরের থানে গিয়ে লাল সূতো বাঁধার মত। নদীর ওপরে পুরণো ব্রিজ, নতুন ব্রিজ একই সময়ে মানে ঐ রাতেই ক্রস করছি, বেশ লাগল ভেবে।
আকাশে তখন কৃষ্ণা চতুর্থীর চাঁদ। ঘুটঘুটে অন্ধকারে পায়ে হেঁটে রূপসী প্রাগের পথ চলার শেষে এবার ভৌতিক অনুভূতি। ছমছম করে ওঠে গা। চোখের পলক পড়েনা গাইডের মুখ গল্প শুনে। মাথাকাটা এক সাধুর গল্প বলে চলে সে। তার অতৃপ্ত আত্মা নাকি এখনো ঘুরে বেড়ায় মনাষ্ট্রির সিঁড়িতে। সেই সাধু অভাবের তাড়নায় কি যেন বেচার চেষ্টায় ছিলেন তাই তার মাথা কেটে দেন অন্য সাধুরা। হেডলেস মঙ্কের গল্প শুনেই মনে হয় কখন বাড়ি থুড়ি হোটেল যাব।
পৌঁছে যাই সেন্ট অ্যাগনেস মনাষ্ট্রির মধ্যে। বেরিয়েই পাউডার গেট ( চেক ভাষায় যার নাম Prašná brána) প্রাগের এক গথিক টাওয়ার সহ প্রবেশদ্বার যেন আমাদের গেট ওয়ে অফ ইন্ডিয়া বা ইন্ডিয়া গেটের মত। এই প্রবেশদ্বার প্রাগের ওল্ডটাউনকে নিউটাউন থেকে পৃথক করেছে। সেখানে দাঁড়িয়ে গল্প শুনি সেন্ট এগনেস নামে এক রাজকন্যার যে আটবছর বয়সে বাগদত্তা ছিল দশবছরের এক রাজপুত্রের সঙ্গে। আর তারপর তার সংসারে বীতরাগ জন্মানো আর কৃচ্ছ্রসাধনে ব্রতী হয়ে ভক্তিমার্গে বিচরণের গল্প শুনতে শুনতে ওল্ড টাউন স্কোয়ারের Wensessler স্কোয়ারে পা বাড়ানো। বোহেমিয়ার প্যাট্রন সেন্ট Wenceslas এর নামে এই স্কোয়ারের নাম। এই ঐতিহাসিক স্থানটি হল প্রাগের হেরিটেজ সাইট। মধ্যযুগে এখানে ঘোড়ার বাজার ছিল। এবারে বোহেমিয়ান রাজা চতুর্থ চার্লসের নিউ টাউন স্কোয়ার বানানোর গল্প শুনে পথ চলি। আলোয় ঝলমলে তখন প্রাগের নিউটাউন। রাতের আলোয় ন্যাশানাল মিউজিয়াম, Wenceslas মনুমেন্ট এক অদ্ভূত রোমান্টিক স্থান।
ওল্ড টাউন স্কোয়ার থেকে প্রাগ কাসল যাবার পথেই পড়ল "নাইটস অফ দ্যা ক্রস স্কোয়ার"... প্রাগের বিখ্যাত রাজপথ, টুরিষ্টদের অন্যতম গন্তব্য। ডিজিটাল ক্লিকে, সেলফি স্টিকে রাজকীয় রাতপরী প্রাগের ছবি তখন ক্যামেরায় ধরে নেবার পালা। সেই স্কোয়ার অন্যদিকে চার্লসব্রিজকেও ছুঁয়েছে। স্কোয়ারের মধ্যিখানে রাজা চতুর্থ চার্লসের বিশাল সেমি-গথিক স্ট্যাচু । শহরের আলোয় ঝলমলে প্রাগ তখন যেন যৌবনউদ্ভিন্না। চালর্স ইউনিভার্সিটির ৫০০ বছর পূর্তিতে রাজার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে এই স্মারক নির্মিত হয়েছিল।
স্কোয়ারের আশপাশের গথিক স্টাইল অট্টালিকার প্যারাপেটে দাঁড়িয়ে সারে সারে ভাস্কর্য। কি অপূর্ব তারা ! পেছন থেকে আলো এসে পড়েছে সর্বাঙ্গে।
আবারো মোবাইলে ডেকে নেওয়া হয় ট্রামকে। সেরাতের মত প্রাগ শহরকে বিদায় জানিয়ে হোটেলে গিয়ে ঘুমে ঢলে পড়ি আর আমার স্বপ্নে এসে তখন ধরা দেয় সেই প্রাগসুন্দরী। মনে হয় স্বচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পারি আরো আরো পথ তার সঙ্গে ।
কখন যাবেনঃ মে থেকে আগষ্ট
কিভাবে যাবেনঃ চেক রিপাবলিকের ক্যাপিটাল প্রাগে যেতে যেকোনো ইউরোপিয়ান শহর থেকেই ফ্লাইট নেওয়া যায়। অথবা ট্যুরগ্রুপের সাথে গেলে তারা বাস প্রোভাইড করে।
কোথায় থাকবেনঃ ট্যুরিষ্টপ্লেস প্রাগে সবধরণের হোটেলের রমরমা। ট্যুর কোম্পানির সাথে যাওয়াই ভাল।
আমরা ট্রাফালগার ট্যুর কোম্পানির সঙ্গে ঘুরেছিলাম। প্রত্যেক হোটেলেই বেড এন্ড ব্রেকফাস্ট ইন্ক্লুডেড
Monday, January 1, 2018
Wednesday, June 7, 2017
হায়াদ্রাবাদ
দৈনিক যুগশঙ্খে প্রকাশিত দুটি ভ্রমণকাহিনী
http://jugasankhasuppli.zohosites.com/files/TRAVEL/CF%2025_24%20May%2C%202017.pdf
http://jugasankhasuppli.zohosites.com/files/TRAVEL/CF%2023_10%20May%2C%202017.pdf
http://jugasankhasuppli.zohosites.com/files/TRAVEL/CF%2025_24%20May%2C%202017.pdf
http://jugasankhasuppli.zohosites.com/files/TRAVEL/CF%2023_10%20May%2C%202017.pdf
![]() | |||||||
| দৈনিক যুগশঙ্খ ২৪শে মে ২০১৭ |
![]() |
| দৈনিক যুগশঙ্খ ১০ই মে ২০১৭ |
Saturday, February 11, 2017
বীরভূমের টেরাকোটা মন্দিরে
শীত পড়লেই মন উসখুশ! আমার রূপসী দক্ষিণবাংলায় গ্রীষ্মে তো বেড়ানোই দায়। তাই অমৃত কমলার ভোর গড়িয়ে পৌষের রোদ গায়ে মেখে প্রতিবারই বেরিয়ে পড়া আর কি! কত কিছুর স্বাদ নেওয়া, কত অজানা অচেনা দ্রষ্টব্য নিয়ে তারিয়ে তারিয়ে লেখা এখনো বাকী। বীরভূম এমনি একটি জেলা যেখানে দেখবার শেষ নেই। তার বোলপুর সার্কিটটা ভাল করে দেখতেই সপ্তাহখানেক সময় লেগে যাবে। আর কলকাতা থেকে গেলে শান্তিনিকেতনকে বেস করাই ভাল। সারাদিন ধরে ঘুরে এসে শান্তির বিশ্রাম নিয়ে আবারো পরদিন ঘোরা যায়। প্রচুর ট্রেন ছাড়ে কলকাতা থেকে। আর শান্তিনিকেতন থেকে গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া যেতেই পারে। আর নিজের গাড়ি থাকলে তো কথাই নেই।
শীত এলেই পৌষমেলার টানে কত হুজুগে মানুষ প্রতিবছর শান্তিনিকেতনে পৌঁছে যান। কিন্তু তার সিকিভাগ মানুষজনও কোলাহল মুক্ত পরিবেশে শীতকে উপভোগ করতে বোলপুর শহর ছেড়ে কিছুটা দূরে যাবার কথা ভাবতেও পারেন না। পৌষমেলা দেখে নিয়েও কিন্তু শান্তিনিকেতন থেকে অতি অনায়াসেই পৌঁছানো যায় জয়দেব প্রসিদ্ধ কেন্দুলি হয়ে ঘুরিশা আর মৌখিড়া গ্রামদুটিতে। ইলামবাজারের চৌপাহাড়ি জঙ্গল এর মধ্যে দিয়ে শীতের সকালে প্রথমে হাজির হয়েছিলাম অজয় নদের ধারে কেন্দুলি বা কেন্দুবিল্ব গ্রামে।
গীতগোবিন্দ প্রসিদ্ধ কবি জয়দেবের জন্মস্থান এই কেন্দুলি গ্রাম। মকরসংক্রান্তিতে মেলা বসে জমিয়ে। আউল-বাউল-বৈষ্ণব কীর্তনিয়া দূরদূরান্ত থেকে হাজির হন এখানে। উন্মুক্ত পরিবেশে গান-উৎসব হয় মহা সমারোহে। জয়দেবের আরাধ্য রাধাবিনোদের টেরাকোটা মন্দিরটির পাশাপাশি কদম্বখন্ডীর ঘাটে রাধামাধবের বিগ্রহপ্রাপ্তির গল্প আজো মুখে মুখে ফেরে। অজয় নদে পুণ্যস্নান করেন অগণিত মানুষ। কবি জয়দেবের ভিটের ওপরেই রাধাবিনোদের নবরত্ন টেরাকোটা মন্দিরটি আজো নজর কাড়ে। মন্দিরের গায়ে রামরাবণের যুদ্ধ থেকে দশাবতার আর গর্ভগৃহে রাধাবিনোদের যুগলমূর্তিটি জয়দেবের আরাধ্য বলে এখনো মানুষের বিশ্বাস। বর্তমানে আর্কিওলজিকাল সোশ্যাইটির তত্ত্বাবধানে রেখাদেউল রীতিতে নির্মিত এই মন্দির । কুলেশ্বর ঘাটের কাছে কুলেশ্বর শিবমন্দিরে কবির সিদ্ধাসন এর প্রস্তরখন্ডটি আজো রয়েছে। প্রকান্ড এক মহীরুহ। মাটীতে টুকটুকে লাল বটফলের গালিচা আর গাছের ওপর থেকে অসংখ্য ঝুরি নামা দেখে বোঝা যায় মূল বৃক্ষটি বট। তার ফোকরের মধ্যে দিয়ে উঠেছে একটি পাকুড়গাছ । আর সবচেয়ে আশ্চর্য্যের ব্যাপার হল বট ও পাকুড়ের মধ্যিকারের ব্যাবধানে প্রকৃতির ইচ্ছেয় আরো দুটি বড়গাছের মধ্যস্থতায় তালের আঁটি পড়ে একটি শালপ্রাংশু তালগাছ সকলকে ছাড়িয়ে আকাশ ছুঁতে চেয়েছে। এই বট-পাকুড় আর তাল গাছের ত্রহ্যস্পর্শে বাঁধানো শানের বেদীতে গিয়ে বসলাম খানিক। কিছুদূরেই অজয়নদের রুক্ষ ও শুষ্ক নদীবিছানা। বালির বুক চিরে একটু একটু জল। রোদের আলো পড়ে সেইটুকুই চিকচিক করে ওঠে। আদিগন্ত শুকনো চরাচর। গাছপালাও কম। জনবসতিও বিরল। অজয়নদের তীরে এই ঘাটটি নতুন করে বাঁধিয়ে সংস্কার করা হয়েছে । এরই নাম কদম্বখন্ডীর ঘাট।
