Sunday, July 21, 2013

একছুট্টে রাজরপ্পা




মাঘের মিঠে রোদ পিঠে চড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম রাঁচী থেকে একটা গাড়ি নিয়ে রাজরপ্পার দিকে । রামগড় থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে আর রাঁচি থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে রামগড় ও চিতোরপুর রোডের ওপরেই রাজরপ্পা । হাজারিবাগ রোড ধরে খেলগাঁও দিয়ে চলতে লাগলাম । ন্যাশানাল হাইওয়ে ৩৩ এর ওপরে ঝকঝকে সাজানো আর্মি ক্যান্টনমেন্ট "দীপাটলি" এল । ছোটনাগপুর মালভূমির সবুজ পাহাড়ের গা ঘেঁষে আমাদের চলা । বেশ মনোরম জলবায়ু আর সবুজ প্রকৃতি । কিছুপরেই এল রামগড় ঘাঁটি । একটু চড়াই আবার সামান্য উতরাই পথ দিয়ে চলতে চলতে পালামৌ, বিভূতিভূষণ মনে পড়ছিল । গাড়ির কাঁচ খুলে নাম না জানা, অচেনা ফুলের বুনো গন্ধ নিতে নিতে ভাবছিলাম অধুনা ঝাড়খন্ডের এই অংশটির কথা । বৈচিত্র্যময় ঝাড়খন্ডের এই ভূখন্ডটির সম্পদ হল পাহাড়-মাটীর স্তূপের মধ্য দিয়ে অগুন্তি ছোট-বড় নদী আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নিঃশব্দে ঝরে পড়া ঝোরার কলকলানি । সেবার গেছিলাম রাঁচি থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে দশম ফলস । মনে পড়ছিল সেই কথা । কি অপূর্ব সেই রূপ ! সুবর্ণরেখা নদীর এক শাখা নদী কাঁচীর দশটি সাবলীল ধারা অবলীলায় ৪৪মিটার ওপর থেকে ঝরে পড়েছে একসাথে নীচে । এছাড়াও হুন্ড্রু, জোনহা, হিরণি, পাঁচ গাঘ ফলস, সীতা ফলস, কাঁকে ড্যাম, রাঁচি লেক ছোটনাগপুর মালভূমির এই অংশটি ঘিরে যেন এক ন্যাচারাল নবরত্নের মালা গেঁথে সাজিয়ে রেখেছে নিঁখুত ভাবে । আর সাঁওতাল মানুষের জীবনযাপন, ধামসা-মাদল, অনবরত ঝরে পড়ে থাকা বিশাল বিশাল ভুর্জ্যপত্রের ওপর লিখে রেখে যায় কত সময়ের দলিল। বছরের পর বছর ধরে যা পুরোণো হয়না । মহুয়ার ঝিম ধরা নেশার মত সেই গল্প উঠে আসে বারবার কত লেখকের কলমে, বীরসা মুন্ডার জীবন যুদ্ধে ।

