Monday, February 11, 2013

লাইমস্টোনেরাও কথা বলে.....


                                               অমরকন্টক
মরকন্টক ঘুরে এসে খুব ক্লান্ত ছিলাম । পরদিন ভোরে উঠে এবার আমাদের যাওয়া লাইমস্টোনের দেশে ।  বিখ্যাত জবলপুর মার্বেল রকস্‌  দেখতে । অমরকন্টকের হোটেলে সুস্বাদু নিরামিষ প্রাতঃরাশে আহ্লাদে উদরপূর্তি হল সুজির উপমা, পরোটা-টক দৈ-আচার এবং আলুর টিকিয়া দিয়ে  । সাথে ধূমায়িত চা এবং উত্তুরে হাওয়ার কনকনানি । প্রথমে যে জায়গাটিতে গেলাম তার নাম ভেরাঘাট ।  জবলপুরের ২২ কিমি দূরে নর্মদা নদী একটি গর্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এখানে । দুধসাদা পাথরের ওপর দিয়ে ঝরণার মত আছড়ে পড়ছে নর্মদার হাসি । ৩০ মিটার উঁচু থেকে নাচতে নাচতে পড়ছে তার জল । মাথার ওপর  দুপুর সূর্য্যি নিয়ে তো দেখছি আমরা । কে যানে পূর্ণিমার রাতে এখানকার নিসর্গ কেমন হয় !  
 ধূঁয়াধার ফলস

নর্মদার সৃষ্ট এই গর্জটির দৈর্ঘ্য ৩ কিমি । মধ্যে মধ্যে যেন উঠে এসেছে লাইমস্টোন বা মার্বেলের পাহাড় ।  দুধসাদা  শ্বেতপাথর অত্যন্ত নরম । আর  তাই বুঝি সেই সফট ষ্টোনকে কেটে কুটে  তা দিয়ে নানারকমের জিনিষ বানিয়ে পণ্য সাজিয়েছে আশপাশের স্থানীয় মানুষ ।   যেতে যেতে  প্রচুর পাথরের পসরা দেখতে পেলাম । 
যেতে যেতে পথে পড়ল গৌরনদী । তারপর ছোট হল্ট বার্গী ড্যামে । 

 বার্গী ড্যাম
দিগন্তরেখা জুড়ে বিশাল বিন্ধ্যরেঞ্জ আর তার কোলে নর্মদার কিছু অংশে এই ড্যাম ।  এবার সোজা ভেরাঘাট পৌঁছলাম । কেবলকারের টিকিট কেটে শূন্য থেকে নর্মদার তাথৈ নাচ দেখতে যাওয়া হল । আমরা কেবলকারের মধ্যে কাঁচের জানলা দিয়ে দুচোখ ভরে সেই দৃশ্য দেখছি । নর্মদা আমাদের নীচে আমরা লোহার রজ্জুতে গতিময় । 

এখানে নর্মদার নাম ধূঁয়াধার ফলস । সত্যি সত্যি মনে হচ্ছে পুরো জায়গাটা ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে । সাদা ধুধের ফেনা হয়ে জল পড়ছে গর্জের মধ্যে আর পুরো জায়গাটি ধোঁয়াময় ।একঘন্টায় কেবলকারের রাইডে আসা এবং যাওয়া সম্পূর্ণ হল । এবার নেমে পায়ে হেঁটে নর্মদাকে ছুঁতে যাওয়া । তাকিয়ে দেখি  শ্বেতপাথরের দেওয়ালে অবাককরা রামধনু ! আর আমার গায়ে নর্মদার জলের ছিটে অনবরত ধেয়ে এল ।এবার পঞ্চবটী ঘাটে এসে নর্মদায় নৌকাবিহার ।  মার্বেল রকস দেখতে যাচ্ছি এতক্ষণে । 



 শিবানী নামে একখানা নৌকো পছন্দ করে টিকিট কেটে উঠে পড়া হল । দূরে ১০৮ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় পার্বতী মন্দির । এছাড়াও বিন্ধ্য পাহাড়ের গায়ে শঙ্কর মন্দির, পাঁচপটা মন্দির । নৌকোর মাঝি এমনটি বলল । বেশ মজার মাঝি সে । গানে গানে কবিতায় ছন্দে ভরিয়ে দিল একটা ঘন্টা । স্বরচিত কবিতা  যা কিনা পুরো মার্বেল রকসকে গল্পের মোড়কে হাজির করে চোখের সামনে ।







