Sunday, February 27, 2011

"খড়গপুর" নাম কেন হ'ল ?


খড়গপুর আইআইটি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে উত্তর দিকে ৫ কিলোমিটার গেলে পড়বে ইন্দা বাজারের মোড় । সেখান থেকে পূবদিকে আরো খানিকটা গেলে পড়বে ইন্দা দুর্গা মন্দির আর তারপরই বাঁদিকে খড়গেশ্বরের শিব মন্দির । এই মন্দিরের নামেই এই জায়গার নাম খড়্গপুর । কারো মতে,   রাজা খড়্গসিংহ তৈরী করেছিলেন এই মন্দির । আবার কারো মতে বিষ্ণুপুরের রাজা খড়্গমল্ল ২০০ বছর আগে এই মন্দির তৈরী করেছিলেন ।


মন্দিরের অভ্যন্তরে  গর্ভগৃহে প্রোথিত  খড়্গেশ্বর শিবলিঙ্গ  । শিবরাত্রি, আর গাজনের সময উতসব হয় এখানে ।


মন্দির চত্বরে বহু প্রাচীন একটি অশ্বত্থ গাছের বেদীমূলে রয়েছে আদিবাসীদের আরাধ্যা কোনো দেবতার প্রস্তর মূর্ত্তি । দক্ষিণবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার এই অঞ্চলগুলি প্রধানত:আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা ছিল । তবে  এখন সূর্য দেব রূপে ইনি পূজিত হন ।
মন্দিরের নাট মন্দিরে এখন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় হয়েছে । স্থানীয় মানুষ জন আর মন্দিরের পুরোহিত বিদ্যালয়টি চালনা করেন । মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণও তাঁরাই করেন আর মন্দিরের মধ্যে অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে এই স্কুলটি করেছেন তাঁরা ।


জটাজুটো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই বহু পুরোণো অশ্বত্থ বৃক্ষ আর বহন করছে সময়ের সাক্ষ্য ।


 পুরো মন্দিরটী তৈরী পাথর দিয়ে । কোনো ইঁট নেই এর গায়ে । এখন সাদা রঙ করা হয়েছে ।

Friday, February 18, 2011

ঘুরে এলাম পাথরা ও কর্ণগড়


১৬ই ফেব্রুয়ারি ২০১১ । একটা ছুটির দিন ছিল । তার আগের দিন রাতে আমাদের আরো এক বন্ধুর সাথে হঠাতই প্ল্যান হ’ল বেরোনোর । ” একে তো ফাগুন মাস , দারুন এ সময় ” ! আর খড়গপুরে এসে অবধি আমরা  নেট সার্ফ করে চলেছি এর আশপাশ নিয়ে । সময় পেলেই বন্ধুরা মিলে আর এন্ড ডি করছি …ছুটির দিনের অপেক্ষা করছি । হঠাতই মিলে গেল আরো একটি ট্যুরিস্টস্পটের  । বাতাসে সজনে ফুলের গন্ধ আর পলাশের রঙ সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়লাম আমরা চারজন মিলে..
মেদিনীপুর থেকে মাত্র দশ কিলোমিটার দূরে মন্দিরময়ে পাথরা গ্রামের ।


কংসাবতী (কাঁসাই) নদীর ধারে, মন্দিরের পর মন্দির রয়েছে পাথরায় । মন্দির, নাট মন্দির , কাছারিবাড়ি, রাসমঞ্চ, ঠাকুরদালান । পাশেই পাথরা গ্রাম । গ্রামের বাড়ি, পুকুর, ধানক্ষেত,  আলুর ক্ষেত,  সবজীর ক্ষেত, বাঁশঝাড় সবকিছুর মধ্যেই মন্দিরময় এই পাথরা ।  সবমিলিয়ে চৌত্রিশটি অসাধারণ সব মন্দির আছে ।  এগুলি প্রায় ২০০ বছরের পুরোণো ।


১৭৩২ সালে বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁ ঐ পাথরা গ্রামের  রত্নাচক পরগণার রাজস্ব আদায়ের জন্য বিদ্যাসুন্দর ঘোষাল নামে একজনকে নিযুক্ত করেন । ঐ বিদ্যাসুন্দর বাবু তাঁর নিজের শখে একের পর এক এইখানে মন্দির বানান । মন্দির গুলির ধ্বংসাবশেষ দেখলে মন খারাপ হয়ে যায় । সব শিবলিঙ্গের ভাঙা করুন অবস্থা ..




