Tuesday, November 13, 2012

দীপাবলী- ২০১২


কার্তিকের হিমপড়ার শুরু হয়েছে দুর্গাঠাকুর জলে যাবার ঠিক পরে পরেই । বিজয়া দশমী আর কোজাগরী উত্সবের শেষরেশটুকুনি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমাদের দেশের এক প্রাচীন শহর বারাণসীতে ।বারাণসীর পূর্বের নাম ছিল আনন্দবন । তারপর  কাশী ।   বরুণা আর অসি এই দুই নদীর সঙ্গম তীর্থ বারাণসী বা বেনারস । গঙ্গায় এসে পড়েছে এই দুই ছোটনদী ঠিক এইখানে । কত বড় বড় মানুষ ঘাট বাঁধিয়েছেন গঙ্গার ধারে ধারে । তাঁদের নামে ঘাটের অধুনা নামকরণ । সবশুদ্ধ ৩৬৫ টি ঘাট রয়েছে এখানে । নৌকা করে কিম্বা পায়ে হেঁটে হেঁটে বেশ কয়েকটি পরিক্রমা ও করা যায় নদীর ধার দিয়ে । কত কত তীর্থপ্রেমী মানুষের আনাগোনা এই চির প্রাচীন মন্দিরময় শহরে । দেশবিদেশের পর্যটকরা কিসের আকর্ষণে সমবেত হন জানা নেই তবে দেশী তীর্থযাত্রীদের ভীড় ও নেহাত কম নয় এখানে । দশাশ্বমেধ ঘাটের পাশেই রাণী অহল্যাবাঈ হোলকার  প্রতিষ্ঠিত  কাশী বিশ্বনাথ মন্দির আর পাশেই অন্নপূর্ণা মায়ের মন্দির । কথিত আছে বহুযুগের প্রাচীন বিশ্বনাথ মন্দিরটি প্রথমে মহম্মদ ঘোরী, তারপর কুতুবুদ্দিন আইবক, ফিরোজ শাহ তুঘলক ও সবশেষে   মোগল সম্রাট ঔরঙজেবের হুকুমে বিনষ্ট করে একটি মসজিদ তৈরী করা হয়েছিল । প্রাচীন শিবলিঙ্গকে পাশ্বর্বর্তী   জ্ঞান ব্যাপী কুন্ডের মধ্যে পুরোহিতরা লুকিয়ে ফেলেছিলেন কিন্তু সেটিকে আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব যায়নি । মুঘল ও মুসলমান শাসনের অবসানের পর এবং হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবনের স্বরূপ হিসেবে রাণী অহল্যাবাঈ হোলকারের সৌজন্যে নবনির্মিত বিশ্বনাথ মন্দিরে বিশ্বনাথের নতুন শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই শিবলিঙ্গই আজ চুম্বকের মত দেশ ও পৃথিবীর কোণা কোণা থেকে মানুষকে বারাণসীর এই মন্দির তলে টেনে নিয়ে আসে । হাওড়া থেকে অমৃতসর মেলে বারাণসী পৌঁছেই আমরা একটি হোটেলে মালপত্র রেখে অটোরিক্সা নিয়ে চলে যাই কালভৈরব মন্দিরে । এই কালভৈরবকে বলা হয় বারাণসীর কোতোয়াল বা বডিগার্ড যিনি বারাণসীকে বাঁচিয়ে আসছেন যুগ যুগ ধরে বহির্শত্রুর আক্রমণ থেকে । সরু গলি প্রধান এই পুরোণো শহরের পেল্লায় ষাঁড় গুলি রাজকীয় । তারা স্বমহিমায় গলির আনাচেকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দন্ডায়মান । শহরের ভীড়ভাট্টা, অটোরিক্সার হর্ণ, মোটরবাইকের ধাক্কাতেও তাদের কোনো হেলদোল নেই ।  গলি জুড়ে আর রয়েছে দর্শনার্থীদের লাইন । কোনো মতে কালভৈরবের মাথায় ফুল-বেলপাতা চড়িয়ে বেরিয়ে এসে ঘাটের দিকে রওনা দিলাম । কেদারঘাটে এসে নৌকো নিলাম । নৌকো চড়ে ওপারে রামনগর প্যালেস দেখতে যাওয়া ।  প্রায় এক ঘন্টা মোটর বোটে চড়ে ঘাট পেরোতে লাগলাম একে একে । কাশীর রাজা চৈত সিং নির্মিত ঘাট, প্রভুঘাট, নিরঞ্জনী ঘাট , পঞ্চকোট ঘাট, মহানির্বাণ ঘাট, হরিশচন্দ্র ঘাট, শ্রী নিষাদরাজ ঘাট, মীরঘাট ( যেখানে মীরাবাঈ স্বয়ং তপস্যা করেছিলেন ) দিগম্বর জৈন ঘাট, সুপার্শ্বনাথের জন্মভূমি প্রসিদ্ধ ; সুপার্শ্বনাথ ঘাট,  আনন্দময়ী ঘাট,  মাতা ভদারিণি ঘাট  হিন্দী  রামায়ণ রচয়িতা তুলসী দাসের নামে তুলসী ঘাট, রীবা ঘাট  প্রভৃতি কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘাট দেখতে দেখতে মাথায় কার্তিকের সূর্য নিয়ে গঙ্গা পরিক্রমণ করতে করতে অবশেষে পৌঁছলাম রামনগর । কার্তিক পূর্ণিমায় সব ঘাট  গুলির সিঁড়িতে মাটির প্রদীপ জ্বলে একসাথে । তখন না জানি কি সুন্দর হয় ঘাটের শোভা ! গঙ্গা উত্সব পালিত হয় তখন মহাধূম করে । গঙ্গার জলে প্রদীপের আলোর সেই প্রতিফলন কি অপূর্ব আলোর জলছবি সৃষ্টি করে তা কল্পনা করে নিলাম মনে মনে । দীপাবলীর প্রাক্কালে ঘাটের সিঁড়িগুলির মেরামতি চলছিল সেই কারণে ।

