Wednesday, May 18, 2016

বোহেমিয়ান ডায়েরী -পর্বঃ(২)

বার্লিন বৃত্তান্ত 

রদিন ভোরে উঠে সাড়ে ছটায় ব্রেকফাস্ট, স্নান সেরেই বাসে উঠে পড়া ফ্র্যাঙ্কফার্ট থেকে বার্লিনের উদ্দেশ্যে। শহর ছেড়ে বাস ছুটে চলল আমাদের হাইওয়ে সমতুল চওড়া রাস্তা অটোবান (autobahn)  দিয়ে। দুপাশে সবুজ অরণ্য আর মাঝেমাঝে ক্যানারী হলুদ রঙের ক্যানোলা চাষের আদিগন্ত  ক্ষেত। প্রথমে ভুল করি সর্ষে ক্ষেত ভেবে। কিন্তু জন জানালো ক্যানোলা এখানে বায়ো ফুয়েল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হলুদ রংয়ে চোখ আটকেই থাকে, এত সুন্দর সেই রং। 
আর সারে সারে  উইন্ড মিল ঘুরছে এবং ঘুরছে হাওয়ার আনুকুল্যে। এই উইন্ড মিল ইউরোপের একটি বৈশিষ্ট্য। এখনো বায়ুশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুত উত্পাদন হয় এখানে।   এবার এল চেকপয়েন্ট। ইষ্ট ও ওয়েষ্ট জার্মাণীর মাঝ বরাবর আমরা। সকালের প্রথম পিটস্টপ। ইউরো খরচ করে টয়লেট আর সাথে মেঘ-বৃষ্টি-রোদ্দুরের লুকোচুরির সঙ্গে কনকনে শীতের ধারালো  ঠান্ডা হাওয়ার সাথে মোকাবিলা। 



এবার পলের মুখে সেই যুদ্ধের গল্প শোনার পালা। ছোটবেলায় রাহুল দাদাইয়ের গলা জড়িয়ে বলত, তারপর হিটলার কি করল দাদাই? হিটলার কি খুব দুষ্টু লোক ছিল? বাবা বলতেন, এই ব‌ইখানা বড় হয়ে পড়বে তুমি। ব‌ইয়ের নাম "দ্যা হিষ্ট্রি অফ দ্যা থার্ড রাইক"  । দাদাইয়ের কাছ থেকে গল্পশোনার পালা যখন শেষ হল সেই ব‌ইখানা সে বার পাঁচেক পড়ে ফেলেছে আর তার নিজের বাবা আর আমার বাবার সঙ্গে রীতিমত বিশ্বযুদ্ধের আলোচনায় সরব হয়েছে। মূলতঃ রাহুলের উদ্যোগেই একদা বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসময় প্রেক্ষাপটে এবারের ভ্রমণ।  
একদা কেলটিক উপজাতির অধ্যূষিত ইউরোপের এই বার্লিন শহরে আমাদের প্রবেশ হল বিকেলে। পেরুলাম এলব নদী। এলব হল মধ্য ইউরোপের অন্যতম বৃহত নদী।   

ইষ্ট  বার্লিনে পৌঁছলাম সন্ধ্যের ঝুলে। ইষ্ট বার্লিনে ট্রামের নেটওয়ার্ক খুব জোরালো। ওয়েষ্ট বার্লিনে ট্রাম নেই। রাস্তায় অগণিত ঝকঝকে ট্রাম এমাথা থেকে ওমাথা ছুটে চলেছে যাত্রী নিয়ে।  আকাশে তখনো সূর্যের আলো জ্বলজ্বল করছে। তবে হাওয়ার দাপটে বেশ ঠান্ডা অনুভূত হল। বাস গিয়ে থামল শহরের অন্যতম ব্যস্ত রেস্তোঁরায়। মালিকের নামে যার নাম "জিকো" বৃদ্ধ মালিক জিকো নিজে হাতে ওয়েলকাম শ্যাম্পেন  ধরিয়ে দিল হাসিমুখে। তারপর রেস্তোঁরা কাম পাবের অন্দরে আমাদের দঙ্গলের প্রবেশ। আসন গ্রহণের পর ঠান্ডা বিয়ার এল। এবার শুরু হল লাইভ মিউজিক। জিকো এভারগ্রিণ। তার কেরামতিতে খাদ্য ও খাদকের   এক অদ্ভূত মেলবন্ধন রচিত হয়। জিকোর পোশাক থেকে হাসিমাখানো মুখ আর কাটলারি-ক্রকারি নিয়ে জাগলারি দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় আমাদের দেশের বৃদ্ধদের কথা। এখানকার বুড়োরা কি সুন্দর করে বাঁচতে জানে! কত প্রাণবন্ত এরা!  আর রেস্তোঁরায় একপাল তরুণ তরুণী কাজ করে চলেছে কিন্তু জিকো এদের মধ্যমণি। খাবারের অর্ডার নিয়ে গেল। এখানে কেবল গ্রিলড প্রোটিন পাওয়া যায় অর্থাত ফিশ, চিকেন, পর্ক অথবা ল্যাম্ব গ্রিল করে প্লেট সাজিয়ে দেওয়া হয় সেদ্ধ সবজীর বিছানায়, একটু ধবধবে সাদা সরুচালের ভাতের চৌকাঠ পেরিয়ে মুচমুচে ফ্রেঞ্চফ্রাইয়ের বেড়া দেওয়া বাগানে। বেড়া  ডিঙিয়ে একটুকরো পাতিলেবুর ছোঁয়া।    
সঙ্গে ধূমায়িত মাশরুম স্যুপ আর মাখন-রুটি।  আসতে লাগল থরে থরে  ওয়াইন ও লিকার। গ্রেপস এবং গ্রেইন। উদ্দাম মিউজিক চলছে তখনো। পরিচিত গানে আমরাও গলা মেলাই।  আমাদের গ্রুপের বৃদ্ধ বৃদ্ধারাও নাচতে শুরু করেছেন। আবারো মনে পড়ে দেশের মানুষগুলোর কথা।   মনে মনে বলি আমার পাড়ার হরিবাবুকে কিম্বা রেখামাসীমাকে। এভাবেই বয়স ধরে রাখতে হয় নয়ত পিছিয়ে পড়তে হয় বুঝি। মেইনকোর্স ডিনার শেষে পৌঁছে গেল সেরাতের সুইট ডিশ । সুচারুভাবে পরিবেশিত প্যানকেকের মধ্যে আইসক্রিম  এবং ওপর থেকে হট চকোলেট সস ঢেলে দেওয়া হয়েছে অকৃপণ হাতে।   
সবশেষে ছোট্ট শটগ্লাসে একটুকু  jagermeister , এক ধরণের ডাইজেষ্টিভ লিকার । বেশ এনজাইম এনজাইম গন্ধ।  জিকোর জয়ধ্বনি দিয়ে পাব থেকে বেরিয়ে এসে আমরা সেই রাতে হাজির হলাম ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের ধারে। বহু পুরণো ঐতিহাসিক জায়গা। এখানে রাজনৈতিক মিটিং, মিছিল হত। বিশ্বযুদ্ধে সবকিছু ক্ষ্তিগ্রস্ত হলেও এই ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটটি বেঁচে গিয়েছিল। সেটিকে এখন আরো সুন্দর করে রাখা হয়েছে । তার চারপাশে ইষ্ট বার্লিনের এমব্যাসি । রাস্তার ধারে ধারে  লিন্ডন গাছ দিয়ে সাজানো বনবীথি। আমাদের চৌরঙ্গী স্কোয়ারের মত।  এই জায়গার নাম উন্টার ডি লিন্ডন বা আন্ডার দ্যা লিন্ডন ট্রি ।  
রাতের অন্ধকারে ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেই হোটেলে চম্পট। সারাদিনের ক্লান্তি মেখে ঘুমে জড়িয়ে এল চোখ। পরদিন আবারো ব্রেকফাস্ট সেরে ইষ্ট বার্লিনের এই অঞ্চলকে ভালোভাবে দেখার পালা। টিভি টাওয়ারটি হল জার্মাণির সবচেয়ে উঁচু মনুমেন্ট। এটি আলেকজান্ডার Platz ( প্লাজা )র কাছেই অবস্থিত। আলেকজান্ডার প্লাজাটি হল এখানকার অন্যতম বৃহত শপিং সেন্টার।   
    