 সেই নৌকার কান্ডারীর ছন্দময়তায় আমাদের যাত্রাপথের আনন্দ বেড়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেল একনিমেষে । হেলছে তরী, দুলছে তরী  ভেসে চলেছে  নর্মদায় ।ছুঁলাম হাত নীচু করে নর্মদাকে । পরেই দেখি পরের নৌকাটির গায়ে একখানা লম্বা জলঢোঁড়া সাপ জল থেকে ওঠার চেষ্টা করছে প্রাণপণে । মাঝি বললে "কিছুতেই উঠতে পারবেনা সে"; সত্যি সত্যি কিছুপরেই সে আবার জলের মধ্যে লাফিয়ে চলে গেল । লাইমষ্টোন্, মার্বেল, ক্যালসিয়াম-ম্যাগনেসিয়াম কার্বনেটের পাহাড় চলল আমাদের দুপাশে । আমরা যেন ভেসে চলেছি একটা ক্যানালের মধ্যে দিয়ে । আমরা চলেছি বান্দরকুঁদনী ঘাটের দিকে যেখান থেকে লাইমষ্টোনের পাহাড়ের ওপর থেকে লাফে লাফে ঝাঁপ দিচ্ছে বাঁদর আর সেই সাথে রোজগারের আশায় দরিদ্র গ্রামের আদুড় গায়ে গ্রামের ছেলে । কোনো চাহিদা নেই তাদের তুমি যদি বল পয়সা দেবে তবেই সে জোরসে ডাইভ দেবে মাঝ নর্মদায় সেই ওপর থেকে । আর পয়সা হাতে নেয় না সে ছেলে মা নর্মদার কোল থেকে তুলে নিয়ে পাহাড়ের গায়ে শুকিয়ে নিচ্ছে নোট । এই তার রুজি । মায়ের জন্য করে খাচ্ছে তাই মা'কে এত ভক্তি ! পুব থেকে পশ্চিমে বহতী নর্মদা । মাথার ওপরে কট কটে দূপুর সূর্য । একবার আকাশী মার্বল তো আবার সাদাকালো । কখনো আবার গোলাপী তো কখনো শ্লেট পাথর । ভুলভুলাইয়ার মত জলে র মধ্যে দিয়ে যেতে লাগলাম আর চারপাশের যে দৃশ্য তা ভাষায় বলতে গেলে বঙ্কিমচন্দ্রে র সাহায্য নিয়ে বলতে হয় " আহা! কি দেখিলাম ! জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না " ! এবার সবচেয়ে গভীর জল, ৩৫০ ফুট গভীরে । ধারে দেখি মার্বেলপাহাড়ের গায়ে জড়াজড়ি করে পড়ে রয়েছে সাত-আটটা সাপ । এবার খানিক সংকীর্ণ জলপথ । কাছ থেকে পাহাড়কে দেখছি ।  পেছনে গভীর জঙ্গল । পাহাড়ের গায়ে কি বিচিত্র চিত্রকল্প। মাঝির কবিতায় তা আরো স্পষ্ট । ছোট ছেলেমেয়ে একজোড়া,গায়ে জামা-প্যান্ট পরা । আবার কোথাও খাজুরাহের পুতুল তো কোথাও কালভৈরবের কালো মূর্তি । কোথাও আবার পাহাড়ের গায়ে মহাদেবের নন্দীর মত একটা বিশাল ষাঁড় । এবার পাহাড়ের মধ্যে গুহা দেখা গেল । একটা আইল্যান্ড এল । ইন্দোরের মহারাণী স্থাপন করেছিলেন শিবলিঙ্গ । এবার আরো গভীর ৪৫০ফুট । গাঁয়ের ছেলে আদুড় গায়ে মাছ ধরতে  ব্যস্ত। অনেক হিন্দী ছায়াছবির শুটিং হয়েছে এখানে । 