একটি এনজিও সংস্থা "পাথরা আর্কিওলজিকাল প্রিজার্ভেশন কমিটি",  আইআইটি খড়গপুরের সাথে সম্মিলিত ভাবে এই সুন্দর মন্দিরগুলির তত্ত্বাবধানে ব্রতী হয়েছে । মন্দিরের কারুকার্য পোড়ামাটির ইটের ; স্টাইলটা বিষ্ণুপুরের বাংলার  চালাঘরের মত আর অভিনব শিল্পশৈলি তার গায়ে ।



সেখান থেকে আরো কিছুটা গিয়ে হাতিওলকা গ্রাম পেরিয়ে গেলাম কর্ণগড় ।


পুরোণো গড় আজ আর নেই । নতুন মন্দির হয়েছে অনেকগুলি ।

সেইখানে মন্দিরের প্রসাদ খেয়ে দুপুরের মধ্যেই আবার ফিরে এলাম খড়গপুরে |

Wednesday, February 9, 2011

কুরুম্ভেরা দুর্গে কিছুক্ষণ !



এখন যে আই-আই-টি খড়গপুরকে আমরা দেখি প্রাক স্বাধীনতার যুগে সেখানে ছিল হিজলী জেল ।
আই-আই-টি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে দক্ষিণদিকে যাত্রা করলে হিজলি ফরেস্ট শুরু হয় ।

শীতের রোববারের সকালে এই অরণ্যের হাত ধরে, কেশিয়াড়ি হয়ে ঘুরে আসা যায় ভসরাঘাট| সুবর্ণরেখা নদীর ধবধবে সাদা, মসৃণ ও রোদের আলোয় চিকচিকে বালির চরে হেঁটে নদীকে ছুঁয়ে দেখে আসা যেতেই পারে ।

নদী দেখে ফেরার পথে বেলদার রাস্তায় ২ কিলোমিটার গেলে পড়বে কুকাই গ্রাম । সেখান থেকে আরো ২ কিলোমিটার গেলে পড়বে গগনেশ্বর গ্রামে কুরুম্ভেরা দুর্গ । পুরাতাত্মিক মনুমেন্ট হিসেবে স্বীকৃত এই ফোর্টটি সত্যি সত্যি এখনো স্বমহিমায় তার রাজকীয়তা বজায় রেখেছে ।

পশ্চিম মেদিনীপুরে যে এত অভিনব একটি স্থাপত্য আছে তা হয়ত অনেকেরই জানা নেই ।

কোলকাতার অনতিদূরে এমন একটি জায়গা আছে । কোলকাতায় আছে অনেক সৃষ্টিশীল মানুষ । কিন্তু কোনারক আর খাজুরাহে হয় ডান্স ফেষ্টিভাল কিন্তু কুরুম্ভেরাতেও তো হতে পারে ! আমার এখানে গিয়ে কেবলই মনে হতে লাগল সে কথা । আমার মনের ক্যামেরায় ধরা র‌ইল সেই রাজকীয় দুর্গের ছবি !
 

Monday, January 17, 2011

মকরের মেলা



আজ দেখে এলাম খড়গপুর থেকে বেরিয়ে একটা ছোট্ট গ্রাম কাশীজোড়ায় মকর সংক্রান্তির মেলা । খড়গপুরের আইআইটি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে প্রেমবাজারের পরই সালুয়া । সেখানে এয়ারফোর্সের বেস । ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলসের হেড কোয়ার্টার এই সালুয়া । সালুয়া ক্রস করে যখন ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে চললাম তখন বিকেল সাড়ে চারটে । সূর্য তখন পশ্চিম মেদিনীপুরের পশ্চিম আকাশের কোলে ঢলে পড়েছে । মাইলের পর মাইল ধরে চলল অনাবাদী জমিও । ফসল নেই কোনো ।লালমাটির রাস্তা খুব চওড়া নয় । প্রত্যন্ত গ্রাম । আবার কিছুটা ধানজমি । ফসল উঠে গেছে পোষের পরবে । গ্রামের লোককে জিগেস করে করে পৌঁছে গেলাম কাশীজোড়া আর বেশ অনেকটা ধানক্ষেতের এবড়োথেবড়ো জমির ওপর মহা ধূমধামে বসেছে এই মকর সংক্রান্তির মেলা কুঝলাঝেঠি গ্রামের নাম । মেলার একপাশে মহাপুরুষ-থান অর্থাত সব দেবদেবীর মূর্ত্তি পূজো হয়েছে । আর নবান্নে ওঠা সদ্যপ্রসূত ধানগাছের গোড়ায় শুকনো মাটিতে বসেছে মেলা । সাতদিন ধরে চলে এই মেলা । জমজমাট মেলা প্রাঙ্গণ । একদিকে হচ্ছে তরজা গান । 