এবার পা বাড়ালাম ঘুরিশার দিকে।
ইলামবাজার থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরে এই গ্রাম। শাল, সোনাঝুরির এভিনিউ এর মধ্যে দিয়ে "পায়ের মোড়" পেরিয়ে প্রথমে খোঁজ নিলাম ঘুরিশা গ্রাম পঞ্চায়েতের। কারণ হাতের মুঠোর গুগ্ল ম্যাপ এর দিশা অন্ততঃ তাই বলছিল। তারপর ঘুরিশা ইস্কুল মোড় পেরুতেই চোখে পড়ল তিনোর বাসস্ট্যান্ড। স্থানীয় মানুষেরা বলল, পুরাতন মন্দির এই পথে। ব্যাস গাড়ি ঘুরিয়ে সেই পথে। স্থানীয় মানুষেরাই পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল ঘুরিশার বিখ্যাত রঘুনাথজী মন্দিরে। বাংলার চারচালার স্টাইলের টেরাকোটার অপরূপ মন্দিরটি। বহু পুরণো বোঝাই যায়। সে সময় ইলামবাজার ছিল বাংলার অন্যতম বিজনেস সেন্টার। নীলকর সাহেব এবং আখচাষের হেতু চিনি উত্পাদন কেন্দ্র হিসেবে বেশ নামডাক ইলামবাজারের। ঘুড়িশা গ্রামে হত ন্যায়শাস্ত্রের চর্চা। রঘুনাথ ভট্টাচার্য ( মতান্তরে, রঘুনাথ আচার্য ) এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আনুমানিক সপ্তদশ খ্রিষ্টাব্দে । এটি প্রধানতঃ রামচন্দ্রের মন্দির। মন্দিরের মধ্যে রামচন্দ্রের স্বর্ণমূর্তিটি মারাঠা বর্গীদস্যুরা লুঠ করে নিয়ে চলে যায়। তাদের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই মন্দির । এরপর স্থানীয় শ্রী রামময় পঞ্চতীর্থ ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরটিকে সংস্কার করে গর্ভগৃহে পশুপতি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মূল মন্দিরটি বেশ উঁচুতে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। মন্দিরের দুটি প্রবেশপথ। চার দেওয়ালের টেরাকোটার অভিনব স্থাপত্য দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। এই পোড়ামাটির পৌরাণিক শিল্পকর্ম যে কত নান্দনিক হতে পারে আর তার বিচিত্র কারুকার্য যে কোনো ভ্রমণপিপাসু মানুষকে আকর্ষণ করবে। অনেকটা যেন বিষ্ণুপুর টেরাকোটা মন্দিরের স্টাইল সেই পোড়ামাটির কাজে।
শীতের সকালে প্রত্যন্ত এক গ্রামের মেঠো পথ ধরে চলেছি। গ্রামের মানুষেরা হাঁ করে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে, ভাবে এই গ্রামের প্রাচীন মন্দিরের টানে গাড়ি চেপে শহরের মানুষ আসে ? আর সেই মন্দিরগাত্রের টেরাকোটার মণিমুক্তো নিয়ে তাদের তো কোনো হেলদোল নেই! একজন ছেলে তার বন্ধুটিকে জিগেস করেই বসল, কি আছে রে মন্দিরে? আমি ঝটিতি জবাব দিলাম, সোনাদানা, হীরে জহরত। ছেলেটি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল আমার দিকে। এ পাশে ফুলুরি-জিলিপির দোকান ওপাশে অঘ্রাণের ধান ঝাড়াই হয়ে পৌষের রোদে সোনা হয়ে পড়ে রয়েছে। রাজহংসী কম্বুকন্ঠ ঘুরিয়ে আড়ে আড়ে চাইল অপরিচিতের দিকে। তারপরেই ধীর পায়ে নেমে গেল পুকুরের জলে। চলেছিলাম মরাই ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর সারিসারি বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে। ধান কাটার পর্ব শেষে। এবার আসন্ন নবান্নের দিকে তাকিয়ে থাকা। এই আমার বাংলা। বাগাল ছেলের অমলিন হাসি, গামছা গায়ে তণ্বী তনয়াদের দলে দলে পুকুর স্নান আর হাঁস চরা থৈ থৈ পান্না পুকুরকে সঙ্গী করে এগুতে থাকি আমরা। মাইলের পর মাইল খেতি জমিতে আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপির ফলন দেখতে দেখতে আরো এগুতে থাকি। খেজুরগাছে হাঁড়ি বাঁধা তখন। এখন এ গ্রামের ধান বুলবুলিতেও আর খায়না আর বর্গীরাও আসেনা লণ্ডভণ্ড করতে। মন্দিরের প্রধান প্রবেশপথটি যথারীতি পুবদিকে। প্রবেশদ্বারের মাথা অর্ধচন্দ্রাকৃতি। সুচারু হাতে পোড়ামাটিতে খোদাই করা রয়েছে ষাঁড়ের পিঠে বেশ লম্বা শিবমূর্তি। এর ঠিক ডানদিকে রাজহংসের পিঠে চতুরানন ব্রহ্মা আর বাঁদিকে গরুড়াসনা বিষ্ণু। বেশ ক্ষতিগ্রস্ত সব কারুকাজ। তবে এখনো অনেকটাই রয়েছে দেখবার মত। এছাড়াও রয়েছে ছিন্নমস্তা এবং অপরূপ এক কালীমূর্তি। কেউ মনে করেন এটি নরমুন্ডের মালা পরিহিতা চামুন্ডা কালী। এছাড়াও দশমহাবিদ্যা, দশাবতার, শিব-পার্বতী, লক্ষ্মী ও সরস্বতী মূর্তিগুলি বেশ স্পষ্ট। কোথাও আবার টেরাকোটার প্যানেলে রাম-রাবণের যুদ্ধ, কোথাও বা বিষ্ণুর অনন্তশয্যা, রাধাকৃষ্ণের রাসলীলা চমত্কার ফুটে উঠল চোখের সামনে।
এবার আরো এগিয়ে চলি স্থানীয় মানুষদের জিগেস করতে করতে। প্রত্যন্ত এই গ্রামে শহরায়নের ছাপ বেশ স্পষ্ট। মোবাইল ফোনের রমরমা মাটির দেওয়ালের বিজ্ঞাপনে। হাওয়ায় উড়ছে 3G, 4G কিন্তু যুবক যুবতীদের কাছে সে কনসেপ্ট এখনো অধরা। প্রকৃতি লুটেপুটে খাচ্ছে ধুলোমলিন ঘুড়িশা গ্রামের দারিদ্য। সামান্য চাষাবাদ, গরু, হাঁসমুরগী প্রতিপালন এই মানুষদের জীবিকা। তবুও হাসিমুখে উত্তর দেয় কথার। গোবর লেপতে লেপতে, ধান ঝাড়তে ঝাড়তে মেয়েরা বলে, "এই তো সামনেই, আরেকটু যান, গোপাল, লক্ষী-জনার্দন মন্দিরটা দেখতে পাবেন"
এঁকেবেঁকে ধানের গোলায় ধাক্কা খেতেই চেয়ে দেখি সুউচ্চ নবরত্ন মন্দিরের চূড়া। হিন্দুরীতি মেনে এটিও পুবমুখী মন্দির। এটিতে নিত্যপুজো হয়। আর এর অবস্থা আগেরটির চেয়ে একটু ভাল মনে হল। বহু প্রাচীন মন্দির। ১৭০০ সালের।
এ মন্দিরের সংস্কার হয়েছে দেখলেই বোঝা যায়। বসেছিলেন এক বয়স্ক মহিলা। মাসীমা বলেই তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। হাসিমুখে তিনি উত্তর দিলেন প্রশ্নের। বললেন, আমার শ্বশুরমশাই বর্ধমানের মানুষ ছিলেন। তিনি এর দেখভাল করতেন। নিত্য পুজোপাঠের ব্যাবস্থা তখন থেকেই দেখে আসছি। উনি থাকলে আপনারা আরো তথ্য পেতেন। মূল মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা বর্ধমানের এক গন্ধবণিক ক্ষেত্রনাথ দত্ত। ব্রিটিশ আমলে ইলামবাজারের নামকরা লাক্ষা ব্যাবসায়ী ছিলেন। উঁচু প্ল্যাটফর্মে গিয়ে তখন আমরা একে একে টেরাকোটা প্যানেলের ছবি তুলেই চলেছি। কি অপূর্ব নান্দনিক সেই কারুকার্য। মন্দিরের তিনটি আর্চ করা প্রবেশপথ গিয়ে পড়েছে এক বারন্দায়। তারপরে মূল মন্দিরের গর্ভগৃহ। গোপাল, লক্ষ্মী আর জনার্দণের বিগ্রহ আছে। বৃদ্ধা বললেন, জানিয়ে এলে ভোগের ব্যাবস্থা করতে পারতাম। এই নবরত্ন মন্দিরের দেওয়ালে টেরাকোটার কাজ দেখলেই বোঝা যায় এটি বৈষ্ণব মন্দির। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ তাঁদের পার্শ্বদদের সাথে নৃত্যরত। এছাড়াও রাধাকৃষ্ণ ও রয়েছে। তবে আর্চ করা খিলানের মাথায় শাক্ত ধর্মাবলম্বীর ছোঁয়া। টেরাকোটায় ফুটে উঠেছে ত্রিপুরাসুন্দরী, ষোড়শীর ন্যায় কালীর দশমহাবিদ্যার রূপ। এছাড়াও রয়েছে রাম, সীতা, গণেশ। মঙ্গলকাব্যে বর্ণিত শ্রীমন্ত বণিকের কমলেকামিনী ও ব্রিটিশ সৈন্য নিয়ে সদলবলে যুদ্ধযাত্রা। বৃদ্ধা জানালেন, গর্ভগৃহে প্রতিনিয়ত শালগ্রাম শিলা, গোপাল, ত্রিপুরাসুন্দরী, গণেশ এবং মঙ্গলচন্ডীর পুজোপাঠ হয়।