রামনগর প্যালেস ও ফোর্ট

কাশীর রাজার রাজবাড়ী এবং স্বাধীন  ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর জন্মস্থান এই রামনগর  । রাজবাড়ি, ফোর্ট এবং মিউজিয়ামটি ঘুরে দেখবার মত । 
অতি উপাদেয় পাওভাজি-চাট এবং লস্যি সহ দুপুরের আহার হল এখানে । লসিতে জল মেশায়না বারাণসীতে । টাটকা টক দৈ ফেটিয়ে তার মধ্যে রাবড়ি দেয় এবং ওপর থেকে খানিকটা ঘন ক্ষীর ছড়িয়ে মাটির ভাঁড়ে সার্ভ করে । 

কাশী-বিশ্বনাথ এবং অন্নপূর্ণা মন্দিরে

সন্ধ্যেবেলায় যাওয়া হল কাশীবিশ্বনাথ এবং অন্নপূর্ণা মন্দিরে পুজো দিতে । ফেরার পথে রাস্তার ধারে  ফুটন্ত গরম  দুধ এবং রাবড়ি খাওয়া হল । তারপর বেনারসী পান ।

সারনাথ

পরদিন সকালে অটো চড়ে সোজা সারনাথ । বুদ্ধ যেখানে প্রথম বাণী প্রচার করেছিলেন । তাই সারা বিশ্বের সকল দেশ যেমন জাপান, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা থেকে বহু মানুষের ভীড় দেখলাম সারনাথে । পরিচ্ছন্ন শহর সারনাথ ।  আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার রক্ষণাবেক্ষণে সারনাথ এবং তার সংলগ্ন মিউজিয়ামটি একটি দ্রষ্টব্য স্থান । 

মণিকর্ণিকা

বেনারসে গঙ্গার তীরে অন্যতম ঘাট হল মণিকর্ণিকা এবং তার সংলগ্ন মহা শ্মশান । এখানে চিতার আগুণ কখনো নেভে না । চব্বিশ ঘন্টা জ্বলতেই থাকে । ঘাটে ঢুকেই লক্ষ্য করলাম বেল, আম প্রভৃতি গাছের শুকনো গুঁড়ি সারেসারে রাখা রয়েছে স্তুপাকারে । আর দূর থেকে ভেসে আসছে সেই শবপোড়া গন্ধ । জ্বলছে লাল চিতা । এখানে মৃত্যু হলে নাকি পরলোকযাত্রা হয় আত্মার । তাই বুঝি পূর্বে কাশীবাসী হতেন অনেকেই বৃদ্ধ বয়সে । মৃত্যু এখানে মঙ্গলময়ের চরণে ঠাঁই দেয় আত্মাকে । তাই মণিকর্ণিকা মহাশ্মশান একটী পুণ্যতীর্থ । এখানে সতীর কুন্ডল এবং মহাদেবের মণি পড়েছিল দক্ষযজ্ঞের সময় । তাই মণিকর্ণিকা একটি একান্ন পিঠের অন্যতম পিঠস্থান ।  সতীর অপূর্ব মন্দিরটি এখন গঙ্গার জলে অনেকটাই নিমজ্জিত । কিন্তু উপরের অংশটী এখনো দৃশ্যমান । মণিকর্ণিকার ঘাট থেকে নৌকো চড়ে দীপবলীর ভূত চতুর্দশীর রাতে মাঝ গঙ্গায় গিয়ে গঙ্গারতি দেখলাম । নৌকোয় ভাসমান হয়ে লাইভ কীর্তন-ভজন কনসার্টের সাথে আরতি দেখিনি কখনো । নৌকো থেকে গঙ্গার জলে পদ্মপাতায় ফুলের ভেলায় দীপ জ্বেলে ফুল-আলোর ছোট্ট নৌকা ভাসিয়ে মা গঙ্গার পুজো দিলাম । সারে সারে অগণিত ভক্তের ভাসানো আলোর ভেলা নিয়ে তির তির করে প্রদীপ জ্বলতে জ্বলতে ধীরে ধীরে এগিয়ে চল
পুণ্যতোয়া গঙ্গার বুকে দক্ষিণ থেকে উত্তরে । 

