Saturday, May 21, 2016

বোহেমিয়ান ডায়েরী- পর্ব(৪)


পোল্যান্ডে প্রবেশ
শহরের নাম পজনান (Poznan)











বার্লিন থেকে পোল্যান্ড পৌঁছতে প্রায় চারঘন্টা লেগে গেল। বাসের সহযাত্রীদের সঙ্গে এরই মধ্যে বেশ আলাপ জমে উঠেছে।  ৪৭ জনের মধ্যে আমরা ছাড়া কুয়েতবাসী এক কেরালাইট দম্পতি আছেন। বেশ হাসিখুশি মহিলাটি, আমার সমবয়সী। হালকা হাসি, ঠাট্টা মশকরা, একসাথে হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে টয়লেটে থামা কিম্বা কফি খেতে খেতে ভারত-গল্পে মশগুল হওয়া...ভালোই লাগে বিদেশ বিভুঁইয়ে। তবে যেইমাত্র শুনলাম কলকাতার নামে তার নাক বেঁকানো আর কলকাতাকে দরিদ্রসীমার নীচে বলে ছোট করা তখন‌ই মনে মনে বলি আর নয় বাপু, এবার দূরে দূরে চল...যাইহোক আমার কলকাতা, তিলোত্তমা, কল্লোলিনী...তার অনেক রূপ এক অঙ্গে।  তাকে বলেই ফেলি, তুমি কলকাতা গিয়েছ কখনো? লিভিট নামের ঐ কেরালাইট মহিলা বলল, না, কিন্তু খুব সস্তা শুনেছি। আমি বললাম তুমি আগে যা শুনেছ, সেই কলকাতা এখন আর নেই। তারপরেই মনেমনে বলি, সত্যি কি তাই? আমাদের কলকাতা কি সত্যি বদলেছে?   



যাইহোক পোল্যান্ডে পা রেখেই মনে হল কি সুন্দর, শান্ত, রুচিশীল একটা দেশ। সেখানেও ট্রাম। এবার কারেন্সি বদল। Euro ভাঙিয়ে  Zloty । আর পলিশ লোকজনের কি সুন্দর সাজপোষাক তাদের মানানস‌ই গায়ের রং আর টিকোলো নাক-ঠোঁটের সাথে  । মনে আমি বললাম এত রূপসর্বস্বতায় আর কি আসে যায়! শুনেই রাহুল বলল, মা ওয়ার্ল্ডস বেষ্ট সফটওয়ার প্রোগ্র্যামার আর ফ্রম পোল্যান্ড। বললাম, তাহলে এরা রূপে কার্তিক, গুণে গণেশ ...কি বল? ছেলে বলল, অন্ততঃ আমাদের ইউএস ইউনিভার্সিটিতে তো তাই দেখি।  



 পজনান পোল্যান্ডের পুরোণো রাজধানী শহর। বাস আমাদের ওল্ড টাউন স্কোয়ারে নামিয়ে দিল শহর ঘুরে দেখবার জন্য।    লক্ষ্য করলাম প্রাচীন পোল্যান্ডের গথিক স্থাপত্য। সেদিন টাউন স্কোয়ারে একপাল স্কুলের খুদেরা এসেছে। সেখানে চার্চের মাথায় এক অদ্ভূত ঘটনা ঘটে প্রতিদিন দুপুর বারোটায়। কিছুটা কিংবদন্তীর ভেলায় ভেসে চললাম আমরাও।  
এই পজ্নান শহরের ওল্ড টাউন হলের শেফ হরিণের মাংস রান্না করছিল। আগুণের আঁচে সেই হরিণের মাংস এতটাই বেশী পুড়ে গেল যে শেফ তখন তাড়াতাড়ি পাশের একটি মাঠ থেকে দুটো চরে খাওয়া ছাগল ধরে এনে পোড়াতে গেল। হরিণের মাংসের বদলে ছাগলের মাংস‌ই রান্না হবে সেদিন। কিন্তু ছাগলদুটি বুঝতে পেরেই রান্নাঘর থেকে পালিয়ে ওল্ড টাউন হলের চার্চের মাথায় উঠে গেল। এবার স্এই থেকে স্থানীয় মানুষের মনে এক অদ্ভূত বিশ্বাস দানা বাঁধে। চার্চের ঘড়িতে ঠিক দুপুর বরোটায় ঘন্টাধ্বনি হয় আর দুটি যান্ত্রিক ছাগল বেলের মাথা থেকে একটি জানলা দিয়ে বেরিয়ে বাইরে দাঁড়াবে। আবার কিছুপরেই ভেতরে প্রবেশ করবে। ছোটছোট স্কুলপড়ুয়ারা এই দৃশ্য দেখবে বলে সেখানে বসে থাকে আবার দেখেই লাইন করে টিচারের সাথে চলে যায়। টাউন স্কোয়ারে সবকিছু গোটের আইকন। আর পজনান কে বলা হয়  The city of headbutting goats!

