Saturday, September 22, 2012

জীবাশ্মে আর শ্বেতপাথরে




আমাদের টিকিট হাওড়া থেকে বিলাসপুর। জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসে । রাতের ট্রেন ছাড়ল ভোর সাড়ে চারটেয় । বিকেল চারটে নাগাদ বিলাসপুর পৌঁছলাম । ভাড়ার গাড়িতে উঠে এবার যাত্রা শুরু অমরকন্টকের উদ্দেশ্যে ।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলেবেলায় আমরা তখন অমরকন্টক থেকে আরো পশ্চিমে চলেছি ন্যাশানাল হাইওয়ে ১১ ধরে জবলপুরের দিকে । ডিন্ডোরি আর শা'পুর পেরিয়ে একটি মোড় থেকে বাঁদিকে ১৪ কিমি এগিয়ে চেয়ে দেখি ঘুঘুয়া ন্যাশানাল পার্কের বিশাল গেট । ভারতবর্ষের একমাত্র ফসিল পার্ক এটি ।আমেরিকার এরিজোনার পেট্রিফায়েড ফরেস্ট ন্যাশানাল পার্কের পর পৃথিবীতে বোধহয় এটাই একমাত্র পেট্রিফায়েড ফরেস্ট যা কয়েক মিলিয়ন বছর আগে ফসিলাইজড হয়ে রকগার্ডেনে রূপান্তরিত হয়েছে । কার্বন ডেটিং পরীক্ষায় জানা যায় এই স্থানের বিশাল ট্রপিকাল চিরসবুজ বৃক্ষের জঙ্গল ছিল । যার বয়স ৬৫ মিলিয়ন । তাই এই ন্যাশানাল পার্কের প্রবেশ দ্বারে রয়েছে কংক্রীটের বিশাল ডাইনোসরাস । 
 

তক্ষুণি মনে হল রাজোসরাস নর্মোডেনসাসের কথা । ইন্ডিয়ান অরিজিনের এই ডাইনোসরের ফসিল তো নর্মদার তীরেই আবিষ্কৃত হয়েছিল । ভারতবর্ষ যুগে যুগে রাজারাজড়ার দেশ বলে এখানকার ডাইনোসরের নামকরণেও সেই রাজকীয়তার ছোঁয়া । কে জানে হয়ত এই ঘুঘুয়াতেই ঘুরে বেড়াতো নর্মোডেন্সাসের পরিবার ।
                                 সরকারী কেয়ারটেকার । আমাদের ঘুরে ঘুরে সবটা পরিদর্শন করিয়েছিলেন যিনি 
১৯৮৩ সালে মধ্যপ্রদেশ সরকার ঘুঘুয়াকে ন্যাশানাল পার্কের সম্মান প্রদান করে। ঘুঘুয়া এবং পার্শ্ববর্তী গ্রাম উমারিয়া নিয়ে এই ফসিল পার্কের সমগ্র ব্যাপ্তি ২৭ হেক্টর জুড়ে । এখনো অবধি ৩১ টি প্রজাতির উদ্ভিদ সনাক্ত করা গেছে । প্রধানতঃ পাম ও দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ এরা । ইউক্যালিপ্টাস, খেঁজুর, কলা, রুদ্রাক্ষ, জাম, এই সব ট্রপিকাল সবুজ গাছকেই চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে । 
                                                          ইউক্যালিপ্টাস
সরকারী কেয়ারটেকার আমাদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে সব দেখালেন । কিছু শামুক জাতীয় অর্থাত খোলসযুক্ত বা মোলাস্কা পর্বের প্রাণীর ফসিল দেখা গেল । এর থেকে বোঝা যায় যে স্থানটি আর্দ্র ছিল এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিও হত এখানে । তারই ফলস্বরূপ চির সবুজ বৃক্ষের সমারোহ ছিল । 

                                  অপর্যাপ্ত ফসিলাইজড চিরসবুজ বৃক্ষের জীবাশ্মের সাক্ষী হয়ে আমরা 

স্থানীয় মানুষ এই অঞ্চলকে বলে "পাত্থর কা পেড়" অর্থাত পাথরের গাছ । আমি বলব গাছ-পাথর । কথায় বলে বয়সের গাছ-পাথর নেই । তার মানে এতদিনে বুঝলাম । যে কত পুরোণো হলে গাছ পাথরে রূপান্তরিত হয় । 
                                                     গাছ-পাথর

অমরকন্টকে এসে পৌঁছলাম বেশ রাত্তিরে । এম পি ট্যুরিসমের লাক্সারি টেন্টে থাকবার ব্যবস্থা । রাতের খাবার খেয়ে এসে বরাদ্দ তাঁবুতে সেরাতের মত আমরা আশ্রয় নিলাম ।



পরদিন ভোরে উঠে এবার আমাদের যাওয়া লাইমস্টোনের দেশে । বিখ্যাত জবলপুর মার্বেল রকস্‌ দেখতে । প্রথমে ভেরাঘাট । জবলপুরের ২২ কিমি দূরে নর্মদা নদী একটি গর্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এখানে । দুধসাদা পাথরের ওপর দিয়ে ঝরণার মত আছড়ে পড়ছে নর্মদা এই গর্জটির দৈর্ঘ্য ৩ কিমি । নদীর কিনারা দিয়ে, বুকের ভাঁজে মিনারের মত সারে সারে উঠে এসেছে শ্বেতপাথরের স্তম্ভেরা । কি অপূর্ব সেই রূপ । আর নদীর উচ্ছলতায় পুরো পরিবেশটাই যেন ভিন্নস্বাদের অনুভূতি সৃষ্টি করে । ভেরাঘাট পৌঁছে কেবলকারের টিকিট কিনে রোপওয়েতে যাওয়া হল মাঝ নর্মদায় ধূঁয়াধার জলপ্রপাতের এক্কেবারে গায়ের কাছে । কেবলকারের ঘেরাটোপে ডিজিটাল ক্লিকে বন্দী হতে লাগল আমার নর্মদা । চারিদিকে যেন ফোটোশপড নীল আকাশ । আর ক্যালসিয়াম-ম্যাগনেসিয়াম কার্বনেটের গাঁটছড়া । কি অপূর্ব সেই রূপ ! আর নদীর উচ্ছলতায় পুরো পরিবেশটাই যেন ভিন্নস্বাদের । পুব থেকে পশ্চিমে বহতী নর্মদা । সাদা ফেনা হয়ে জল পড়ছে গর্জের মধ্যে আর পুরো জায়গাটি ধোঁয়াময় । 
 
