Monday, February 11, 2013

সৌন্দর্য্য আর ভালোবাসার মান্ডু

প্রতিধ্বনি শুনি আমি......

 

বিন্ধ্যাচলে ২০০০ ফুট উচ্চতায়, মালওয়া প্লেটোর, ধর জেলায় অবস্থিত মান্ডু । পাথরের স্থাপত্যের অভাবনীয় উত্কর্ষের চরম উদাহরণ মান্ডু। যার মধ্যে মিশে আছে জীবন, সম্ভোগ, আনন্দ, যৌবন এবং ভালোবাসার কাহিনী । পাথরের নিপুণ শৈলী দেখলে মনে হয় মানুষ কি না পারে ! মান্ডুর রাজপ্রাসাদ এবং প্রতিটি মহল দেখলে বোঝা যায় তার বিশালতা এবং রাজকীয়তা । এখনো মধ্যপ্রদেশের মালওয়ার চারণকবিরা গেয়ে থাকেন কবি এবং রাজপুত্র বাজ বাহাদুর আর তার হিন্দুরাণী রূপমতীর প্রণয় গাথা । আফগান স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন এই মান্ডু । মুঘল সম্রাটদের আরামের শৈলশহর ছিল পাহাড়ের অলঙ্কার এই মান্ডু । সমতল থেকে উঁচুতে, মালভূমির শীর্ষদেশ জুড়ে লেক, রাজপ্রাসাদ, উন্মুক্ত সবুজ প্রান্তর সব মিলিয়ে মান্ডুদুর্গ এক অনন্য ট্যুরিষ্ট ঠিকানার জায়গা করে নিয়েছে । আজো সেই রাজমহলগুলির ভেতরে প্রবেশ করলে হয়ত শুনতে পাওয়া যাবে রাজকীয় সেই সোনাটা । ভুলভুলাইয়ার মত প্রাসাদে হারিয়ে গেলে অন্ধকারে শোনা যেতে পারে উতসবের রাতে কোনো রাজনর্তকীর বিছুয়ার অণুরণন । আর পাথরের দেওয়ালে কান পাতলে হয়ত বা পাথর শোনাতে পারে রূপমতী আর বাজ বাহাদুরের রোম্যান্সের টুকরো গসিপ । মালওয়ার পারমার শাসকদের আদি রাজধানী ছিল মান্ডবগড় বা মান্ডু । ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষে খিলজিদের আক্রমণে মান্ডু তাদের দখলে চলে যায় ; আফগান গভর্নর দিলাওয়ার খান গৌরী মান্ডুতে তার রাজধানী স্থাপন করেন । তারা প্রথমেই মান্ডুর নামকরণ করেন "শাদিয়াবাদ" বা "সিটি অফ জয়"
আমরা ভোপাল থেকে ইন্দোর গিয়েছিলাম । সকাল সকাল ইন্দোর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম মান্ডুর পথে । ইন্দোর থেকে মান্ডুর দূরত্ব ৯৮ কিমি । পুরো মান্ডু ভালো করে দেখতে সারাদিন সময় লেগে যাবে ।
মান্ডুর কাছাকাছি পৌঁছতেই চোখে পড়তে লাগল দূরে পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে পুরোণো ছোট বড় প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। বুঝলাম মান্ডু এসে গেছে । পেরোতে লাগলাম বিখ্যাত বারটি প্রবেশদ্বার গুলি । যার মধ্যে নাম করতে হয় আলমগীর এবং ভাঙ্গি দরোয়াজার । এছাড়াও রয়েছে রামপল দরোয়াজা, জাহাঙ্গীর গেট এবং তারাপুর গেট । গাড়ী করে চলতে লাগলাম দিল্লি দরোয়াজার মধ্য দিয়ে। কি প্রকান্ড গেট ! সুদূর অতীতে পাহাড়ের মাথা বেয়ে যে বিরাট প্রাচীর ছিল সেই প্রাচীরকে লঙ্ঘন করার জন্যই এই বিরাট বিরাট দরোয়াজা । প্রবেশ করলাম ১২০ মিটার লম্বা জাহাজ মহলে। এর মধ্যে দুটি কৃত্রিম জলাশয় রয়েছে যাদের নাম "মুঞ্জ তালাও" "কাপুর তালাও" । সুলতান গিয়াসুদ্দিন খিলজীর হারেম ছিল এই জাহাজ মহল । এই জাহাজ মহলের টেরেস থেকে পূর্ণিমার মোম জোছনায় চোখ ভিজিয়ে দেখলে পুরো মান্ডু রাজপ্রাসাদের ফোর্ট, সমাধি, প্রাসাদ এইসবকিছুর রেখাচিত্র নিয়ে এক অদ্ভূত অনুভূতি হতে পারে । এই দ্বিতল বিশাল প্রাসাদের টেরেসে দাঁড়িয়ে দুপাশে দুটি লেকের জলে তাকালে মনে হবে একটি জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে রয়েছি । এই দুই লেকের জলে নোঙর করা জাহাজমহল থেকে নেমে ঘুরে দেখা হল মান্ডুর মিউজিয়াম যেখানে দেখতে পেলাম রাজপ্রাসাদের অনেক ধ্বংসাবশেষ, মাটি থেকে পাওয়া প্রত্নতাত্বিক অবশেষ, দেবদেবীর মূর্তি এবং চীনামাটির বাসন কোসনের টুকরো ।
এবার যাওয়া হল হিন্দোলা মহল দেখতে । এটি একটি অডিয়েন্স হল বা দেওয়ানি দরবার সমতুল্য । স্লোপিং দেওয়াল এবং পিলারের কারসাজি দেখে বিভ্রান্ত হতে হয় । দেখে মনে হয় দোদুল্যমান এই মহলটি । তাই বুঝি এমন নাম । স্যান্ড স্টোনের কি অপূর্ব কাজ !
জাহাজমহল ও হিন্দোলামহল ঘুরে এবার যাওয়া হল হোসং শাহের সমাধিক্ষেত্র দেখতে । মার্বেলের তৈরী সূক্ষ আফগান স্থাপত্য । সেখান থেকে যাওয়া হল জামি মসজিদ যেটি কিনা দামাস্কাসের বিখ্যাত মসজিদের অণুকরণে বানানো । দেখা হল রেওয়া কুন্ড । যেটি একটি জলাধার বাজ বাহাদুর বানিয়েছিলেন তাঁর প্রিয়তমা পত্নী রূপমতীর জন্য । এবার আমাদের গন্তব্য বাজবাহাদুরের প্রাসাদ এবং রূপমতী প্যাভিলিয়ন ।