Tuesday, October 30, 2012

গৃহনৌকা


 
-->
প্রতিবার পাহাড় না সাগর এই বিতর্কে হেরে যাই আমি । গরমের ছুটির ফাঁদে পা দিলেই হিমালয় টেনে নিয়ে যায় তার কাছে । এবারেও তার ব্যতিক্রম হল না । 
 আমরা তিনজনে দিল্লী থেকে আবার শ্রীনগরের উড়ানে ।
প্রিন্সলি স্টেট কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শহর শ্রীনগরে এলাম ঘুরতে ঘুরতে । এসে অবধি জ্যৈষ্ঠ্যের  অপ্রত্যাশিত বৃষ্টি আমাদের পথ ছাড়তে নারাজ । -->
ঝিলাম সেতু পেরিয়ে ডাল ঝিলে এলাম আমরা । একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে হয় কিছুক্ষণ । লেক যে এত বড় হয় আগে কখনো দেখিনি ।শিলং এ বড়াপানি লেক দেখেছিলাম, সুইজারল্যান্ডের লুগানো লেক দেখেছিলাম । কিন্তু তাই বলে এত হৈ হৈ হাউসবোটের পসরা আর কূলে কূলে এত শিকারা
-->
দরদস্তুর করে শিকারার মাঝির আমন্ত্রণে চড়ে বসলাম শিকারায় । এমন কাশ্মীরি নৌকোর ছবি দেখেছি । চড়িনি আগে । পড়ন্ত রোদের আলোয় ডালঝিল রমরম করছে তখন । হাউসবোটের উঠোন ঘেঁষে শিকারা চলেছে মাঝির খেয়ালে । কখনো কাশ্মীরি পশমিনার দোকানের রোয়াকে কখনো আখরোট কাঠের ওয়ার্কশপে কখনো বা মীনাকারির গয়নার শিকারার বারান্দায় । সবাই মিলে বাসছি আমরা ডাললেকের জলে । শিকারার দাঁড় কাঠের পানের গড়নের । মাঝি কি অবলীলায় না সর্বক্ষণ সে দাঁড় বাইছে আপনমনে । আমাদের নৌকার সমান্তরালে এগিয়ে এল উলের পোষাক, পাথরের গয়নার মোবাইল দোকানি । এল শুকনোফল আর কেশর । এগিয়ে এল ফোটোগ্রাফারও রাজারাজড়ার পোশাক-গয়না হাতে । একটু অনুরোধ বৈ আর কিছুই নয় । এইভাবে সেই প্রদোষে ঘন্টা দেড়েক শিকারা ভ্রমণ। মাঝে দু একটা পিটস্টপ । নেহরুগার্ডেনে অবতরণ গোলাপের বাগানে । একটু ছবি তোলা । আবার ভাসমান শিকারায় । আশপাশে ভাসমান সবজী বাগানের মধ্যে দিয়ে লিলিপুলের মধ্যে দিয়ে ।, হাউসবোটের রোয়াক ঘেঁষে । কাশ্মীরি শাল আলোয়ানের দোকানের পাশ দিয়ে একটু আধটু ছোঁক ছোঁকানি , কি কিনি কি কিনি এই ভাব নিয়ে ।
 
  আপাতত  আমরা ত্রয়ী সুবিস্তৃত ডাল-ঝিলের মধ্যে  ভাসমান এক বিলাস বহুল গৃহনৌকার মধ্যে ।  পথে দেখেছি ঝিলামের রূপ । সোনামার্গ যাওয়ার পথে সিন্ধুদর্শনও হয়েছে ।  পহেলগামে লিডার নদীকেও ছুঁয়ে এসেছি । তবে ডাল লেকের বিশালতা দেখে মনে পড়ে গেল ১৯৮৯তে স্যুইটজারল্যান্ডের লুসার্ন আর লুগানো লেকের কথা । সেখানে সুইস আল্পসের কোল জুড়ে লেকগুলি আর ভারতীয় এই ভূস্বর্গে হিমালয়ের কোল আলো করে এই ডাললেক । শিকারায় করে যে হাউসবোটটিতে আমরা বন্দী হলাম দুদিন-দুরাতের জন্য তার নাম ক্যালিফোর্নিয়া । রূপকথার গল্পে পড়া পঙ্খের কাজ করা পিঙ্ক হাউসবোট । পুরো জাহাজ বাড়িটি দেওদার বা সেডার কাঠের তৈরী । জলে ডুবে আছে বছরের পর বছর । পচ ধরেনা এই কাঠে ।যেন ছোট্ট রাজবাড়িতে ঢুকলাম । প্রবেশ দ্বার থেকে কাশ্মিরী কার্পেটে মোড়া  । প্রশস্ত বারান্দায় বসার সোফা পাতা । প্রবেশ পথ পেরিয়ে ড্রয়িংরুম বা টিভি লাউঞ্জ । দেওয়ালে কাঠের কাজ ছাদে কাঠের কারুকার্য আর চারিদিকে আখরোট কাঠের ছড়ানো ছেটানো আসবাব । এমন কি ছাদের মধ্যিখান থেকে ঝুলন্ত ঝাড়লন্ঠন ! জানলা ও দরজায় কাশ্মীরি কাজের পর্দা । এবার ডাইনিং রুম । কাঁচের বাসন সম্বলিত আলমারী, বিশাল ডাইনিং টেবিল ও চেয়ার্, ডিনার ওয়াগান । ঠিক জাহাজ বা ট্রেনের মত লবি পেরিয়ে বেডরুমে এসে বিছিয়ে দিলাম নিজেকে । আবার সেই আখরোট কাঠের পালঙ্ক, চেষ্ট অফ ড্রয়ারস্, টেবিল... ড্রেসিং রুম, ওয়াড্রোব আর সংলগ্ন বাথরুম ।    কোনো অনুষ্ঠানের ত্রুটি নেই । দেওয়ালে কাশ্মিরী কাজের ওয়াল হ্যাংগিং থেকে কাঠের সূক্ষ কাজের পেলমেট ও বাহারী ল্যাম্পশেড ।
রাতের আহার সেরে হাউসবোটের ডেকে এসে ঘুমন্ত ডালঝিলকে একঝলক দেখে ঝিম ধরে গেল মাথায় । নেশাগ্রস্তের মত একদৃষ্টে চেয়ে র‌ইলাম তার দিকে । ফুটফুটে লাল নীল সবুজ আলো জ্বলছে আশপাশের হাউসবোট থেকে আর তাদের প্রতিবিম্ব ডালঝিলের জলে দুলে বেড়াচ্ছে জলপরীদের মত, রাতপরীদের মত ।  
ঘুমিয়ে পড়লাম দেবী চৌধুরাণির বজরায় । স্বপ্নে মনে পড়ে গেল চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙার কথা । এমনটিই ছিল হয়ত সে সময় ।  মাঝরাতে বৃষ্টি ঝরল হাউসবোটের ছাদে । কাঠের ছাদে  টুপটাপ বৃষ্টিকণার শব্দ কানে লেগে র‌ইল । 
এবার পহেলগামে দুদিন । অবন্তীপুরম, কেশর ক্ষেত,  উইলো কাঠের ব্যাট,  শুকনো ফলের পসরা ফেলে এবার পহেলগামের দিকে । রাস্তা দুদিকে চলে গেছে । একদিকে জম্বু যাওয়ার রাস্তা  অন্যদিকে পহেলগামের পথ । ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর পথ ছাড়েনা ।
ঘোড়ায় চেপে বৈশরণ এডভেঞ্চার । তিনটে জবরদোস্ত ঘোড়া , দুই সহিস আর আমরা তিন মূর্তি । ঘন বাদামী আট বছরের বুলডোজার্, হালকা বাদামী দশ বছরের চেতক আর আমার সফেদ ঘোড়া মাত্র তিন বছরের বাদল । 