এবার পঞ্চবটী ঘাটে এসে নৌকাবিহারে বান্দরকুঁদনী । দুপাশে মার্বল রক্‌স এর অলিগলি রাজপথের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত নর্মদা নদী । নৌকো চড়ে ঘন্টাখানেক যেন ভুলভুলাইয়ার মধ্যে ভাসমান হলাম । পাথরের কত রকমের রঙ । পরতে পরতে যেন সৃষ্টির প্রলেপ । নৌকার মাঝির স্বরচিত কবিতায় বলিউড থেকে টুজি স্ক্যাম সবই উঠে এল স্বতস্ফূর্ত ভাবে । দুপুর সূর্য্যিতখন মাথার ওপরে । আদুড় গায়ে ডাইভ মারছে স্থানীয় কিশোর নর্মদার বুকে ।

 বর্ষার পর যেন আরো ঝাঁ চকচকে পাথরের রং আর নর্মদাও যেন থৈ থৈ রূপ নিয়ে খুশিতে ডগমগ । লাইমস্টোনের স্তবকে স্তবকে গাম্ভীর্য আর নদীর হাসি মিলেমিশে একাকার । কে যানে পূর্ণিমার রাতে এখানকার নিসর্গ কেমন হয় !কোজাগরীর রাতে আবার আসতে হবে এই বলে প্রণাম জানালাম মা নর্মদাকে । 


সকালবেলা, "ঘুরেআসি"  সংবাদপত্রে প্রকাশিত বৃহস্পতিবার,  ১৩ই সেপ্টেম্বর ২০১২ তে প্রকাশিত "সৃষ্টিপাথরের উপাখ্যান"   ঘুঘুয়া ফসিল ন্যাশানাল পার্ক এবং জব্বলপুর মার্বল রকস নিয়ে ভ্রমণ বৃত্তান্ত   

Thursday, August 23, 2012

খড়দহ নামের উত্স



গত বছর ভাদ্রমাসে  আমরা উত্তর কলকাতার খড়দহতে শ্যামসুন্দরের মন্দির এবং সংলগ্ন গঙ্গার ধারে বেড়াতে গিয়েছিলাম ।  মন্দিরে ভোগের ব্যাবস্থা ছিল । অসাধারণ সব নিরামিষ খাবার । প্রায় ১৪রকমের আইটেম যা ঠাকুরকে নিবেদন করা হয়  । এবং দুর্দান্ত সুস্বাদু সব ভোগ । মন্দির দেখে আমরা কিছুদূরে আগরপাড়ায় আনন্দময়ী মায়ের আশ্রমে গেলাম ও সেখানে থেকে গঙ্গার এত সুন্দর রূপ দেখলাম যে তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না । অতি নির্জন ও মনোরম ঐ স্থান । খড়দহ গিয়ে জানতে পারলাম ঐ অঞ্চলের নামের ইতিকথা । নিত্যানন্দ মহাপ্রভু বিবাহের পর ঐ স্থানে আসেন ও সন্ন্যাস ত্যাগ করে গার্হস্থ জীবনযাপনের জন্য সেখানকার তদানীন্তন জমিদারের কাছ থেকে একটুকরো জমি চেয়েছিলেন । জমিদার দর্পের সঙ্গে গঙাবক্ষে একটুকরো খড় ছুঁড়ে ফেলে এবং তা দেখিয়ে নিত্যানন্দকে বলেছিলেন ঐ টুকু খড়ের ওপরে যদি বাসা বেঁধে থাকতে পারো তবে থাক । নিত্যানন্দ বলেছিলেন ‘ঠিক আছে, আমি ওইটুকু স্থানেই ঘর বাঁধব’
মহাপুরুষের কথা । যেমন বলা ওমনি কাজ । পরদিন সকালে উঠে গাঁয়ের মানুষ দেখল যে গঙ্গার ওপরে একটুকরো চর ভেসে উঠেছে  এবং ঐ স্থানেই কুটির বেঁধে নিত্যানন্দ মহাপ্রভু বসবাস করতে শুরু করেন ।  এবং খড় ফেলার ঐ জায়গাটিতেই নদীর চর জেগে ওঠার  জনশ্রুতি নিয়েই ঐ স্থানের নাম খড়দহ হয়েছে ।

Wednesday, July 4, 2012

উত্তরাখণ্ডের পথে পথে


 আনন্দবাজার পত্রিকার ইন্টারনেট সংস্করণের ভ্রমণ কলম "হাওয়াবদলে"  প্রকাশিত ১লা জুলাই ২০১২ 