হোসং শাহের আমলে মান্ডু তার অর্থ, প্রতিপত্তি এবং ঐশ্বর্যে খ্যাতি লাভ করে । অনেক হাত বদলের পর ১৫৫৪ সালে বাজ বাহাদুর ক্ষমতায় আসেন । বাজ বাহাদুর ছিলেন মান্ডুর শেষ স্বাধীন সুলতান । সঙ্গীতের প্রতি তার ছিল অকুন্ঠ ভালবাসা । কুমারী রূপমতী ছিল এক অতি সাধারণ হিন্দু রাজপুত ঘরের অসাধারণ রূপসী তনয়া । তার গলার স্বরে ছিল এক অনবদ্য মিষ্টতা যা আকৃষ্ট করেছিল বাজ বাহাদুরকে । একদিন শিকারে বেরিয়েছিলেন বাজবাহাদুর । বাগাল, রাখাল বন্ধুদের সাথে রূপমতী গান গেয়ে খেলে বেড়াচ্ছিলেন সেই বনে । সুলতান তাকে দেখে তার সাথে রাজপুরীতে যেতে বললেন এবং তাকে বিয়ে করবেন জানালেন । রূপমতী একটি ছোট্ট শর্তে সুলতানের রাজধানী মান্ডু যেতে রাজী হলেন । রূপমতী রাজার প্রাসাদ থেকে কেবলমাত্র নর্মদা নদীকে দর্শন জানাবার বাসনা জানালেন । বাজ বাহাদুর সম্মত হলেন । সুলতান তার হবু বেগম রূপমতীর জন্য পাহাড়ের ওপরে বানালেন এক ঐশ্বরীয় রাজপ্রাসাদ যার নাম রূপমতী প্যাভিলিয়ন এবং যার ওপর থেকে রূপোলী সূতোর এক চিলতে নর্মদাকে রোজ দর্শন করে রাণী তবে জলস্পর্শ করতেন । নর্মদা ঐ পথে এঁকে বেঁকে পশ্চিম অভিমুখে আরবসাগরে গিয়ে পড়েছে । রাণীর জন্য তৈরী হল পুণ্যতোয়া নর্মদার জলে রেওয়া কুন্ড । হিন্দু এবং মুসলিম উভয় রীতি মেনে বিবাহ সম্পন্ন হল তাদের কিন্তু পরিণতি সুখকর হলনা । মোঘল সম্রাট আকবর দিল্লী থেকে অধম খানকে মান্ডুতে পাঠালেন শুধুমাত্র মান্ডু দখল করতেই নয় রূপমতীকে ছিনিয়ে আনতে । বাজ বাহাদুরের ছোট্ট সেনাবাহিনী পারবে কেন সম্রাট আকবরের সেনাদের সাথে ? বাজ বাহাদুর ভয়ে চিতোরগড়ে পালিয়ে গেলেন রাণীকে একা ফেলে রেখে । রূপমতী সেই খবর পেয়ে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন । সুলতান লিখতেন কবিতা । রাণী গাইতেন গান । কবিতা আর গানের মধ্যে দিয়ে ভালোবাসার এক রূপকথার ভয়ানক পরিসমাপ্তি ঘটল । এখনো রূপমতী প্যাভিলিয়নে হয়ত বা ঘুরে বেড়ায় রূপমতীর অতৃপ্ত আত্মা । চুপকথার চিলেকোঠায় চামচিকেরা আজো শুনতে পায় তার পায়ের নূপুরের শব্দ । দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয় একটাই শব্দ যার নাম মেহবুবা । এখনো রাজপ্রাসাদের মধ্যে সেই ক্যানাল দিয়ে কলকল করে জল বয়ে চলেছে অবিরত । নর্মদাও রয়ে গেছে আগের মত শুধু রূপমতীই পারলেন না এই মহল ভোগ করতে ।
এবার গেলাম বাজ বাহাদুরের প্রাসাদ দেখতে । পাহাড়ের স্লোপে এক সুন্দর নৈসর্গিক পটভূমিতে দন্ডায়মান এই প্যালেস । পাঠান বা আফগান প্রাসাদের মতসুন্দর বাগান, লন সবকিছুর মধ্যে রাজপ্রাসাদ । অভিনব তার স্থাপত্য । দুটি দরবার রয়েছে ভেতরে । সম্ভবত দেওয়ানি আম এবং দেওয়ানি খাসের আদলে । বাইরে দুটি অভূতপূর্ব বারান্দা রয়েছে যেখান থেকে পুরো মান্ডুর সৌন্দর্যের আস্বাদ বুঝি গ্রহণ করতেন সুলতান । প্রধান প্রবেশ দ্বারে খোদিত পার্সি লিপি বহন করছে সেই সময়ের দলিল অর্থাত । এবার ফেরার পালা । সূয্যি তখন আকাশের গায়ে মুখ লুকোতে যাবে । তাড়াতাড়ি আমরা পৌঁছলাম নীলকন্ঠ মন্দিরে যা আগে ছিল নীলকন্ঠ প্রাসাদ । নাম শুনেই বোঝা গেল শিব মন্দির । আশ্চর্য হলাম মুসলিম রাজত্বে শিবমন্দিরের অক্ষয়, অব্যয় চেহারা দেখে । গাইডকে জিগেস করতে তিনি দেখালেন মন্দিরের গায়ে খোদাই করা অক্ষত একরাশ পার্সি লিপি । জানলাম সম্রাট আকবরের গভর্ণর নাকি স্থাপন করেছিলেন এই মন্দির । শিবমন্দিরে শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢেলে । নর্মদা থেকে জল এসে পড়েছে ঐ লিঙ্গের ওপরে । এমনভাবেই তৈরী ঐটি । পাহাড় থেকে নীচে সিঁড়ি দিয়ে অনেকটা নেমে যেতে হয় । বাঁদরের বড় উত্পাত ভেতরে । আর দেখলাম মন্দির থেকে জল শোধনের আশ্চর্য্য ব্যবস্থা । পাথরের আঁকিবুঁকির এক প্রণালীর মধ্য দিয়ে ব‌ইতে ব‌ইতে প্রবাহিত জল ধূলিকণা মুক্ত হয়ে সবশেষে বিশুদ্ধ হচ্ছে অবিরত ।
মান্ডু দেখা শেষ হল কিন্তু গাইডের বলা রূপমতী আর বাজ বাহাদুরের প্রেমের গল্প লেগে রয়ে গেল কানে । কিছুটা প্রতিধ্বনি, কিছুটা উদ্বায়ী আবেগ, কিছুটা এলোমেলো চিন্তার জটে সেই কাহিনী হোটেলে ফিরে এসে লিপিবদ্ধ করলাম । 
 