বুলডোজার জ্ঞানী বৃদ্ধ, সাবধানী এবং ভব্য সভ্য । বাদল খুব চালাক এবং দুষ্টুমিষ্টি স্বভাবের । আর চেতক হল সবচেয়ে পাজি এবং ওপরচালাক । ঘোড়ায় চেপে তো বসলাম তিনজনে ভয়েভয়ে  দুই সহিস পায়ে হেঁটে আমাদের পেছন পেছনে চলল । অসমতল পাহাড়ি পথ । খানাখন্দে ভরা তায় আবার বৃষ্টি পড়ে কর্দমাক্ত । চেতক শুধু ওভারটেক করায় ব্যস্ত শুরুথেকেই । বাদল ও বুলডোজার না এগিয়ে যায় ওর থেকে । চড়াই পথে আমাদের লাগাম ধরে আমাদের নীচু হয়ে যাওয়া আর উতরাই পথে লাগাম ধরে আমাদের পিছে হেলে যাওয়া । এই নিয়ে বারবার টানাপোড়েন । তার মধ্যে মেঘের বাড়ির দরজায় পৌঁছলেই বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে কেবল । সামনে আবার নীল আকাশ, পেছনে বরফচূড়ো । কিছুটা নদীর উপত্যকা তো আবার পাহাড়ী । সবুজ মেডো, দু একটা দাঁড়কাক  আবার হেলতে দুলতে চলা ঘোড়াদের মর্জিমত । কাইনমার্গ পৌঁছলাম । সবুজ মাঠ। দূষণ নেই । বৃষ্টি পড়ে আরো সবুজ লাগছে । সাজানো প্রান্তর ।  আচমকা এক চোরা নদী পাহাড় থেকে এঁকে বেঁকে নেমে এসে ঢুকে পড়ল পায়ের কাছে । ঘোড়া তার স্রোতে বেশ ন্যায়দম খেতে খেতে চলছে । কাদায় পা পড়লেই মনে হচ্ছে পা পিছলে যাবে ওদের । কিন্তু ওদের পায়ে নাল পরা থাকে বলে ওরা স্বচ্ছন্দ্যে অবলীলাক্রমে নদীর গতিপথে পা রেখে   চলতে লাগল । ততক্ষণে আমাদের জুতো আর প্যান্টে জলকাদার প্রিণ্ট । বৈশরণ এল বুঝি । পাইনগাছের সারি দিয়ে ঘেরা সবুজ প্রান্তর । দূর দিগন্তে নীল আকাশের পৃথিবী । পৃথিবীর নীচে ঐ প্রান্তর যার নাম সুইত্জারল্যান্ড পয়েন্ট । ছবি তুলে তফাত করা যাবেনা ।  ভিউপয়েন্টও বটে ।  আল্পসের বরফচূড়ো  আর হিমালয়ের বরফচূড়োয় । নো প্লাস্টিক জোন । পরিচ্ছন্ন চা-কফির ঠেক । ঘোড়া থেকে নেমে গরম চায়ে চুমুক ।  ননস্টপ ডিজিটাল ক্লিকে বন্দী হল ভারতের সুইস পয়েন্ট । 
  চা খেয়ে ওপরে উঠে এসে আবার বাদল, বুলডোজার আর চেতকের ভরসায় চেপে বসলাম ওদের পিঠে । ওরাই আমাদের একমাত্র বল ভরসা । আবার সেই ছিটেফোঁটা বৃষ্টি, এক চিলতে রোদ্দুর মেখে  পাইনবনের মধ্যে দিয়ে অন্যপথে ফেরা হোল হোটেলে । 