Tuesday, May 17, 2016

বোহেমিয়ান ডায়েরী (১)

বোহেমিয়ান ডায়েরী  (১) ফ্র্যাঙ্কফার্ট পর্বঃ 

 লকাতার মেঘ ও মৌসুমীর টানাপোড়েনে  মন দে উড়ান। প্ল্যান অনুযায়ী এটিহাডের বিমানে আবুধাবি ও সেখান থেকে ফ্যাঙ্কফার্ট। তারপর সেখান থেকে বাসে করে শুরু হবে বোহেমিয়ান সফর। কথায় বলেনা? ধর্মের কল বাতাসে নড়ে? কলকাতার বৃষ্টিকে অভিশম্পাত করা? বিমানবন্দরে বসেই ছিলাম বিন্দাস। সময় মত সিকিউরিটি চেকিং, ইমিগ্রেশান সব সেরে   বিমানে উঠে পড়া হল। রানওয়েতে চোখের সামনে দিয়ে সব বিমান উড়ে গেল। আমাদের প্লেনটি ছুটল কিছুটা রানওয়েতে। তারপরেই বিপত্তি। অঝোরে বৃষ্টি ও সেইসাথে বহুপ্রত্যাশিত কালবৈশাখী নাড়া দিল আমাদের সফর। বিমানের জানলায় চোখ রেখে দেখছি গাছপালার উদ্দাম নৃত্য আর আছড়ে পড়া  বৃষ্টির ফোঁটায় সপসপে প্লেনের জানলা। বাইরে কিছুই দেখা যায়না। হঠাত এত বৃষ্টি? প্লেন রানওয়েতে ইঞ্জিন বন্ধ না করেই ভিজছিল। একসময় তার জ্বালানী গেল ফুরিয়ে।  
এরপর? তারপর আর কি? জ্বালানী ভরে নিয়ে আবার ওড়ার তোড়জোড় কিন্তু বোঝাই গেল আবুধাবি থেকে ফ্রাঙ্কফার্টের কানেক্টিং ফ্লাইটটি মিস করব‌ই আমরা। ওদিকে আমার পুত্র ফিলাডেলফিয়া থেকে ফ্রাঙ্কফার্ট পৌঁছে যাবে। ট্রাফালগার নামক যে সংস্থাটির সাথে ১৬দিনের গাঁটছড়া বাঁধা হয়েছে তাদের শাটলটি আমরা পাবনা। বেশ টেনশান। শুধু হোয়াটস্যাপের দৌলতে ছেলেকে খবরটা দিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্তি। সে যেন বাস নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে ফ্র্যাঙ্কফার্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে আর পিতৃমাতৃহীনতার বার্তাটি জনায় জনায় শুধিয়ে বলে আমার বাবা-মা "অন দ্যা ওয়ে টু ফ্যাঙ্কফার্ট, ফ্লাইট মিসড ডিউ টু ওয়েদার, ব্লা, ব্লা, ব্লা..."  
ফ্র্যাঙ্কফার্ট এয়ারপোর্টে পৌঁছেই মন কেঁদে উঠল। ছেলেটার সঙ্গে কখন দেখা হবে? কিন্তু জানতে পারলাম সে আমাদের সাতচল্লিশ জনের গ্রুপের সঙ্গে ট্রাফালগার-ট্যুর ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানে ফ্র্যাঙ্কফার্ট শহরের আশেপাশেই জ্ঞান নিতে ব্যস্ত।   অগত্যা মধুসূদন। আমরা গ্যাঁটের কড়ি ভাঙিয়ে নিলাম এয়ারপোর্টে। ডলার থেকে ইউরো। তারপর নিজেরাই ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে পোঁছে গেলাম।  কিছুপরেই রাহুল ঘরে এসে ঢুকল। বহুদিনের অদর্শণে আকুলিবিকুলি প্রাণে কিছুটা স্বস্তি তখন তিনজনের। সন্ধ্যেবেলায় যখন আমাদের ট্যুর ম্যানেজার পলের সঙ্গে আলাপ হল তখন দেখি আমরা বাদে সকলেই রাহুলের বেশ পরিচিত হয়ে গেছে। সে রীতিমত আড্ডা দিয়েছে তাদের সাথে। আর মুকাজ্জি পরিবারের  বিলম্বে ট্যুরে যোগদানের ইতিবৃত্তটি সকলের বেশ জানা হয়ে গেছে। আমরা হারিয়ে যাওয়া মাতা-পিতা মুকাজ্জি বেশ সেলিব্রিটি ষ্টেটাস নিয়ে ঘুরছি ফ্র্যাঙ্কফার্টের পথেঘাটে।  
বেশ কনকনে ঠান্ডা আর সঙ্গে হাওয়া। সন্ধ্যে ছটার মধ্যেই শপিংমলের ফুডকোর্টে ঝাঁপ ফেলার তোড়জোড়। 