কিভাবে যাবেন : কলকাতা থেকে ইন্দোর গিয়ে গাড়ি নিয়ে মান্ডু যাওয়া যায় । ইন্দোর থেকে মান্ডু যেতে দুঘন্টা সময় লাগে ।
কোথায় থাকবেন : মধ্যপ্রদেশ ট্যুরিজমের রেসর্ট ছাড়াও অনেক হোটেল আছে মান্ডুতে । এছাড়া ইন্দোরে হোটেলে থেকেও মান্ডু ঘুরে ফিরে যাওয়া যায়
কখন যাবেন: গরমে প্রচন্ড গরম এখানে তাই জুলাই থেকে মার্চ হল আদর্শ সময় 

সানন্দা ম্যাগাজিন, ৩০শে ডিসেম্বর ২০১২  

নববর্ষের চার কল্পতরু

পশ্চিম  মেদিনীপুরের এক গ্রামের মধ্যে দিয়ে বছর শুরুর দিনে যেতে যেতে  বর্ষবরণ দেখে এলাম । খড়গপুর থেকে হিজলী ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে সালুয়া পেরিয়ে নাক বরাবর কেশিয়াড়ির পথে । সোজা গেলে সুবর্ণরেখা নদীর তীরে ভসরাঘাট না গিয়ে তার আগেই ডান দিকে মোরামের পথ, মাটীর পথ ধরে বহু পুরোণো দুর্গা মন্দির । সর্বমঙ্গলা মন্দির আর কাশীশ্বর জিউ ।
বেলা গড়িয়ে, দুপুর পেরিয়ে, বিকেলের সময় চলেছিলাম পয়লা জানুয়ারির দিন ।
শহরে তখন কত হিড়িক ধুম করে নিউইয়ার পার্টির । কত তোড়জোড় রেস্তোরাঁয়া, ক্লাবে, মাঠে ময়দানে। সার্কাসের তাঁবুতে, চিড়িয়াখানায়, শীতের মেলাপ্রাঙ্গনে তখন মানুষে মানুষে ছয়লাপ । গ্রামের মানুষের মনে সেই নিয়ে কোনো হেলদোল নেই । 
নতুন বছরের প্রথম সূর্যাস্ত তখন রঙ ছড়িয়ে চলেছে আপনমনে । ঠান্ডার দাপটও ছিল বেশ । আর রাস্তায় যেতে যেতে চড়ুইভাতির গন্ধ । তখন বনভোজনের রসুইখানার ঝাঁপ ফেলা হচ্ছে । তারই মধ্যে জোরে মাইকে বেজে চলছে" পরাণ যায় জ্বলিয়ারে "... বড়রাস্তার একপাশে সেন্ট পলস গীর্জায় বর্ষবরণের পার্টির শেষ ঝলক । মাদল বাজছে আর সাথে ট্রাইবাল ডান্স । বিলিভার্স চার্চে নিউইয়ারের ফেস্টুন ।  


সর্বমঙ্গলা মন্দির

খড়গপুর আইআইটি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে উত্তর দিকে ৫ কিলোমিটার গেলে পড়বে ইন্দা বাজারের মোড় । সেখান থেকে পূবদিকে আরো খানিকটা গেলে পড়বে ইন্দা দুর্গা মন্দির আর তারপরই বাঁদিকে খড়গেশ্বরের শিব মন্দির । এই মন্দিরের নামেই এই জায়গার নাম খড়্গপুর । কারো মতে,   রাজা খড়্গসিংহ তৈরী করেছিলেন এই মন্দির । আবার কারো মতে বিষ্ণুপুরের রাজা খড়্গমল্ল ২০০ বছর আগে এই মন্দির তৈরী করেছিলেন ।মন্দিরের অভ্যন্তরে  গর্ভগৃহে প্রোথিত  খড়্গেশ্বর শিবলিঙ্গ  । শিবরাত্রি, আর গাজনের সময উতসব হয় এখানে ।


মন্দির চত্বরে বহু প্রাচীন একটি অশ্বত্থ গাছের বেদীমূলে রয়েছে আদিবাসীদের আরাধ্যা কোনো দেবতার প্রস্তর মূর্ত্তি । দক্ষিণবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার এই অঞ্চলগুলি প্রধানত:আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা ছিল । তবে  এখন সূর্য দেব রূপে ইনি পূজিত হন ।



মন্দিরের নাট মন্দিরে এখন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় হয়েছে । স্থানীয় মানুষ জন আর মন্দিরের পুরোহিত বিদ্যালয়টি চালনা করেন । মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণও তাঁরাই করেন আর মন্দিরের মধ্যে অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে এই স্কুলটি করেছেন তাঁরা ।জটাজুটো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই বহু পুরোণো অশ্বত্থ বৃক্ষ আর বহন করছে সময়ের সাক্ষ্য ।পুরো মন্দিরটী তৈরী পাথর দিয়ে । কোনো ইঁট নেই এর গায়ে । এখন সাদা রঙ করা হয়েছে ।


খড়গেশ্বর মন্দির

খড়্গেশ্বরের মন্দির  থেকে আরো কিছুদূর গ্রামের পথ ধরে স্থানীয় মানুষদের জিগেস করতে করতে পৌঁছনো যায় হিড়িম্বেশ্বরী মন্দিরে  ।


 বড় বড় দীঘি পরিবেষ্টিত  ইন্দার এই  গ্রামটির নাম বামুনপাড়া । কথিত আছে মহাভারতে পঞ্চপান্ডবের অজ্ঞাতবাসের সময় ভীম ঘুরতে ঘুরতে  এসে স্থানীয় এক অনার্য নারী হিড়িম্বাকে বিবাহ করেন  ;এই আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলটির নাম ছিল " হিড়িম্বা ডাঙা "    এই অঞ্চলে হিড়িম্বার আরাধ্যা একটি অত্যন্ত জাগ্রত কালীমূর্ত্তি ছিল যা কালাপাহাড়ের অত্যাচারে,   কালের স্রোতে ভেসে যাওয়া এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল ।এখনো গাছের নীচে সেই অতি প্রাচীন পাথরের মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায় আর সেইখানেই বাংলার ১৩৭৫ সালে নতুন করে মন্দির স্থাপন করেন বামুনপাড়ার স্থানীয় মানুষ জন । মন্দিরের মধ্যে ধাতব কালীমূর্ত্তির পাশে শীতলারও ধাতব মূর্ত্তি পূজো হয় ।
 হিড়িম্বেশ্বরী মন্দির
এবার গাড়ি নিয়ে খড়গপুর থেকে তমলুক । গুগ্‌ল ম্যাপে মোটামুটি ঠাহর করে নিয়ে বেরিয়ে পড়া আরকি । আর অগতির গতি  স্মার্টফোন বাকী দিশা দেখানোর জন্য তো আছেই ।  তমলুক পূর্ব মেদিনীপুরের ডিস্ট্রিক্ট হেড কোয়ার্টার্স ।  এককালে যার নাম ছিল তাম্রলিপ্ত । পূর্বে রূপনারায়ণ আর পশ্চিমে সুবর্ণরেখা নদীর তীরে এই তাম্রলিপ্ত ছিল বাংলার অন্যতম প্রধান বন্দর । বঙ্গোপসাগর এর খুব কাছে ।  
তমলুক-পাঁশকুড়া বাসষ্ট্যান্ড পৌঁছে হরিরবাজার, জেলখানা মোড়, চক্রেশ্বর  পেরিয়ে বর্গভীমা মন্দির । কাছেই একটি মাঠে গাড়ি রাখা হল । সেখান থেকে পায়ে হেঁটে মায়ের মন্দিরে ।
 বর্গভীমা মন্দির