ডিজিটাল ক্লিকে মুখর নবরত্ন মন্দিরের টেরাকোটার দেওয়াল। নেমে দাঁড়াতেই গায়ে কষে সর্ষের তেল মাখতে মাখতে শীতের রোদ পোহাচ্ছিলেন বৃদ্ধার এক আত্মীয়। তিনি বললেন, ফেরবার সময় মনসার থানে মাথা ঠেকিয়ে যাবেন কিন্তু। সাপখোপ নিয়ে বেঁচে থাকত মানুষ সেসময়। এখন জঙ্গল কেটে সাফ। তবুও মা মনসার দোর ধরে আমরা পড়ে আছি এ গ্রামে। এগিয়ে গেলাম। মনসা মন্দিরটি আরো প্রাচীন। তার নাটমন্দিরে এক জেলে দম্পতি মাছ ধরবার জাল বুনছে । মন্দির বন্ধ। বেশ ভগ্নপ্রায় তার অবস্থা। এখন অরণ্যমেধ যজ্ঞে সামিল গ্রামের মানুষ। পালিয়েছে সাপ। আর মা মনসা তার আগেই স্বর্গবাসী হয়ত। তবুও মানুষের বিশ্বাস যায়না ম'লে।
এরপর আমাদের গন্তব্য ইলামবাজারের দক্ষিণে আরেকটি গ্রাম মৌখীড়ায়। বর্ধমান-বীরভূম সীমান্তে ইলামবাজার থেকে যার দূরত্ব মাত্র মাইল তিনেক। আবার গুগ্লম্যাপ। আবার স্থানীয় পুছতাছ। ওদিকে পাশের দ্বারন্দা গ্রামে বনলক্ষ্মীর তপোবনে আমাদের দুপুরের খাওয়ার ব্যাবস্থা করা আছে। অতএব ফোন ঘোরাও। ওপ্রান্ত থেকে বনলক্ষ্মীর উত্তর, দেরী হলেও আসুন । আপনাদের, গরম ভাত আর চিংড়ির মালাইকারী রেডি থাকবে। অগত্যা চলো লেটস গো টুওয়ার্ডস মৌখীড়া। ইলামবাজারের এত কাছে মন্দিরপ্রধান গ্রাম মৌখীড়া? সেখানেও আঠারোশো খ্রীষ্টাব্দের প্রাচীন সব মন্দির। গ্রামের রাস্তায় প্রবেশ করলেই দেখতে পাওয়া যায় ভগ্ন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ।
“It is an object very dear to my heart and I cannot help welcoming any endeavours towards its realisation”
চলেছি আর বারেবারে মনে করছি রবিঠাকুরের কথাগুলি। আমার রূপসীবাংলায় সে যুগে দলে দলে ক্রাফটসম্যান ছিলেন আর কিছু মানুষ ছিলেন এদের অকুণ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। এই সব শিল্পীদের দিয়ে তাঁরা তৈরী করেই চলতেন একের পর এক মন্দির। এ যেন কারিগরের চাঁদের হাটে বাংলার গ্রাম উঠত জেগে। আর ছড়িয়ে পড়ত টেরাকোটার শিল্পকর্ম এভাবেই। অতএব ইট, চুন, সুরকি, বালি আর প্লাসটার। ফুটিয়ে তোলো তিরিশ কিম্বা পঞ্চাশ ফুট লম্বা মন্দিরের গায়ে সেই অভিনব পোড়ামাটির মোটিফ। পয়সার অভাব নেই। শিল্পীর হাতের কাজ যেন শ্রেষ্ঠত্বের দাবী রাখে। তখন বাংলায় বিত্তবানদের বাস। জমিদার, রেশম ব্যাবসায়ী, কায়স্থ, ব্রাহ্মণ, পানের বরজের মালকিন, কয়লার ব্যাবসায়ী, সকলের সম্মিলিত ধনদানে পরিপূর্ণ হয়ে উঠুক বাংলার গ্রামের পর গ্রাম। ঠিক তেমনি এক গ্রামের সন্ধান পাওয়া গেল সেদিন। নাম কালিকাপুর। সেখানকার দুর্গাবাড়ি আজো সুপ্রসিদ্ধ। নামী বাংলা ছায়াছবির শ্যুটিং স্পট। একদা নীলকুঠি পাড়া। আজো একরের পর একর তাদের জমি, প্রাসাদ, কুঠিবাড়ি সব পরিত্যক্ত, চাবি বন্ধ। আর সেই চত্ত্বরেই উন্মুক্ত প্রান্তরে জোড়া মন্দির। আবারো অভিনব স্থাপত্য তার গায়। নীলকর সাহেবদের আধিপত্য এখনো অমলিন মন্দিরের গায়ে। প্রায় এক ফুটেরো বেশী লম্বা সারে সারে মেম সাহেবের প্রতিকৃতি মূর্ত হয়ে রয়েছে মন্দিরের গায়ে। তার সঙ্গে আমাদের সব ধর্মীয় দেবদেবীরাও রয়েছে যথারীতি। পৌরাণিক কাহিনীও বর্ণিত দেওয়াল গাত্রে।
জমিদার পরমানন্দ রায় এর পুত্র কৈলাস রায় এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। সেদিনকার মত মৌখীড়ার মন্দির দেখে এবার বনলক্ষ্মীর পথে দ্বারন্দা গ্রামে। সেখানে খেতের রাঁধুনিপাগল চাল, খেজুরের গুড়ের পিঠে, আচার, নতুন কলাই ডালের বড়ি আর হস্তশিল্প পর্ব সমাধা হতেই দেরীতে লাঞ্চ সেরেই সেদিনের মত ঘরে ফেরার গান। ভাগ্যি ভগবান কপালে প্রান্তিকে একটুকরো মাথা গোঁজার স্থান রেখেছিলেন। তাই বেলাবেলি টুক করে ঢুকে পড়েছিলাম সেখানে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে জমে যায় শীতের ছুটি, কেনাকাটির দুপুর, গ্যাস্ট্রনমিক ফুর্তি! আর গ্রাম বাংলার মন্দিরময়তা আর তার সারে সারে টেরাকোটার ছবি তুলে রাখে আমার মন ক্যামেরা। কলমে বেঁচে থাকে বাংলার ঐতিহ্য।
Sunday, January 8, 2017
অঘ্রাণে সাগরস্নানে
![]() |
| উত্তরবঙ্গ সংবাদ রংদার রোববার ৮ই জানুয়ারি ২০১৭ |
সামনেই আমাদের পৌষ সংক্রান্তি। পৌষ পার্ব্বণের পাশাপাশি সাগরসঙ্গমে স্নানে সামিল হন দেশের বহু মানুষ। সেখানে গঙ্গা গিয়ে মিশেছে সাগরের সাথে। কোলাহলময়তা পছন্দ না হলে, পুণ্যিলাভের আশা মাথায় রেখে শুধু নির্মল আনন্দ আর নির্জন সৈকত খুঁজতে কলকাতার কাছেই এমন সুন্দর উইকএন্ড ভ্রমণ এ সামিল হওয়া যেতেই পারে। সেই নিয়ে পৌষ সংক্রান্তির প্রাক্কালে ।
Saturday, November 19, 2016
বিচিত্র রূপসী বাংলা
একসময়ের মশলা আর মসলিনের বাংলা এখন পাহাড়, অরণ্য, মন্দির, নদী, সমুদ্রে পরিবেষ্টিত বৈচিত্র্যময় পর্যটনের রূপসী বাংলা । তারই মায়ায় ছুটে চলি আমি। শুধু তারিয়ে তারিয়ে সেই রূপ দেখব বলে আর ফিরে এসে তাকে নিয়ে লিখব বলে।
বেড়াতে যাবার আগেই প্রতিবার ভাবই রাজ্যেই কোথাও একটা যাব কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতা আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় রাজ্যের বাইরে। আমাদের রাজ্যে D আছে কিন্তু C নেই। D মানে ডেষ্টিনেশন, D মানে ডাইভার্সিটি। কিন্তু C এর অভাব। এই মূহুর্তে মনে হচ্ছে আমার রাজ্য এ একটা C জ্বলজ্বল করছে সেটা হল cheap কিন্তু এর সাথে বাকী C গুলো absent. we can compromise on COST but in lieu of that expect convinience and comfort । কিন্তু ট্র্যাভেলিংয়ের সবকটি প্যারামিটার কি পাই আমরা? অথচ উত্তরে হিমালয়, ডুয়ার্স থেকে দক্ষিণে সাগরদ্বীপ, সুন্দরবন, পশ্চিমে পুরুলিয়ার অযোধ্যাপাহাড়, গড়পঞ্চকোট থেকে পূর্বে মেদিনীপুরের কুরুম্ভেরা ফোর্ট কিম্বা গনগনির মাঠ? কত কত সুন্দর জায়গা এ রাজ্যে, শুধু ট্যুরিজমের ইন্ফ্রাস্ট্রাকচার নেই।
তবুও গ্রীষ্মে যাই উত্তরবাংলায় তো শীতে ঝাঁপ দি সাগরের বুকে।
হিমালয়ের কোলে অপূর্ব পাহাড়ি গ্রামে যাই, দুটিপাতা-একটি কুঁড়ির স্বর্গরাজ্যে। রোদের কণা লুটোপুটি খায় চা-পাতায়। দিগন্তের নীল আর সবুজের মাখামাখি দেখে মনে পড়ে রবিঠাকুরকে... আলোর নাচন পাতায় পাতায়, এই তো ভালো লেগেছিল ।