এখানকার সবচেয়ে বড় নদী দামোদর । রাঁচি ও হাজারিবাগ মালভূমির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলের আরেক নদী ভৈরবী বা ভেরার সাথে মিলিত হয়েছে দামোদর আর সেই সঙ্গমেই রাজরপ্পা জলপ্রপাত । প্রায় ৯ মিটার উঁচু থেকে ভেরা নদীর অবিরত ধারা ঝরেছে দামোদরের বুকে । রাজরপ্পা শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের জন্যই নয় ছিন্নমস্তা বা ছিন্নমস্তিকার মন্দিরের জন্যও যথেষ্ট বিখ্যাত । সতীর দেহ ত্যাগের পর মহাদেবের তান্ডব নৃত্যে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন সতীর মস্তকটি না কি এখানে পড়েছিল তাই দশমহাবিদ্যার অন্যতম ছিন্নমস্তা মায়ের মন্দিরটি একান্ন সতীপিঠের একটি বলে অনেকেই দাবী করেন । সতীপিঠ হোক বা না হোক গাড়ি নীচে রেখে সামান্য চড়াই পাহাড়ী পথ ধরে মন্দিরের দিকে এগুতে লাগলাম আর কেমন যেন একটা এথান মাহাত্ম্য অনুভূত হল । বহুদিন আগে যখন এই রাস্তা হয়নি তখন নদী পেরিয়ে মন্দিরে আসতে হোত । এখন রাজরপ্পা বেশ অনেকটাই আধুনিক এবং ভেতরে প্রবেশ করে দেখি কঙ্ক্রিটের বাহুল্যে কিছুটা হলেও কৃত্রিম । তবে মা ছিন্নমস্তার মন্দির এবং রাজরপ্পা জলপ্রপাতটি ভুলিয়ে দেয় সবকিছু । ছিন্নমস্তার মন্দির বড় একটা দেখা যায়না তাই আমার এত আগ্রহ ছিল । অনেকটা কামাখ্যা মন্দিরের ঢঙে নির্মিত মূল মন্দিরটি । আর এই মন্দিরকে ঘিরে কালীর দশ মহাবিদ্যা রূপের অন্য গুলি অর্থাত তারা, কমলা, বগলা, ভৈরবী, ধূমাবতী, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, মাতঙ্গী প্রভৃতির মন্দির গুলি নির্মিত হয় অনেক পরে । মন্দির চত্বরে দর্শনার্থীদের বিশাল লাইন দেখে ঘাবড়ে গেলাম । কিন্তু কিছুপরেই অতি সুন্দর নিয়ম মেনে লাইন এগুতে দেখলাম আর একসাথে জনা কুড়ি মানুষকে পুজো দিতে সম্মতি দেওয়া হয় । কোনো পান্ডার উপদ্রব নেই । আর অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পুজো দেওয়া যায় । তাই গাড়ীর ড্রাইভারকে লাইন রাখতে বলে পুজোর ডালা কিনে নিয়ে ঘুরতে গেলাম নদীর ধারে । নৌকো করে ওপারে যাচ্ছে মানুষ । আর দুই নদীর সঙ্গমে রাজরপ্পা ঝোরার কলকলানি বড়ই দৃষ্টিনন্দন ।

তখন দুপুর একটা বাজে । সারি সারি শালগাছের মাথায় দুপুরের সূর্য সজাগ । আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু-এক ঘর সাঁওতাল বসতি । লাইন দিয়ে মা ছিন্নমস্তার মন্দিরে প্রবেশ করলাম এক গা ছমছমে অনুভূতি নিয়ে ; সিঁদুর লেপা পাথরের গায়ে খোদাই করা হয়ত মায়ের মুখ । অন্ধকারে দেখা গেলনা । তবে পুজো নিয়ে অহেতুক আড়ম্বর নেই । পূজারীর দাদাগিরিও নেই । সেটাই বেশ ভালো লাগল ।বহু দূর দুরান্ত থেকে মানুষ এসেছেন মনস্কামনা পূরণ করতে ছাগল সাথে করে । স্থানীয় সাঁওতাল মানুষেরা ছিন্নমস্তাকে অসম্ভব ভক্তি করে এবং তাদের মৃত মানুষের অস্থিভস্ম এই দামোদর নদীতে ফেলে । মন্দির থেকে নেমেই যেতে হয় কালভৈরবের কাছে । নারকোল ভেঙে জল ঢেলে শিবের প্রণাম হল । তারপর আবার দুই নদীর সঙ্গমস্থল পেরিয়ে পেছনপথ দিয়ে তীরে উঠে গাড়ির খোঁজ করা । 


কখন যাবেন : বর্ষাকালে গেলে ওয়াটার ফলস গুলির থৈ থৈ রূপলাবণ্য দেখা যায় । এছাড়া রজরপ্পা নভেম্বর থেকে মার্চ অবধি যাওয়াই শ্রেয় । কারণ গরমের সময় প্রচন্ড দাবদাহ চলে এই অঞ্চলে ।
কিভাবে যাবেন : হাওড়া থেকে রাঁচি-হাতিয়া এক্সপ্রেসে রাঁচি ও সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে রাজরপ্পা যাওয়া যায় ।
কোথায় থাকবেন : রাঁচি শহরে নামী দামী অজস্র হোটেল আছে । বিশেষ ছুটিতে গেলে আগে থেকে বুক করে যাওয়াই ভাল ।


No comments:

Post a Comment