দেবী বর্গভীমা হলেন তমলুক শহরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী । দেবীকে ঘিরে দুটি কিংবদন্তী আছে । প্রাচীন যুগের কিংবদন্তী অনুযায়ী জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে দেবীর মাহাত্ম্যের উল্লেখ পাওয়া যায় । মহাভারতের যুগে যখন তাম্রলিপ্তে ময়ূরবংশীয় রাজা তাম্রধ্বজের রাজবাড়িতে এক জেলে বৌ নিয়মিত মাছ সরবরাহ করত । একদিন  সে পথে আসার সময় তার ঝুড়ির মাছে, রাস্তার একটি জলভরা গর্ত থেকে জল নিয়ে ছেটানো মাত্রই   মরা মাছগুলি জীবন্ত হয়ে ওঠে । রাজবাড়িতে গিয়ে এই ঘটনা জানানোর পর জেলেবৌ সহ রাজা ঐ স্থানে পৌঁছে জলেভরা গর্তের বদলে সেখানে দেবীমূর্তি আসীন একটি বেদী দেখতে পান সেইখানেই রাজা ঐ দেবীর পূজা শুরু করেন ও সেই দেবীই বর্গভীমা নামে পরিচিত । 
প্রাচীনযুগের আরো একটি কিংবদন্তী অনুযায়ী দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা দেবী বর্গভীমার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন । প্রাচীন যুগের তৃতীয় কিংবদন্তী অনুযায়ী দক্ষযজ্ঞের সময় সতীর বাম গুল্ফ(গোড়ালি)  তমলুকের এই অংশে পতিত হয়েছিল তাই এটি একটি শক্তিপিঠের অন্যতম । 
কিংবদন্তীর কড়চা দূরে সরিয়ে রাখলেও বিশ্বাস করতে হয় যে দেবী বর্গভীমা হলেন দক্ষিণবঙ্গের অগণিত দেবদেবীর অন্যতম স্থানীয় লৌকিক দেবী ।  মূল মন্দিরের গঠনরীতিও চমত্কার এবং এখানে বর্গভীমার সাথে অন্যান্য দেবদেবীর পাথরের মূর্তি আছে । সপ্তরথ রীতিতে নির্মিত এর নাম বড় দেউল । যেখানে দাঁড়িয়ে ভক্তরা দেবীকে দর্শন করেন তার নাম জগমোহন । এছাড়াও রয়েছে যজ্ঞমন্দির এবং নাটমন্দির । উত্তরদিকে মন্দির সংলগ্ন একটি কুন্ড আছে ।

মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে  দেবদেবীর ২৬টি টেরাকোটার নিপুণ চিত্র আছে ।  

ছোটবেলায় নিয়ম করে প্রতিবছর দক্ষিণেশরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কল্পতরু উত্সবে সামিল হতাম । ভীড় ঠেলে দর্শন করাতেও কত তৃপ্তি মানুষের! এখন সেটাও খুব মিস করি । মিস করি গঙ্গার ধার, ঠাকুরের মন্দিরের নিরিবিলি নিস্তব্ধতা আর সেই একরাশ অনাবিল শান্তি নিয়ে কল্পতরুর কাছে প্রার্থনা করা । কি যে চাইতাম জানিনা । কিন্তু যেতাম ও সারাবছরের রেসোলিউশান নিয়ে চোখ বুঁজে অনেক ভাবতাম । "এই বছরে, এটা করবনা, সেটা করতে হবে"...আরো কত কিছু !  
নতুন বছরে সর্বমঙ্গলা, খড়গেশ্বর, হিড়িম্বেশ্বরী আর বর্গভীমাই আমার কল্পতরু উত্সবে সামিল হলেন । 

ছোটদের ই-পত্রিকা ইচ্ছামতী, শীতসংখ্যা ২০১৩  

লাইমস্টোনেরাও কথা বলে.....


                                               অমরকন্টক
মরকন্টক ঘুরে এসে খুব ক্লান্ত ছিলাম । পরদিন ভোরে উঠে এবার আমাদের যাওয়া লাইমস্টোনের দেশে ।  বিখ্যাত জবলপুর মার্বেল রকস্‌  দেখতে । অমরকন্টকের হোটেলে সুস্বাদু নিরামিষ প্রাতঃরাশে আহ্লাদে উদরপূর্তি হল সুজির উপমা, পরোটা-টক দৈ-আচার এবং আলুর টিকিয়া দিয়ে  । সাথে ধূমায়িত চা এবং উত্তুরে হাওয়ার কনকনানি । প্রথমে যে জায়গাটিতে গেলাম তার নাম ভেরাঘাট ।  জবলপুরের ২২ কিমি দূরে নর্মদা নদী একটি গর্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এখানে । দুধসাদা পাথরের ওপর দিয়ে ঝরণার মত আছড়ে পড়ছে নর্মদার হাসি । ৩০ মিটার উঁচু থেকে নাচতে নাচতে পড়ছে তার জল । মাথার ওপর  দুপুর সূর্য্যি নিয়ে তো দেখছি আমরা । কে যানে পূর্ণিমার রাতে এখানকার নিসর্গ কেমন হয় !  
 ধূঁয়াধার ফলস