Wednesday, May 18, 2016

বোহেমিয়ান ডায়েরী- পর্ব( ৩)

বাই বাই বার্লিন !

বার ভোরের আলো, ঠান্ডা হাওয়া আর এক আধপশলা বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাসে ওঠা। বার্লিনে আজ আমাদের সারাটা দিন, সারাটা রাত কাটানোর পালা।  গতকাল সন্ধ্যেবেলায় ব্রান্ডেনবার্গ গেটের ভাল ছবি নেওয়া হয়নি বলে একটু খুঁতখুতুনি ছিল। অগত্যা সেখানেই প্রথম যাওয়া। ইষ্ট বার্লিনের রাস্তায় হরেক কিসিমের ট্রাম দেখলাম বাপু। যেমন ঝাঁ চকচকে ট্রামের সাজুগুজু তেমনি নেটওয়ার্ক। ক্রিশক্রশ ভাবে সারা শহর যেন ট্রামময়। কেবলি মনে হচ্ছিল বাস থেকে নেমে ট্রামে উঠে পড়ি। আর আমাদের কলকাতার ট্রামগুলোর কথা ভাবলেই লজ্জা হচ্ছিল।



আমরা কিনা কতগুলো রাস্তার ট্রাম তুলেই দিলাম! সারেসারে লিন্ডন গাছের কচি সবুজ পাতায় তখন সোনা গলানো ভোরের রোদ।   টাউন হলের মাথায় পতপত করে ওদেশের পতাকা উড়ছে। তারপর একে একে জন চেনাতে লাগল বার্লিন ডোম, কাগজের পাতায় পড়া সেই এডলন হোটেল । এই এডলন হোটেলের উঁচু, খোলা জানলা দিয়ে মাইকেল জ্যাকসন  তার সন্তানকে ঝুলিয়ে মজা দেখাতে গিয়ে খবরের শিরোনামে এসেছিল।  



















এবার নদীর ধারে যাওয়া। ঠান্ডা হাওয়ায় আরো তীক্ষ্ণ ধার অনুভূত হল। নদীর নাম স্প্রে( Spree) । নদী বেশ ছোট‌ই কারণ আমাদের চোখ গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র দেখে অভ্যস্ত। তবে সুনিপুণভাবেই লঞ্চ চলছে নদীর বুকে। ওপরে ব্রিজ। বেশ ফোটো নেবার আদর্শ ভারতীয়ের ক্যামেরায়। নদীর দিক থেকে চোখ ফেরাতেই  জন বলল, "look at the Berlin Wall ! "এই সেই ইতিহাস খ্যাত বার্লিনের প্রাচীর? মন ভারি হবার আগেই জন বলল, এদিকটা হল "the most funny part of the wall" বললাম, এতে আবার মজা কোথায় দেখল সে? রাহুল বলল, ঐ দ্যাখো মা দেওয়ালের গায়ে কি অদ্ভূত পেন্টিং এখনো রয়েছে। বার্লিন ওয়াল যখন ভেঙে ফেলা হল তখন প্রায় ১০০ জন চিত্রশিল্পী প্রতিবাদে সরব হয়ে বলেছিল, রাখা হোক দেওয়ালটা। আমরা না হয় সুন্দর করে এঁকে সাজিয়ে রাখব আমাদের শিল্পকর্ম। ঐটুকুনি দেওয়াল  সবচেয়ে লম্বা যা এখনো বেঁচেবর্তে আছে। নদীর জলে হালকা ঢেউ তুলে নৌকো যাচ্ছে। নদীর ধারে পিয়ানো একর্ডিয়ানে হালকা সুর বাজাচ্ছে কেউ।  
এতজন চিত্রশিল্পীর দেওয়াল চিত্র সম্বলিত এই স্থানকে বলা হয় ইষ্টসাইড গ্যালারী।  এরপর গেলাম বার্লিন প্রাচীরের আরেকটা দিক দেখতে। 





বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি ছাড়াও জার্মাণী ও বার্লিনের একটি দ্বিতীয় অস্তিত্ত্ব আছে। তা হল আমেরিকার সঙ্গে রাশিয়ার অর্থাত ক্যাপিটালিজম ও কমিউনিজম এবং পশ্চিম ইউরোপের সভ্যতার সঙ্গে পূর্ব ইউরোপের  slavic এর রণভূমি  হয়ে ওঠা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রতে সারাবিশ্ব ভরে উঠেছিল তখন এই দুই রাষ্ট্রের কূটনৈতিকেরা এক নতুন পন্থা অবলম্বন করল যার নাম কোল্ড ওয়ার। আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করে গুপ্তচর এবং দেশদ্রোহীর সাহায্যে  একে অপরের ক্ষতিসাধন করার দুষ্টু অভিসন্ধির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল এই বার্লিন।মিত্রপক্ষের তিন দেশ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স যৌথভাবে পশ্চিম জার্মাণী দখল করেছিল এলব নদী অবধি ও রাশিয়া  পূর্ব জার্মাণী দখল করল।  বার্লিন যদিও পূর্ব জার্মাণীতে তবুও সেই শহর‌ও দ্বিধাবিভক্ত, ইষ্ট ও ওয়েষ্ট বার্লিন।  পূর্ব বার্লিন রাশিয়া অধিকৃত কমিউনিষ্ট ও ডিক্টেটরশিপের পীঠস্থান আর পশ্চিম জার্মাণী ছিল গণতান্ত্রিক, লিবরাল। সাধারণ জার্মাণরা পূর্বজার্মাণী থেকে পশ্চিমে পালাতে শুরু করল।   গণতান্ত্রিক অধিকার ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার জন্য। এটিকে বন্ধ করার উদ্দেশ্যেই ১৯৬১ সালে তৈরী হল শহরের বুক চিরে, পশ্চিম বার্লিনকে ঘিরে ঐতিহাসিক এই বার্লিন ওয়াল। সেই পাঁচিল টপকাতে গিয়ে বহু মানুষের মৃত্যু হল।  
অবশেষে ১৯৯০ সালে জনরোষের মুখে পড়ে সেই বার্লিন ওয়াল ভেঙে দেওয়া হল। ও তার সাথে ভেঙে পড়ল পূর্ব জার্মাণীর কমিউনিষ্ট স্বৈরতন্ত্র। পূর্ব ও পশ্চিম জার্মাণীর এই মিলনে জার্মাণী এখন উল্লেখযোগ্য সাম্রাজ্য ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। স্প্রি নদী পেরিয়ে একবার একূলে যাই তো আরেকবার ওকূলে গিয়ে দাঁড়াই। আক্ষরিক অর্থে এই নদীও যেন উভয় জার্মাণীর সীমারেখায়  প্রবহমান। একদিকে ব্রিটিশ এমব্যাসি, মিউজিয়ামে ছয়লাপ । ঠিক দুপুর বারোটায় বেজে উঠল চার্চের ঘন্টা। দূরে চোখ রাখি আকাশছোঁয়া বার্লিন ডোমে ও জার্মাণ হিষ্ট্রি মিউজিয়ামে। ওয়ার মেমোরিয়ালে চোখ রাখলেই ভারি হয়ে ওঠে চোখের পাতা। তারপরেই আইনস্টাইন ও কার্লমার্ক্সের স্মৃতিবিজড়িত হ্যামবোল্ট ইউনিভার্সিটি নজর কেড়ে নেয়। দুপুরে একটু বিশ্রাম নেওয়া রাস্তার ধারে কফিশপে। আবার একটু চাঙ্গা হয়ে দেখতে যাওয়া ঐতিহাসিক বুক-বার্নিং স্কোয়ার। ১৯৩০ সালে ঠিক এই জায়গায় ২০০০০ ব‌ই পুড়িয়েছিল । এক জার্মাণ লেখক এই ঘটনার ১০০ বছর আগে নাকি নাত্‌জী বাহিনীর এই নারকীয় কর্মকান্ডের ভবিষ্যদ্বাণী  করেছিলেন  । তিনি বলেছিলেন যারা ব‌ই পোড়ায়, তারা একসময় মানুষ ও পোড়াবে।  এই উক্তি অক্ষরে অক্ষরে  মিলে গেল যখন হিটলার তার বীভত্স কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্পে কাতারে কাতারে মানুষকে মারল।  