গরুমারায় জিপ সাফারি। ভোর হতে না হতেই ময়ূরের ঘুম ভাঙানিয়া কর্কশ ডাক শহুরেদের কানে মিষ্টি লাগে । জিপের ধারালো হাওয়ায় আবার শীতকে নতুন করে পাওয়া । জঙ্গলমহল থেকে বেরিয়ে আসা বাইসন, হরিণ অথবা মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া সবুজ পায়রা, ঠোঁটসর্বস্ব ধনেশ পাখি! ডিজিটাল ক্যামেরায় ক্লিক, ক্লিক! ভীতু বনমোরগের পেছনে ছুটতে ছুটতে দেখি গন্ডার! কি রাজকীয়! আমার রূপসী বাংলার ঐশ্বর্য্য এরা।
শীতের রোদের গনগনে আঁচে ছুটে যাই সাগরের দিকে । সুন্দরবনের নোনা জল ছুঁই আর আমার মনখারাপের সব ঢেউগুলো আছড়ে পড়ে সেখানে। বাংলাকে আমি যেন নতুন করে পাই তখন। সুন্দরবন নামটিতে যতটা সৌন্দর্য্য ঠিক ততটাই সুন্দর তার ভৌগোলিক চেহারা। সেখানে মানুষের প্রতিনিয়ত ডাঙায় বাঘ আর জলে কুমীর নিয়ে বেঁচে থাকা । চরাচর জুড়ে নোনাজলের ঐশ্বর্য্য যার অনন্ত, অসীম জলরাশির মাঝে লুকিয়ে থাকে অগণিত সজীব আর সবুজ। গল্পকারের ভাষায় যা হয়ে ওঠে মূর্ত, ভ্রমণপিপাসুর কলমে যা হয়ে ওঠে আরো প্রাণবন্ত। কালের স্রোতে তার ভূগোল পুরোনো হয়না এই বায়োডাইভার্সিটির অন্যতম নিদর্শনে ।
কাজের চাপে শীত ফুরায়। ভাবতে ভাবতেই দোল ফুরোয় । অমৃত কমলার মিঠে রোদ, উলকাঁটার দুপুর গড়িয়ে সেদিন চৈত্রমাস। চৈত্রের গনগনে আগুণ দুপুরবেলা । কখনো পাতাঝরার টুপটাপ আর পলাশ-শিমূলের শুকনো ডালে কোকিলের ডাক । মনে পড়ে অক্ষয়কুমার বড়ালের মধ্যাহ্নের ছবি । নিথর চৈত্র ফাগুনে তালদিঘীতে রাজহংসীর মাথা ডুবিয়ে দুপুরস্নানের ফাঁকে গেঁড়ি গুগলি দিয়ে মধ্যাহ্নভোজন। সিঁদুরে ল্যাটেরাইট মাটিতে পা দিয়েই গনগনির মাঠ। ওদিকেই শিলাবতী নদীর বিছানা পাতা । শীতে অনেকটাই শুষ্কতা শিলাইয়ের বুকে । আবার ভরাবর্ষায় রূপ দেখাবে সে । লালমাটির খেয়ালে কি বিচিত্র সৃষ্টি হয়েছে। যেন পাহাড়ের গায়ে কে খোদাই করে রেখেছে গ্রামবংলার চালাঘর, মন্দির, বারান্দা, কুঠিবাড়ি, সাধুসন্ত , বারান্দা । যেন কালের স্রোতে ধুয়ে গিয়েও ক্ষয়ে যায়নি । অথচ এটা কৃত্রিম নয় । এ হল বাংলার গ্র্যান্ডক্যানিয়ন।
কোনোবার বসন্তের ভোরে ছুটে গেছি লালমাটির দেশে। সকালের মিষ্টিরোদ এসে পড়েছে শালবনের মাথায়, বসন্তের কচি সবুজপাতায় । চেনাপথ যেন আরো নবীন সজীবতায় । সজনে গাছ তার ভর-ভরন্ত রূপ নিয়ে, সজনেফুলের গন্ধ মেখে পলাশ তার লাল নিয়ে । পৌঁছে গেছি সত্যজিত রায়ের প্রিয় শুটিং স্পট মামাভাগনে পাহাড়ে। নীল এক আকাশের নীচে একসাথে কত জীবন্ত পাহাড়ের শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান। কেউ যেন একটা বিশাল অঞ্চল জুড়ে, অগোছালো করে রেখে দিয়ে গেছে কত কত পাথর, নানা আকৃতির কত কত নাম না জানা পাহাড় হয়ে উঠেছে সেগুলো । ছোট, বড়, মেজো, সেজো, ন', রাঙা, ফুল, কুট্টি, আন্না !
ভোরের গোলাপী কুয়াশা দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই পাঞ্চেত পাহাড়ের গায়ে গড়পঞ্চকোট। পাহাড়ে ট্রেকিং। নামের উত্সমূলে পঞ্চকোট পাহাড়। পুরাণের পাঁচটি চূড়াবিশিষ্ট শেখর পর্বত। শাল-মহুয়া-পলাশ-আকাশমণির জঙ্গল পরিবেষ্টিত পাহাড়ের মাথায় নদীর ঝোরা আর অতি প্রাচীন রঘুনাথজীর মন্দির । নীচে প্রবেশদ্বারেই দুয়ারবাঁধ তোরণ, পোড়াইঁটের পঞ্চরত্ন মন্দির, রাসমন্দির, রাণিমহল সবকিছুই ছিল একসময়, সব মিলিয়ে যার নাম গড়পঞ্চকোট ।
এই মন্দিরের প্রতি আমার একটু দুর্বলতা আছে। প্রাচীন মন্দিরের ঐতিহ্যময়তা, গঠনশৈলী আর এদের ঘিরে পুরোণো কিংবদন্তী আমাকে টেনে নিয়ে চলে মেদিনীপুরের পাথরা গ্রামে কিম্বা কুরুম্ভেরা দুর্গে। মেদিনীপুর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে এই পাথরা গ্রাম । যেখানে মন্দির যেন আজো কথা বলে ওঠে। মন্দিরময় পাথরা গ্রামে রয়েছে চৌত্রিশটি এমন পুরোণো মন্দির। মেদিনীপুরের পথ, পাথরার রাস্তা খুব ভাল । ধান খেতের সবুজ চলল আমাদের হাত ধরে । পেরোলাম মাইলের পর মাইল আলুর খেত, গাঁয়ের বীথিপথ। শীতের শুকনো ঝরাপাতাদের পেছনে ফেলে রেখে চললাম কোকিলের ডাক শুনতে শুনতে । ইউক্যালিপটাস, সোনাঝুরি, কদম, সেগুন আর বাঁশ ঝাড়ের সারি ।
পরিত্যক্ত ভাঙা মন্দির পেরিয়ে কাঁসাই নদী দেখা গেল আর বাঁদিকে এল সেই মন্দিরময় পাথরা গ্রাম ।
ছোট মন্দির, বড় মন্দির, মন্দিরের ধ্বংস স্তূপ আর মন্দিরের সংলগ্ন গ্রাম, খেত খামার, ধানের গোলা, পুকুর কি নেই এখানে । নানান ধরণের, নানান গড়নের । এক একটির ভাস্কর্য এক এক রকম ! তবে সবকটি মন্দিরই বাংলার ট্র্যাডিশানাল চালাঘরের আদতে বানানো । মন্দিরময় পাথরা গ্রামটির মানুষজন যেন যুগযুগ ধরে মন্দিরগুলিকে বুকে করে আগলে আসছে । মন্দিরের গায়ের লেখা থেকে জানা গেল যে সেগুলি প্রায় ৫০০ বছরের পুরোণো।
খড়গপুর থেকে কেশিয়াড়ির পথ ধরে কিছুদূর গেলেই পড়বে বিশাল দুর্গময় কুরুম্ভেরা। বাইরে বিশাল উঁচু প্রাচীর পরিবেষ্টিত দুর্গটি দশ ফুট উঁচু এবং বিশাল মাঠের মধ্যিখানে প্রায় ৩০ বিঘে স্থান জুড়ে এই দুর্গ ।
পাথর দিয়ে কেটে কেটে তৈরী । যেন চক মিলোনো রাজপ্রাসাদ ! একদিকে উঁচুতে নাটমন্দিরে তিনটি মন্দিরের গড়নে স্থাপত্য রয়েছে ।
এর মধ্যে একটি শিব মন্দির আছে । ওড়িয়া লিপি থেকে জানা যায় ১৪৩৮-১৪৬৯ সালে তৈরী হয়েছিল এই ফোর্টটি । ছমছমে দুর্গপুরীর দুর্গের নাম "কুরুম্ভেরা"। গুগলম্যাপ দিশা দেখিয়ে দেয় অচেনা ও অজানা এই সব পথের। নিজের শহরের এত কাছে আর্কিওলজিক্যাল সোশাইটির দেখভালে এত সুন্দর মন্দির আর দুর্গ যে রয়েছে তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবেনা।
আর আমার রূপসী বাংলার উইকএন্ডগুলোর কথা? ডায়মন্ডহারবারের গঙ্গার ধারে ফলতা কিম্বা বাসন্তী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সোজা ইছামতীর ধারে বিভূতিভূষণের স্মৃতিবিজড়িত টাকী? অথবা বসন্তের পাহাড়ে পলাশের আগুণ লাগা মুকুটমণিপুর কিম্বা মন্দারমণি বা শঙ্করপুরের সমুদ্রসৈকতে । চব্বিশ ঘন্টার ফুরসত মিললে শঙ্করপুর বেশ উপভোগ্য। সাদাবালির চরে একলহমায় সমুদ্র তট দেখে পরখ করতে হয় নোনা জলের সাদাফেনায় ছুটে আসা জলের রঙ, ঢেউয়ের পরে ঢেউয়ের আনাগোনায় আছড়ে পড়া মুঠো মুঠো ঝিনুক, তারা মাছ, শঙ্কর মাছেরা, বালির চরে আসর বসায় । দলবেঁধে আসা বকের সারি উড়ে যায় ক্যাসুরিনার ফাঁক দিয়ে, খেয়ে যায় বাঁশপাতা মাছ সমুদ্রের তট থেকে, ঢেউ এসে নিয়ে যায় বিকেলের সূর্যাস্তের রং। সব মনখারাপের দুপুরগুলো আছড়ে পড়ে সেই ঢেউতে । ক্লান্ত সূর্য তখন আপন মনে রঙ ছড়িয়ে চলে পূর্ব মেদিনীপুরের পশ্চিম আকাশের গায়ে। সন্ধ্যেবেলা ছমছমে সমুদ্রতটে শুধু ঢেউয়ের গর্জন । প্রতিদিন সূর্যের এই অবসর নেওয়ার মূহুর্তে ঝাউবনে পাখ-পাখালির ঘরে ফেরার কলরব আর বালির চরে ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার শব্দ, নিঝুম নিসর্গকে নতুন করে পৌঁছে দেয় মনের আঙিনায় । সূর্যাস্তে শঙ্করপুর একরকম আর সূর্যোদয়ে অন্যরকম ।