 অন্যদিকে খাবারদাবার । আর পাঁচমিশেলী হরেকরকম জিনিষপত্র বিক্রি হচ্ছে । আমি কিনলাম একটি ছোট্ট শিবলিঙ্গ । আর পাঁচটা মেলার মত লোহার সব জিনিষ, প্লাস্টিকের জিনিষ, খেলনা, বাসনকোসন তো আছেই । আর চোখে পড়ল দূর দূর গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে আসা সব মানুষ গুলো। কত আনন্দে ঘুরছে মেলায় । শীতের বিকেলে মা বাবার হাত ধরে কত কুচোরা বায়না ধরেছে এটাসেটা কেনার । 

ফেরার সময় দেখলাম গ্রামের মাটীর সব দোতলা বাড়ি । আর দেখলাম ধানের গোলা । ঢেঁকিও দেখলাম । কিন্তু খুব গরীব এই গ্রাম । ঠিক আর পাঁচটা বাংলার গ্রাম যেমন । বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া সর্বত্র একরকম গ্রাম । একধরণের মেলা । অনেকটা একই রকমের দেখতে মানুষগুলো ও । কেউ পায়ে হেঁটে মেলায় গেছে কেউ সাইকেলে ডাবল ক্যারি করে । কেউ আবার নতুন কাপড় ও পরেছে , কেউ বা একখানা নতুন চাদর । কোনো বাচ্চা মেয়ের মাথায় টুকটুকে লাল ফিতে আর তার মায়ের মাথায় একগাদা তেলমাখা সিঁথিতে টকটকে সিঁদুর । কিন্তু সূর্য ছিল একটাই ! পশ্চিম মেদিনীপুরের পশ্চিম আকাশে । একাই রঙ ছড়িয়ে চলেছে আপন মনে ....ঠিক যেমন ছড়ায় রোজ রোজ এই গ্রাম বাংলার আকাশে । মনে হল, এত দারিদ্রের মধ্যেও এদের মেলা বসে, এরা মকর সংক্রান্তি পালন করে ধূমধাম করে । সদ্য উঠেছে ধান তাদের ঘরে । কি জানি তাই বুঝি এত মজা তাদের ! 

Friday, November 12, 2010

শান্ত-স্নিগ্ধ শঙ্করপুরের সমুদ্রতটে











The Sandy Bay Hotel : Excellent place to stay when you are here



একটা বিকেল নেবে তুমি?
যার নোনা জলের সাদাফেনায় ছুটে আসা জলের ফোঁটার রঙ সাদা
যার সাদা উড়নি নোনতা স্বাদের ঢেউয়ের পরে ঢেউয়ের
আনাগোনায় আছড়ে পড়া বালির চরে আসর বসায়
মুঠো মুঠো ঝিনুক তারা মাছ, শঙ্কর মাছেরা,
দলবেঁধে আসা বকের সারি উড়ে যায় ক্যাসুরিনার ফাঁক দিয়ে,
খেয়ে যায় বাঁশপাতা মাছ সমুদ্রের তট থেকে,
ঢেউ এসে নিয়ে যায় বিকেলের সূর্যাস্তের রং ।
সব মনখারাপের দুপুরগুলো আছড়ে পড়ে সেই ঢেউতে ।
ক্লান্ত সূর্য তখন আপন মনে রঙ ছড়িয়ে চলে পশ্চিম আকাশের গায়ে,
রং ছড়াতে ছড়াতে অবসর নেয় ঠিক আমার মত
যখন আমার ইচ্ছেডানায় ভর করে সাগর-স্বপ্নেরা...