Saturday, September 22, 2012

জীবাশ্মে আর শ্বেতপাথরে




আমাদের টিকিট হাওড়া থেকে বিলাসপুর। জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসে । রাতের ট্রেন ছাড়ল ভোর সাড়ে চারটেয় । বিকেল চারটে নাগাদ বিলাসপুর পৌঁছলাম । ভাড়ার গাড়িতে উঠে এবার যাত্রা শুরু অমরকন্টকের উদ্দেশ্যে ।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলেবেলায় আমরা তখন অমরকন্টক থেকে আরো পশ্চিমে চলেছি ন্যাশানাল হাইওয়ে ১১ ধরে জবলপুরের দিকে । ডিন্ডোরি আর শা'পুর পেরিয়ে একটি মোড় থেকে বাঁদিকে ১৪ কিমি এগিয়ে চেয়ে দেখি ঘুঘুয়া ন্যাশানাল পার্কের বিশাল গেট । ভারতবর্ষের একমাত্র ফসিল পার্ক এটি ।আমেরিকার এরিজোনার পেট্রিফায়েড ফরেস্ট ন্যাশানাল পার্কের পর পৃথিবীতে বোধহয় এটাই একমাত্র পেট্রিফায়েড ফরেস্ট যা কয়েক মিলিয়ন বছর আগে ফসিলাইজড হয়ে রকগার্ডেনে রূপান্তরিত হয়েছে । কার্বন ডেটিং পরীক্ষায় জানা যায় এই স্থানের বিশাল ট্রপিকাল চিরসবুজ বৃক্ষের জঙ্গল ছিল । যার বয়স ৬৫ মিলিয়ন । তাই এই ন্যাশানাল পার্কের প্রবেশ দ্বারে রয়েছে কংক্রীটের বিশাল ডাইনোসরাস । 
 

তক্ষুণি মনে হল রাজোসরাস নর্মোডেনসাসের কথা । ইন্ডিয়ান অরিজিনের এই ডাইনোসরের ফসিল তো নর্মদার তীরেই আবিষ্কৃত হয়েছিল । ভারতবর্ষ যুগে যুগে রাজারাজড়ার দেশ বলে এখানকার ডাইনোসরের নামকরণেও সেই রাজকীয়তার ছোঁয়া । কে জানে হয়ত এই ঘুঘুয়াতেই ঘুরে বেড়াতো নর্মোডেন্সাসের পরিবার ।
                                 সরকারী কেয়ারটেকার । আমাদের ঘুরে ঘুরে সবটা পরিদর্শন করিয়েছিলেন যিনি 
১৯৮৩ সালে মধ্যপ্রদেশ সরকার ঘুঘুয়াকে ন্যাশানাল পার্কের সম্মান প্রদান করে। ঘুঘুয়া এবং পার্শ্ববর্তী গ্রাম উমারিয়া নিয়ে এই ফসিল পার্কের সমগ্র ব্যাপ্তি ২৭ হেক্টর জুড়ে । এখনো অবধি ৩১ টি প্রজাতির উদ্ভিদ সনাক্ত করা গেছে । প্রধানতঃ পাম ও দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ এরা । ইউক্যালিপ্টাস, খেঁজুর, কলা, রুদ্রাক্ষ, জাম, এই সব ট্রপিকাল সবুজ গাছকেই চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে । 
                                                          ইউক্যালিপ্টাস
সরকারী কেয়ারটেকার আমাদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে সব দেখালেন । কিছু শামুক জাতীয় অর্থাত খোলসযুক্ত বা মোলাস্কা পর্বের প্রাণীর ফসিল দেখা গেল । এর থেকে বোঝা যায় যে স্থানটি আর্দ্র ছিল এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিও হত এখানে । তারই ফলস্বরূপ চির সবুজ বৃক্ষের সমারোহ ছিল । 

                                  অপর্যাপ্ত ফসিলাইজড চিরসবুজ বৃক্ষের জীবাশ্মের সাক্ষী হয়ে আমরা 

স্থানীয় মানুষ এই অঞ্চলকে বলে "পাত্থর কা পেড়" অর্থাত পাথরের গাছ । আমি বলব গাছ-পাথর । কথায় বলে বয়সের গাছ-পাথর নেই । তার মানে এতদিনে বুঝলাম । যে কত পুরোণো হলে গাছ পাথরে রূপান্তরিত হয় । 
                                                     গাছ-পাথর

অমরকন্টকে এসে পৌঁছলাম বেশ রাত্তিরে । এম পি ট্যুরিসমের লাক্সারি টেন্টে থাকবার ব্যবস্থা । রাতের খাবার খেয়ে এসে বরাদ্দ তাঁবুতে সেরাতের মত আমরা আশ্রয় নিলাম ।



পরদিন ভোরে উঠে এবার আমাদের যাওয়া লাইমস্টোনের দেশে । বিখ্যাত জবলপুর মার্বেল রকস্‌ দেখতে । প্রথমে ভেরাঘাট । জবলপুরের ২২ কিমি দূরে নর্মদা নদী একটি গর্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এখানে । দুধসাদা পাথরের ওপর দিয়ে ঝরণার মত আছড়ে পড়ছে নর্মদা এই গর্জটির দৈর্ঘ্য ৩ কিমি । নদীর কিনারা দিয়ে, বুকের ভাঁজে মিনারের মত সারে সারে উঠে এসেছে শ্বেতপাথরের স্তম্ভেরা । কি অপূর্ব সেই রূপ । আর নদীর উচ্ছলতায় পুরো পরিবেশটাই যেন ভিন্নস্বাদের অনুভূতি সৃষ্টি করে । ভেরাঘাট পৌঁছে কেবলকারের টিকিট কিনে রোপওয়েতে যাওয়া হল মাঝ নর্মদায় ধূঁয়াধার জলপ্রপাতের এক্কেবারে গায়ের কাছে । কেবলকারের ঘেরাটোপে ডিজিটাল ক্লিকে বন্দী হতে লাগল আমার নর্মদা । চারিদিকে যেন ফোটোশপড নীল আকাশ । আর ক্যালসিয়াম-ম্যাগনেসিয়াম কার্বনেটের গাঁটছড়া । কি অপূর্ব সেই রূপ ! আর নদীর উচ্ছলতায় পুরো পরিবেশটাই যেন ভিন্নস্বাদের । পুব থেকে পশ্চিমে বহতী নর্মদা । সাদা ফেনা হয়ে জল পড়ছে গর্জের মধ্যে আর পুরো জায়গাটি ধোঁয়াময় । 
 