প্রত্যূষে উত্তরদিকে তখনো জ্বলজ্বলে ধ্রুবতারা আর পশ্চিম আকাশে শুকতারা । অন্ধকার ভোরে কত রকমের শাঁখ ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে আসে আর আসে চিতি কাঁকড়ারা ছটফট করে ধেয়ে । সমুদ্রের বুকে জন্ম নেয় নতুন ঢেউ আর তীরে এসে ভাঙে । দেখতে দেখতে পুব আকাশের গায়ে রঙ ছেটাতে আসে ভোরের বালক সূর্য । আকাশ চিরে চিরে লাল, নীল, গোলাপী রঙের দাগ আর লুকোচুরি খেলতে খেলতে সেই আবীর রঙা আকাশের কোল থেকে উঁকি মারে সে ।
রূপসীবাংলার গল্প এক বৈচিত্র্যময় রূপকথার মত। এ গল্প ফুরোয়না। কালেকালে আরো যেন রূপবতী হয় আমার বাংলা। থৈ থৈ তার রূপ লাবণ্য নিয়ে।
বেড়াতে যাবার আগেই প্রতিবার ভাবই রাজ্যেই কোথাও একটা যাব কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতা আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় রাজ্যের বাইরে। আমাদের রাজ্যে D আছে কিন্তু C নেই। D মানে ডেষ্টিনেশন, D মানে ডাইভার্সিটি। কিন্তু C এর অভাব। এই মূহুর্তে মনে হচ্ছে আমার রাজ্য এ একটা C জ্বলজ্বল করছে সেটা হল cheap কিন্তু এর সাথে বাকী C গুলো absent. we can compromise on COST but in lieu of that expect convinience and comfort । কিন্তু ট্র্যাভেলিংয়ের সবকটি প্যারামিটার কি পাই আমরা? অথচ উত্তরে হিমালয়, ডুয়ার্স থেকে দক্ষিণে সাগরদ্বীপ, সুন্দরবন, পশ্চিমে পুরুলিয়ার অযোধ্যাপাহাড়, গড়পঞ্চকোট থেকে পূর্বে মেদিনীপুরের কুরুম্ভেরা ফোর্ট কিম্বা গনগনির মাঠ? কত কত সুন্দর জায়গা এ রাজ্যে, শুধু ট্যুরিজমের ইন্ফ্রাস্ট্রাকচার নেই।
| লাটাগুড়ির কুয়াশামাখা অরণ্য |
তবুও গ্রীষ্মে যাই উত্তরবাংলায় তো শীতে ঝাঁপ দি সাগরের বুকে।
হিমালয়ের কোলে অপূর্ব পাহাড়ি গ্রামে যাই, দুটিপাতা-একটি কুঁড়ির স্বর্গরাজ্যে। রোদের কণা লুটোপুটি খায় চা-পাতায়। দিগন্তের নীল আর সবুজের মাখামাখি দেখে মনে পড়ে রবিঠাকুরকে... আলোর নাচন পাতায় পাতায়, এই তো ভালো লেগেছিল ।
গরুমারায় জিপ সাফারি। ভোর হতে না হতেই ময়ূরের ঘুম ভাঙানিয়া কর্কশ ডাক শহুরেদের কানে মিষ্টি লাগে । জিপের ধারালো হাওয়ায় আবার শীতকে নতুন করে পাওয়া । জঙ্গলমহল থেকে বেরিয়ে আসা বাইসন, হরিণ অথবা মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া সবুজ পায়রা, ঠোঁটসর্বস্ব ধনেশ পাখি! ডিজিটাল ক্যামেরায় ক্লিক, ক্লিক! ভীতু বনমোরগের পেছনে ছুটতে ছুটতে দেখি গন্ডার! কি রাজকীয়! আমার রূপসী বাংলার ঐশ্বর্য্য এরা।
| শঙ্করপুরের সমুদ্র তটে |
শীতের রোদের গনগনে আঁচে ছুটে যাই সাগরের দিকে । সুন্দরবনের নোনা জল ছুঁই আর আমার মনখারাপের সব ঢেউগুলো আছড়ে পড়ে সেখানে। বাংলাকে আমি যেন নতুন করে পাই তখন। সুন্দরবন নামটিতে যতটা সৌন্দর্য্য ঠিক ততটাই সুন্দর তার ভৌগোলিক চেহারা। সেখানে মানুষের প্রতিনিয়ত ডাঙায় বাঘ আর জলে কুমীর নিয়ে বেঁচে থাকা । চরাচর জুড়ে নোনাজলের ঐশ্বর্য্য যার অনন্ত, অসীম জলরাশির মাঝে লুকিয়ে থাকে অগণিত সজীব আর সবুজ। গল্পকারের ভাষায় যা হয়ে ওঠে মূর্ত, ভ্রমণপিপাসুর কলমে যা হয়ে ওঠে আরো প্রাণবন্ত। কালের স্রোতে তার ভূগোল পুরোনো হয়না এই বায়োডাইভার্সিটির অন্যতম নিদর্শনে ।
| সুন্দরবনের জল-জঙ্গলের কাব্য |
| বাঙলার গ্র্যান্ড ক্যানিয়, গনগনি |
![]() |
| সত্যজিত রায়ের প্রিয় শ্যুটিং স্পট, মামাভাগ্নে পাহাড় |
![]() |
| গড়-পঞ্চকোটের কালের দলিল |
পরিত্যক্ত ভাঙা মন্দির পেরিয়ে কাঁসাই নদী দেখা গেল আর বাঁদিকে এল সেই মন্দিরময় পাথরা গ্রাম ।
| মন্দিরময় পাথরা |
ছোট মন্দির, বড় মন্দির, মন্দিরের ধ্বংস স্তূপ আর মন্দিরের সংলগ্ন গ্রাম, খেত খামার, ধানের গোলা, পুকুর কি নেই এখানে । নানান ধরণের, নানান গড়নের । এক একটির ভাস্কর্য এক এক রকম ! তবে সবকটি মন্দিরই বাংলার ট্র্যাডিশানাল চালাঘরের আদতে বানানো । মন্দিরময় পাথরা গ্রামটির মানুষজন যেন যুগযুগ ধরে মন্দিরগুলিকে বুকে করে আগলে আসছে । মন্দিরের গায়ের লেখা থেকে জানা গেল যে সেগুলি প্রায় ৫০০ বছরের পুরোণো।
খড়গপুর থেকে কেশিয়াড়ির পথ ধরে কিছুদূর গেলেই পড়বে বিশাল দুর্গময় কুরুম্ভেরা। বাইরে বিশাল উঁচু প্রাচীর পরিবেষ্টিত দুর্গটি দশ ফুট উঁচু এবং বিশাল মাঠের মধ্যিখানে প্রায় ৩০ বিঘে স্থান জুড়ে এই দুর্গ ।
পাথর দিয়ে কেটে কেটে তৈরী । যেন চক মিলোনো রাজপ্রাসাদ ! একদিকে উঁচুতে নাটমন্দিরে তিনটি মন্দিরের গড়নে স্থাপত্য রয়েছে ।
এর মধ্যে একটি শিব মন্দির আছে । ওড়িয়া লিপি থেকে জানা যায় ১৪৩৮-১৪৬৯ সালে তৈরী হয়েছিল এই ফোর্টটি । ছমছমে দুর্গপুরীর দুর্গের নাম "কুরুম্ভেরা"। গুগলম্যাপ দিশা দেখিয়ে দেয় অচেনা ও অজানা এই সব পথের। নিজের শহরের এত কাছে আর্কিওলজিক্যাল সোশাইটির দেখভালে এত সুন্দর মন্দির আর দুর্গ যে রয়েছে তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবেনা।
![]() |
| কুরুম্ভেরা দুর্গ |
প্রত্যূষে উত্তরদিকে তখনো জ্বলজ্বলে ধ্রুবতারা আর পশ্চিম আকাশে শুকতারা । অন্ধকার ভোরে কত রকমের শাঁখ ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে আসে আর আসে চিতি কাঁকড়ারা ছটফট করে ধেয়ে । সমুদ্রের বুকে জন্ম নেয় নতুন ঢেউ আর তীরে এসে ভাঙে । দেখতে দেখতে পুব আকাশের গায়ে রঙ ছেটাতে আসে ভোরের বালক সূর্য । আকাশ চিরে চিরে লাল, নীল, গোলাপী রঙের দাগ আর লুকোচুরি খেলতে খেলতে সেই আবীর রঙা আকাশের কোল থেকে উঁকি মারে সে ।
রূপসীবাংলার গল্প এক বৈচিত্র্যময় রূপকথার মত। এ গল্প ফুরোয়না। কালেকালে আরো যেন রূপবতী হয় আমার বাংলা। থৈ থৈ তার রূপ লাবণ্য নিয়ে।
Monday, October 3, 2016
Monday, May 30, 2016
বোহেমিয়ান ডাযেরী ( পর্ব- ৪ )
OMG
! ও মা
গো! এই
বাহুবলী হোঁদল কুত্কুত পল'
কে ঠেলে
রোজ আমাকে বাসে উঠতে হবে?
কিন্তু
মৃদু হেসে পাশ কাটিয়ে বাসে
উঠে পড়তেই তার কেতাদুরস্ত
ট্যুর গাইড সুলভ অ্যাকসেন্ট
আর স্মার্টনেস ক্ষণিকেই
কলকাতাইয়ার মনে আঁচড় কাটল।
Guten
Morgen meine Damen und Herren !
রোজ
এইভাষাতেই শুনতে হবে নকি?
না,
না ।
জার্মাণীতে পলের জন্ম। আর
আমাদের ট্যুর শুরু হল সেখানেই
মানে ফ্র্যাঙ্কফুর্টে । তাই
আপাততঃ পলের পাঞ্চজন্য ঘোষিত
হল " গুড,
মর্ণিং
লেডিজ এন্ড জেন্টলম্যান"
বলে।
পরক্ষণেই বলল,
" ক্যান
ইউ হিয়ার মি?”