Thursday, June 21, 2012

Lingaraja Temple

ফাল্গুনের একটা মিষ্টি রোদের দুপুরে খড়গপুর থেকে রাজধানী এক্সপ্রেসে আমরা ভুবনেশ্বরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম । ক'দিন আগেই বৃষ্টি হয়ে ঝকঝক করছে সবুজ প্রকৃতি । পাঁচঘন্টা পর ভুবনেশ্বর । পথে পেরোলাম সুবর্ণরেখা, মহানদীর ব্রিজ । এক একজায়গায় শীতের রুক্ষতায় চড়াও পড়েছে নদীর বুকে । হোটেলে গিয়ে উঠলাম । সেখানে থেকে পরদিন ভোরে একটা অটোরিক্সো ভাড়া করে লিঙ্গরাজা মন্দির । মন্দিরময় ভুবনেশ্বরে এটি একটি অন্যতম বৃহত মন্দির ।  কলিঙ্গ স্থাপত্যে একে পঞ্চরথের আদল বলা হয় ।  ১১ th century তে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন  সোমবংশীয় রাজা জজাতি কেশরী ।  ভুবনেশ্বরের সবচেয়ে বড় মন্দির এটি । ল্যাটেরাইট পাথরের  প্রাচীর বেষ্টিত এই বিশাল মন্দিরের চত্বরটি দেখলে মনে হয় বহির্শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য এত উঁচু এবং প্রশস্ত প্রাচীর দিয়ে একে ঘিরে রাখা হয়েছিল । প্রবেশদ্বারটিও বেশ রাজকীয় । পিতলের কারুকার্যময় দরজা । তবে ক্যামেরা, জুতো এবং সেলফোন নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ । এ যুগেও এত  রক্ষণশীলতার কারণ বুঝে উঠতে পারলামনা ।  কিন্তু এত সত্ত্বেও লিঙ্গরাজাকে দর্শন করতে গিয়ে দেখি আসল মহালিঙ্গটিই কালের স্রোতে বিদ্বেষে, রোষে আক্রমণে রক্ষা করতে পারেনি তারা ।  ঐ স্বয়ংভূ বা মাটি থেকে আপনিই উঠে আসা রাজলিঙ্গকে হরি-হর জ্ঞানে পূজা করা হয় । একদিকে যা বৈষ্ণব এবং শৈব ধর্মের মেলবন্ধন ঘটায় ।  শিব এখানে পূজিত হন ত্রিভুবনেশ্বর বা  স্বর্গ, মর্ত্য এবং পাতালের প্রভু রূপে । ভুবনেশ্বরী দেবী হলেন এই শিবের প্রকৃতি । তাঁর মন্দির ও রয়েছে পাশে ।  মূল মন্দিরটি ৫৫মিটার উঁচু এবং ঐ বিশাল মন্দিরের চত্বরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরো  আরো ১৫০টি ছোট বড় অমন মন্দির । ঘুরে ঘুরে দেখলাম বেশ কয়েকটি । প্রবেশদ্বারে ঢুকেই বাঁদিকে গণেশ মন্দির । তারপর মূলমন্দিরে পুজো দিলাম দুধ, বেলপাতা ধুতুরা ফুল দিয়ে । বাইরে এসে দীপ জ্বালালাম মহাদেবকে স্মরণ করে । ঊড়িষ্যার কোনো মন্দিরে দর্শনার্থীরা লিঙ্গের মাথায় জল, ফুল বা দুধ চড়াতে পারেনা ।একদল পান্ডাদের স্বেচ্ছাচারিতা,  অহমিকা আর ট্যুরিষ্ট বিদ্বেষ জায়গাটির স্থান মাহাত্ম্যকে কিছুটা ম্লান করে দিয়েছে । যারাই আসছেন দূর দূর থেকে সকলের মুখেই সেই এককথা ।   লিঙ্গরাজ যেন ঐ প্রদেশের পূজারী এবং সেবায়েতদেরই সম্পত্তি । উত্তর বা পূর্ব ভারতের আর কোথাও এমনটি খুঁজে পাইনি ।      ভূবনেশ্বরী, কালী, সাবিত্রী, যমরাজ ইত্যাদি কয়েকটি মন্দিরে প্রবেশ করলাম ।  
 ল্যাটেরাইট পাথরের খোদাই করা স্থাপত্য সত্যি সত্যি অভিনব । নিখুঁত হস্তশৈলী ।   ১১০০ বছরের পুরোণো এই মন্দির গাত্রের কাজ পার করে দিয়েছে কত ধর্মবৈষম্যের  ঝড়ঝাপটা , কত বর্ণ বিদ্বেষের কোলাহল তবুও আজ স্বমহিমায় টিকে রয়ে গেছেন লিঙ্গরাজা । কিছুদূরেই রয়েছে বিন্দুসাগর এবং তার লাগোয়া  ১৫  th century তে গজপতি রাজাদের তৈরী   ব্রহ্মরাজ মন্দির । বৈশাখী পূর্ণিমায় লিঙ্গরাজ এখানে আসেন হাওয়া বদল করতে ঠিক যেমন পুরীর জগন্নাথ রথযাত্রায় মাসীর বাড়ি যান ।   আরো খানিক গেলেই পড়বে 9th century তে নির্মিত   রামেশ্বর মন্দির । কলিঙ্গ স্থাপত্যের ছোঁয়া এখানেও । কিছুটা লিঙ্গরাজ মন্দিরের আদলে তৈরী । রামচন্দ্র নাকি লঙ্কা বিজয়ের পর বিজয়রথ নিয়ে   সীতার সাথে   এখানে আসেন এবং এই শিবলিঙ্গটি প্রতিষ্ঠা করেন । বাসন্তীপূজার সময় অশোক-অষ্টমী তিথিতে,    রামনবমীর আগের দিন লিঙ্গরাজ  বিশাল "রুকুনা" রথে আরোহণ করে এই রামেশ্বর মন্দিরে আসেন চারদিনের জন্য ।  আর কিম্বদন্তী বলে এই চৈত্রমাসের বাসন্তীপূজার সময়ই তো রামচন্দ্র অকালবোধন করেছিলেন ।  ঐ চারদিন ধরেই তো বাসন্তী পুজো হয়ে আসছে দুর্গাপুজোর আদলে । 