নর্মদার সৃষ্ট এই গর্জটির দৈর্ঘ্য ৩ কিমি । মধ্যে মধ্যে যেন উঠে এসেছে লাইমস্টোন বা মার্বেলের পাহাড় ।  দুধসাদা  শ্বেতপাথর অত্যন্ত নরম । আর  তাই বুঝি সেই সফট ষ্টোনকে কেটে কুটে  তা দিয়ে নানারকমের জিনিষ বানিয়ে পণ্য সাজিয়েছে আশপাশের স্থানীয় মানুষ ।   যেতে যেতে  প্রচুর পাথরের পসরা দেখতে পেলাম । 
যেতে যেতে পথে পড়ল গৌরনদী । তারপর ছোট হল্ট বার্গী ড্যামে । 

 বার্গী ড্যাম
দিগন্তরেখা জুড়ে বিশাল বিন্ধ্যরেঞ্জ আর তার কোলে নর্মদার কিছু অংশে এই ড্যাম ।  এবার সোজা ভেরাঘাট পৌঁছলাম । কেবলকারের টিকিট কেটে শূন্য থেকে নর্মদার তাথৈ নাচ দেখতে যাওয়া হল । আমরা কেবলকারের মধ্যে কাঁচের জানলা দিয়ে দুচোখ ভরে সেই দৃশ্য দেখছি । নর্মদা আমাদের নীচে আমরা লোহার রজ্জুতে গতিময় । 

এখানে নর্মদার নাম ধূঁয়াধার ফলস । সত্যি সত্যি মনে হচ্ছে পুরো জায়গাটা ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে । সাদা ধুধের ফেনা হয়ে জল পড়ছে গর্জের মধ্যে আর পুরো জায়গাটি ধোঁয়াময় ।একঘন্টায় কেবলকারের রাইডে আসা এবং যাওয়া সম্পূর্ণ হল । এবার নেমে পায়ে হেঁটে নর্মদাকে ছুঁতে যাওয়া । তাকিয়ে দেখি  শ্বেতপাথরের দেওয়ালে অবাককরা রামধনু ! আর আমার গায়ে নর্মদার জলের ছিটে অনবরত ধেয়ে এল ।এবার পঞ্চবটী ঘাটে এসে নর্মদায় নৌকাবিহার ।  মার্বেল রকস দেখতে যাচ্ছি এতক্ষণে । 



 শিবানী নামে একখানা নৌকো পছন্দ করে টিকিট কেটে উঠে পড়া হল । দূরে ১০৮ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় পার্বতী মন্দির । এছাড়াও বিন্ধ্য পাহাড়ের গায়ে শঙ্কর মন্দির, পাঁচপটা মন্দির । নৌকোর মাঝি এমনটি বলল । বেশ মজার মাঝি সে । গানে গানে কবিতায় ছন্দে ভরিয়ে দিল একটা ঘন্টা । স্বরচিত কবিতা  যা কিনা পুরো মার্বেল রকসকে গল্পের মোড়কে হাজির করে চোখের সামনে ।







 সেই নৌকার কান্ডারীর ছন্দময়তায় আমাদের যাত্রাপথের আনন্দ বেড়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেল একনিমেষে । হেলছে তরী, দুলছে তরী  ভেসে চলেছে  নর্মদায় ।ছুঁলাম হাত নীচু করে নর্মদাকে । পরেই দেখি পরের নৌকাটির গায়ে একখানা লম্বা জলঢোঁড়া সাপ জল থেকে ওঠার চেষ্টা করছে প্রাণপণে । মাঝি বললে "কিছুতেই উঠতে পারবেনা সে"; সত্যি সত্যি কিছুপরেই সে আবার জলের মধ্যে লাফিয়ে চলে গেল । লাইমষ্টোন্, মার্বেল, ক্যালসিয়াম-ম্যাগনেসিয়াম কার্বনেটের পাহাড় চলল আমাদের দুপাশে । আমরা যেন ভেসে চলেছি একটা ক্যানালের মধ্যে দিয়ে । আমরা চলেছি বান্দরকুঁদনী ঘাটের দিকে যেখান থেকে লাইমষ্টোনের পাহাড়ের ওপর থেকে লাফে লাফে ঝাঁপ দিচ্ছে বাঁদর আর সেই সাথে রোজগারের আশায় দরিদ্র গ্রামের আদুড় গায়ে গ্রামের ছেলে । কোনো চাহিদা নেই তাদের তুমি যদি বল পয়সা দেবে তবেই সে জোরসে ডাইভ দেবে মাঝ নর্মদায় সেই ওপর থেকে । আর পয়সা হাতে নেয় না সে ছেলে মা নর্মদার কোল থেকে তুলে নিয়ে পাহাড়ের গায়ে শুকিয়ে নিচ্ছে নোট । এই তার রুজি । মায়ের জন্য করে খাচ্ছে তাই মা'কে এত ভক্তি ! পুব থেকে পশ্চিমে বহতী নর্মদা । মাথার ওপরে কট কটে দূপুর সূর্য । একবার আকাশী মার্বল তো আবার সাদাকালো । কখনো আবার গোলাপী তো কখনো শ্লেট পাথর । ভুলভুলাইয়ার মত জলে র মধ্যে দিয়ে যেতে লাগলাম আর চারপাশের যে দৃশ্য তা ভাষায় বলতে গেলে বঙ্কিমচন্দ্রে র সাহায্য নিয়ে বলতে হয় " আহা! কি দেখিলাম ! জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না " ! এবার সবচেয়ে গভীর জল, ৩৫০ ফুট গভীরে । ধারে দেখি মার্বেলপাহাড়ের গায়ে জড়াজড়ি করে পড়ে রয়েছে সাত-আটটা সাপ । এবার খানিক সংকীর্ণ জলপথ । কাছ থেকে পাহাড়কে দেখছি ।  পেছনে গভীর জঙ্গল । পাহাড়ের গায়ে কি বিচিত্র চিত্রকল্প। মাঝির কবিতায় তা আরো স্পষ্ট । ছোট ছেলেমেয়ে একজোড়া,গায়ে জামা-প্যান্ট পরা । আবার কোথাও খাজুরাহের পুতুল তো কোথাও কালভৈরবের কালো মূর্তি । কোথাও আবার পাহাড়ের গায়ে মহাদেবের নন্দীর মত একটা বিশাল ষাঁড় । এবার পাহাড়ের মধ্যে গুহা দেখা গেল । একটা আইল্যান্ড এল । ইন্দোরের মহারাণী স্থাপন করেছিলেন শিবলিঙ্গ । এবার আরো গভীর ৪৫০ফুট । গাঁয়ের ছেলে আদুড় গায়ে মাছ ধরতে  ব্যস্ত। অনেক হিন্দী ছায়াছবির শুটিং হয়েছে এখানে । 