বাসে
যারা দূরে বসেছে তাদের জন্য।
সবাই চুপচাপ ছিল এতক্ষণ। এবার
সাতচল্লিশজনের সম্মিলিত
চীত্কারে বাস যেন ভেঙে
পড়ল...ইয়ে.....স্..স্..স্...স্"
পল
নিজের কথা বলল। সে ৫০%
জার্মাণ
ও ৫০% সাউথ
আফ্রিকান। হসপিটালিটি
ম্যানেজমেন্ট পড়ে এই পেশা
স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছে। আর
তার বিশালকার ভুঁড়িটির সৌজন্যে
ইউরোপিয়ান বিয়ার ব্রুয়ারী।
সেই অজস্র ঋণও স্বীকার করে
ফেলল অনায়াসে,
একমূহুর্তে
। বাসের সাতচল্লিশজনের সঙ্গে
আলাপ করিয়ে দেওয়া থেকে ট্যুরের
রোজনামচায় রিয়েল সোশ্যালনেটের
অ্যাডমিন হয়ে রইল এই জার্মাণ
যুবকটি।
বাসের
সিটে বাই রোটেশান রোজ বসতে
হবে আমাদের। যাতে আমাদের সকলের
সাথে সকলের বন্ধন আরো মজবুত
হয়। আর কে সামনে,
কে পেছনে
এই নিয়ে মারামারিও হবেনা।
আমেরিকার এক বরিষ্ঠ নাগরিক
এসেছেন। অশীতিপর বৃদ্ধ দম্পতি।
হলুদ দাঁত বেশ ক্ষয়ে গেছে।
মহিলাটির দুচোখের ছানি বেশ
পেকে গেছে। গিয়েই বুঝি তুলে
ফেলতে হবে। তাঁরা সফিষ্টিকেটেড
সূত্রধর। আমি এঁদের নাম দিলাম
মিষ্টার অ্যান্ড মিসেস ছুতোর।
এঁরা বেশ নির্বিবাদী। আমি
যতটা মাংস একা না খেতে পারি
ওঁরা অবলীলায় খেয়ে নেন রোজ
রোজ। আমার বাস থেকে নেমে হাঁটতে
হাঁটতে পায়ে ব্যাথা হয় কিন্ত
ওঁরা তাঁদের নিরলস পা-গাড়ী
টানতে বেশ সক্ষম। দুজনে বেশ
হাত ধরাধরি করে হাঁটে। আমাদের
মত মোটেও নয়। এবার আসি একজোড়া
মা-মেয়ের
কথায়। মা'টি
আমেরিকান ষাটোর্দ্ধ সুন্দরী।
এককালে ছিলেন হেডটার্নার বা
সেক্সবম্ব যাই বল। এখনো ছিপছিপে
অর্থাত স্লিম এন্ড ট্রিম।
তার মেয়েটি কুড়ি বাইশের কিন্তু
ফার্ষ্টফুডের আধিক্যে তার
সারা দেহে স্নেহপদার্থের
আধিক্যের দরুণ তর মায়ের চেয়ে
তাকে বয়স্ক বলে মনে হয়। মায়ের
চুল ছাঁটা আর মেয়ের চুল শনের
মত স্ট্রেইট,
ঘাড় ছাড়িয়ে
কাঁধের ওপরে। মা সোজা হাঁটে,
মেয়ে
কোলকুঁজো। মায়ের শর্টস পরা
পা দুটি যেন ঈষত ক্ষীণকায় কদলী
বৃক্ষের মত আর মেয়ের দুটি
ট্রান্সফ্যাটের সৌজন্যে বেশ
বলিষ্ঠ এবং দুটিতে ঘর্ষণের
কারণে তফাতে চলে। মা হাসে
উচ্চৈঃস্বরে,
মেয়ে
শান্ত, গম্ভীর।
হাসিঠাট্টায় তার বড়োএকটা
হেলদোল নেই। মা বেশ ঝগড়ুটে,
মেয়ে
আপোষে মেনে নেয় সবকিছু। মেয়ের
চোখমুখ দেখে নাম দিলাম
হ্যারিপটারের মোর্নিং মাটল।
মনে মনে বলি মেয়ের কি পুরাতন
প্রেম ঢাকা পড়ে গেছে?
তাই কি
তার মা তাকে নিয়ে বেড়াতে
বেরিয়েছে?
সাধারণতঃ
এই বয়সের ছেলেমেয়েরা বেড়াতে
বেরিয়ে হেসে খলখল,
গেয়ে
কলকল করে। পাঁচজনের সঙ্গে
আলাপ করে। আমার পুত্রটিতো
তেমনি।
মা'টি
অহোরাত্র মেয়ের ওপরে ছড়ি
ঘোরাতে ব্যস্ত। এই বুঝি তার
মেয়ে আমাদের পলের সাথে দৃষ্টি
বিনিময় করল,
তার চোখ
ঘুরছে সর্বদা। মেয়ের চুলের
লকস চোখের ওপরে পড়লেই তিনি
শশব্যস্ত হয়ে লকস জোড়াকে কানের
পাশ দিয়ে ঠেলে দিচ্ছেন। কেন
তুমি আজ হাঁটুর ওপরে শর্টসের
সাথে এই জুতোজোড়া পরেছ অথবা
ডিনারে পঙক্তি ভোজে বসেই কেন
ব্রেডা টুকরোতে কামড় বসাচ্ছো...ঠিক
যেন সেই রাজকুমারী সিনেমার
মায়ের মত।
আরেক
জোড়া অষ্ট্রেলিয়ান মা-মেয়েও
রয়েছে। আশি ছুঁই ছুঁই বেরিল
আর তার মেয়ে জেনিস। এই মা'ও
তার মেয়ের তুলনায় খটখটে। মা
স্লিম, মেয়ে
বেশ নধর। বেরিল এর রোজ দুবেলা
দু মাগ বিয়ার চাই-ই।
বিয়ারেই তাঁর মোক্ষলাভ...তিনি
একথা বিশ্বাস করেন। পাব এ গিয়ে
বেরিল বুড়ির যা নাচ দেখেছি
তা ভুলবনা। জেনিস নাচেনা
কিন্তু দারুণ গায়। বলিরেখার
আধিক্যে বেরিলের সর্বাঙ্গ
কুঞ্চিত কিন্তু বেরিল মোটেও
দমবার পাত্রী নন। আমি এই
মা-মেয়ের
নাম দিলাম বেড়ালমাসী ও ছানা।
এক আমেরিকান ভদ্রলোক এসেছিলেন
একা। তাঁর নাম উইলিয়াম। তিনি
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। আমার
ছেলের সাথে বেশ দোস্তি হল
তাঁর। তাঁর শ্বশ্রুগুম্ফসম্বলিত
চোখমুখের হাবভাব দেখে মনে
হযেছিল ক্রিমিনাল সাগার হিরো
বুঝি কিন্তু আলাপে বেশ ভাল
লাগল। নির্বিবাদী এই জেন্টলম্যান
সার পৃথিবী চষে বেড়ান তবে ইনি
সধবা না বিধবা না হতবান্ধবা
তা বুঝতে পারিনি। বাই দ্যা
ওয়ে আমার প্রত্যেকটি সালোয়ার
স্যুট এনার খুব মন কেড়েছে।
ইন্ডিয়ান ড্রেসের রংগুলি বেশ
লেগেছে তাঁর।
আরো
এক মা-মেয়ে
ছিল। তবে সারাটা ট্রিপ তারা
মুখ খোলেনি। এমনকি পাশে বসে
খাবার সময়েও নয়। কি জানি আমরা
বুঝি গাঁইয়া ভূত তাই আমাদের
সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করেনি
তার। মা'টি
রূপের দেমাকে মটমটান। আর
মেয়েটি নিজেকে প্রিন্সেস
ডায়না মনে করে। মায়ের শনের
মত ব্লন্ড হেয়ার চোখের সামনে
যেভাবে পড়ে থাকে তাতে অর্ধ
নিমীলিত চোখ দুটিকে আলো আঁধারিতে
ডাইনি বলে ভ্রম হবে। আমি এদের
নাম দিলাম ডাইনি ও ডায়না। এরা
বুঝি সবচেয়ে বেশী পোষাক এনেছিল।
আর কমপক্ষে দশজোড়া করে ম্যাচিং
জুতো এনেছিল সঙ্গে। বিশ্বাস
করো, আমি
গুনেছি।
লাসভেগাস
থেকে এসেছিল এক চাইনিজ যুবতী।
সে "একল
চলোরে" পন্থায়
বিশ্বাসী। একগন্ডা ভাইবোনের
মধ্যে মানুষ হয়ে নিজেই ঘুরে
বেড়ায় এখন। এর নাম সত্যি ডায়না।
এর আমার কাঁথাস্টীচের স্কার্ফগুলো
খুব পছন্দ হয়েছে। আমাকে বলল,
তুমি
শাড়ি পরবেনা?
শুনে
ভালোই লাগল। ছিলেন এক coptic
ক্রিশ্চান
দম্পতি। তারা ইজিপ্টের লোক।
থাকেন শিকাগোতে।প্রথমদিন
বুড়ো ভদ্রলোক আমাকে দেখেই
বললেন, আর
ইউ হিন্দু?
আমি বললাম
ইয়েস এন্ড প্রাউড টু বি হিন্দু।
তার উত্তরে তিনি বললেন,
আমাদের
অনেক হিন্দু বন্ধুবান্ধব
আছে। হিন্দুদের আমি খুব পছন্দ
করি। আমি বললাম,
তোমার
কি দেখে মনে হল আমি হিন্দু?
তিনি
বললেন তোমার চোখ। শুনে ভালো
লাগল। বলেই বললেন,
আই লাভ
হিন্দু কালচার,
হিন্দু
এটিকেট এন্ড দ্যা ওয়ে অফ লিভিং।
আমি বললাম,
একটা
বিন্দু দিয়ে গ্রাফ টেনোনা
জেন্টলম্যান।
এই
ভদ্রলোকের সত্তরোর্ধ্ব স্ত্রী
এসেছেন। বেশ সুন্দরী আর সাজপোষাক
বেশ পাল্টে পাল্টে করেন। এনার
হাতে একটি প্যাচ দেখে জিগেস
করায় বললেন উনি ব্রেষ্ট ক্যানসার
এ আক্রান্ত। রেডিয়েশান চলছে
ঐ প্যাচের মাধ্যমে। তার
জুয়েলারী,
জুতো আর
পোষাক বদল দেখে মনে হল "ক্যানসার?
তো কি?