Monday, June 11, 2012

বিপন্ন বাঁশবেড়িয়ায়


কোলকাতা ছেড়ে আমরা তখন বিটি রোড ধরেছি । হুগলীর বাঁশবেড়িয়ায় আমার শ্বশুরমশাইয়ের পিতামহ শ্রী সত্যচরণ মুখোপাধ্যায়ের তৈরী বসতভিটে পরিদর্শনে । একে একে পেরোলাম বালি, উত্তরপাড়া, কোন্নগর, ভদ্রকালী, রিষঢ়া, শ্রীরামপুর পেরোতে পেরোতে জৈষ্ঠ্যের রোদ তখন প্রায় আলম্ব মাথার ওপর । তারমধ্যেই শহরতলীর বাজারে হৈ হৈ করে বিকোচ্ছে আম-কাঁঠাল-লিচু । রবিবারের সরগরম বাজারে ঠা ঠা রোদেও বিকিকিনির খামতি নেই ।
জিটি রোড ছেড়ে এবার পুরোণো দিল্লী রোড ধরে সোজা মগরা হয়ে বাঁশবেড়িয়া । হংসেশ্বরী রোড ধরে রঘুদেবপুরে থামা ।
দেড়শো বছরের পুরোণো মুখুজ্যে বাস্তুভিটে এখন জঙ্গলাকীর্ণ । লোকাল ক্লাব, লোকনাথ বাবার মন্দির গড়ে উঠেছে এই জমিতেই । 

দোতলাবাড়ি ভেঙে গেছে বহুদিন আগেই ।জানলা দরজা ভেঙে ভেঙে নিয়ে গেছে কেউ । কড়িবরগার ছাদের নীচে একতলায় বাস করছে তিনটি পরিবার । পাশে দুটো পুকুরে এখনো জল থৈ থৈ । সংলগ্ন বাড়ি উঠেছে আমাদের জমির ওপর দিয়েই । প্রকান্ড বাড়ির সামনে বারমহল এখনো কিছুটা ভগ্নাবস্থায় দাঁড়িয়ে । পাশে ছিল উঁচু করা খানিক জমি যেখানে প্রতিবছর জগাদ্ধাত্রী পুজো হত ।
এখন পরিত্যক্ত ভিটের কুলুঙ্গিতে চামচিকের আনাগোনা । ক্লান্ত দুপুরে এ ভিটে হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গ কুবো-ঘুঘুদের ছায়াসাথী ।  পোড়া ইঁটের সুরকি নিয়ে রান্নাবাটি জমিয়ে দেয় পাড়ার ছোট ছেলেমেয়েরা ।  বারমহলের লবি চু-কিত্কিত প্রেমীদের অবারিত দ্বার ।  


 এরপর যাওয়া হল হংসেশ্বরী মন্দির ।  


পুরোণো হুগলীজেলার শিল্পনগরী ব্যান্ডেল এবং ত্রিবেণীর মাঝামাঝি অবস্থিত হংসেশ্বরী মন্দির । রাজা নৃসিংহদেব রায় এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীকালে ওনার বিধবা পত্নী রাণী শংকরী সেই কাজ সমাপ্ত করেন । হংসেশ্বরী মন্দিরের অদ্ভূত গড়ন । বাংলার অন্যান্য মন্দিরের থেকে ভিন্নরকমের । পঞ্চতল এই মন্দিরে তেরোটি উঁচু মিনার আছে যাকে বলে রত্ন । প্রতিটি মিনার যেন এক একটি প্রস্ফুটিত পদ্মের আকৃতিতে তৈরী । হংসেশ্বরী মন্দিরের গঠনশৈলীকে বলা হয় তান্ত্রিক সাতচক্রভেদ ।


 পাশেই অনন্ত বাসুদেবের মন্দিরটি ও নজর কাড়ে । সেটি বাংলার চালাঘরের আদতে পোড়ামাটির তৈরী । গায়ে টেরাকোটার অভিনব স্থাপত্য ।নিঁখুত কারুকার্য এই টেরাকোটার । কোনোটিতে রাধাকৃষ্ণ, কোনোটিতে দশাবতার, কোনোটিতে হনুমান । 


 এই দুই মন্দিরই এখন আরকিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার অধীনে ।কাছেই ত্রিবেণী হল তিন নদী গঙ্গা, সরস্বতী ও বিদ্যাধরীর সঙ্গমস্থল । কিন্তু সরস্বতী নদী মজে যাওয়ায় দুটি নদী এখন দৃশ্যমান ।
মন্দির এবং সংলগ্ন জমিদার বাড়ীর পুরো চৌহর্দির সীমানা বরাবর পরিখা খনন করে সুরক্ষিত করা রয়েছে এখনো ।