অতএব চোখের সামনে পিত্জা হাট, ম্যাকডোনাল্ডসের সাজানো বাগানে চোখ রেখেই ক্ষুধার বাজারে অগ্নিতে ঘৃতাহুতি । বেরিয়ে এসে পথের ধারে বেশ ছিমছাম এক স্পোর্টস বারে গিয়ে তিনজনে বসলাম। তারপর টম-ইয়ম চিকেন স্যুপ আর বিশাল এক পিত্জা নিয়ে পাকিস্তানী ললনা হাসিমুখে উদয় হল। সঙ্গে ড্রাফট বিয়ার। গরম, সুস্বাদু স্যুপে সারাদিনের পথশ্রম নিমেষে উধাও। আর বিয়ারে চুমুক দিতেই জলশূন্যতা উবে গিয়ে শরীরটা বেশ হাইড্রেটেড তখন।  
বেশ সস্তার রেস্তোরাঁটি। আর পিত্জাটিও বেশ ভাল। সবশুদ্ধ কুড়ি ইউরোতে তিনজনের ভরপেট খাওয়া। এবার হেঁটে ফিরে আসি হোটেলে। পরদিনের তোড়জোড় শুরু। মানে আমাদের শেডিউল মত বোহেমিয়ান সফর শুরু হল পরদিন ভোরে। হোটেলে স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট ব্যুফেতে ঠিক সাড়ে ছটায়। তারপর পেটচুক্তিতে প্রাতঃরাশ সেরে জিনিষপত্র নিয়ে বাসে ওঠা। এই বড়সড় বাসটিই আমাদের সারাদিনের দোসর।  আর বাসের মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন কোণা থেকে জড়ো হওয়া সাত চল্লিশজনের সঙ্গে অহোরাত্র সৌজন্যবোধ, বন্ধুতা  আর সর্বোপরি ট্যুর ম্যানেজার কাম গাইড জার্মাণ বিশাল বপুর পল ও রোমানিয়ান বাস ড্রাইভার সুদর্শণ জন আপাততঃ আমাদের সঙ্গী। সারাদিন বাসে ঘোরা আর দিনের শেষে হোটেলে গিয়ে বিশ্রাম। এই হল আপাততঃ আমাদের শয়নে স্বপনে জাগরণে বোহেমিয়ান ট্যুরের আয়োজন।   

Thursday, April 9, 2015

একটি দুরন্ত কালবৈশাখী এবং ইস্তারী পূর্ণিমা

ষ্টারের ছুটিতে চৈত্রের পূর্ণ চন্দ্র ছিল গতকাল। মানে যাকে বলা হয় চৈত্র পূর্ণিমা , আমি বলি ইস্তারী পূর্ণিমা এবং সেই সাথে চন্দ্রগ্রহণ। শরতকালের দুর্গাপুজোর পর যে পূর্ণিমাটি হয় তার নাম কোজাগরী। আমাদের লক্ষ্মীপুজো হয়। আর কালকের পূর্ণিমাটি ছিল বাসন্তী পুজোর পরের পূর্ণিমা। সেই অর্থে খুব জোরদার তিথি। হনুমানের নাকি জন্মতিথি। তাই বহু জায়গায় খুব ধুম করে ধর্ম পুজো হয় ঐ দিনে। কালীমন্দিরগুলিতেও খুব ধুম হয়। এর বেশী তথ্য আমার জানা নেই। 



ঐদিন বোলপুরের প্রান্তিক থেকে কঙ্কালীতলায় পুজো দিতে গিয়ে দেখি বিশাল লাইন। আমার এই নিয়ে ওখানে ৩৯বার যাওয়া হল। এমন ভীড় প্রথম দেখলাম। উত্তরবাহিনী কোপাই নদী, শ্মশান আর কুন্ডটি সব মিলিয়ে বেশ সুন্দর জায়গা। 


কাঞ্চী দেশে পড়িল কাঁকালি অভিরাম।
বেদগর্ভা দেবতা ভৈরব রুরু নাম।। 
সতীর দেহত্যাগের সময় মায়ের কাঁখাল বা কোমরের অংশ পড়েছিল এই কুন্ডে। তাই একান্ন পীঠের একটি পীঠ এটি। কঙ্কালীমায়ের ভৈরব হলেন রুরু, যাঁর স্বয়ংভূ লিঙ্গটি কালাপাহাড়ের অত্যাচারে বিনষ্ট । প্রাচীন মন্দিরটিও সংস্কারে কিছুটা বেঁচে আছে। সেখান থেকে ঐ পথ দিয়েই লাভপুরের ফুল্লরাতলা গেলাম। একান্নপীঠের অরেকটি পীঠ। অট্টহাসও বলে এই স্থানকে। সতীমায়ের অধরোষ্ঠ পড়েছিল এখানে। ভৈরবের নাম বিশ্বেশ। অপূর্ব ছবির মত পরিবেশ। সেখানে পুজো দিয়ে আমরা গেলাম আরো একটি প্রাচীন মন্দির দর্শণে। ফুল্লরাতলা থেকে গুণুটিয়া ঘাট। সেখান থেকে ময়ূরাক্ষী নদীর ওপর একটি অস্থায়ী রাস্তা দিয়ে বন জঙ্গল পেরিয়ে, ছোট ছোট গ্রামের মধ্যে দ্ইয়ে গিয়ে পড়লাম ন'পাড়া ও সেখান থেকে তারাপীঠের রাস্তায় কলেশ্বর শিবমন্দির। অতীতের নাম পার্বতীপুর। নবরত্ন আকৃতির মন্দিরটি একশো বছরের পুরণো। প্রাচীন মন্দির কালাপাহাড়ের অত্যাচারে ধ্বংস হয়ে যায়। এখানেও গর্ভগৃহের মধ্যে স্বয়ংভূ শিবলিঙ্গটি ভাঙা। 