বোহেমিয়ান ডায়েরী -পর্বঃ(২)

বার্লিন বৃত্তান্ত 

রদিন ভোরে উঠে সাড়ে ছটায় ব্রেকফাস্ট, স্নান সেরেই বাসে উঠে পড়া ফ্র্যাঙ্কফার্ট থেকে বার্লিনের উদ্দেশ্যে। শহর ছেড়ে বাস ছুটে চলল আমাদের হাইওয়ে সমতুল চওড়া রাস্তা অটোবান (autobahn)  দিয়ে। দুপাশে সবুজ অরণ্য আর মাঝেমাঝে ক্যানারী হলুদ রঙের ক্যানোলা চাষের আদিগন্ত  ক্ষেত। প্রথমে ভুল করি সর্ষে ক্ষেত ভেবে। কিন্তু জন জানালো ক্যানোলা এখানে বায়ো ফুয়েল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হলুদ রংয়ে চোখ আটকেই থাকে, এত সুন্দর সেই রং। 
আর সারে সারে  উইন্ড মিল ঘুরছে এবং ঘুরছে হাওয়ার আনুকুল্যে। এই উইন্ড মিল ইউরোপের একটি বৈশিষ্ট্য। এখনো বায়ুশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুত উত্পাদন হয় এখানে।   এবার এল চেকপয়েন্ট। ইষ্ট ও ওয়েষ্ট জার্মাণীর মাঝ বরাবর আমরা। সকালের প্রথম পিটস্টপ। ইউরো খরচ করে টয়লেট আর সাথে মেঘ-বৃষ্টি-রোদ্দুরের লুকোচুরির সঙ্গে কনকনে শীতের ধারালো  ঠান্ডা হাওয়ার সাথে মোকাবিলা। 



এবার পলের মুখে সেই যুদ্ধের গল্প শোনার পালা। ছোটবেলায় রাহুল দাদাইয়ের গলা জড়িয়ে বলত, তারপর হিটলার কি করল দাদাই? হিটলার কি খুব দুষ্টু লোক ছিল? বাবা বলতেন, এই ব‌ইখানা বড় হয়ে পড়বে তুমি। ব‌ইয়ের নাম "দ্যা হিষ্ট্রি অফ দ্যা থার্ড রাইক"  । দাদাইয়ের কাছ থেকে গল্পশোনার পালা যখন শেষ হল সেই ব‌ইখানা সে বার পাঁচেক পড়ে ফেলেছে আর তার নিজের বাবা আর আমার বাবার সঙ্গে রীতিমত বিশ্বযুদ্ধের আলোচনায় সরব হয়েছে। মূলতঃ রাহুলের উদ্যোগেই একদা বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসময় প্রেক্ষাপটে এবারের ভ্রমণ।  
একদা কেলটিক উপজাতির অধ্যূষিত ইউরোপের এই বার্লিন শহরে আমাদের প্রবেশ হল বিকেলে। পেরুলাম এলব নদী। এলব হল মধ্য ইউরোপের অন্যতম বৃহত নদী।   