Wednesday, May 30, 2012

কাশ্মীরে


-->
কাশ্মীরে
17th May 2012
প্রতিবার পাহাড় না সাগর এই বিতর্কে হেরে যাই আমি । গরমের ছুটির ফাঁদে পা দিলেই হিমালয় টেনে নিয়ে যায় তার কাছে । এবারেও তার ব্যতিক্রম হল না । গ্রীষ্মের ভোরের অতিবেগুনী রশ্মির মশারী ছিঁড়েখুঁড়ে আমরা তখন মহানগরকে নীচে ফেলে হারিয়ে গেলাম বায়ুপথে । ততক্ষণে ভুলে গেছি প্রখর তপন তাপ । উধাও গ্রীষ্মের দাপুটে মেজাজ । আমরা তিনজনে দিল্লী থেকে আবার শ্রীনগরের উড়ানে । আমার চোখে কাশ্মীর কি কলির সিনেমেটিক রং ... দুচোখ জুড়ে শাম্মী কাপুর আর শর্মিলা ঠাকুর ভাসছে । ধীরে ধীরে হিমালয়ের টানে, বরফের গানে এগিয়ে চলেছি । আমার দেশের রূপলাবণ্য নিয়ে সর্বাগ্রে যে মুখশ্রীর কথা বলতে হয় সেই কাশ্মীর পৌঁছলাম শ্রীনগর থেকে একখানা গাড়িতে করে । এই সেই বিদ্ধস্ত terrain যাকে ছিনিয়ে নেবার জন্যে এত দাঙ্গা হয়েছে ? দেশের এই মুখশ্রীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে বর্ডারে কত কাঁটাতারের বেড়া , কত সৈনিকের লড়াই ! কত টানাপোড়েন ! এই ভূস্বর্গকে তুলনা করা হয় ইউরোপের সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে । কয়েকদিনের জন্যে না হয় তোলা থাক সে তুলনা । সুইস আলপ্‌সের স্মৃতি তোলা থাক এলবামে । ওরে হিমালয় যে আলপ্‌সের চেয়ে কিছু কম নয় ...এই বলতে বলতে এগিয়ে চললাম ফোটোশপড নীল আকাশের দেশে । এমন নীল যে কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি! এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি চলল হৃদয়পুরা দিয়ে । ঝাউগাছ আর লতানে গোলাপের গুল্মের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে বারবার মনে পড়ছিল ওপি নায়ারের কাশ্মীর কি কলির গানের সিকোয়েন্স । স্লোপিং রুফের বাড়িগুলো দেখে মনে পড়ে গেল খবরের কাগজের তুষারপাতের কথা । পথে চাপদাড়ি যুবক, বোরখা ঢাকা যুবতী আর মোড়ে মোড়ে সিআর পিএফ জওয়ানদের ভ্যান গাড়ি দেখে অনুভব করলাম কাশ্মীরের প্রতিকূলতা । পথে পড়ল রাজবাগ পার্ক । ঝিলামকে দেখলাম একঝলক । একে বলে বিতস্তা । ড্রাইভার মুক্তেয়ার বলল "দরিয়া ঝালেম" । যার পেছনে ঘন সবুজ পাহাড় স্তরে স্তরে সাজানো । ঝিলাম নেমেছে হিমালয়ের কোনো এক চোরা গ্লেসিয়ার থেকে । বেশ ঢল ঢল থৈ থৈ নিটোল রূপ তার । ঝিলাম সেতু পেরিয়ে ডাল ঝিলে এলাম আমরা । একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে হয় কিছুক্ষণ । লেক যে এত বড় হয় আগে কখনো দেখিনি ।শিলং এ বড়াপানি লেক দেখেছিলাম, সুইজারল্যান্ডের লুগানো লেক দেখেছিলাম । কিন্তু তাই বলে এত হৈ হৈ হাউসবোটের পসরা আর কূলে কূলে এত শিকারা ?
ডাললেকের ধারে একটা হোটেলে আমাদের সেদিনের রাত্রিবাসের ব্যবস্থা । মালপত্র রেখে একটু চা-স্ন্যাক্স খেয়েই আমরা পায়ে হেঁটে ডাল-ঝিল পরিক্রমায় বেরোলাম । দরদস্তুর করে শিকারার মাঝির আমন্ত্রণে চড়ে বসলাম শিকারায় । এমন কাশ্মীরি নৌকোর ছবি দেখেছি । চড়িনি আগে । পড়ন্ত রোদের আলোয় ডালঝিল রমরম করছে তখন । হাউসবোটের উঠোন ঘেঁষে শিকারা চলেছে মাঝির খেয়ালে । কখনো কাশ্মীরি পশমিনার দোকানের রোয়াকে কখনো আখরোট কাঠের ওয়ার্কশপে কখনো বা মীনাকারির গয়নার শিকারার বারান্দায় । সবাই মিলে বাসছি আমরা ডাললেকের জলে । শিকারার দাঁড় কাঠের পানের গড়নের । মাঝি কি অবলীলায় না সর্বক্ষণ সে দাঁড় বাইছে আপনমনে । আমাদের নৌকার সমান্তরালে এগিয়ে এল উলের পোষাক, পাথরের গয়নার মোবাইল দোকানি । এল শুকনোফল আর কেশর । এগিয়ে এল ফোটোগ্রাফারও রাজারাজড়ার পোশাক-গয়না হাতে । একটু অনুরোধ বৈ আর কিছুই নয় । এইভাবে সেই প্রদোষে ঘন্টা দেড়েক শিকারা ভ্রমণ। মাঝে দু একটা পিটস্টপ । নেহরুগার্ডেনে অবতরণ গোলাপের বাগানে । একটু ছবি তোলা । আবার শিকারা চড়ে ভাসমান শিকারায় । আশপাশে ভাসমান সবজী বাগানের মধ্যে দিয়ে লিলিপুলের মধ্যে দিয়ে ।, হাউসবোটের রোয়াক ঘেঁষে । কাশ্মীরি শাল আলোয়ানের দোকানের পাশ দিয়ে একটু আধটু ছোঁক ছোঁকানি , কি কিনি কি কিনি এই ভাব নিয়ে । ডাললেকের ধারে একটা ধাবায় রাতের খাওয়া সারা হল রুটি আর মুরগীর রোগানজোশ দিয়ে । বেশ সুস্বাদু রান্না । তেল কম , মশলা বেশি । বেশ অন্যরকম স্বাদ । রাতে হোটেলে ফিরে সুখনিদ্রায় ডুবসাগরে ।