Sunday, November 7, 2010

"লালমাটির পথে পাঁচ সতীপিঠ "

দৈনিক স্টেটসম্যান ৭ই নভেম্বর ২০১০, রবিবারের ক্রোড়পত্র বিচিত্রায়  ভ্রমণ কাহিনী
"লালমাটির পথে পাঁচ সতীপিঠ "  


১৯১৪ সালে পূজোর ছুটির পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গয়া থেকে বেলা যাবার পথে রেলওয়ে ওয়েটিংরুমে বসে লিখলেন পথের গান
"পান্থ তুমি পান্থজনের সখা হে,
পথে চলাই সেই তো তোমায় পাওয়া
যাত্রাপথের আনন্দগান যে গাহে
তারি কন্ঠে তোমারি গান গাওয়া"
রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত বীরভূম-রাঙামাটির অমোঘ আকর্ষণে বেশ কয়েকবার পা বাড়িয়েছি । কখনো বিদায়ী ফাগুণের ভোরে, কখনো শ্রাবণী পূর্ণিমার মেঘমালাদের সঙ্গী করে, কিম্বা শীতের অলস দুপুরে |শেষ বসন্তের রেশ নিয়ে চোখঝলসানো চৈতী আগুণই হোক বা পৌষালির কনকনানি কাঁপুনিই হোক কিম্বা শরতের সোনালী রোদ ঝলমলে আকাশ ; বোলপুরের প্রকৃতির রঙ এক এক সময় এক এক রকম । ফুলের বৈচিত্রে পাতাবাহারের রঙিনতায় গ্রামবাংলার এই রাঙামাটি বোধহয় একসময় কবিগুরুকে আকৃষ্ট করেছিল ।আর শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী না থাকলে সাধারণ মানুষ এই অঞ্চলের প্রতি টান অনুভব করত না । শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনের আশপাশগুলিও বুঝি এত জনপ্রিয়তা পেত না । এই লালপাহাড়ির দেশ, রাঙামাটির বেশে আমাদের জন্য সাজিয়ে রেখেছে তার শক্তিপীঠের পাঁচ-পাঁচটি বরণ ডালা ।কিংবদন্তী সতীপীঠের সত্যতা যাচাই করার ধৃষ্টতা আমার নেই তবে যেমন বৌদ্ধধর্মের মহাপুরুষের রেলিকস ও তাকে কেন্দ্র করে স্তূপ তৈরী হয় হিন্দুধর্মের সতীর দেহত্যাগের পর সতীর দেহাবশেষকে কেন্দ্র করে ৫১টি শক্তিপীঠ রয়েছে | আর বীরভূমে রয়েছে এই ৫১ পীঠের পাঁচটি| বীরভূমের এই পাঁচটি সতীপীঠ হল কঙ্কালিতলা, নলহাটি, ফুল্লরা, সাঁইথিয়া আর বক্রেশ্বর ।তারাপীঠও বীরভূমের একটি পুণ্য শক্তিপীঠ কিন্তু এটি সতীপীঠ নয় ।শান্তিনিকেতন ছাড়াও এই পীঠের আকর্ষণে বারবার ছুটে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করে কোলকাতা থেকে বোলপুরের পথে... "তোমায় নতুন করে পাবো বলে" | দেখা হয়েচে বহুবার চোখ মেলে, তবুও ঘর থেকে দু'পা ফেলেই আবার হাঁটি চেনা পথে, আবার নতুন করে আবিষ্কার করি গ্রামবাংলাকে। সবথেকে ভালো হয় যদি বোলপুর থেকে প্রথমে প্রান্তিক হয়ে কঙ্কালিতলা, তারপর ফুল্লরা ও সাঁইথিয়া দেখে তারাপীঠে গিয়ে রাতে কোনো হোটেলে থাকা যায় । পরদিন সকালে তারাপিঠ মন্দির ঘুরে, পুজো দিয়ে নলহাটি ও সেখান থেকে বক্রেশ্বর দেখে বোলপুরে ফিরে আসুন । যদি সময় থাকে তবে নলহাটি থেকে আকালিপুরও ঘুরে আসা যাবে ।