রাজকাপুরের আওয়ারা থেকে রেখার খুন ভরি মাং, যিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায় থেকে শাহরুখের অশোকা , রেখা-সুনীল দত্তের প্রাণ যায় পর বচন না যায়  এদের মধ্যে অন্যতম । ভাবছি কোথায়  সেই দ্বীপের ওপর নৃত্যরতা, স্বল্পবসনা রেখাকে কোথা থেকে একটা বিশাল মাছ ঘাই মেরে আমার কল্পনার সূতোগুলো ছিঁড়েখুঁড়ে একাকার করে দিল । এতক্ষণে বুঝলাম জলের আঁশটে গন্ধের রহস্য । নৌকোর মাঝি থামেনা । সে অনবরত ছড়া কেটে চলেছে " চাঁদনী রাত মে, ক্যামেরা হাথ মে, ফ্যামিলি সাথ মে আউর  কেয়া? আপ বলিয়ে জি! সে পরখ করছে আমরা মন দিয়ে তার কবিতা শুনছি কি না । আমার মা জোড় হাতে নর্মদাকে প্রণাম করে বলে উঠলেন
" নর্মদে শর্মদে নিত্যং পাপতাপবিনাশিনী, শংকর স্বেদসম্ভূতে সনাতনী নমোহস্তুতে " 
এবার চেয়ে দেখি কতকত মৌচাক লাইমষ্টোনের ওপরে বাসা বেঁধেছে মনের সুখে ।


এইভাবে নর্মদা বয়ে চলেছে আবহমান কাল ধরে সাতপুরা আর বিন্ধ্যর মাঝখান দিয়ে । দূরে শঙ্করকুন্ড আর বাণকুন্ড যেখানে জল গিয়ে পড়ছে আর অবিরত সৃষ্টি করে চলেছে প্রাকৃতিক উপায়ে শিবলিঙ্গ । নদী যেখানে গভীর সেখানে তার জল তত শান্ত আর গভীরতা কমে যায় আর তার স্রোতস্বিনী নাম সার্থকতা পায় । দূর থেকে মাঝি দেখাল বগলামুখী আর ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির । আমরা কোথা দিয়ে পেরিয়ে গেল কবিতার মাঝদরিয়া । একঘন্টা পেরিয়ে ঘাটে এসে নৌকা খানা ভিড়ল ।  চেয়ে দেখি শ্বেতপাথরের মূর্তি, গয়না আর থালাবাটির পসরা ।


 আনন্দবাজার পত্রিকা, পশ্চিম দিনাজপুর,  রবিবারের ক্রোড়পত্র ৬ই জানুয়ারি ২০১৩  

Monday, February 4, 2013

মা গঙ্গার বডিগার্ড শিব !



তাকিয়ে দেখি ভাগিরথী আমার চোখের সামনে । গঙ্গোত্রীর মন্দিরের বাজারের মধ্যে দিয়ে, মাগঙ্গাকে পুজো দেবার পসরা নিয়ে অলিগলি দিয়ে চলেছি আর ডানদিকে উঁকি মারছে ভাগিরথী । কি তার কলকলানি ! উত্তরকাশী থেকে ভোর ভোর বেরিয়েছিলাম গঙ্গোত্রীর পথে । উত্তরকাশী থেকে ৯৯কিমি দূরে ৩০৪৮ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত গঙ্গোত্রী । ভাগিরথীর উত্সমুখ হল গঙ্গোত্রী গ্লেসিয়ার যার টার্মিনাস হল আরো ১৮কিমি দূরে গোমুখে । স্থান মাহাত্ম্য বলে, পুরাকালে রাজা ভগীরথ শিবের তপস্যা করে গঙ্গাকে শিবের জটা থেকে গঙ্গোত্রীতে নামিয়ে আনেন । এই ভাগিরথী দেবপ্রয়াগে অলকানন্দার সাথে মিলিত হয়ে গঙ্গা হয়েছে । ভাগিরথীর তীর ঘেঁষে চলতে লাগলাম অজস্র মন্দিরময় শহরতলীকে ফেলে । ভাটোয়াড়ি এল, সামনে অগণিত ভেড়ার পাল পাহাড় থেকে নেমে আসছে সমতলে ।