১৮ই মে ২০১২
শ্রীনগরের ডাললেকের ধারে হোটেলের কামরা থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শব্দে ঘুম গেল ভেঙে । মেঘ না মৌসুমী ? কাঁচের জানলায় অন্ধকারের থাবা । ভূস্বর্গ বৃষ্টিস্বর্গে পৌঁছে গেল না কি ! মনখারাপের পার্টির শুরু । জানলার ভারী পর্দা সরিয়ে দেখি কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেছে । প্রথমে টুথব্রাশ তারপর চায়ের কাপ হাতে আমি চোখ রেখেছি পাহাড়ের মাথায় । কখনো মেঘ উড়ে গেলে তুষারশিখর মুখ বেরে করছে আবার মেঘের চাদর তার গায়ে । আমাদের মনের চাপা টেনশনে ঘরের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে ততক্ষণে । রুম হিটার বন্ধ করলাম । হঠাত চানঘর থেকে এসে দেখি রোদ উঠেছে । পাহাড়ের চূড়ো হাসতে শুরু করেছে খিলখিল করে । সবজী পরোটা আর দৈ সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়া হল পহেলগামের উদ্দেশ্যে । হালকা ঠান্ডা তখন চিনার বনের মধ্যে । ঝিলামের ধারে ধারে চিনারের এই অভিভাবকত্ব মুঘল আমল থেকে । চিনারকে কেউ কুড়ুল মারতে পারবেনা । এই ইকোফ্রেন্ডলি চিনারকে নিয়ে কাশ্মীরিদের খুব গর্ব । পাঁচ;'শো বছরের পুরোণো চিনারের গাম্ভীর্যে কাশ্মীরের রাস্তাগুলো যেন আরো সুন্দর হয়ে উঠেছে সবুজে সবুজে । চিনার পাতা সর্বস্ব বৃক্ষ । পরিবেশ দূষণ রুখতে এর জুড়ি নেই । আর আছে এর ভেষজ গুণ ।চিনারের ছায়ায় টিবি রোগ সারে । প্রচুর পাতা থাকায় অক্সিজেন সাপ্লাই করে পরিবেশ দূষণ রুখতে এর জুড়ি মেলা ভার । স্থানীয় মানুষেরা পারলে চিনারকে পুজো করে । চলেছি চিনার বনের মধ্যে দিয়ে কেশর ক্ষেতে । জাফরাণী মাদকতা নিয়ে । দুষ্প্রাপ্য এই কেশরকে খুব যত্নে চাষ করা হয় । বছরের অল্প সময়ে অস্তিত্ত্ব । তার মধ্যেই ফুল ফুটিয়ে ফুল শুকিয়ে বাক্সবন্দী হয় এই সুগন্ধী ।
পথে পড়ল পান্থচক । পাথরের সব কারখানা । কারিগরেরা সেখানে খুদে খুদে বানাচ্ছে শিল নোড়া, খলনুড়ি, হামান দিস্তা । কিনে ফেললাম একটা খলনুড়ি । বেশ অন্যরকম দেখতে । এটাই কাশ্মীরের ট্র্যাডিশানাল মশলা পেষার কল ।
 এবার আখরোট গাছ । ড্রাইভারের প্রশ্রয়ে এক শুকনোফলের দোকানে থামলাম । জাফরাণী পাঁচন কাওয়া দিয়ে ওয়েলকাম পর্ব । পাঁচন যে এত সুখকর পানীয় হতে পারে তা প্রমাণ করল অনবদ্য এই কাওয়া ড্রিংক । পেস্তা, আমন্ড কুচি দিয়ে গার্ণিশ করা কেশর-এলাচের গন্ধে ম ম করছে আশপাশ । ওয়েলকাম  পর্ব সেরে শুভেচ্ছা বিনিময় তারপর চোখরাখা হল শুকনো ফলের পসরায় । আখরোট, মনাক্কা, আমন্ড, পেস্তা, কাজু, কিশমিশ , ফিগ ও পোস্ত । আখরোটই একমাত্র স্থানীয় ফল ।  কিছুটা খরিদারি হল । এবার পথচলা ।  
 এবার দেখি উইলোকাঠের সারি । ক্রিকেট ব্যাট তৈরী হয় এই কাঠ দিয়ে । প্রচুর ট্যুরিস্ট গাড়ি থামিয়ে বাক্সবন্দী করছে ক্রিকেট ব্যাট । এবার এল অবন্তীপুরম । কাশ্মীরের রাজা অবন্তী বর্মণের তৈরী ১১০০ বছরের পুরোণো এই মন্দির । দুধর্ষ সুন্দর । ৯০০ শতাব্দীতে নির্মিত । তারপর ৫০০ বছর পর ভূমিকম্পে ওলটপালট মন্দিরের স্থাপত্য  । ঝিলামের স্রোতে ভেসে গেছে খুঁটিনাটি । ঝিলামের ঢেউ আছড়ে পড়েছে  ভাঙা মন্দিরের কালো পাথরের উঠোনে । তলিয়ে গেছে ইতিহাস । সাক্ষী শুধু কাশ্মীরের পথ । চাপা পড়ে যাওয়া সময়ের দলিলে চোখ রাখলাম লোকাল গাইডের সাথে । ভূকম্পনে বিদ্ধস্ত এই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করেছিলেন প্রত্নতত্ত্ববিদ দয়ানন্দ সরস্বতী । ১৯২৩ সালে তখন ব্রিটিশ আমল । মন্দিরের চারপাশে পাথরের চারটি অভিনব সরস্বতী। এছাড়া রয়েছে লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক । মধ্যিখানে উঁচু মঞ্চে রূপোর বিষ্ণু মন্দির ছিল । ব্রিটিশরা সেই রূপোর মূর্তি লন্ডনের মিউজিয়ামে নিয়ে চলে যায় । পাথরের অন্যান্য মূর্তিগুলি শ্রীনগরের মিউজিয়ামে সংরক্ষিত । চিনারের ছায়ায় ঘুরে ঘুরে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে পাথরের খোদাই কর্ম খুঁজে বের করে  দেখালেন গাইড বন্ধু । বিষ্ণুর অনন্ত শয্যা শেষ নাগের ওপর, নবগ্রহের মূর্তি, লক্ষ্মী নারায়ণ   আরো কত কিছু । 
-->