রাজকাপুরের আওয়ারা থেকে রেখার খুন ভরি মাং, যিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায় থেকে শাহরুখের অশোকা , রেখা-সুনীল দত্তের প্রাণ যায় পর বচন না যায়  এদের মধ্যে অন্যতম । ভাবছি কোথায়  সেই দ্বীপের ওপর নৃত্যরতা, স্বল্পবসনা রেখাকে কোথা থেকে একটা বিশাল মাছ ঘাই মেরে আমার কল্পনার সূতোগুলো ছিঁড়েখুঁড়ে একাকার করে দিল । এতক্ষণে বুঝলাম জলের আঁশটে গন্ধের রহস্য । নৌকোর মাঝি থামেনা । সে অনবরত ছড়া কেটে চলেছে " চাঁদনী রাত মে, ক্যামেরা হাথ মে, ফ্যামিলি সাথ মে আউর  কেয়া? আপ বলিয়ে জি! সে পরখ করছে আমরা মন দিয়ে তার কবিতা শুনছি কি না । আমার মা জোড় হাতে নর্মদাকে প্রণাম করে বলে উঠলেন
" নর্মদে শর্মদে নিত্যং পাপতাপবিনাশিনী, শংকর স্বেদসম্ভূতে সনাতনী নমোহস্তুতে " 
এবার চেয়ে দেখি কতকত মৌচাক লাইমষ্টোনের ওপরে বাসা বেঁধেছে মনের সুখে ।


এইভাবে নর্মদা বয়ে চলেছে আবহমান কাল ধরে সাতপুরা আর বিন্ধ্যর মাঝখান দিয়ে । দূরে শঙ্করকুন্ড আর বাণকুন্ড যেখানে জল গিয়ে পড়ছে আর অবিরত সৃষ্টি করে চলেছে প্রাকৃতিক উপায়ে শিবলিঙ্গ । নদী যেখানে গভীর সেখানে তার জল তত শান্ত আর গভীরতা কমে যায় আর তার স্রোতস্বিনী নাম সার্থকতা পায় । দূর থেকে মাঝি দেখাল বগলামুখী আর ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির । আমরা কোথা দিয়ে পেরিয়ে গেল কবিতার মাঝদরিয়া । একঘন্টা পেরিয়ে ঘাটে এসে নৌকা খানা ভিড়ল ।  চেয়ে দেখি শ্বেতপাথরের মূর্তি, গয়না আর থালাবাটির পসরা ।


 আনন্দবাজার পত্রিকা, পশ্চিম দিনাজপুর,  রবিবারের ক্রোড়পত্র ৬ই জানুয়ারি ২০১৩  

Monday, February 4, 2013

মা গঙ্গার বডিগার্ড শিব !



তাকিয়ে দেখি ভাগিরথী আমার চোখের সামনে । গঙ্গোত্রীর মন্দিরের বাজারের মধ্যে দিয়ে, মাগঙ্গাকে পুজো দেবার পসরা নিয়ে অলিগলি দিয়ে চলেছি আর ডানদিকে উঁকি মারছে ভাগিরথী । কি তার কলকলানি ! উত্তরকাশী থেকে ভোর ভোর বেরিয়েছিলাম গঙ্গোত্রীর পথে । উত্তরকাশী থেকে ৯৯কিমি দূরে ৩০৪৮ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত গঙ্গোত্রী । ভাগিরথীর উত্সমুখ হল গঙ্গোত্রী গ্লেসিয়ার যার টার্মিনাস হল আরো ১৮কিমি দূরে গোমুখে । স্থান মাহাত্ম্য বলে, পুরাকালে রাজা ভগীরথ শিবের তপস্যা করে গঙ্গাকে শিবের জটা থেকে গঙ্গোত্রীতে নামিয়ে আনেন । এই ভাগিরথী দেবপ্রয়াগে অলকানন্দার সাথে মিলিত হয়ে গঙ্গা হয়েছে । ভাগিরথীর তীর ঘেঁষে চলতে লাগলাম অজস্র মন্দিরময় শহরতলীকে ফেলে । ভাটোয়াড়ি এল, সামনে অগণিত ভেড়ার পাল পাহাড় থেকে নেমে আসছে সমতলে ।

 দীপাবলী অবধি তীর্থযাত্রা তারপরদিনই প্রবল তুষারপাতের জন্য রাস্তা বন্ধ । মেষশাবকরা আপাততঃ মাস ছয়েকের জন্য সমতলে ঘরকন্না করতে আসছে । সেই জ্যামে কিছুক্ষণ । প্রথমে নদীর সমতলে কিছুটা, আবার উঁচুতে উঠতে শুরু করল গাড়ি ।বীভত্স সরু পাহাড়ের চড়াই পথ । উল্টোদিক থেকে একটা বাস বা গাড়ি এলে বিপদে। অতি সন্তর্পণে পিছু হটে সামনের গাড়িকে রাস্তা ছেড়ে দিয়ে আবার চলা । সাথে বুকধড়পড়ানি , এই বুঝি পড়ে যায় গাড়ি ! রাস্তার একপাশে পাথরের দেওয়াল আর অন্যদিকে গভীর খাদ । ততক্ষণে ভাগিরথী এক চিলতে নীল সূতোর মত হয়েছে । আর দুর্গম থেকে দুর্গমতর পাহাড়ী পথ । ১৯৯১ সালে ভূমিকম্পের ফলে উত্তরকাশীর রাস্তাঘাট এখনো ভয়ানক । অজস্র ল্যান্ডস্লাইড । বড় বড় পাথরের চাঙড় এখনো ঝুলে পাহাড়ের গা ঘেঁষে । রাস্তা যেন দাঁত মুখ খিঁচিয়ে রয়েছে ! পরের পিটস্টপ গঙ্গনানী । উত্তরকাশী থেকে গঙ্গনানী ৩৯কিমি দূরে । নীল আকাশের গায়ে বরফের টুপি পরা হিমালয়ের চূড়ো । সামনে ঘন সবুজ পাহাড়, স্তরে স্তরে সাজানো । সম্ভবতঃ ঐ বরফচূড়োই গোমুখ গ্লেসিয়ার । গঙ্গনানীর পথ আরো দুর্গম । ভয়ে রক্ত হিম হয়ে গেল ।
 গঙ্গোত্রী পৌঁছে আবার ফিরতে হবে এই ভয়ঙ্কর পথ দিয়ে ! আরো সরু রাস্তা আর মধ্যে মধ্যে ল্যান্ডস্লাইডের নজির ; ভরাবর্ষায় না জানি কি অবস্থা ছিল এখানকার ! একবার ভাগিরথীকে ওপর থেকে দেখতে পাই তো আবার সে হারিয়ে যায় বহুনীচে । উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে গায়ে গরম জামাকাপড়ের আস্তরণ একেএকে । গঙ্গনানীতে একটি গরমজলের কুন্ড ও পরাশর মুনির মন্দির আছে । পাহাড়ের ধাপে ধাপে ঝর্ণার জল গড়িয়ে পড়ছে অবলীলায় । পাহাড়ী ঝোরায় রাস্তা জলময় । এল লোহারীনাগ জলবিদ্যুত কেন্দ্র । কিছুদূরে পাহাড়ের ওপর শৈল শহর হর্ষিল । এবার আবার দেখা গেল ভাগিরথীকে এক ঝলক । ভাগিরথীর ওপর মানেরী ড্যাম আরো সুন্দর করেছে স্থানটিকে । কিছুটা সমতলের মত আর ধারে ধারে কোনিফেরাস পাইন, ক্যাসুরিনার দল সারে সারে । অনেকটা মনোরম রাস্তা ক্যাসুরিনার ছায়াবীথি ধরে ।