কলেশ্বর দেখে আমাদের লাভপুরে তারাশঙ্কর ব‌ইমেলায় যাবার কথা। চয়নিকা কাগজটির সম্পাদক কৌশিক ভান্ডারী আমাদের জন্য ভালো ব্যবস্থা করেছিলেন। ভালো লাগল তাদের ব‌ইমেলার উদ্যোগ দেখে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মস্থান এই লাভপুর। আর পাশেই তাঁর উপন্যাসের স্মৃতি বিজড়িত হাঁসুলিবাঁক। 



কালবৈশাখী ও সেই সাথে শিলাবৃষ্টি কিছুটা হলেও ম্লান করে দিল আনন্দ। ফেরার পথে এমন শিলাবৃস্টির প্রকোপে পড়ব আশা করিনি। গাড়ির সামনে এক বাগাল ছেলে তার গরুদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। শিলের আঘাতে গরুগুলি এধার ওধার ছিটকে যাচ্ছিল ভয়ে। আর সেই সাথে বাঁশগাছগুলি এমন দুলছিল যে মনে হল ওরা যেন গরুগুলির গায়ে সজোরে আছড়ে পড়বে। রাস্তার দুপাশে মজুত হলুদ খড়ের গাদায় শিলের ধবধবে সাদা গোলাগুলো দেখে মনে হচ্ছিল কবিতা লিখতে কিন্তু সেই সময় শুধু মনে হয়েছে আমাদের জীবন কত ঠুনকো। প্রকৃতির রোষ কত কিছু করতে পারে। জোয়ার ভাঁটা আর অমাবস্যা-পূর্ণিমা সেই শক্তির অঙ্গুলি হেলনে হয়। পৃথিবী যে পূর্ণিমাতে চাঁদ আর সূর্যের মাঝখানে আসে সেই পূর্ণিমাতে চন্দ্রগ্রহণ হয়। কাল সত্যি সত্যি একটি ওজনদার তিথি ছিল। কি চরম ছিল মাধ্যাকর্ষণ! এই চৈত্রের শেষ পূর্ণিমা! কালাপাহাড়, কালবোশেখি মাথায় তখন তোলপাড়। কবিতা ভাবব কি কেমন যেন মুষড়ে পড়লাম !
জয় মা কঙ্কালী! জয় মা ফুল্লরা! জয় মা ইস্তারা ! ভালো রেখো সকলকে। রেখোঢেকো সকলকে! 


Monday, January 5, 2015

অচেনা সুন্দরীর ট্র্যাজিক ম্যাজিক




নামটায় যতটা সৌন্দর্য্য ঠিক ততটাই সুন্দর তার ভৌগোলিক চেহারা। আর সেখানে মানুষের প্রতিনিয়ত জীবনসংগ্রামও ঠিক ততটাই ভয়ানক। সেখানে ডাঙায় বাঘ আর জলে কুমীর নিয়ে যে মানুষেরা অহোরাত্র বেঁচে থাকে ভৌগোলিক সৌন্দর্য্য তারিয়ে খাওয়া তাদের ভাগ্যে নেই। এই হল পশ্চিমবাংলার বদ্বীপ অঞ্চল সুন্দরবন যার সাথে জড়িয়ে আছে কিংবদন্তীর কড়চা। বেহুলা ভেলা ভেসে এসেছিল যার নেতিধোপানির ঘাটে। এই সেই সুন্দরবন যার প্রেক্ষাপটে রচিত হয়্রেছে অমিতাভ ঘোষের হাংরি টাইড অথবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি। এখানে চরাচর জুড়ে আছে নোনাজলের ঐশ্বর্য্য যার অনন্ত, অসীম জলরাশির মাঝে লুকিয়ে থাকে অগণিত সজীব আর সবুজ। গল্পকারের ভাষায় যা হয়ে ওঠে মূর্ত, ভ্রমণপিপাসুর কলমে যা হয়ে ওঠে আরো প্রাণবন্ত। কালের স্রোতে যার ভূগোল পুরণো হয়না সেই বায়োডাইভার্সিটির অন্যতম নিদর্শন সুন্দরবনে হাজির হলাম আমরা ক'জন। শীতের আলসেমি আর ভোরের রোদ্দুরকে সঙ্গী করে কলকাতা থেকে গাড়ি করে ক্যানিং পেরিয়েই মাত্র একশো কিলোমিটার দূরে গদখালি। কলকাতার কাছেই এমন অনবদ্য উইকএন্ড স্পট এখনো অনেক বাঙালীর না-দেখা । ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তকমা নিয়ে স্বমহিমায় বিরাজ করছে এই ম্যানগ্রোভ অরণ্য। এবার গাড়িকে দুরাতের মত গদখালির বিশ্বস্ত খোঁয়াড়ে পার্ক করে মালপত্র নিয়ে লঞ্চে উঠে পড়া সকলে মিলে। কলকাতার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমরা ছিলাম মোট বাইশ জন। 
 
চুলোয় গেল ঝুটঝামেলি, শিকেয় তোলা কূটকাচালি।
বন্দী হলাম লঞ্চে ভেসে, সুন্দর বন চারিপাশে । 