পথের আকর্ষণে বেরিয়ে পড়ি বারবার, কালের গাড়ি আরোহন করে। লিখে চলি পথের পাঁচালী । দু'চারদিন ছুটি চাই শুধু ।হাওড়া থেকে গণদেবতা, শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস, শহীদ এক্সপ্রেস,, ইন্টার সিটি এক্সপ্রেস, বিশ্বভারতী এক্সপ্রেস, আর সরাইঘাট এক্সপ্রেস ; এই এতগুলি ভিন্ন সময়ের ট্রেন আছে বোলপুর বা প্রান্তিক পৌঁছবার জন্য । আর কোনো অপরিকল্পিত ছুটির পিকনিক হলে শীতকালে গাড়ি নিয়ে সদলবলে বেরিয়ে পড়লেই হল । শেরশাহ সুরীর মধ্যযুগীয় রাস্তার ওপর ইংরেজ তৈরী করেছিল গ্র্যাণ্ড ট্র্যাঙ্ক রোড এবং সেটিকে এনএইচ-২ আখ্যা দিয়ে ভারত সরকার গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারালের কোলকাতা দিল্লী শাখা তৈরী করে।
স্বর্ণালী-চতুর্ভুজ-সড়ক-যোজনার সার্থকতায় ভ্রমণের আনন্দ ছাপিয়ে যায়। মনে হয় কে বলে বাংলা আমার নি:স্ব? মানুষ রীতিমত টোল ট্যাক্স দিয়ে গাড়িতে ভ্রমণ করছে এখন । ধন্যবাদ বিশ্বায়ন ! ন্যাশানাল হাইওয়ে অথরিটি অফ ইন্ডিয়া(NHAI) মেন্টেন্যান্স করছে ! ধন্যবাদ NHAI ! চারলেনের রাস্তায় স্রোতের মত নিয়ম মেনে গাড়ি চলছে ঠিক বিদেশের মত ; মাঝখানের ডিভাইডারে দৃষ্টিনন্দন বোগন-ভোলিয়া, করবী আর কলকে ফুলের বাতাসীয়া দোলা দেখে কৃতজ্ঞতা জানাই NHAI ইঞ্জিনিয়ারের রুচিশীলতাকে । গাড়িতে যাবার কথা বললাম এই কারণে । আর বললাম এভাবে গেলে কোনো প্ল্যান ছাড়াই বেরোনো যায় । ট্রেনের টিকিট কাটা, স্টেশন যাওয়া, সময় মত ট্রেন ধরার হ্যাপা নেই । আর ব্যস্ততার জীবনে হঠাত মনে করলেই বেরিয়ে পড়া যায় এইসব কাছে পিঠের জায়গায় । কোলকাতা থেকে গাড়ি করে গেলে বোলপুর পৌঁছতে সময় লাগে মাত্র সাড়ে তিন ঘন্টা । ভোর ভোর বেরুলে অনেক বার ঘন্টা তিনেকের মধ্যেও পৌঁছে গেছি ।  মাঝে শক্তিগড়ে দাঁড়িয়ে প্রাতরাশ সেরে নেওয়া যায় গরম কচুরি আর চা দিয়ে । এন এইচ-২ ধরে সোজা যেতে হবে পানাগড় অবধি|পানাগড়ের ভাঙা ট্রাকের সারি পেরিয়ে তারপর ডান দিকে পানাগড়-মোরগ্রাম হাইওয়ের বাঁকে ঘুরে, অজয় নদী পেরিয়ে পেরোতে হয় শাল ইউক্যালিপটাসের জঙ্গল | ইলামবাজারের ঘন জঙ্গলমহল | পথের সাথী সকালের মিষ্টিরোদ এসে পড়ে তখন শালবনের মাথায়, কচি সবুজপাতায় ।চেনাপথ যেন আরো নবীন সজীবতায় ভরে ওঠে । বৃক্ষরাজির এভ্যিনিউ সুসজ্জিত গভীর অরণ্যের করিডোর |শিল্পায়নে ব্রতী হয়ে আমরা "অরণ্যমেধ" যজ্ঞে সামিল হয়েছি তবুও বাংলার সবুজ এখনো যা আছে তা অনেক রাজ্যের ঈর্ষা আর আমাদের গর্ব | তারপরেই কবিগুরুর কর্মভূমিতে, ছাতিম, শিমূল, পলাশের শহর শান্তিনিকেতনে। শ্র্রীনিকেতন, বিশ্বভারতীর আশ্রম পেরিয়ে রতনপল্লী, বনপুলক, শ্যামবাটি, তালতোড়কে সরিয়ে রেখে দুপুর সূর্যকে মাথায় নিয়ে বোলপুর বা প্রান্তিক পৌঁছে সেরে নেওয়া যেতে পারে দুপুরের খাওয়া।বোলপুর বা প্রান্তিকে অনেক হোটেলে আছে থাকার ব্যাবস্থা। কলকাতা থেকে বুক করে এলেই হল ।