আই ডোন্ট
কেয়ার।" যেন
ডায়রিয়া হয়েছে কিম্বা জ্বর।
বেড়াতে গিয়ে তা হলেও আমরা ভয়
পেয়ে যাই। ২৪x৭
রেডিয়েশান নিয়েও ওনার বিন্দুমাত্র
হেলদোল নেই। ফেসবুকে ছবি আপডেট
করছেন, হোয়াটস্যাপে
নাতিনাতনীর সঙ্গে কথা বলছেন,
জুয়েলারী
কিনে চলেছেন এখনো। এনাকে
অহোরাত্র মনেমনে কুর্ণিশ
জানিয়েছি আমি। মনে মনে বলেছি,
এমনি
থেকো মিসেস গুরগুইশ। টেক
কেয়ার। ভালো থেকো!
Thursday, May 26, 2016
বোহেমিয়ান ডায়েরী পর্ব-৬
ক্র্যাকুফে দুরাত
পোলিশরা এই ব্ল্যাক ম্যাডোনাকে আমাদের কালীর মত মানে। ওরা বলে Our lady of Czestochowa । এ দেবী নাকি অসাধ্য সাধন করেন। খুব জাগ্রত এখানে। ব্ল্যাক ম্যাডোনা দেবীর এই পোলিশ অধিষ্ঠান জাসনা গোরা মনাষ্ট্রি হল পোল্যান্ডের অন্যতম ঐতিহাসিক মনুমেন্ট। এখানে কুমারী মেরীর কোলে যীশু। কিন্তু এর সর্বাঙ্গ কালো। অর্থাত ইনি আমাদের কালীর মত কৃষ্ণকলি।
গল্প শুনেই নেমে পড়ি জাসনা গোরা মনাস্ট্রিতে। অসাধারণ সুন্দর স্থাপত্য সেই চার্চের। প্রবেশ করি অন্দরমহলে। সেদিন শনিবার। কোনো মাস চলছিল। একপাল স্কুলপড়ুযা ব্যাসিলিকার ভেতরে সুসংবদ্ধ লাইনে প্রবেশ করছিল। তাদের সামনে ও পেছনে একজন করে সিষ্টার ছিলেন। আমরা ইশারায় সেই লাইনে ঢুকে পড়লাম। সিষ্টারের অনুমতি নিয়ে। তারপর ছবি তুলতে তুলতে সোজা পৌঁছে গেলাম ব্ল্যাক ম্যাডোনার প্রতিকৃতির সামনে। তারপর দিব্যি পুরোটা ঘুরে ফেললাম ঐ খুদে স্কুল পড়ুয়াদের পেছন পেছন। আমাদের মন্দিরের ছবি তোলার কোনো বিধিনিষেধ নেই এসব জায়গায়।
পোলিশ কিংবদন্তী বলে বহুযুগ আগে পোল্যান্ডে ওয়ায়েল পাহাড়ের নীচে এক ভয়ানক ড্রাগন বাস করত। ক্র্যাকুফ স্শহরের কেউ তাকে মারতে পারছিলনা। সারা স্শহরের লোকজন সেই ড্রাগনের ভয়ে থরহরিকম্প। লোকজন প্রায়শঃই তার তর্জন গর্জন শুনত । একদিন রাজা ক্রাক ঠিক শহরবাসীকে ধেঁড়া পিটিয়ে ঘোষণা করলেন
"He who once and for all puts this dragon
Shall recieve my sceptre and my royal crown,
So come and defeat this most horrid beast
And win my daughters hand and a wedding feasts"
বহু দূর দূর থেকে রাজপুত্রেরা, সাহসী যোদ্ধারা সব পোল্যান্ডে এসে সেই ড্রাগনকে হত্যা করে রাজা ক্র্যাকের কন্যার সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হতে চ্চাইল। সারা শহর তীরধনুকে ছয়লাপ হল কিন্তু কেউ ড্রাগনকে মারতে পারলনা। অবশেষে একজন অল্পবয়সী মুচি সেই স্শহরে এসে জানাল সে ঐ ড্রাগনকে হত্যা করতে সক্ষম। তার যুদ্ধের কোনো স্সাজসরঞ্জাম ছিলনা। কেবল ছিল প্রখর বুদ্ধি, ছুঁচ ও সূতো। সে রাজপুরীতে প্রবেশ করেই রাজার সঙ্গে দেখা করতে চাইল। রাজা ক্রাক তো হতবাক! ঐটুকুনি এক বালক মুচি কিনা ঐ বিশাল ড্রাগনকে মারবে? ছেলেটি বলল, আমার চাই ভেড়ার চামড়া, একটু গন্ধক আর একটু সর্ষেদানা। রাজা বলল, বেশ তাই হবে। স্থানীয় মানুষেরা জানলা দিয়ে ভয়ে ভয়ে দেখতে লাগল সেই ড্রাগন নিধন যজ্ঞ। সেই বিস্ময়কর মুচিবালকটি সেই ভেড়ার চামড়ার মধ্যে গন্ধক পাউডার আর সর্ষে ভর্তি করে সেটিকে কায়দা করে সেলাই করে দিল ছুঁচ-সুতো দিয়ে। ভোরবেলায় সূর্যোদয় হতেই সে ঐ গন্ধক আর সর্ষে ভর্তি বস্তা নিয়ে ড্রাগনের কাছে যাবার আয়োজন করল। ড্রাগন জেগেই ছিল। সে খিদের তাড়নায় পাহাড়ের নীচে কিছুদূর এগুতেই একটা দেখল একটি ভেড়ার মৃতদেহ। সে সেই চামড়া বন্দী গন্ধক সব খেয়ে ফেলল। খেয়ে ফেলা মাত্রই ড্রাগনের পেট ফেটে মৃত্যু হল। রাজ্যের সব লোক তখন সেই ড্রাগন দেখতে গিয়ে আবিষ্কার করল পাহাড়ের নীচে ভিসটুলা নদীর কোনো অস্তিত্ব নেই। সালফারে বিস্ফোরণ হয়ে ড্রাগনের আগুণ নেভাতে নদীর জল প্রায় শেষ।
এই রোমাঞ্চকর পোলিশ কিংবদন্তী শুনতে শুনতেই পথে পড়ল ভিশটুলা নদী। বাস থেকে ক্লিক ক্লিক। আবারো চলা।
ড্রাগনের গল্প শুনে এবার নেমে পড়া ক্র্যাকুফ মেইন টাউন স্কোয়ারে। একর্ডিয়ানের সুর বাজছে কোথাও। কোথাও করুণ সুরে ভায়োলিন। পুরণো শহরের অলিগলি হাঁটতে গিয়ে কেবলি মনে পড়ে নিজের শহরটাকে। কোথাও আবারো টুংটাং ঘোড়ারগাড়ির আওয়াজ। কি রাজকীয় তাদের সাজপোষাক!
মনে হয় আরো কি করে সুন্দর হয় সে! ক্র্যাকুফেও ট্রাম চলে অনবরত।
মনে মনে ভাবি সেদিক থেকেও আমরা পিছিয়ে নেইকো মোটেও। রাস্তার মোড়ে মোবাইল পোষ্ট-অফিস ভ্যান।
হলুদ পিটুনিয়া শীতের শেষ রেশটুকুনি মেখে তখনো এক এভিনিউ আলো করে দাঁড়িয়ে আছে।
পথের ধারে রেস্তোঁরায় আবার সামান্য দ্বিপ্রাহরিক আহার সেরে নি। রেস্তোঁরায় টয়লেট সারতে গিয়ে দেখি প্রকান্ড কাঠকয়লার আঁচে মাংস ঝলসানোর পর্ব চলছে অহোরাত্র।
শিল্প আর শিল্পীর সমাবেশকে আমার শহরও পাত্তা দেয় যথেষ্ট। আর গান-তাল-বাদ্য সেদিক থেকেও পিছিয়ে নেই সে। তাহলে অসুবিধে কোথায়? মানে কলকাতার রাস্তায় পোল্যান্ডকে নামিয়ে আনতে?
দূরে বসে কলকাতাকে বলে উঠি..."dzien-do-bry"
জাগো সুন্দরী! ভোর হয়েছে, দ্যাখো....