 
বিদ্যেধরীর বিস্তৃত পাড়ে লঞ্চ ছিল বাঁধা। একে একে তার মধ্যে আমাদের সাথে উঠল দু-তিনদিনের রসদ। কাতলা, ভেটকি,পার্শে, পমফ্রেট, চিংড়ি আর মুরগী। সাথে পানীয় জল যার বড় অভাব এই সুন্দরবনে। বিদ্যেধরীর এপারে আমরা আর অন্যপারে দক্ষিণের ব্যস্ততম বাজার শহর গোসাবা। সেখানথেকেও উঠবে কিছু আনাজপাতি। ছোট ছোট নদী দুর্গা দুয়ানী, হোগল, সূর্যভেরী,দত্তা, রায়মঙ্গল, ঠাকুরাণ, গোসাবা সকলের আঁকাবাঁকা নেটওয়ার্ক চোখে পড়ল গুগলম্যাপের মধ্যে। কিছু পরেই বালি আইল্যান্ড, যেখান থেকে মিষ্টিজল আমাদের ছেড়ে চলে গেল আর শুরু হল নোনাজলের সুন্দরবন। পুবের মিষ্টি আলো গায়ে লাগছে.. হালকা শীতের নরম ওম জড়িয়ে জায়গা নিলাম। চোখ রাখলাম বিদ্যেধরীর বিস্তৃত জলরাশিতে। সুখ আর সুখ।
নদীর গায়ে নদী এসে লেগেছে সুন্দরবনে আর সব নদী মিলেমিশে সে যে কি বিশালতা আর সকলের একসাথে সেই বয়ে চলা আর অবশেষে বঙ্গোপসাগরের মধ্যে গিয়ে আত্মসমর্পণ। সমুদ্রের বিছানায় লুটিয়ে পড়েও নদীর চলার শেষ নেই। সর্পিল গতিতে বয়ে চলে মোহানার মুখে একের সাথে অন্যের সে কি সখ্যতা! সেখানেও নদীর স্বকীয়তা বর্তমান আর ফ্লোরা আর ফনার বৈচিত্র্যময়তায় ভরপুর সে নদীর শরীর। নদীমাতৃক বাংলার অনবদ্য ট্যুরিষ্ট স্পট সুন্দরবনের শীত ঋতু জমজমাট হয় সপ্তাহান্তের ট্যুরিষ্ট আগমনে।
এখানকার মানুষের দৈনন্দীন জীবন জোয়ারভাঁটার টানাপোড়েনে অতিবাহিত হয়। ম্যানগ্রোভ অরণ্যের মত সয়ে গেছে এদের জীবনযাত্রার খুঁটিনাটি। এরা জঙ্গল বোঝে, পশুপাখি বোঝে তবুও প্রকৃতি রুষ্ট হলে এরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছিপনৌকায় মাছ ধরতে গিয়ে কিম্বা জঙ্গলে মধু আনতে গিয়ে এরা বাঘের পেটে যায় । সুনামী বা আয়লায় এরা সর্বস্বান্ত হয় । তবুও ভাঙতে ভাঙতে গড়ে ওঠে নতুন হ্যাবিট্যাট।আবারো জেগে ওঠে সুন্দরবনের ফ্লোরা(flora) ও ফনা(fauna) । যেন আগুণপাখি আমাদের এই গর্বের সুন্দরবন। পুড়ে ছাই হয়ে গিয়ে আবার তার মধ্যে থেকে নতুন করে জন্ম নেয়। প্রাকৃতিক বিপর্যয় কাবু করে দেয় একে। কিন্তু প্রকৃতি আবারো কোলে টেনে নেয়। 

 
লঞ্চ বা মোটোরাইজড নৌকা ছাড়া স্থলপথে সুন্দরবন যাবার কোনো রাস্তা নেই । আমাদের গন্তব্য হল সজনেখালি টাইগার রিসার্ভ অঞ্চল। লঞ্চযাত্রার শুরুতেই কচি ডাবের জল দিয়ে ওয়েলকাম পর্ব সেরে নিলেন আমাদের ট্যুর অপারেটর । তারপরেই হাতে এল শালপাতার বাটিতে করে আলুকাবলি। কখনো চোখ রাখি বিস্তৃত জলরাশিতে আর কখনো বা দুপাশের ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্যের ঘন সবুজে। আর গল্প শুনি বাংলার গর্বের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের। প্রায় এগারোহাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে এই টাইগার রিসার্ভ ফরেষ্ট। জলের কুমীর ঐ বাঘের ভয়ে কাঁটা। এখানে বাঘ নদী পেরোয় নির্বিবাদে।জলের মধ্যে অবিশ্যি কামটের কামড় তাকে খেতে হয় কখনো। এই বাঘ ছিপনৌকায় মাছ ধরতে আসা মানুষের দল থেকে একজনকে নিঃসাড়ে টেনে নিয়ে যায়। বাকীরা তা জানতেও পারেনা। রয়েল বেঙগল টাইগারের এত হিংস্রতার কারণ হল জঙ্গল কেটে কেটে মানুষের বসতি গড়ে তোলা, নদীর নোনা জলের আধিক্য আর হেতাল গাছের ভয়ানক কাঁটা। এই হেতাল ঝোপে বাঘ থাকে কিছুটা গা ঢাকা দিয়ে অথচ গুল্ম জাতীয় হেতালের কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় তার সারা শরীর। সুন্দরীগাছের শ্বাসমূলের খোঁচায় কেটে যায় তার পায়ের তলার নরম অংশ। সেখানে আবার নোনাজল লেগে শুরু হয় জ্বলন। তাই বাঘ এখানে অনেকটাই বিক্ষুব্ধ ।
সবুজ এখানে প্রচুর কিন্তু শাকাহারী জন্তুদের খাবার মত ঘাসপাতা এখানে কম তাই এখানে মানুষ হল বাঘের সহজলভ্য শিকার। চিতল হরিণ আছে তবে তার খাদ্যের প্রাচুর্য নেই ফলে খাদ্য শৃঙ্খলের অনেকটাই বিপন্ন। এতসব শুনতে শুনতে বেলা পড়ে এল, এবার লাঞ্চ @ লঞ্চ।
লঞ্চ তখন মধ্যাহ্নভোজের প্রস্তুতিতে গ্যাস্ট্রোনমিক গন্ধময়তায় ভরপুর ।
ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছগুলো যেমন দিনের পর দিন সহ্য করে জোয়ারে ধেয়ে আসা সমুদ্রের নোনা জল, ভেজা মাটি আর স্যাঁতস্যাঁতে জলহাওয়া ডাঙার মানুষেরা বেঁচে থাকে বাঘ,কুমীর আর কামটের চোখরাঙানি নিয়ে। তবুও এখানকার সূর্যোদয় কি ভীষণ সুন্দর! আর সূর্যের পাটে যাওয়াটাও ততটাই চোখের সুখ দেয়। তবে চরাচরের সব আলোগুলো নিয়ে পশ্চিম আকাশে যখন সূর্যাস্ত হয় তখন আকাশের লালকমলার খেলা দেখতে দেখতে কবি-দার্শনিকরা যতটাই আপ্লুত হন স্থানীয় মানুষ আবারো অপেক্ষায় থাকে পরের সূর্যোদয়ের । 
 