শ্যামবাটির মোড়ে সেচ দপ্তরের ক্যানালের জল বয়ে চলেছে । ভরাবর্ষায় এই জলের অমোঘ আকর্ষণ আমাকে আরো টানে। প্রতি শনিবারে ক্যানালের ধারে খোয়াইয়ের হাট বসে । এটি আর কোথাও দেখিনি। সূর্যাস্তের ঠিক ঘন্টা দুয়েক আগে থেকে বসে এই হাট। কত শিল্পীরা নিজ নিজ শিল্পের পসরা সাজিয়ে বসেন সেখানে আর সাথে থাকে বাউলের গান । রাঙামাটির পথ ধরে আমরাও পৌঁছে যাই সেখানে । ডোকরার গয়না, কত রকম ফলের বীজ দিয়ে তৈরী গয়না, কাঁথার কাজের বাহার, পটশিল্প, বাউলগানের আনুষাঙ্গিক বাদ্যযন্ত্র, তালপাতা, পোড়ামাটির কাজ, বাটিকের কাজ আরো কত কিছু এনে তারা বিক্রি করে । কিন্তু অন্ধকার হবার পূর্বমূহুর্তেই পাততাড়ি গোটাতে হয় তাদের । সোনাঝুরির ছায়ায় প্রান্তিকের বনবীথি যেন ঘুরে ফিরে নতুন করে ধরা দেয় আমার কাছে। প্রান্তিকের অনতিদূরে বোলপুর থেকে ৯কিমি দূরে বোলপুর-লাভপুর রোডের ওপর কংকালিতলায় মাকালীর মন্দিরের আকর্ষণও দুর্নিবার । দক্ষযজ্ঞের সময় সতীর খন্ড দেহাংশের কাঁখাল অর্থাত কোমরের অংশ বিশেষ পতিত হয় এখানে ...একটি কুন্ডে। আর পাশে উত্তরমুখে প্রবাহিনী কোপাই নদী সংলগ্ন এলাকায় শ্শ্মশান । আমি এই জায়গায় এলে কিছু মাহাত্ম্য অনুভব করি।কঙ্কালিতলার মায়ের মন্দিরের সামনেই রুরু-ভৈরব শিবের মন্দির । অগণিত বাউলের গানের মূর্ছনায় জমজমাট কঙ্কালিতলার প্রাঙ্গণ । ঐ পথেই অনেক দূর এগুলেই পড়বে ময়ূরাক্ষী নদীর সমতলে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মস্থান লাভপুর যার অনতিদূরে অবস্থিত ফুল্লরা বা সতীপীঠ অট্টহাস । এখানে সতীমায়ের অধর ওষ্ঠ পড়েছিল । মন্দিরের পাশে বিরাট পুকুর । কথিত আছে রামচন্দ্র যখন দুর্গাপুজো করেছিলেন তখন হনুমান ১০৮টি নীলপদ্ম এই পুকুর থেকে সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন রামচন্দ্রের পূজার জন্য । অট্টহাসে দেবী ফুল্লরার ভৈরব হলেন বিশ্বেশ ।সেখান থেকে ঘুরে আসা যায় অপর একটি পীঠ সাঁইথিয়া যেখানে সতীর গলার গহনা পড়েছিল । সাঁইথিয়ার নন্দীকেশ্বরী মায়ের অপর নাম নন্দিনী ।ভৈরব হলেন নন্দীকেশর । সাঁইথিয়া স্টেশন থেকে দেড় কিমি দূরে এই মন্দির ।এরপর রামপুরহাট থেকে ৬কিমি দূরে দ্বারকা নদীর ধারে তারাপীঠও ঘুরে আসা যেতে পারে । একদিকে কিংবদন্তীর সাধক বশিষ্ঠ মুনির তপস্যায় আর অন্যদিকে ইতিহাস খ্যাত সাধক বামাখ্যাপার তন্ত্রসাধনায় "তারাপীঠ" আজ একটি জাগ্রত পীঠ । বামাখ্যাপা তারাপীঠের মহাশ্মশানে তন্ত্র সাধনা করে তারামায়ের দর্শন পেয়েছিলেন । ভোর চারটের সময় তারাপীঠের মন্দির খোলে ।রাতে এখানে একটি হোটেলে থেকে, ভোরে পুজো দিয়ে মন্দির দর্শন করে চা জলখাবার খেয়ে পরদিন বেরিয়ে পড়া যেতে পারে পানাগড়-মোরগ্রাম হাইওয়ের ধারে নলহাটির পথে যেখানে সতীপীঠ "নলহাটেশ্বরী"র মন্দির । এখানে সতীমায়ের গলার নলী বা ভোকাল কর্ড পতিত হয় ।ছোট্ট টিলার ওপরে রাণি ভবানীর তৈরী নলাটেশ্বরী মন্দির রামপুরহাট থেকে ১৬কিমি দূরে এবং শান্তিনিকেতন থেকে ৯১ কিমি দূরে । নলাটেশ্বরী দেবীর নাম কালিকা আর তাঁর ভৈরব হলেন যোগেশ । সেখানে সকালে পৌঁছে গেলে মায়ের ভোগের ব্যাবস্থাও পাওয়া যায় । পানাগড়- মোরগ্রাম হাইওয়ের থেকে বেরিয়ে ঘুরে আসা যায় বক্রেশ্বরে যেখানে সতীর "মন" পড়েছিল । বক্রেশ্বর নদীর ওপর "নীল-নির্জন" ড্যাম যা একটি ট্যুরিষ্ট স্পটও বটে | এই জলাধারটি বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুত কেন্দ্রের