এবার পঞ্চবটী ঘাটে এসে নৌকাবিহারে বান্দরকুঁদনী । দুপাশে মার্বল রক্‌স এর অলিগলি রাজপথের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত নর্মদা নদী । নৌকো চড়ে ঘন্টাখানেক যেন ভুলভুলাইয়ার মধ্যে ভাসমান হলাম । পাথরের কত রকমের রঙ । পরতে পরতে যেন সৃষ্টির প্রলেপ । নৌকার মাঝির স্বরচিত কবিতায় বলিউড থেকে টুজি স্ক্যাম সবই উঠে এল স্বতস্ফূর্ত ভাবে । দুপুর সূর্য্যিতখন মাথার ওপরে । আদুড় গায়ে ডাইভ মারছে স্থানীয় কিশোর নর্মদার বুকে ।

 বর্ষার পর যেন আরো ঝাঁ চকচকে পাথরের রং আর নর্মদাও যেন থৈ থৈ রূপ নিয়ে খুশিতে ডগমগ । লাইমস্টোনের স্তবকে স্তবকে গাম্ভীর্য আর নদীর হাসি মিলেমিশে একাকার । কে যানে পূর্ণিমার রাতে এখানকার নিসর্গ কেমন হয় !কোজাগরীর রাতে আবার আসতে হবে এই বলে প্রণাম জানালাম মা নর্মদাকে । 


সকালবেলা, "ঘুরেআসি"  সংবাদপত্রে প্রকাশিত বৃহস্পতিবার,  ১৩ই সেপ্টেম্বর ২০১২ তে প্রকাশিত "সৃষ্টিপাথরের উপাখ্যান"   ঘুঘুয়া ফসিল ন্যাশানাল পার্ক এবং জব্বলপুর মার্বল রকস নিয়ে ভ্রমণ বৃত্তান্ত   

Thursday, August 23, 2012

খড়দহ নামের উত্স



গত বছর ভাদ্রমাসে  আমরা উত্তর কলকাতার খড়দহতে শ্যামসুন্দরের মন্দির এবং সংলগ্ন গঙ্গার ধারে বেড়াতে গিয়েছিলাম ।  মন্দিরে ভোগের ব্যাবস্থা ছিল । অসাধারণ সব নিরামিষ খাবার । প্রায় ১৪রকমের আইটেম যা ঠাকুরকে নিবেদন করা হয়  । এবং দুর্দান্ত সুস্বাদু সব ভোগ । মন্দির দেখে আমরা কিছুদূরে আগরপাড়ায় আনন্দময়ী মায়ের আশ্রমে গেলাম ও সেখানে থেকে গঙ্গার এত সুন্দর রূপ দেখলাম যে তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না । অতি নির্জন ও মনোরম ঐ স্থান । খড়দহ গিয়ে জানতে পারলাম ঐ অঞ্চলের নামের ইতিকথা । নিত্যানন্দ মহাপ্রভু বিবাহের পর ঐ স্থানে আসেন ও সন্ন্যাস ত্যাগ করে গার্হস্থ জীবনযাপনের জন্য সেখানকার তদানীন্তন জমিদারের কাছ থেকে একটুকরো জমি চেয়েছিলেন । জমিদার দর্পের সঙ্গে গঙাবক্ষে একটুকরো খড় ছুঁড়ে ফেলে এবং তা দেখিয়ে নিত্যানন্দকে বলেছিলেন ঐ টুকু খড়ের ওপরে যদি বাসা বেঁধে থাকতে পারো তবে থাক । নিত্যানন্দ বলেছিলেন ‘ঠিক আছে, আমি ওইটুকু স্থানেই ঘর বাঁধব’
মহাপুরুষের কথা । যেমন বলা ওমনি কাজ । পরদিন সকালে উঠে গাঁয়ের মানুষ দেখল যে গঙ্গার ওপরে একটুকরো চর ভেসে উঠেছে  এবং ঐ স্থানেই কুটির বেঁধে নিত্যানন্দ মহাপ্রভু বসবাস করতে শুরু করেন ।  এবং খড় ফেলার ঐ জায়গাটিতেই নদীর চর জেগে ওঠার  জনশ্রুতি নিয়েই ঐ স্থানের নাম খড়দহ হয়েছে ।

Wednesday, July 4, 2012

উত্তরাখণ্ডের পথে পথে


 আনন্দবাজার পত্রিকার ইন্টারনেট সংস্করণের ভ্রমণ কলম "হাওয়াবদলে"  প্রকাশিত ১লা জুলাই ২০১২ 