সন্ধ্যের ঝুলে নেমে পড়লাম লঞ্চ থেকে। জায়গার নাম দয়াপুর। সেখানেই আমাদের রাত্রিবাসের আয়োজন। রয়েল বেঙ্গল রিসার্ভ রেসর্টে প্রবেশ করে হাত-পা-মুখ ধুয়ে ধূমায়িত চা ও গরমাগরম ভেটকি ফ্রাই খেয়ে সারাদিনের ধকলটা যেন উড়ে গেল নিমেষে। এরপর পথের ক্লান্তি ভুলে, ভদকার শিশি খুলে আমরা পেরোলাম কিছুটা সময় .. হালকা ঠান্ডা, সুন্দরবন জমে বরফ, দ‌ই, ক্ষীর না হলেও বেশ ভালোলাগা জড়িয়ে র‌ইল। হোটেলের উল্টোদিকে সজনেখালি অভয়ারণ্য। এখানে জঙ্গল যেন আরো ঘন আর হিংস্র মনে হল। অন্ধকারে এবার নদীর ধারে বসে গল্প শোনার পালা। খলসি গাছের মধু নাকি সবচেয়ে ভালো হয়। মধু যারা সংগ্রহ করে তাদের ম‌উল বলে। ছিপ নৌকায় জঙ্গলে ঢুকে ম‌উলরা হেতালের ধোঁয়া দিয়ে মৌমাছি তাড়িয়ে চাকভাঙা মধু আনে। গ্রামগুলি খুব প্রত্যন্ত। মানুষেরাও হতদরিদ্র। কারোর জীবিকা মধু আনা, কারোর বা ঝিনুকে করে বাগদার মীন মেপে নোনা জলে ছেড়ে দিনান্তে কিছু পয়সা রোজগার। তবে মুখ্য ফসল হল ধান। তাই চাষবাসই মূলত প্রধান উপজীবিকা। ডিসেম্বরের হালকা ঠান্ডায় চোখ জুড়ে আসছিল। ডিনারের ডাক পড়ল। গরম রুটি, বেগুনভাজা, বাঁধাকপির ডালনা আর মুরগীর মাংস খেয়ে রাতঘুম। পরদিন বেডটি কলিং। বালতির গরমজলের দাম মিটিয়ে তৈরী হয়ে নিলাম। আবারো সাফসুতরা লঞ্চটিতে ফিরে আসা। এসেই দেখি লুচি ভাজার পর্ব শেষ। আমাদের হাতে হাতে লুচি-আলুরদম আর চা পৌঁছে গেল। চলতে চলতে দেখি ডাঙার চরে রোদ পোহাতে ব্যস্ত এক মাঝারি কুমীর। লঞ্চ তখন ডিজিটাল ক্লিকে মুখর। কাছেই নাকি সজনেখালি কুমীর প্রকল্প। কিছু পরেই সজনেখালি নজরমিনার।আবারো লঞ্চ থেকে নামার পালা। বনবিবি ও দক্ষিণরায়ের মন্দিরে পেন্নাম ঠুকে যেতে হয় এটাই রীতি এখানে।
জঙ্গলের রাজা হিসেবে আদি অনন্তকাল ধরে বাঘকে মানুষ সমীহ করে। সুন্দরবনের এই ব্যাঘ্র দেবতা হলেন দক্ষিণ রায় যাঁকে পুজো করে মানুষ তাঁকে প্রতিনিয়ত তুষ্ট রাখে। উত্তরবঙ্গের তরাই জঙ্গলে যিনি সোনারায় দক্ষিণবঙ্গে তিনি দক্ষিণরায়। তাঁর পুজোর সাথে সাথে বাঘের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য বনদেবী বনবিবির পুজো করে মানুষ। বাউল, ম‌উল, জেলে সকলে জঙ্গলে প্রবেশের আগে পুজো দেয় বনবিবির মন্দিরে। সুন্দরবনের সংস্কৃতির সাথে এই দুইয়ের পুজো এখানকার সাথে ওতপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে। বনবিবি শক্তিরূপিণী মাদুর্গার আরেক রূপ। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে তাঁকে এখানে স্মরণ করে।

কত প্রজাতির গাছ এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যে। সব গাছেরাই প্রায় গুল্ম জাতীয় (shrub)। গরাণ থেকে গেঁওয়া, কেওড়া থেকে হেতাল, সুন্দরী থেকে গোলপাতা, ধুঁধুল, কাঁকরা, খাগড়া আরো কতরকমের !
কি অপূর্ব এক বাস্তুতন্ত্র এই সুন্দরবনের্! বিশ্বে পরিচিত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবসস্থল রূপে তবে বাঘ দেখতে পাওয়াটা অনেকটাই ভাগ্যের ওপর। বাঘ ছাড়াও জলের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির মাছ, কাঁকড়া, শুশুক আর চিংড়ির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। রয়েছে গোসাপ, কচ্ছপ, টেরাপিন, গিরগিটি, ব্যাঙ, পাইথনদের মত নানান প্রজাতির উভচরী সরীসৃপেরা । চিতল হরিণের সাথে ঘুরে বেড়ায় বুনো শুয়োর। বাঁদর উঁকি দেয় ঝোপের আড়াল থেকে। আর গাছের ডালে চোখ রাখলেই দেখা যাবে কত ধরণের পাখি। জলে মাছ খেতে আসে নানা প্রজাতির বক। নাকি ১৭০প্রজাতির পাখী আছে এই সুন্দরবনে। মাছরাঙা থেকে শুরু করে কোঁচবক, সারস থেকে শুরু করে পেলিকান, জলপিপি, হেরন, জলমুরগী, ব্রাহ্মণী চিল, পানকৌড়ি সি-গাল আরো কত কি!





ফেরার পথে সুধন্যখালি আর পাখিরালয়। অনেক ঘোরা হল, হাঁটাহাঁটি হল বাঘের পায়ের ছাপও দেখা গেল। কিন্তু সে যাত্রায় বাঘ আমাদের অধরা। তবে খেচর, উভচর, জলচর আর লঞ্চের সহচরদের সাথে ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় মন তখন ভরপুর আর আলো-আঁধারি নিয়ে জোয়ারভাটার খেলায় মেতে তখনো সুন্দরবনের চরাচর।
হোটেলে ফিরে এসে আদিবাসী নৃত্য আর বাউলগানে মুখর হল সন্ধ্যা আর সাথে বনফায়ার। গরম চা আর চিকেন পকোড়াও হাজির হল মুখের সামনে। আবার পরদিনের তোড়জোড়। আরো একবার চেষ্টাচরিত্র হল বাঘের ডেরায় উঁকি দেবার, দোবাঁকি টাইগার প্রজেক্টে অবতরণ হল । তবুও দক্ষিণরায়ের দেখা মিললনা।

ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলি লঞ্চঘাটের দিকে। নামবার পালা এবার। গোসাবায় নেমে এগিয়ে চলি রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত হ্যামিলটন সাহেবের কুঠিবাড়ির দিকে। কিছু ট্র্যাজিক ম্যাজিক আছে এই সুন্দরবনে যা অনায়াসে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে এখানে টেনে আনে । তাই গর্ব হয় মনে মনে আবার মন ভারীও হয় এখানকার মানুষগুলোর জন্যে।
আবারো উঠবে সুন্দরীগাছের আড়াল থেকে সুন্দর সূর্য এখানে। ভেসে যাবে সেই আলোয় সুন্দরবনের নদ-নদী। জেগে উঠবে চর। গাছপালার সবুজ আরো আরো সবুজে ভরে উঠবে। সুন্দরবনের নোনা জল আর মিষ্টি জলের টানাপোড়েন লেগেই থাকবে। জনসভা হবে। এখানকার স্থানীয় মানুষজনের উন্নতির প্রতিশ্রুতিতে গর্জে উঠবে সুন্দরবনের অরণ্য। তবুও এরা থাকবে কিছুটা ব্রাত্য, শহর থেকে আরো অনেক পিছিয়ে, অনেকটাই প্রতিকূলতায় আর অনেকটা প্রতিবন্ধকতায় । এটাই নিয়ম।






বিদ্যেধরীর জন্য রেখে এলাম দু'কলম চিরকূট..
দু-দুটো দুপুর দিয়েছিলে আমায়। নিজের কোলের মধ্যে টেনে নিয়েছিলে বিদ্যেধরী । দুটো রাত রেখেছিলে তোমার সংসারে। বিদ্যেধরী !লোভ দেখালে টাটকা মাছের্? আকৃষ্ট করলে পাখীর ডাকে? কাছে টানলে সূর্যাস্তের রং দেখিয়ে? বিদ্যেধরী ! তোমার কত সহ্যশক্তি! তোমার এ কূল ভাঙে আবার ও কূল গড়ে। বিনষ্ট হয় ইকোসিস্টেম। তুমি নিঃশব্দে নীরবে বয়ে চলো এই সুন্দরবনকে আঁকড়ে ধরে।

পরক্ষণেই ভাবি, আমি যে তাকে কিছুই দিয়ে এলামনা? বরং নিঙড়ে নিলাম তাকে...সে আমাকে তৃপ্ত করল তার রূপ-যৌবন সবকিছু দিয়ে। তার টাটকা মাছ, দেশী মুরগীর ডিম,খাঁটি মধু, গাছের ফলপাকড় দিয়ে...কত সাইক্লোন সামলেছে সে। সামলেছে কত বিপর্যয়। আর আয়লা-সুনামীর সময় বুক দিয়ে আগলেছে আমাদের শহর কলকাতাকে। ফেরার সময় লঞ্চে বসে বসে এতসব ভাবছিলাম ।

হঠাত কে যেন ধাক্কা দিয়ে বলল, দিয়ে যাও কিছু। লঞ্চ থেকে নেমে দেখি ক্লান্ত দুপুর সূর্যের সোনালী রোদ লেগে রয়েছে ছেঁড়া সোয়েটার পরা ছোট একটি ছেলের চোখের তারায়। নাক দিয়ে ঝরছে অবিরত ধারা আর মুখ ফুটে কথা নেই তার, বোবা সে। দিলাম তাকে মোটে দশটা টাকা। দশ টাকার নোট নিয়ে তার চোখেমুখে অপার খুশির জোয়ার নামল যেন! গোসাবার লঞ্চঘাট তখন ফিরতি জনতার ভীড়ে থৈ থৈ । আবার শুরু হল ঘরে ফেরার গান।

Wednesday, October 22, 2014

কালীপুজোয় আকালীপুর

জানো কি মহারাজা নন্দকুমারের গুহ্যকালীর গল্প? কালীপুজোয় ঘুরে এসো তবে আকালীপুর।

                                            কালীপুজোয় আকালীপুর

বাতাসে অল্প হিমেল গন্ধ আর সাথে শিউলির শেষ রেশটুকুনি নিয়ে শহর ছেড়ে রাঙামাটির পথে পাড়ি দিয়ে ঘুরে আসা যেতেই পারে কালীপুজোর ছুটিতে আকালীপুর ভদ্রপুর । নলহাটি বহরমপুর সড়কপথে বাসে করে গেলে পানাগড়-মোরগ্রাম হাইওয়ের ওপর নগোরার মোড় । সেখান থেকে আকালীপুর মাত্র পাঁচ কিলোমিটার । আজিমগঞ্জ-নলহাটী শাখায় রেল স্টেশন লোহাপুর থেকে আকালীপুর মাত্র ছ'কিলোমিটার দূরে । কোলকাতার কাছেই এই মন্দিরের খোঁজ অনেকেরই হয়ত বা অজানা ।
কথায় বলে " কীর্তযস্য স জীবতি " ! মহারাজা নন্দকুমারের কীর্তিসমূহ হেস্টিংস বিলোপ করতে চেয়েও পারেন নি । তাঁর অজস্র কীর্তির মধ্যে অন্যতম হল বীরভূমের আকালীপুরে উত্তরবাহিনী ব্রহ্মাণী নদীতীরে গুহ্যকালীর প্রতিষ্ঠা ।