Sunday, March 18, 2012

Chandidas

নানুর চন্ডীদাসের পিতামহের বাস্তুভিটে । অভাবের তাড়নায় কিছুকাল বাঁকুড়া জেলার ছাতনা গ্রামে বাস করেন তিনি । স্ত্রী পদ্মজা তাঁকে ছেড়ে নানুরের অদূরে কীর্ণাহার গ্রামে পিত্রালয়ে চলে যান । চন্ডীদাসও তখন গৃহত্যাগ করে  পদ লিখে কথকতা করে বেড়ান । মাধুকরী হয় তাঁর উপজীবিকা । দিনের শেষে স্বপাকে ফুটিয়ে নেন ভিক্ষার অন্ন । এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে একদিন রাজ দরবারে নিজের ভুর্জ্যপত্রের পুঁথিখানি খুলে বিনা প্রস্তুতিতে ঝুমর গান শুনিয়ে রাজাকে তৃপ্ত করেন । আর তখনি রাজা নানুরের বাসলী দেবীর মন্দিরে পৌরোহিত্য করার ভার দেন তাঁকে । মন প্রাণ এক করে চন্ডীদাস তখন শ্রীকৃষ্ণকথার পর পর পর্বগুলির পদ আওড়ান  মনেমনে আর সাথে সাথে লিখে ফেলতে থাকেন । আশ্রয় পান মন্দির সংলগ্ন ছোট্ট একটি ঘরে । এ যাবতকাল পদরচনায় যে ভাটা পড়েছিল রাজার অনুগ্রহে আশ্রয় এবং অন্নের চিন্তা করতে না হওয়ার কারণে তাঁর কাব্যচর্চার পরিস্ফূরণ হতে লাগল । একদিন ঘোর অমাবস্যাতিথির করাল অন্ধকারে স্বপ্নাদেশ পেলেন বাসলীদেবীর কাছ থেকে । তারপর তুলে নিলেন বহুদিনের অব্যবহৃত কর্ণিকাখানি । একটুকরো ভুর্জ্যপত্র প্রদীপের আলোয় ধরে পদ লিখতে শুরু করলেন । সেইথেকে আবার শুরু হয়ে যায় কাব্যচর্চা ।এখন বাসলীদেবীর মুখ মনে পড়লেই তাঁর মনে পড়ে যায় সেই রজকিনী রামীর মুখ । যেন অবিকল এক মুখশ্রী! রজকিনী রামী বাশলী মন্দিরের দেবদাসী । অপূর্ব মুখাবয়ব, বিদ্যুতলতার মত তনুশ্রী তার ।  কুয়ো থেকে প্রতিদিন সকালে জল তুলে মন্দির ঝাঁট দেয় সে । ঠাকুরের বাসনকোসন ঝকঝকে করে মাজে । মন্দিরের ভোগ নিতে এসেছিল একবেলায় ।  তখন‌ই চন্ডীদাসের সাথে আলাপ হয় তার । নানুরের অদূরে তেহাই গ্রামে সেই রজকতনয়ার বাস । পিতৃমাতৃহীনা এই রামিণির প্রতি সেই থেকেই ভালোলাগা এবং তার পরিণতি সার্থক প্রেমে।    আশ মেটেনা রামীকে দেখে । এত রূপ এত যৌবন তার কিন্তু  করেম কখনো অনীহা নেই । হাসিমুখে কাজ করে মেয়েটা । ভোরের পুবের আলোতে রামীর রূপ একরকম । চাঁদের জ্যোত্স্নায় তাকে দেখলে সর্বাঙ্গ অবশ করা এক অনুভূতি হয় ।  অমাবস্যার অন্ধকারে সেই নারীমূর্তি যেন আচ্ছন্ন করে রাখে চন্ডীদাসকে  । রামিনির যেন কৃষ্ণকলি । কালোমেয়ের এতরূপ! কাজলকালো আঁখি, নিটোল গড়নপেটন । আর চেহারায় যেন কি একটা যাদু আছে ।  চন্ডীদাস দিনে দিনে ক্রমশঃ উপলব্ধি করেন রামিনির এই রূপ রহস্য । এই মেয়েকে দেবীমূর্তির মত মনে হয় তাঁর ।  
কখনো এই নারীমূর্তিকে তাঁর মনে হয়  তাঁর বৈষ্ণব কাব্যের শ্রীরাধিকা আবার কখনো তাকে মনে হয় বাঁশুলি দেবীর প্রতিমূর্তি । একদিন রাতে স্বপ্ন দেখেন চন্ডীদাস । তীব্র কামপিপাসা জাগে শরীরে । স্ত্রী পদ্মজাকে কিছুই দিতে পারেননি তিনি । মনের দুঃখে চলে গেছে সে । বহুদিন নারীসঙ্গ বিবর্জিত একঘেয়ে জীবন তাঁর । অথচ পূর্ণ যৌবন তাকে এখনো ছেড়ে যায়নি । পদ্মজা রূপবতীও ছিলনা । তবুও তো সতীলক্ষ্মী ছিল । কিন্তু আজ তাঁর স্বপ্নে একবার আসেন রামী একবার অসেন দেবী বাঁশুলির মুখাবয়ব । কেন এমন হয়? হৃদয়ের একুল ওকুল সব উথালপাথাল । ভোর হতেই ঝাঁটা হাতে রামিণীকে দেখেই বোবার মত হতভম্ভ হয়ে যান কবি । রজকিনিকে বলেন কাছে আসতে । যেন রামির রাই-অঙ্গের ছটা লেগে শ্যাম আজ পুলকিত, বিস্মিত, শিহরিত !  দুহাত বাড়িয়ে রামীর আলগা বাহুকে ছুঁয়ে আলিঙ্গন করতে গেলেন । রজকিনী বলে উঠলেন " ও মা, ছি ছি, এ কি গোঁসাই?  একি করছেন আপনি? আজ থেকে এই মন্দিরের সব অধিকার তোমায় দিলাম ।  তুমি বাসলীদেবীর বেদীস্পর্শের, দেবীবিগ্রহকে ছোঁবার,  ভোগ নিবেদন করার সব অধিকার তোমার ।    কুন্ঠিত, লজ্জিত রামিণি মনে মনে ভাবলেন নীচুজাতের মেয়ে হয়ে আমার এ কি সৌভাগ্য হল ঠাকুর ? পাড়ার লোকে যদি একঘরে করে দেয় তার গোঁসাইকে ।  সে  পড়ল  দোটানায় । পুরুষের চোখে  যে কামের আগুন জ্বলতে দেখেছে  সে তাকে প্রকৃত ভালোবাসবে তো ? না কি কেবল তাঁর শরীরের আকর্ষণেই বারবার তার কাছে আসছে, প্রেমনিবেদন করতে ।
এই দোলাচলে সে বলেই ফেলল " না সে হয়না গোঁসাই । লোকলজ্জাকে আমি ভয় পাই । যেদিন তুমি আমাকে সত্যি সত্যি নিজের করে ভালোবাসবে সেই দিন এই শরীর আমি তোমায় দেব । আরো লেখ তুমি কবি । মনসংযোগ করো লেখায় । বয়স চলে গেলে এত সুন্দর পদ রচনায় ভাটা পড়বে । কাব্যের স্বতস্ফূরণ আর তখন হয়ত ঘটবেনা ।
 চন্ডীদাস মনে মনে বুঝলেন "এ বাসলীদেবীরই ছলাকলা ।  আরো ডাকতে হবে তাকে । আরো রচনা করতে হবে পদ । তবেই দেবী তার একান্ত আপনার হবে"  
এদিকে মনের সুখে চন্ডীদাস পদরচনা করে চলেছেন । অবসরে রামীর সাথে দুষ্টুমিষ্টি খুনসুটি, ভালোবাসার দীপাবলি জ্বলছে তখন রামীর মনে । চন্ডীদাসের কুঁড়ে সেই আলোয় সেজে উঠেছে ।  পুরুষপ্রকৃতি একজোটে সৃষ্টিসুখে রাধাকৃষ্ণ পদলীলায় মেতে উঠেছে ।
 এদিকে কাব্যের পান্ডুলিপি জমা পড়ে গেছে অনেকদিন ছাতনার রাজা হামিরের কাছে । কিন্তু রাজার তরফ থেকে কোনো উচ্চবাচ্য নেই । আর চন্ডীদাসের কাছে না আছে সেই পান্ডুলিপির প্রতিলিপি না আছে কোনো যোগাযোগের মাধ্যম । স্বয়ং রাজদরবারে উপস্থিত হয়ে রাজার কাছ থেকে জেনে আসতে মানে লাগে তাঁর । অথচ রাজা ফেরত পাঠিয়েও দেননি সেই কাব্য সম্ভার । অতঃপর নিজেই গেলেন লাজলজ্জা সম্বরণ করে । রাজা জানালেন কাব্যের বিনিময়ে তো বহুদিন পূর্বেই  তাঁকে ভূমি, জীবিকা এবং নানাবিধ উপহারে ভূষিত করেইছেন তিনি । কিন্তু চন্ডীদাস বললেন কিন্তু আমার পুঁথিটির কি হবে? তার স্বত্ত্ব কার থাকবে ? আর কেই বা সে পুঁথির প্রচার করবে ? মানুষ জানবেনা সেই অমূল্য পদ রচনার সুললিত কাব্যমালা ? রাজা বললেন   "আপনার কাব্য সত্যি খুব সুন্দর, মন আর প্রাণ এককরে রচিত। অপূর্ব ছন্দমাধুরী পদের । কিন্তু কৃষ্ণ যে আপনার হাতে কলঙ্কিত, লম্পট  এক ব্যক্তিত্ত্ব । মূল ইতিহাসকে যা বিকৃত করে, ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানে ।  চন্ডীদাস আহত হয়ে বললেন তাঁর পদসম্ভার ফিরিয়ে দিতে । রাজা বললেন " এত বড় আস্পর্ধা? ঐ পুঁথির কথা ভুলে গিয়ে নতুন পদ রচনা করুন।  অসহায় চন্ডীদাস ফিরে এলেন রিক্ত হাতে ।