ইষ্ট  বার্লিনে পৌঁছলাম সন্ধ্যের ঝুলে। ইষ্ট বার্লিনে ট্রামের নেটওয়ার্ক খুব জোরালো। ওয়েষ্ট বার্লিনে ট্রাম নেই। রাস্তায় অগণিত ঝকঝকে ট্রাম এমাথা থেকে ওমাথা ছুটে চলেছে যাত্রী নিয়ে।  আকাশে তখনো সূর্যের আলো জ্বলজ্বল করছে। তবে হাওয়ার দাপটে বেশ ঠান্ডা অনুভূত হল। বাস গিয়ে থামল শহরের অন্যতম ব্যস্ত রেস্তোঁরায়। মালিকের নামে যার নাম "জিকো" বৃদ্ধ মালিক জিকো নিজে হাতে ওয়েলকাম শ্যাম্পেন  ধরিয়ে দিল হাসিমুখে। তারপর রেস্তোঁরা কাম পাবের অন্দরে আমাদের দঙ্গলের প্রবেশ। আসন গ্রহণের পর ঠান্ডা বিয়ার এল। এবার শুরু হল লাইভ মিউজিক। জিকো এভারগ্রিণ। তার কেরামতিতে খাদ্য ও খাদকের   এক অদ্ভূত মেলবন্ধন রচিত হয়। জিকোর পোশাক থেকে হাসিমাখানো মুখ আর কাটলারি-ক্রকারি নিয়ে জাগলারি দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় আমাদের দেশের বৃদ্ধদের কথা। এখানকার বুড়োরা কি সুন্দর করে বাঁচতে জানে! কত প্রাণবন্ত এরা!  আর রেস্তোঁরায় একপাল তরুণ তরুণী কাজ করে চলেছে কিন্তু জিকো এদের মধ্যমণি। খাবারের অর্ডার নিয়ে গেল। এখানে কেবল গ্রিলড প্রোটিন পাওয়া যায় অর্থাত ফিশ, চিকেন, পর্ক অথবা ল্যাম্ব গ্রিল করে প্লেট সাজিয়ে দেওয়া হয় সেদ্ধ সবজীর বিছানায়, একটু ধবধবে সাদা সরুচালের ভাতের চৌকাঠ পেরিয়ে মুচমুচে ফ্রেঞ্চফ্রাইয়ের বেড়া দেওয়া বাগানে। বেড়া  ডিঙিয়ে একটুকরো পাতিলেবুর ছোঁয়া।    
সঙ্গে ধূমায়িত মাশরুম স্যুপ আর মাখন-রুটি।  আসতে লাগল থরে থরে  ওয়াইন ও লিকার। গ্রেপস এবং গ্রেইন। উদ্দাম মিউজিক চলছে তখনো। পরিচিত গানে আমরাও গলা মেলাই।  আমাদের গ্রুপের বৃদ্ধ বৃদ্ধারাও নাচতে শুরু করেছেন। আবারো মনে পড়ে দেশের মানুষগুলোর কথা।   মনে মনে বলি আমার পাড়ার হরিবাবুকে কিম্বা রেখামাসীমাকে। এভাবেই বয়স ধরে রাখতে হয় নয়ত পিছিয়ে পড়তে হয় বুঝি। মেইনকোর্স ডিনার শেষে পৌঁছে গেল সেরাতের সুইট ডিশ । সুচারুভাবে পরিবেশিত প্যানকেকের মধ্যে আইসক্রিম  এবং ওপর থেকে হট চকোলেট সস ঢেলে দেওয়া হয়েছে অকৃপণ হাতে।   
সবশেষে ছোট্ট শটগ্লাসে একটুকু  jagermeister , এক ধরণের ডাইজেষ্টিভ লিকার । বেশ এনজাইম এনজাইম গন্ধ।  জিকোর জয়ধ্বনি দিয়ে পাব থেকে বেরিয়ে এসে আমরা সেই রাতে হাজির হলাম ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের ধারে। বহু পুরণো ঐতিহাসিক জায়গা। এখানে রাজনৈতিক মিটিং, মিছিল হত। বিশ্বযুদ্ধে সবকিছু ক্ষ্তিগ্রস্ত হলেও এই ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটটি বেঁচে গিয়েছিল। সেটিকে এখন আরো সুন্দর করে রাখা হয়েছে । তার চারপাশে ইষ্ট বার্লিনের এমব্যাসি । রাস্তার ধারে ধারে  লিন্ডন গাছ দিয়ে সাজানো বনবীথি। আমাদের চৌরঙ্গী স্কোয়ারের মত।  এই জায়গার নাম উন্টার ডি লিন্ডন বা আন্ডার দ্যা লিন্ডন ট্রি ।  
রাতের অন্ধকারে ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেই হোটেলে চম্পট। সারাদিনের ক্লান্তি মেখে ঘুমে জড়িয়ে এল চোখ। পরদিন আবারো ব্রেকফাস্ট সেরে ইষ্ট বার্লিনের এই অঞ্চলকে ভালোভাবে দেখার পালা। টিভি টাওয়ারটি হল জার্মাণির সবচেয়ে উঁচু মনুমেন্ট। এটি আলেকজান্ডার Platz ( প্লাজা )র কাছেই অবস্থিত। আলেকজান্ডার প্লাজাটি হল এখানকার অন্যতম বৃহত শপিং সেন্টার।   
    

Tuesday, May 17, 2016

বোহেমিয়ান ডায়েরী (১)