নন্দকুমার যখন এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন তখন ঐ গ্রামে জনাকয়েক মানুষের বাস ছিল তার মধ্যে কিছু ভট্টাচার্য বামুন ছিল । নদীতীর ছিল জঙ্গলাকীর্ণ । কথিত আছে এই গুহ্যকালী মহাভারতে বর্ণিত মগধরাজ জরাসন্ধের আরাধ্যা দেবী । কালস্রোতে ইনি কাশীরাজ চৈতসিংহের গৃহে পূজিতা হন । রাজা চৈতসিং তাঁর রাহ্যে এক ইঁদারা খননের সময় এই কালীর হদিশ পান । অস্থায়ী মন্দির নির্মিত হয়ে পুজো শুরু হয় । হেষ্টিংস সে সময় এই অপূর্ব গুহ্যকালীর শিল্পশৈলীর কথা জানতে পেয়ে ইংল্যান্ডের এন্টিক বস্তুর সংগ্রহশালায় ঐ দামী কষ্টিপাথরের মূর্তি নিয়ে যাবার ফন্দী আঁটেন । চৈতসিং এইকথা জানতে পেরে গোপনে দেবীকে ব্রাহ্মণী নদীর জলে নিমজ্জিত করে রাখেন ।মহারাজ নন্দকুমার স্বপ্নাদেশ পেয়ে রাতারাতি এই দেবীমূর্তিকে জল থেকে উদ্ধার করে তাঁর জমিদারীর অন্তর্গত আকালীপুর ভদ্রপুরে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করে দেবীকে স্থাপন করেন । কেউ কেউ বলেন হেষ্টিংস নাকি নৌকাপথে ঐ মূর্তিকে পাচার করে দিছিলেন । নন্দকুমার গঙ্গাবক্ষেই দেবীকে উদ্ধার করেন এবং ওনার কলিকাতার বিডন স্ট্রীটের বাড়িতে প্রথমে রাখেন এবং পরে মন্দির নির্মাণ করে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেন । ব্রহ্মাণী নদী ভাগিরথীর সাথে কাটোয়ায় মিলিত হয়েছে । নন্দকুমার চেয়েছিলেন এই নৌকাকে ভদ্রপুরে থামাতে কিন্তু নৌকাকে থামানো যায়নি । তাই আকালীপুরে যখন নৌকা এসে ভিড়েছিল তখন ঐ মূর্তিকে নামানো সম্ভব হয়েছিল । উত্তরবাহিনী ব্রাহ্মণী নদী কালের স্রোতে পূর্বমুখী হয়েছে । কে জানে দেবী স্বয়ং দুরাচার, অর্থপিশাচ হেষ্টিংসের হাত থেকে বাঁচবার জন্যই হয়ত জঙ্গল পরিবেষ্টিত আকালীপুরকেই নিরাপদ স্থান বলে ভেবেছিলেন । অদূরে ব্রহ্মাণী নদীর কোলে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রেশম কুঠিরের ধ্বংসাবশেষ ইতিহাসের উপদান হয়ে থেকে গেছে ।

মন্দিরটি ছিল আটকোণা দুর্গের অণুকরণে নির্মিত । চুন-সুরকির গাঁথনির মধ্যে ছোট ছোট বাংলা ইঁট দিয়ে তৈরী । পাঁচিল পলাস্তরা বিহীন । দেওয়ালের খোপে দেবীর দশমহাবিদ্যার মূর্তির অসম্পূর্ণ পরিকল্পনা । জনশ্রুতি আছে ভদ্রপুরের মহারাণী রাজপ্রাসাদ থেকে মন্দিরের চূড়ো দর্শন করতে চেয়েছিলেন । রাণীর ঐ দম্ভ দেবীর সহ্য হয় নি । তাই দৈব দুর্যোগে একরাতের মধ্যে নির্মিত ঐ মন্দিরের চূড়ো নষ্ট হয়ে যায় ও মন্দিরের পিছনের দেওয়ালে ফাটল ধরে ।কারো মতে এই দেবীমূর্তি শ্মশানকালী বলে মন্দির প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ থাকতে নারাজ । তাই নির্মাণকালেই এই মন্দিরটি বিদীর্ণ হয় এবং এখনো অসমাপ্ত ।
মন্দিরের গর্ভগৃহটিকে বেষ্টন করে পরিখার মত আবরণী । তিনটি দরজা । প্রধান দরজা দক্ষিণদিকে । ত্রিনয়না দেবী দক্ষিণমুখী । ভারতবর্ষের অন্য কোথাও এমন কালীমূর্তির নিদর্শন নেই । অনেকটা নেপাল বা চীনের কালীমূর্তির মত গড়ন । কালো কষ্টিপাথরের একখন্ড টুকরো কেটে কোনো এক অনামা শিল্পী বানিয়ে ছিলেন । আয়তাকার কালো পাথরের বেদীতে দুটি কুন্ডলীকৃত সাপের ওপর অর্ধ পদ্মাসনে উপবিষ্টা দেবী । দেবীর ডান পা সাপের মাথা স্পর্শ করে আছে । দেবীর মস্তকে পাঁচটি ধাপে সহস্রাধার । অর্থাত হটযোগে যে মস্তকে যে সহস্রাধারের কথা বলা হয় এই সাপের মুকুট তারই প্রতীক । দেবীর গলায় পঞ্চাশটি নরমুন্ড দিয়ে তৈরী মালা । কর্ণ কুহর থেকে বুক অবধি নেমে এসেছে দুটি শিশুর মৃত শবদেহ । দেবীর সর্প উপবীত । নাভীকুন্ডের ওপর দিয়ে সাপের কোমর বেষ্টনী । দুহাতে সাপের বলয় । উন্মুক্ত লোলজিহ্বা, বিস্ফারিত ত্রিনয়ন আর মুখ গহ্বরে নাকি আসল নরদন্তের সারি । চক্ষু ও নাকি নর-করোটির অংশে নির্মিত । দুই হাতে বর এবং অভয় । একাধারে সৃষ্টি এবং লয়ের প্রতীকি এই দেবীর ভয়ানক রূপের মধ্যে আবার তাঁর প্রস্ন্ন রূপটিও প্রচ্ছন্নভাবে রয়েছে । ব্রহ্মাণী নদীতীর সংলগ্ন শ্মশানঘাটটির পরিবেশও বেশ ছমছমে ।
দেবীর ভৈরব গৌরীশঙ্করের মূর্তিও আছে পাশেই । গুহ্যকালীর নিত্যপুজো হয় এখানে । দশপোয়া অতপচালের ভোগ দেওয়া হয় দুর্গাপূজার পর চতুর্দশীতে ভেড়া, ছাগল ও মোষ বলির ও প্রচলন আছে । মায়ের প্রতিষ্ঠা দিবসে মাঘ মাসে রটন্তী কালীপুজোতে মেলাও বসে এখানে ।তান্ত্রিকরা এই কালীকে বেদের বেটী বলে থাকেন । ২০০৪ সাল থেকে এই মন্দিরের উন্নয়নে জোর কদমে কাজকর্ম চলছে । ব্রহ্মাণীনদীর সবুজ অরণ্যময়তায়, তুঁতচাষের বাহুল্যে আর বাঁশবনের মর্মরতায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পরিপুষ্ট এই আকালীপুর ভদ্রপুরের গুহ্যকালী বোলপুরের অন্যান্য সতীপিঠ অপেক্ষা কোনো অংশে কম নয় । আর মহারাজা নন্দকুমারের অপরিমিত সাহস ও দূরদৃষ্টির কথা বার বার আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই মন্দির । শক্তিসাধনার ক্ষেত্র হিসেবে এই তীর্থভূমি পশ্চিমবঙ্গের আর পাঁচটি তীর্থ সাধনার স্থানের মতই ।

শারদীয়া "স্মরণিকা" ২০১৪, প্রান্তিক, বোলপুর এ প্রকাশিত