 বেশ উপভোগ্য ড্রাইভ । চওড়া রাস্তা, রোদমাখা আকাশ অথচ আমরা চলেছি ছায়ার হাত ধরে । নীল আকাশ আর সবুজ পাহাড়ে মিলে মিশে একাকার । এল লঙ্কা ভিউ পয়েন্ট । খুব সুন্দর দেখায় এখান থেকে । এবার এক চমত্কার দৃশ্য । দুটি পাহাড়ের মধ্যে তৈরী গর্জ দিয়ে ফেনার মত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে ভাগিরথীর স্রোত । পাহাড়ের সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নামছে অবিরাম । অসাধারণ দৃশ্য! এতক্ষণের পথের দুর্গমতা, ভয় ভুলে ছবি নেওয়া শুরু । এবার এল ভৈরোঘাঁটির প্রাচীন শিবমন্দির সেখানে রয়েছেন আনন্দ ভৈরবনাথ, মাগঙ্গার পাহারায় । লেখা "ওয়েলকাম টু গঙ্গোত্রী" । মহাদেব এখানে মাগঙ্গার সিকিউরিটি গার্ড । ততক্ষণে সেই বরফের চূড়ার বেশ কাছে এসেছি । তাপমাত্রাও কমে গেছে অনেকটা । গঙ্গোত্রীর কাছাকাছি এসে মা গঙ্গাকে দেখবার জন্য আকুলি বিকুলি প্রাণ । সেদিন কালীপুজো আর দীপাবলী । গাড়ি গিয়ে নামিয়ে দিল সমতলে। । যার পাশ দিয়ে উঠে গেছে পাহাড়ের চড়াই পথ গোমুখের দিকে । সুদীর্ঘ ১৮ কিমি ট্রেক করতে হয় । আর নীচে চোখের সামনে তখন গঙ্গোত্রী। ভাগিরথীর হৈ হৈ করে বয়ে চলা । কি প্রচন্ড গর্জন তার । কি অপূর্ব রূপ তার । কত উপন্যাস, মানচিত্র, ভূগোল তখন বর্তমান হয়ে ভাসছে চোখের সামনে । বর্ণণা পড়েছি ভাগিরথীর, ছবি দেখেছি এতদিন অবধি এখন সে আমার সামনে; ভাগিরথীকে রাজা না রাণী কি আখ্যা দেওয়া যায় সে বিচার করার ধৃষ্টতা আমার নেই তবে তার যে রাজকীয়তা আছে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না । সেই মূহুর্তে আমি তাকে রাণী ভেবে নিলাম । স্রোতস্বিনী তখন নীল ঘাগরার কুঁচি দুলিয়ে, সাদা ওড়না উড়িয়ে নেচে চলেছে আপন মনে । 
অবিরত তার কোলের কচিকাঁচা নুড়িপাথরকে চুম্বন করে চলেছে । জল নয়, নদী পান্নার কুচি বয়ে নিয়ে চলেছে । অবিরল কুলকুচি সেই পান্নাপাথরের । তার গর্জন ঢেকে ফেলেছে সবকিছু । তার সামনে রোদ্দুরকে মনে হচ্ছে কম তেজী ! দীপাবলীতেই এবছরের মত তাকে দেখে নিতে হবে । ঐদিন সন্ধ্যা থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে সব মন্দির । সেদিন পাহাড়ের শেষরাত । দীপাবলীর রাত । পরদিন ঘরে ফিরবে সকলে মিলে । কেদারনাথ ফিরে আসবেন উখীমঠে । বদ্রীবিশাল যোশীমঠে । গঙ্গোত্রীর মাগঙ্গার ডুলি-পালকিও পৌঁছে গেল আমাদের সাথে সেই এক‌রাস্তায় । সূর্যের দক্ষিণায়নের সাথে সাথে পাহাড়চূড়োয় বরফ পড়বে। তুষারপাত হবে ওপরে । রাস্তা বন্ধ তাই শীতের ছ'মাস সকলে নীচে এসে ঘর পাতবে । আবার সূর্যের উত্তরায়নের সাথে সাথে এরা ওপরে উঠবে । কালীপুজোর দিন গঙ্গাস্নান । পাথর ভেঙে জলে দাঁড়াতেই মনে হল পা দুটো শিথিল । শূণ্য ডিগ্রীর কম বৈ তো বেশি নয় জলের তাপমাত্রা । কোনোক্রমে তিনডুব দিয়ে সকলে পারমার্থিক আনন্দ লাভ করছে । আবার পাথর নুড়ি, উপল সিঁড়ি ভেঙে জল থেকে উঠে ডাঙায় পা দিয়ে চেঞ্জরুম । তারপর গঙ্গারতি, গঙ্গাপুজো আর পিতৃতর্পণ । দেবী সুরেশ্বরী তখনো নাচের ভঙ্গীমায় । মাথার ওপর দুপুর সূর্য । তার ঝলক ভাগিরথীর বুকে । উত্তরদিকে ঘন সবুজ দুইপাহাড়ের মাঝখানে বরফঢাকা গোমুখ । ভাগিরথীর তরল তরঙ্গ নেমেছে সেখান থেকে । 
 

(কিভাবে যাবেনঃ হাওড়া থেকে হরিদ্বার ও সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে গুপ্তকাশী । পরদিন গুপ্তকাশী থেকে উত্তরকাশী হয়ে গঙ্গোত্রী ।
আনন্দবাজার পত্রিকা ১৭ই ডিসেম্বর ২০১১ ওয়ান স্টপ ট্র্যাভেলগ  

 