বোহেমিয়ান ডায়েরী  (১) ফ্র্যাঙ্কফার্ট পর্বঃ 

 লকাতার মেঘ ও মৌসুমীর টানাপোড়েনে  মন দে উড়ান। প্ল্যান অনুযায়ী এটিহাডের বিমানে আবুধাবি ও সেখান থেকে ফ্যাঙ্কফার্ট। তারপর সেখান থেকে বাসে করে শুরু হবে বোহেমিয়ান সফর। কথায় বলেনা? ধর্মের কল বাতাসে নড়ে? কলকাতার বৃষ্টিকে অভিশম্পাত করা? বিমানবন্দরে বসেই ছিলাম বিন্দাস। সময় মত সিকিউরিটি চেকিং, ইমিগ্রেশান সব সেরে   বিমানে উঠে পড়া হল। রানওয়েতে চোখের সামনে দিয়ে সব বিমান উড়ে গেল। আমাদের প্লেনটি ছুটল কিছুটা রানওয়েতে। তারপরেই বিপত্তি। অঝোরে বৃষ্টি ও সেইসাথে বহুপ্রত্যাশিত কালবৈশাখী নাড়া দিল আমাদের সফর। বিমানের জানলায় চোখ রেখে দেখছি গাছপালার উদ্দাম নৃত্য আর আছড়ে পড়া  বৃষ্টির ফোঁটায় সপসপে প্লেনের জানলা। বাইরে কিছুই দেখা যায়না। হঠাত এত বৃষ্টি? প্লেন রানওয়েতে ইঞ্জিন বন্ধ না করেই ভিজছিল। একসময় তার জ্বালানী গেল ফুরিয়ে।  
এরপর? তারপর আর কি? জ্বালানী ভরে নিয়ে আবার ওড়ার তোড়জোড় কিন্তু বোঝাই গেল আবুধাবি থেকে ফ্রাঙ্কফার্টের কানেক্টিং ফ্লাইটটি মিস করব‌ই আমরা। ওদিকে আমার পুত্র ফিলাডেলফিয়া থেকে ফ্রাঙ্কফার্ট পৌঁছে যাবে। ট্রাফালগার নামক যে সংস্থাটির সাথে ১৬দিনের গাঁটছড়া বাঁধা হয়েছে তাদের শাটলটি আমরা পাবনা। বেশ টেনশান। শুধু হোয়াটস্যাপের দৌলতে ছেলেকে খবরটা দিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্তি। সে যেন বাস নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে ফ্র্যাঙ্কফার্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে আর পিতৃমাতৃহীনতার বার্তাটি জনায় জনায় শুধিয়ে বলে আমার বাবা-মা "অন দ্যা ওয়ে টু ফ্যাঙ্কফার্ট, ফ্লাইট মিসড ডিউ টু ওয়েদার, ব্লা, ব্লা, ব্লা..."  
ফ্র্যাঙ্কফার্ট এয়ারপোর্টে পৌঁছেই মন কেঁদে উঠল। ছেলেটার সঙ্গে কখন দেখা হবে? কিন্তু জানতে পারলাম সে আমাদের সাতচল্লিশ জনের গ্রুপের সঙ্গে ট্রাফালগার-ট্যুর ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানে ফ্র্যাঙ্কফার্ট শহরের আশেপাশেই জ্ঞান নিতে ব্যস্ত।   অগত্যা মধুসূদন। আমরা গ্যাঁটের কড়ি ভাঙিয়ে নিলাম এয়ারপোর্টে। ডলার থেকে ইউরো। তারপর নিজেরাই ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে পোঁছে গেলাম।  কিছুপরেই রাহুল ঘরে এসে ঢুকল। বহুদিনের অদর্শণে আকুলিবিকুলি প্রাণে কিছুটা স্বস্তি তখন তিনজনের। সন্ধ্যেবেলায় যখন আমাদের ট্যুর ম্যানেজার পলের সঙ্গে আলাপ হল তখন দেখি আমরা বাদে সকলেই রাহুলের বেশ পরিচিত হয়ে গেছে। সে রীতিমত আড্ডা দিয়েছে তাদের সাথে। আর মুকাজ্জি পরিবারের  বিলম্বে ট্যুরে যোগদানের ইতিবৃত্তটি সকলের বেশ জানা হয়ে গেছে। আমরা হারিয়ে যাওয়া মাতা-পিতা মুকাজ্জি বেশ সেলিব্রিটি ষ্টেটাস নিয়ে ঘুরছি ফ্র্যাঙ্কফার্টের পথেঘাটে।  
বেশ কনকনে ঠান্ডা আর সঙ্গে হাওয়া। সন্ধ্যে ছটার মধ্যেই শপিংমলের ফুডকোর্টে ঝাঁপ ফেলার তোড়জোড়। 