Sunday, May 22, 2016
বোহেমিয়ান ডায়েরী (পর্ব ৫)
পোল্যান্ডে দ্বিতীয় দিনে ওয়ার'স ( Warsow)
পোলিশ ভাষায় Warszawa বলে। পোল্যন্ডের বর্তমান রাজধানী। অন্যতম বৃহত শহর। বার্লিন থেকে পজনান হয়ে ওয়ার'স যাবার পথে ঘন সবুজ জঙ্গল চলল আমাদের সাথে। পথে পড়ল ওডার ( Oder )নদী। পোলিশ ভাষায় Odra. চেক রিপাবলিক থেকে উত্পন্ন হয়ে এই নদী পোল্যান্ড ও জার্মাণীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
যথারীতি বাস থামল কিছু পরেই। টয়লেট সেরে নিয়ে বাসে ওঠার মুখে চোখে পড়ল টিউবওয়েল। এই ওয়ার'স পোলিশ ফ্লিন্ট, জুয়েলারী, এম্বার, পটারী উত্পাদনে বিখ্যাত। আবার সেই সকালে মন ভারি হয়ে গেল ওয়ার'স ঘেট্টো (ghetto) এল। ট্যুর ম্যানেজার পলের মুখে বিভীষিকাময় ওয়ার'স বৃত্তান্ত শুনতে শুনতে হাজির হলাম ওল্ড টাউনে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ( ১৯৩৯, থার্ড সেপ্টেম্বর) হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করল এবং রাশিয়ার সাথে একটি গুপ্ত চুক্তি থাকার ফলে রাশিয়ার সাহায্য নিয়ে পোল্যান্ডকে দুভাগে ভাগ করে পশ্চিমদিকটা জার্মাণি দখল করেছিল আর পূর্বদিকটা দখল করেছিল রাশিয়া। একমাস ভয়ানক যুদ্ধের পর ওয়ার'স ধ্বংস হলে পোল্যান্ড আত্মসমর্পণ করল। হিটলারের মতে স্লাভিক জাতি অর্থাত রাশিয়ান, পোলিশ...এরা মানুষের মধ্যে পড়েনা এবং জু (jew) বা ইহুদীরাও এদের দলে। অতএব দেশ খালি করে জু এবং পোলিশদের যেনতেনপ্রকারেণ হত্যা করে সেখানে জার্মাণ জাতির বসতি কায়েম করার উদ্দেশ্যে বর্তী হল নাতসী পার্টির নেতা হিটলার। অনেকগুলি কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্প তৈরী হল যেখানে সবল পুরুষ নাগরিকদের রাখা হত ক্রীতদাসের মত যেখানে তারা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করত। আর দুর্বল, নাবালক ও মহিলাদের মেরে ফেলা হত। ওয়ার'স তে বহু ইহুদীদের একত্র জড়ো করা হয়েছিল এই কারণে। সেই জায়গার নাম হল ঘেট্টো। এই অমানবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে ওয়ার'স তে দুবার সামরিক উত্থান করার চেষ্টা হয়েছিল। একবার ইহুদীরা সেই চেষ্টা করে। আরেকবার পোলিশ হোম আর্মিরা এই চেষ্টা করে। কিন্তু জোশেফ স্ত্যালিনের নেতৃত্বে রাশিয়া নিষ্ক্রিয়তার সাহায্য নিয়ে হিটলারের নাত্সীরা এই দুই উত্থানকে নির্মমভাবে অবদমিত করে এবং ওয়ার'স ঘেট্টোর প্রতিটি বাড়ি ধ্বংস করে ও প্রত্যেক মানুষকে খুন করে ওয়ার'স তে শ্মাশানের শান্তি ফিরিয়ে নিয়ে অঅসে। ওয়ার'স সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় কিন্তু পরবর্তীকালে সেই ওল্ড টাউনকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পুণরায় নির্মাণ করা হয়( Reconstruction) এবং এই পুনঃনির্মাণ এতই নিখুঁত যে ওল্ড টাউনকে UNESCO হেরিটেজ সাইট রূপে ঘোষিত করা হয়েছে।
ইউরোপে ওয়ার'স এর নাম করলেই যার কথা সর্বাগ্রে মনে পড়ে তিনি হলেন বিখ্যাত পিয়ানিষ্ট শপিন ( Chopin) বিশাল সবুজ এক প্রাঙ্গণের মধ্যিখানে রাখা এই শিল্পীর স্থাপত্য। তিনি যেন বাতাস থেকে সুর হাতড়ে তাকে ছন্দে আরোপিত করেছিলেন হাতের যাদুতে। কি চমত্কার শপিনের অবয়বটি। হাঁটতে হাঁটতে হাজির হই পুনঃনির্মিত ওয়ার'স এর টাউন স্কোয়ারে। থরেথরে সাজানো পথ রেস্তোঁরা। ঢুকে পড়ি একটি তেমনি ছাতার নীচে। সুন্দরী পোলিশ মেয়ে হাসিমুখে আতিথেয়তা জানায়। ইউরোপে জল বুঝি কেউ খায়না। আবারো গলা ভেজাই স্থানীয় পোলিশ বিয়ার Perla তে। ঠান্ডায় ক্লান্তি নিমেষে উধাও হয়ে বেশ ছুটির আমেজ অনুভূত হয় দুপুরবেলায়। হরেক কিসিমের চিজ দিয়ে বোঝাই মস্ত এক চিজ প্ল্যাটারে কামড় দি আমরা। কিছুপরেই একফালি গ্রিলড চিকেন আসে। মাছভাতের তৃপ্তি হয়ত নেই কিন্তু অন্য আরো কিছু আছে যা মনে ধরে রাখার মত। ওয়ার'স পুরোণো শহরে আর রয়েছে সেন্ট জন'স ক্যাথিড্রাল, রয়্যাল প্যালেস। আর পোলিশ কিং জ্যান সোবেইস্কির বাসস্থান উইলানোউ প্যালেসটিও দেখবার মত।
খাবার খেতে খেতে পিয়ানো একর্ডিয়ানে রাজকাপুরের মেরা নাম জোকারের সুর ভেসে আসল কানে। শুধু এখানেই নয় অনেক জায়গায় রাস্তার ধারে অনামা আর্টিষ্টের একর্ডিয়ানে এই সুর আমাকে আপাততঃ তাড়িয়ে নিয়ে চলল ওয়ার'স এর অলিগলিতে। আর দেখলাম ঘোড়ারগাড়ি।
![]() |
| পিয়ানিষ্ট Chopin এর স্মৃতি বিজড়িত পার্কে |
পোলিশ ভাষায় Warszawa বলে। পোল্যন্ডের বর্তমান রাজধানী। অন্যতম বৃহত শহর। বার্লিন থেকে পজনান হয়ে ওয়ার'স যাবার পথে ঘন সবুজ জঙ্গল চলল আমাদের সাথে। পথে পড়ল ওডার ( Oder )নদী। পোলিশ ভাষায় Odra. চেক রিপাবলিক থেকে উত্পন্ন হয়ে এই নদী পোল্যান্ড ও জার্মাণীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
যথারীতি বাস থামল কিছু পরেই। টয়লেট সেরে নিয়ে বাসে ওঠার মুখে চোখে পড়ল টিউবওয়েল। এই ওয়ার'স পোলিশ ফ্লিন্ট, জুয়েলারী, এম্বার, পটারী উত্পাদনে বিখ্যাত। আবার সেই সকালে মন ভারি হয়ে গেল ওয়ার'স ঘেট্টো (ghetto) এল। ট্যুর ম্যানেজার পলের মুখে বিভীষিকাময় ওয়ার'স বৃত্তান্ত শুনতে শুনতে হাজির হলাম ওল্ড টাউনে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ( ১৯৩৯, থার্ড সেপ্টেম্বর) হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করল এবং রাশিয়ার সাথে একটি গুপ্ত চুক্তি থাকার ফলে রাশিয়ার সাহায্য নিয়ে পোল্যান্ডকে দুভাগে ভাগ করে পশ্চিমদিকটা জার্মাণি দখল করেছিল আর পূর্বদিকটা দখল করেছিল রাশিয়া। একমাস ভয়ানক যুদ্ধের পর ওয়ার'স ধ্বংস হলে পোল্যান্ড আত্মসমর্পণ করল। হিটলারের মতে স্লাভিক জাতি অর্থাত রাশিয়ান, পোলিশ...এরা মানুষের মধ্যে পড়েনা এবং জু (jew) বা ইহুদীরাও এদের দলে। অতএব দেশ খালি করে জু এবং পোলিশদের যেনতেনপ্রকারেণ হত্যা করে সেখানে জার্মাণ জাতির বসতি কায়েম করার উদ্দেশ্যে বর্তী হল নাতসী পার্টির নেতা হিটলার। অনেকগুলি কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্প তৈরী হল যেখানে সবল পুরুষ নাগরিকদের রাখা হত ক্রীতদাসের মত যেখানে তারা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করত। আর দুর্বল, নাবালক ও মহিলাদের মেরে ফেলা হত। ওয়ার'স তে বহু ইহুদীদের একত্র জড়ো করা হয়েছিল এই কারণে। সেই জায়গার নাম হল ঘেট্টো। এই অমানবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে ওয়ার'স তে দুবার সামরিক উত্থান করার চেষ্টা হয়েছিল। একবার ইহুদীরা সেই চেষ্টা করে। আরেকবার পোলিশ হোম আর্মিরা এই চেষ্টা করে। কিন্তু জোশেফ স্ত্যালিনের নেতৃত্বে রাশিয়া নিষ্ক্রিয়তার সাহায্য নিয়ে হিটলারের নাত্সীরা এই দুই উত্থানকে নির্মমভাবে অবদমিত করে এবং ওয়ার'স ঘেট্টোর প্রতিটি বাড়ি ধ্বংস করে ও প্রত্যেক মানুষকে খুন করে ওয়ার'স তে শ্মাশানের শান্তি ফিরিয়ে নিয়ে অঅসে। ওয়ার'স সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় কিন্তু পরবর্তীকালে সেই ওল্ড টাউনকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পুণরায় নির্মাণ করা হয়( Reconstruction) এবং এই পুনঃনির্মাণ এতই নিখুঁত যে ওল্ড টাউনকে UNESCO হেরিটেজ সাইট রূপে ঘোষিত করা হয়েছে।
ইউরোপে ওয়ার'স এর নাম করলেই যার কথা সর্বাগ্রে মনে পড়ে তিনি হলেন বিখ্যাত পিয়ানিষ্ট শপিন ( Chopin) বিশাল সবুজ এক প্রাঙ্গণের মধ্যিখানে রাখা এই শিল্পীর স্থাপত্য। তিনি যেন বাতাস থেকে সুর হাতড়ে তাকে ছন্দে আরোপিত করেছিলেন হাতের যাদুতে। কি চমত্কার শপিনের অবয়বটি। হাঁটতে হাঁটতে হাজির হই পুনঃনির্মিত ওয়ার'স এর টাউন স্কোয়ারে। থরেথরে সাজানো পথ রেস্তোঁরা। ঢুকে পড়ি একটি তেমনি ছাতার নীচে। সুন্দরী পোলিশ মেয়ে হাসিমুখে আতিথেয়তা জানায়। ইউরোপে জল বুঝি কেউ খায়না। আবারো গলা ভেজাই স্থানীয় পোলিশ বিয়ার Perla তে। ঠান্ডায় ক্লান্তি নিমেষে উধাও হয়ে বেশ ছুটির আমেজ অনুভূত হয় দুপুরবেলায়। হরেক কিসিমের চিজ দিয়ে বোঝাই মস্ত এক চিজ প্ল্যাটারে কামড় দি আমরা। কিছুপরেই একফালি গ্রিলড চিকেন আসে। মাছভাতের তৃপ্তি হয়ত নেই কিন্তু অন্য আরো কিছু আছে যা মনে ধরে রাখার মত। ওয়ার'স পুরোণো শহরে আর রয়েছে সেন্ট জন'স ক্যাথিড্রাল, রয়্যাল প্যালেস। আর পোলিশ কিং জ্যান সোবেইস্কির বাসস্থান উইলানোউ প্যালেসটিও দেখবার মত।
খাবার খেতে খেতে পিয়ানো একর্ডিয়ানে রাজকাপুরের মেরা নাম জোকারের সুর ভেসে আসল কানে। শুধু এখানেই নয় অনেক জায়গায় রাস্তার ধারে অনামা আর্টিষ্টের একর্ডিয়ানে এই সুর আমাকে আপাততঃ তাড়িয়ে নিয়ে চলল ওয়ার'স এর অলিগলিতে। আর দেখলাম ঘোড়ারগাড়ি।
Subscribe to:
Posts (Atom)












