Thursday, June 21, 2012

Lingaraja Temple

ফাল্গুনের একটা মিষ্টি রোদের দুপুরে খড়গপুর থেকে রাজধানী এক্সপ্রেসে আমরা ভুবনেশ্বরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম । ক'দিন আগেই বৃষ্টি হয়ে ঝকঝক করছে সবুজ প্রকৃতি । পাঁচঘন্টা পর ভুবনেশ্বর । পথে পেরোলাম সুবর্ণরেখা, মহানদীর ব্রিজ । এক একজায়গায় শীতের রুক্ষতায় চড়াও পড়েছে নদীর বুকে । হোটেলে গিয়ে উঠলাম । সেখানে থেকে পরদিন ভোরে একটা অটোরিক্সো ভাড়া করে লিঙ্গরাজা মন্দির । মন্দিরময় ভুবনেশ্বরে এটি একটি অন্যতম বৃহত মন্দির ।  কলিঙ্গ স্থাপত্যে একে পঞ্চরথের আদল বলা হয় ।  ১১ th century তে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন  সোমবংশীয় রাজা জজাতি কেশরী ।  ভুবনেশ্বরের সবচেয়ে বড় মন্দির এটি । ল্যাটেরাইট পাথরের  প্রাচীর বেষ্টিত এই বিশাল মন্দিরের চত্বরটি দেখলে মনে হয় বহির্শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য এত উঁচু এবং প্রশস্ত প্রাচীর দিয়ে একে ঘিরে রাখা হয়েছিল । প্রবেশদ্বারটিও বেশ রাজকীয় । পিতলের কারুকার্যময় দরজা । তবে ক্যামেরা, জুতো এবং সেলফোন নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ । এ যুগেও এত  রক্ষণশীলতার কারণ বুঝে উঠতে পারলামনা ।  কিন্তু এত সত্ত্বেও লিঙ্গরাজাকে দর্শন করতে গিয়ে দেখি আসল মহালিঙ্গটিই কালের স্রোতে বিদ্বেষে, রোষে আক্রমণে রক্ষা করতে পারেনি তারা ।  ঐ স্বয়ংভূ বা মাটি থেকে আপনিই উঠে আসা রাজলিঙ্গকে হরি-হর জ্ঞানে পূজা করা হয় । একদিকে যা বৈষ্ণব এবং শৈব ধর্মের মেলবন্ধন ঘটায় ।  শিব এখানে পূজিত হন ত্রিভুবনেশ্বর বা  স্বর্গ, মর্ত্য এবং পাতালের প্রভু রূপে । ভুবনেশ্বরী দেবী হলেন এই শিবের প্রকৃতি । তাঁর মন্দির ও রয়েছে পাশে ।  মূল মন্দিরটি ৫৫মিটার উঁচু এবং ঐ বিশাল মন্দিরের চত্বরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরো  আরো ১৫০টি ছোট বড় অমন মন্দির । ঘুরে ঘুরে দেখলাম বেশ কয়েকটি । প্রবেশদ্বারে ঢুকেই বাঁদিকে গণেশ মন্দির । তারপর মূলমন্দিরে পুজো দিলাম দুধ, বেলপাতা ধুতুরা ফুল দিয়ে । বাইরে এসে দীপ জ্বালালাম মহাদেবকে স্মরণ করে । ঊড়িষ্যার কোনো মন্দিরে দর্শনার্থীরা লিঙ্গের মাথায় জল, ফুল বা দুধ চড়াতে পারেনা ।একদল পান্ডাদের স্বেচ্ছাচারিতা,  অহমিকা আর ট্যুরিষ্ট বিদ্বেষ জায়গাটির স্থান মাহাত্ম্যকে কিছুটা ম্লান করে দিয়েছে । যারাই আসছেন দূর দূর থেকে সকলের মুখেই সেই এককথা ।   লিঙ্গরাজ যেন ঐ প্রদেশের পূজারী এবং সেবায়েতদেরই সম্পত্তি । উত্তর বা পূর্ব ভারতের আর কোথাও এমনটি খুঁজে পাইনি ।      ভূবনেশ্বরী, কালী, সাবিত্রী, যমরাজ ইত্যাদি কয়েকটি মন্দিরে প্রবেশ করলাম ।  
 ল্যাটেরাইট পাথরের খোদাই করা স্থাপত্য সত্যি সত্যি অভিনব । নিখুঁত হস্তশৈলী ।   ১১০০ বছরের পুরোণো এই মন্দির গাত্রের কাজ পার করে দিয়েছে কত ধর্মবৈষম্যের  ঝড়ঝাপটা , কত বর্ণ বিদ্বেষের কোলাহল তবুও আজ স্বমহিমায় টিকে রয়ে গেছেন লিঙ্গরাজা । কিছুদূরেই রয়েছে বিন্দুসাগর এবং তার লাগোয়া  ১৫  th century তে গজপতি রাজাদের তৈরী   ব্রহ্মরাজ মন্দির । বৈশাখী পূর্ণিমায় লিঙ্গরাজ এখানে আসেন হাওয়া বদল করতে ঠিক যেমন পুরীর জগন্নাথ রথযাত্রায় মাসীর বাড়ি যান ।   আরো খানিক গেলেই পড়বে 9th century তে নির্মিত   রামেশ্বর মন্দির । কলিঙ্গ স্থাপত্যের ছোঁয়া এখানেও । কিছুটা লিঙ্গরাজ মন্দিরের আদলে তৈরী । রামচন্দ্র নাকি লঙ্কা বিজয়ের পর বিজয়রথ নিয়ে   সীতার সাথে   এখানে আসেন এবং এই শিবলিঙ্গটি প্রতিষ্ঠা করেন । বাসন্তীপূজার সময় অশোক-অষ্টমী তিথিতে,    রামনবমীর আগের দিন লিঙ্গরাজ  বিশাল "রুকুনা" রথে আরোহণ করে এই রামেশ্বর মন্দিরে আসেন চারদিনের জন্য ।  আর কিম্বদন্তী বলে এই চৈত্রমাসের বাসন্তীপূজার সময়ই তো রামচন্দ্র অকালবোধন করেছিলেন ।  ঐ চারদিন ধরেই তো বাসন্তী পুজো হয়ে আসছে দুর্গাপুজোর আদলে । 