Friday, January 18, 2013

সর্বমঙ্গলা মন্দির, কেশিয়াড়ি পশ্চিম মেদিনীপুর

 সর্বমঙ্গলা মন্দির


 শ্চিম  মেদিনীপুরের এক গ্রামের মধ্যে দিয়ে বছর শুরুর দিনে যেতে যেতে  বর্ষবরণ দেখে এলাম । খড়গপুর থেকে হিজলী ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে সালুয়া পেরিয়ে নাক বরাবর কেশিয়াড়ির পথে । সোজা গেলে সুবর্ণরেখা নদীর তীরে ভসরাঘাট না গিয়ে তার আগেই ডান দিকে মোরামের পথ, মাটীর পথ ধরে বহু পুরোণো দুর্গা মন্দির । সর্বমঙ্গলা মন্দির আর কাশীশ্বর জিউ । 
বেলা গড়িয়ে, দুপুর পেরিয়ে, বিকেলের সময় চলেছিলাম পয়লা জানুয়ারির দিন । 
শহরে তখন কত হিড়িক ধুম করে নিউইয়ার পার্টির । কত তোড়জোড় রেস্তোরাঁয়া, ক্লাবে, মাঠে ময়দানে। সার্কাসের তাঁবুতে, চিড়িয়াখানায়, শীতের মেলাপ্রাঙ্গনে তখন মানুষে মানুষে ছয়লাপ । গ্রামের মানুষের মনে সেই নিয়ে কোনো হেলদোল নেই ।  
নতুন বছরের প্রথম সূর্যাস্ত তখন রঙ ছড়িয়ে চলেছে আপনমনে । ঠান্ডার দাপটও ছিল বেশ । আর রাস্তায় যেতে যেতে চড়ুইভাতির গন্ধ । তখন বনভোজনের রসুইখানার ঝাঁপ ফেলা হচ্ছে । তারই মধ্যে জোরে মাইকে বেজে চলছে" পরাণ যায় জ্বলিয়ারে "... বড়রাস্তার একপাশে সেন্ট পলস গীর্জায় বর্ষবরণের পার্টির শেষ ঝলক । মাদল বাজছে আর সাথে ট্রাইবাল ডান্স । বিলিভার্স চার্চে নিউইয়ারের ফেস্টুন ।   
ছোটবেলায় নিয়ম করে প্রতিবছর দক্ষিণেশরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কল্পতরু উত্সবে সামিল হতাম । ভীড় ঠেলে দর্শন করাতেও কত তৃপ্তি মানুষের! এখন সেটাও খুব মিস করি । মিস করি গঙ্গার ধার, ঠাকুরের মন্দিরের নিরিবিলি নিস্তব্ধতা আর সেই একরাশ অনাবিল শান্তি নিয়ে কল্পতরুর কাছে প্রার্থনা করা । কি যে চাইতাম জানিনা । কিন্তু যেতাম ও সারাবছরের রেসোলিউশান নিয়ে চোখ বুঁজে অনেক ভাবতাম । "এই বছরে, এটা করবনা, সেটা করতে হবে"...আরো কত কিছু !   
আজ সর্বমঙ্গলাই আমার কল্পতরু, আমার উদ্যানবাটী আর আমার ভালোলাগার একটুকরো কমলালেবুর শীতের দুপুর । 
 খড়গপুরে আমাদের কোয়ার্টার ( IIT campus, C1-107)

Sunday, December 2, 2012

পটমায়া @ পিঙ্গলা


আজ খড়গপুর থেকে পশ্চিম মেদিনীপুরের পিঙ্গলা গেছিলাম । খুব খারাপ  গ্রামের রাস্তা, যেতে প্রায় ঘন্টাদুয়েক লাগল ।হাতের মুঠোয় স্মার্টফোনে উন্মুক্ত  একভর্তি গুগল ম্যাপ । দিশা দেখাল আমাদের । 
খড়গপুর আইআইটি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে ষ্টেশনের দিকে না গিয়ে ঝপেটাপুর, ছোটা ট্যাংরা দিয়ে কৌশল্যার মোড় পড়ে । সেখান দিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের বারবেটিয়া, ধরে চওড়া পিচের রাস্তা দিয়ে একে একে পেরোতে লাগলাম চাঙ্গুয়াল, দক্ষিণ গেড়িয়া, মাওয়া হাটতলা, দুজিপুর বাজার  । ডাইনে বাঁয়ে ধূ ধূ ধানজমি । অঘ্রাণের শেষের মাঝামাঝি ধান উঠেছে একপ্রস্থ । পিচের রাস্তায় ধান শুখোচ্ছে । আর পথের দুধারে স্তূপিকৃত খড়ের আঁটি । এল জামনা । তারপর আরো গিয়ে পিঙ্গলা । সেখানে নয়া নামে এক ছোট্ট গ্রামে বাংলানাটক-ডটকম আয়োজিত "পট-মায়া" দেখতে যাওয়া । 


পটশিল্পীদের গ্রাম নয়ায় আয়োজিত "পট মায়া" দেখলাম ঘুরে ঘুরে। নীল আকাশের নীচে, শীতের মিঠে রোদ্দুরে পা ছড়িয়ে  গ্রামের ঘরে ঘরে পটুয়া, চিত্রকরেরা মাটীর ঘরের দাওয়ায় মেলে বসেছিল পটশিল্পের পসরা । ঘরের ঝি, বৌ, ছেলে সকলে মিলে এঁকে চলেছে । অবলীলাক্রমে এরা আঁকে । বংশ পরম্পরায় ধরে রাখে বাংলার এই ঐতিহ্যকে ।  প্রাকৃতিক রং দিয়ে আঁকছে তারা । শীলে বেটে নিচ্ছে কাঁচা হলুদ, শিমপাতার সবুজ, অপরাজিতা ফুলের নীল, গাঁদাফুলের পাপড়ি আর জাফরন বলে একটা কাঁটাওলা ফল যার ভেতরের লাল বীজগুলো থেকে লালরং বের করছিল ওরা । রংয়ের সঙ্গে কাঁচা বেলের আঠা মিশিয়ে তুলির টানে ফুটিয়ে তুলছে অভিনব শিল্পকর্ম । আর ছবি তৈরীর পর গান গেয়ে ব্যাখ্যা করছে ছবির বিষয়বস্তু।  পটশিল্পীরা মাটীর পট, ফুলদানী হাতপাখা, টিশার্ট বানিয়ে সাজিয়ে রেখেছে । ঘরে ঘরে সকলের আজ মহামেলা ।  অনেক মানুষ এসেছিলেন কলকতা থেকে । ৩০শে নভেম্বর থেকে ২রা ডিসেম্বর অবধি চলল এই মেলা ।