স্থানঃ নানুর, বীরভূম  
কালঃ বসন্ত
সময় কালঃ বর্তমান  
চন্ডীদাস ডাক দিলেন  "রামীণী,  এই অবেলায়, হাওয়াবদলের সময় নদীর ঘাটে বসে কাপড় কাচলে যে ঠান্ডা লেগে যাবে তোমার ।  দিনের আলো নিবে এল যে....
" চলো প্রিয়তমা রামীণী, আর যে সয়না বিরহ আমার, মধুর হোক আজ যামিনী ।   
সুন্দরী রামীণি  আলুলায়িত চুলের লক্‌স ভিজে হাতে পুঁছে বললে,
যাই গো যাই !  কাপড় কেচে যেটুকুনি পাই, কোনোরকমে পেট চলে, তা কি তোমার জানা নাই ?
চন্ডীদাস বললেন, সে তো ভালো করেই জানি....
আমার মত অধম স্বামী, একটিও কাব্যমালা বেচতে পারিনা আমি ।  
রামীণির ভিজে আঁচল । কাপড় কেচে কেচে পায়ে হাজা । কাপড়কাচার পাটার ওপর থেকে উজালার কৌটো, কাপড়কাচার ব্রাশ আর ডাঁইকরা সদ্য কাচা ভিজে কাপড় দেখিয়ে চন্ডীদাসকে বললে, একটু নিঙড়ে দাও বাপু, হাতের কবজিতে আর জোর পাইনে।  চলো গিয়ে মেলে দি, ঐ জামাকাপড়,  ধোবিঘাটের ঐ লাইনে । 
চন্ডীদাস আড়চোখে দ্যাখেন রামীর ঢলঢল কাঁচা যৌবন । নিজেকে মনে হয় বড় পুণ্যবাণ ।  আগের বৌ ত্যাগ দিয়েছে অভাবের জ্বালায় । বাশুলীদেবীর থানে রামীকে নিজের পত্নী বলে মেনেছেন ।   এখন রামী তাঁর ধ্যান, রামী তাঁর বাগদেবী । প্রতিটি রাতের  অপেক্ষা । নতুন নতুন কামকলা।   আর রামীর অণুপ্রেরণায় চন্ডীদাসের রোজ নতুন নতুন পদ লেখা ।