অতএব চোখের সামনে পিত্জা হাট, ম্যাকডোনাল্ডসের সাজানো বাগানে চোখ রেখেই ক্ষুধার বাজারে অগ্নিতে ঘৃতাহুতি । বেরিয়ে এসে পথের ধারে বেশ ছিমছাম এক স্পোর্টস বারে গিয়ে তিনজনে বসলাম। তারপর টম-ইয়ম চিকেন স্যুপ আর বিশাল এক পিত্জা নিয়ে পাকিস্তানী ললনা হাসিমুখে উদয় হল। সঙ্গে ড্রাফট বিয়ার। গরম, সুস্বাদু স্যুপে সারাদিনের পথশ্রম নিমেষে উধাও। আর বিয়ারে চুমুক দিতেই জলশূন্যতা উবে গিয়ে শরীরটা বেশ হাইড্রেটেড তখন।  
বেশ সস্তার রেস্তোরাঁটি। আর পিত্জাটিও বেশ ভাল। সবশুদ্ধ কুড়ি ইউরোতে তিনজনের ভরপেট খাওয়া। এবার হেঁটে ফিরে আসি হোটেলে। পরদিনের তোড়জোড় শুরু। মানে আমাদের শেডিউল মত বোহেমিয়ান সফর শুরু হল পরদিন ভোরে। হোটেলে স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট ব্যুফেতে ঠিক সাড়ে ছটায়। তারপর পেটচুক্তিতে প্রাতঃরাশ সেরে জিনিষপত্র নিয়ে বাসে ওঠা। এই বড়সড় বাসটিই আমাদের সারাদিনের দোসর।  আর বাসের মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন কোণা থেকে জড়ো হওয়া সাত চল্লিশজনের সঙ্গে অহোরাত্র সৌজন্যবোধ, বন্ধুতা  আর সর্বোপরি ট্যুর ম্যানেজার কাম গাইড জার্মাণ বিশাল বপুর পল ও রোমানিয়ান বাস ড্রাইভার সুদর্শণ জন আপাততঃ আমাদের সঙ্গী। সারাদিন বাসে ঘোরা আর দিনের শেষে হোটেলে গিয়ে বিশ্রাম। এই হল আপাততঃ আমাদের শয়নে স্বপনে জাগরণে বোহেমিয়ান ট্যুরের আয়োজন।   

Thursday, April 9, 2015

একটি দুরন্ত কালবৈশাখী এবং ইস্তারী পূর্ণিমা

ষ্টারের ছুটিতে চৈত্রের পূর্ণ চন্দ্র ছিল গতকাল। মানে যাকে বলা হয় চৈত্র পূর্ণিমা , আমি বলি ইস্তারী পূর্ণিমা এবং সেই সাথে চন্দ্রগ্রহণ। শরতকালের দুর্গাপুজোর পর যে পূর্ণিমাটি হয় তার নাম কোজাগরী। আমাদের লক্ষ্মীপুজো হয়। আর কালকের পূর্ণিমাটি ছিল বাসন্তী পুজোর পরের পূর্ণিমা। সেই অর্থে খুব জোরদার তিথি। হনুমানের নাকি জন্মতিথি। তাই বহু জায়গায় খুব ধুম করে ধর্ম পুজো হয় ঐ দিনে। কালীমন্দিরগুলিতেও খুব ধুম হয়। এর বেশী তথ্য আমার জানা নেই। 



ঐদিন বোলপুরের প্রান্তিক থেকে কঙ্কালীতলায় পুজো দিতে গিয়ে দেখি বিশাল লাইন। আমার এই নিয়ে ওখানে ৩৯বার যাওয়া হল। এমন ভীড় প্রথম দেখলাম। উত্তরবাহিনী কোপাই নদী, শ্মশান আর কুন্ডটি সব মিলিয়ে বেশ সুন্দর জায়গা। 