Monday, June 11, 2012

বিপন্ন বাঁশবেড়িয়ায়


কোলকাতা ছেড়ে আমরা তখন বিটি রোড ধরেছি । হুগলীর বাঁশবেড়িয়ায় আমার শ্বশুরমশাইয়ের পিতামহ শ্রী সত্যচরণ মুখোপাধ্যায়ের তৈরী বসতভিটে পরিদর্শনে । একে একে পেরোলাম বালি, উত্তরপাড়া, কোন্নগর, ভদ্রকালী, রিষঢ়া, শ্রীরামপুর পেরোতে পেরোতে জৈষ্ঠ্যের রোদ তখন প্রায় আলম্ব মাথার ওপর । তারমধ্যেই শহরতলীর বাজারে হৈ হৈ করে বিকোচ্ছে আম-কাঁঠাল-লিচু । রবিবারের সরগরম বাজারে ঠা ঠা রোদেও বিকিকিনির খামতি নেই ।
জিটি রোড ছেড়ে এবার পুরোণো দিল্লী রোড ধরে সোজা মগরা হয়ে বাঁশবেড়িয়া । হংসেশ্বরী রোড ধরে রঘুদেবপুরে থামা ।
দেড়শো বছরের পুরোণো মুখুজ্যে বাস্তুভিটে এখন জঙ্গলাকীর্ণ । লোকাল ক্লাব, লোকনাথ বাবার মন্দির গড়ে উঠেছে এই জমিতেই । 

দোতলাবাড়ি ভেঙে গেছে বহুদিন আগেই ।জানলা দরজা ভেঙে ভেঙে নিয়ে গেছে কেউ । কড়িবরগার ছাদের নীচে একতলায় বাস করছে তিনটি পরিবার । পাশে দুটো পুকুরে এখনো জল থৈ থৈ । সংলগ্ন বাড়ি উঠেছে আমাদের জমির ওপর দিয়েই । প্রকান্ড বাড়ির সামনে বারমহল এখনো কিছুটা ভগ্নাবস্থায় দাঁড়িয়ে । পাশে ছিল উঁচু করা খানিক জমি যেখানে প্রতিবছর জগাদ্ধাত্রী পুজো হত ।
এখন পরিত্যক্ত ভিটের কুলুঙ্গিতে চামচিকের আনাগোনা । ক্লান্ত দুপুরে এ ভিটে হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গ কুবো-ঘুঘুদের ছায়াসাথী ।  পোড়া ইঁটের সুরকি নিয়ে রান্নাবাটি জমিয়ে দেয় পাড়ার ছোট ছেলেমেয়েরা ।  বারমহলের লবি চু-কিত্কিত প্রেমীদের অবারিত দ্বার ।  


 এরপর যাওয়া হল হংসেশ্বরী মন্দির ।  


পুরোণো হুগলীজেলার শিল্পনগরী ব্যান্ডেল এবং ত্রিবেণীর মাঝামাঝি অবস্থিত হংসেশ্বরী মন্দির । রাজা নৃসিংহদেব রায় এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীকালে ওনার বিধবা পত্নী রাণী শংকরী সেই কাজ সমাপ্ত করেন । হংসেশ্বরী মন্দিরের অদ্ভূত গড়ন । বাংলার অন্যান্য মন্দিরের থেকে ভিন্নরকমের । পঞ্চতল এই মন্দিরে তেরোটি উঁচু মিনার আছে যাকে বলে রত্ন । প্রতিটি মিনার যেন এক একটি প্রস্ফুটিত পদ্মের আকৃতিতে তৈরী । হংসেশ্বরী মন্দিরের গঠনশৈলীকে বলা হয় তান্ত্রিক সাতচক্রভেদ ।


 পাশেই অনন্ত বাসুদেবের মন্দিরটি ও নজর কাড়ে । সেটি বাংলার চালাঘরের আদতে পোড়ামাটির তৈরী । গায়ে টেরাকোটার অভিনব স্থাপত্য ।নিঁখুত কারুকার্য এই টেরাকোটার । কোনোটিতে রাধাকৃষ্ণ, কোনোটিতে দশাবতার, কোনোটিতে হনুমান । 


 এই দুই মন্দিরই এখন আরকিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার অধীনে ।কাছেই ত্রিবেণী হল তিন নদী গঙ্গা, সরস্বতী ও বিদ্যাধরীর সঙ্গমস্থল । কিন্তু সরস্বতী নদী মজে যাওয়ায় দুটি নদী এখন দৃশ্যমান ।
মন্দির এবং সংলগ্ন জমিদার বাড়ীর পুরো চৌহর্দির সীমানা বরাবর পরিখা খনন করে সুরক্ষিত করা রয়েছে এখনো ।