জল সরবরাহ করে । এবার আসি বক্রেশ্বরের মাহাত্ম্যে । সত্যযুগে লক্ষ্মী-নারায়ণের বিবাহের সময় ইন্দ্র সুব্রত নামে এক মুনিকে ভীষণ অপমান করেছিলেন । যার ফলে সেই সুব্রত মুনির শরীরে আটটি ভয়ংকর ভাঁজ পড়ে যার জন্য তার নাম হয় "অষ্টাবক্র" মুনি । এই অষ্টাবক্র মুনি বহুদিন শিবের তপস্যা করার পর শিবের আশীর্বাদে মুক্তি পান । তাই এই বক্রেশ্বর শিব খুব জাগ্রত । এখানে দশটি উষ্ণ প্রস্রবণ আছে যাদের জল গড়ে ৬৫ থেকে ৬৬ডিগ্রি সেলসিয়াস । সতীর "মন" বা ভ্রুযুগলের মধ্যবর্তী অংশ পতিত হয় । আপাত অনাড়ম্বর মহিষমর্দিনি মায়ের মন্দিরে দাঁড়ালে বেশ ছমছমে অনুভূতি হয় । আর সাথে বক্রেশ্বরের শিবমন্দিরটিও দেখে ঘোরা যায় । কত প্রাচীন এইসব মন্দির তা মন্দিরের চেহারা দেখলেই বোঝা যায় । বক্রেশ্বরের উষ্ণপ্রস্রবণে স্নানের ব্যাবস্থাও আছে । সেখান থেকে সময় থাকলে যাত্রা করা যায় আকালিপুর ভদ্রপুরের উদ্দেশ্যে । এটি রামপুরহাট থেকে ২৫কিমি দূরে । মহারাজা নন্দকুমারের প্রতিষ্ঠিত কালীমন্দির আছে এখানে ।
অসাধারণ সুন্দর এই ছয়কোণা মন্দিরের স্থাপত্য । আর সুন্দর প্রতিমার বিগ্রহ । আকালীপুর যাওয়ার পথে পড়বে "একচক্রাগ্রাম" যেখানে নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর জন্মস্থান । কথিত আছে মহাভারতের পান্ডবরা তাদের অজ্ঞাতবাসের সময় এখানে কিছুদিন বাস করেছিলেন ।
কেন্দুলি এবং নানুর এই দুটি জায়গার জন্যও বীরভূম প্রসিদ্ধ। গীতগোবিন্দের রচয়িতা জয়দেবের জন্মস্থান কেন্দুবিল্ব বা কেঁদুলি আর বৈষ্ণবপদাবলীর রচয়িতা চন্ডীদাসের জন্মস্থান নানুর । শান্তিনিকেতন থেকে মাত্র ১৮ কিমি দূরে অজয় নদী ও ময়ূরাক্ষী নদীর মধ্যবর্তী সমতলে অবস্থিত নানুর । পানাগড় থেকে গেলে ইলামবাজারের একটু পরেই বাঁদিকে ঘুরে কেঁদুলির পথে যাওয়া যায়।মকর-সংক্রান্তির সময় বিরাট মেলা বসে কেঁদুলিতে ।গ্রামবাংলার চালার অনুকরণে তৈরী অত্যন্ত সুন্দর সব মন্দিরের হাট এই কেঁদুলি | অপূর্ব সুন্দর টেরাকোটার ভাস্কর্যের রাধাবিনোদ মন্দির যা আবারো মনে করিয়ে দেয় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে, পোড়ামাটির নিখুঁত স্থাপত্যে রামায়ণের কাহিনী লিপিবদ্ধ করা আছে মন্দিরের গায়ে ।
কাজেই শুধু বিশ্বভারতী পৌষমেলা বা বসন্ত উতসব নয় পুজোর ঠিক পরথেকেই রাঙামাটির বাতাসে থাকে মৃদু ঠান্ডার স্পর্শ যার রেশ চলে বসন্তের শেষ অবধি । ঐসময়গুলি বাদ দিলেও ক্ষতি নেই । নিরিবিলিতে আর শান্তিতে ঘুরে আসা যায় দর্শনীয় স্থানগুলি । তিন থেকে চারটি দিন বার করে নিলে একটু আরামে দেখা যায় সব ক'টি জায়গা । আর কোলকাতার এত কাছে এতগুলি জায়গা থাকতে পুজোর পর মনখারাপ কাটাতে সস্তায় ঘুরে আসা যেতেই পারে বোলপুর ।আর যদি উইকএন্ডে যান তবে ভুলে যাবেন না যেন শনিবারের খোয়াই হাটের কথা |
ফুলেদের সাথে কথা বলে, পাখিদের সাথে গান গেয়ে যাই । আর খবর নিয়ে যাই সবুজ আর নীলের | ভালো থাকতে বলি , বেঁচে থাকতে বলি বাউলকে আর মনের একতারায় বেঁধে নিয়ে যাই বাউলের দোতারার সুর |আবার আসি ফিরে গ্রামছাড়া ঐ রাঙামাটির পথের ধূলায় সতী মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে ।