কাঞ্চী দেশে পড়িল কাঁকালি অভিরাম।
বেদগর্ভা দেবতা ভৈরব রুরু নাম।। 
সতীর দেহত্যাগের সময় মায়ের কাঁখাল বা কোমরের অংশ পড়েছিল এই কুন্ডে। তাই একান্ন পীঠের একটি পীঠ এটি। কঙ্কালীমায়ের ভৈরব হলেন রুরু, যাঁর স্বয়ংভূ লিঙ্গটি কালাপাহাড়ের অত্যাচারে বিনষ্ট । প্রাচীন মন্দিরটিও সংস্কারে কিছুটা বেঁচে আছে। সেখান থেকে ঐ পথ দিয়েই লাভপুরের ফুল্লরাতলা গেলাম। একান্নপীঠের অরেকটি পীঠ। অট্টহাসও বলে এই স্থানকে। সতীমায়ের অধরোষ্ঠ পড়েছিল এখানে। ভৈরবের নাম বিশ্বেশ। অপূর্ব ছবির মত পরিবেশ। সেখানে পুজো দিয়ে আমরা গেলাম আরো একটি প্রাচীন মন্দির দর্শণে। ফুল্লরাতলা থেকে গুণুটিয়া ঘাট। সেখান থেকে ময়ূরাক্ষী নদীর ওপর একটি অস্থায়ী রাস্তা দিয়ে বন জঙ্গল পেরিয়ে, ছোট ছোট গ্রামের মধ্যে দ্ইয়ে গিয়ে পড়লাম ন'পাড়া ও সেখান থেকে তারাপীঠের রাস্তায় কলেশ্বর শিবমন্দির। অতীতের নাম পার্বতীপুর। নবরত্ন আকৃতির মন্দিরটি একশো বছরের পুরণো। প্রাচীন মন্দির কালাপাহাড়ের অত্যাচারে ধ্বংস হয়ে যায়। এখানেও গর্ভগৃহের মধ্যে স্বয়ংভূ শিবলিঙ্গটি ভাঙা। 

কলেশ্বর দেখে আমাদের লাভপুরে তারাশঙ্কর ব‌ইমেলায় যাবার কথা। চয়নিকা কাগজটির সম্পাদক কৌশিক ভান্ডারী আমাদের জন্য ভালো ব্যবস্থা করেছিলেন। ভালো লাগল তাদের ব‌ইমেলার উদ্যোগ দেখে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মস্থান এই লাভপুর। আর পাশেই তাঁর উপন্যাসের স্মৃতি বিজড়িত হাঁসুলিবাঁক। 



কালবৈশাখী ও সেই সাথে শিলাবৃষ্টি কিছুটা হলেও ম্লান করে দিল আনন্দ। ফেরার পথে এমন শিলাবৃস্টির প্রকোপে পড়ব আশা করিনি। গাড়ির সামনে এক বাগাল ছেলে তার গরুদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। শিলের আঘাতে গরুগুলি এধার ওধার ছিটকে যাচ্ছিল ভয়ে। আর সেই সাথে বাঁশগাছগুলি এমন দুলছিল যে মনে হল ওরা যেন গরুগুলির গায়ে সজোরে আছড়ে পড়বে। রাস্তার দুপাশে মজুত হলুদ খড়ের গাদায় শিলের ধবধবে সাদা গোলাগুলো দেখে মনে হচ্ছিল কবিতা লিখতে কিন্তু সেই সময় শুধু মনে হয়েছে আমাদের জীবন কত ঠুনকো। প্রকৃতির রোষ কত কিছু করতে পারে। জোয়ার ভাঁটা আর অমাবস্যা-পূর্ণিমা সেই শক্তির অঙ্গুলি হেলনে হয়। পৃথিবী যে পূর্ণিমাতে চাঁদ আর সূর্যের মাঝখানে আসে সেই পূর্ণিমাতে চন্দ্রগ্রহণ হয়। কাল সত্যি সত্যি একটি ওজনদার তিথি ছিল। কি চরম ছিল মাধ্যাকর্ষণ! এই চৈত্রের শেষ পূর্ণিমা! কালাপাহাড়, কালবোশেখি মাথায় তখন তোলপাড়। কবিতা ভাবব কি কেমন যেন মুষড়ে পড়লাম !
জয় মা কঙ্কালী! জয় মা ফুল্লরা! জয় মা ইস্তারা ! ভালো রেখো সকলকে। রেখোঢেকো সকলকে!