Saturday, October 2, 2010

সেই কাশফুলেরা


আবার তোমার আসার সময় হয়ে গেল । কিন্তু তুমি কি বোঝ যে তোমার জন্য সারাটা বছর চেয়ে থাকি, তোমার পথ চেয়ে ...তুমি কি জান আকাশের কত রঙ হয় শরতে? তুমি কি কখনো দেখেছ একরাশ কালোমেঘের দল যখন ভিন আকাশপুরে পাড়ি দেয় তখন পেঁজা-তুলোট মেঘভাসি আকাশে রঙধনুর বন্যা বয়ে যায় । তোমার জন্যে কাশফুলেরা হেসে গড়াগড়ি খায় । শিউলি উঠোন, পদ্মপুকুর থৈ থৈ সুখবৃষ্টি নিয়ে চকচক করে । কিন্তু তুমি কি দেখ এসব ?
  
আগমনীর ঢেউ বাতাসী-পুকুরে । মেয়েলি আলপনায় স্থলপদ্মে শিশির আঁকে তুলি দিয়ে । দুব্বোঘাস সবুজের শব্দ শোনায় । তুমি কি শুনতে পাওনা
 
আমি বসে বসে শুনি তোমার নূপুরের শব্দ । ঢেউ গুনি বাতাসে আর নীল আকাশে তোমার জন্য রোজ পাঠাই পদ্মপাতায় মোড়া একটা চিরকুট। তুমি কি সে চিঠি পেলেনা আজো? গানপুকুর পাড়ে, সুর সিঁড়ির ধারে তোমার জন্যে একলাটি আমি বসে থাকব কিন্তু। ধানক্ষেতে তোমার সবুজ দুপুর নিয়ে, শিউলির কমলা সকাল নিয়ে আর কাশ-কিশলয়ের রূপোলী বিকেল নিয়ে ... 
 
পেয়েছিলে আমার পদ্মপাতায় মোড়া চিরকুট খানি ? আমি তো সেই মেয়ে যে তোমার আগুণ নিয়ে মেতে উঠি, তোমার ছায়ায় আমার ছায়াকে আবিষ্কার করি, তোমার আলো নিয়ে খেলা করি, তোমার আকাশে আমার শুকতারা ফুটিয়ে তুলি, তোমার ছন্দে আমার সুরের তুলি আঁকি মনের ক্যানভাসে ।
আজ তোমার কাশফুলেরা কথাবন্ধু আমার !
আজ তোমার শিউলিঝরণায় আমার কথাবৃষ্টি পড়ুক ঝরে, আমি তবু চাই তোমাকে আবার নতুন করে...

সেই শাপলা-শালুকের গোলাপী ডানায়, পদ্মপরাগ অনুরাগে, সেই উচ্ছ্বসিত আবেগে কাশেদের অভ্র-শুভ্র শীষে, তোমার নতুন ধানের ক্ষেতে, রোদের বাঁশির লুকোচুরি আমার সাথে, আজ শরতের একলা ভোরে
সেই কাশফুলেদের সুরে
তুমি চিঠি লিখো আমায়
সেই শিউলিফুলের মালাগাঁথায় , শিশির আঁকা শরত কথায় , কাশ-পদ্ম বনের ওপারে দেখা করো আমার সাথে