 দীপাবলী অবধি তীর্থযাত্রা তারপরদিনই প্রবল তুষারপাতের জন্য রাস্তা বন্ধ । মেষশাবকরা আপাততঃ মাস ছয়েকের জন্য সমতলে ঘরকন্না করতে আসছে । সেই জ্যামে কিছুক্ষণ । প্রথমে নদীর সমতলে কিছুটা, আবার উঁচুতে উঠতে শুরু করল গাড়ি ।বীভত্স সরু পাহাড়ের চড়াই পথ । উল্টোদিক থেকে একটা বাস বা গাড়ি এলে বিপদে। অতি সন্তর্পণে পিছু হটে সামনের গাড়িকে রাস্তা ছেড়ে দিয়ে আবার চলা । সাথে বুকধড়পড়ানি , এই বুঝি পড়ে যায় গাড়ি ! রাস্তার একপাশে পাথরের দেওয়াল আর অন্যদিকে গভীর খাদ । ততক্ষণে ভাগিরথী এক চিলতে নীল সূতোর মত হয়েছে । আর দুর্গম থেকে দুর্গমতর পাহাড়ী পথ । ১৯৯১ সালে ভূমিকম্পের ফলে উত্তরকাশীর রাস্তাঘাট এখনো ভয়ানক । অজস্র ল্যান্ডস্লাইড । বড় বড় পাথরের চাঙড় এখনো ঝুলে পাহাড়ের গা ঘেঁষে । রাস্তা যেন দাঁত মুখ খিঁচিয়ে রয়েছে ! পরের পিটস্টপ গঙ্গনানী । উত্তরকাশী থেকে গঙ্গনানী ৩৯কিমি দূরে । নীল আকাশের গায়ে বরফের টুপি পরা হিমালয়ের চূড়ো । সামনে ঘন সবুজ পাহাড়, স্তরে স্তরে সাজানো । সম্ভবতঃ ঐ বরফচূড়োই গোমুখ গ্লেসিয়ার । গঙ্গনানীর পথ আরো দুর্গম । ভয়ে রক্ত হিম হয়ে গেল ।
 গঙ্গোত্রী পৌঁছে আবার ফিরতে হবে এই ভয়ঙ্কর পথ দিয়ে ! আরো সরু রাস্তা আর মধ্যে মধ্যে ল্যান্ডস্লাইডের নজির ; ভরাবর্ষায় না জানি কি অবস্থা ছিল এখানকার ! একবার ভাগিরথীকে ওপর থেকে দেখতে পাই তো আবার সে হারিয়ে যায় বহুনীচে । উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে গায়ে গরম জামাকাপড়ের আস্তরণ একেএকে । গঙ্গনানীতে একটি গরমজলের কুন্ড ও পরাশর মুনির মন্দির আছে । পাহাড়ের ধাপে ধাপে ঝর্ণার জল গড়িয়ে পড়ছে অবলীলায় । পাহাড়ী ঝোরায় রাস্তা জলময় । এল লোহারীনাগ জলবিদ্যুত কেন্দ্র । কিছুদূরে পাহাড়ের ওপর শৈল শহর হর্ষিল । এবার আবার দেখা গেল ভাগিরথীকে এক ঝলক । ভাগিরথীর ওপর মানেরী ড্যাম আরো সুন্দর করেছে স্থানটিকে । কিছুটা সমতলের মত আর ধারে ধারে কোনিফেরাস পাইন, ক্যাসুরিনার দল সারে সারে । অনেকটা মনোরম রাস্তা ক্যাসুরিনার ছায়াবীথি ধরে ।

 বেশ উপভোগ্য ড্রাইভ । চওড়া রাস্তা, রোদমাখা আকাশ অথচ আমরা চলেছি ছায়ার হাত ধরে । নীল আকাশ আর সবুজ পাহাড়ে মিলে মিশে একাকার । এল লঙ্কা ভিউ পয়েন্ট । খুব সুন্দর দেখায় এখান থেকে । এবার এক চমত্কার দৃশ্য । দুটি পাহাড়ের মধ্যে তৈরী গর্জ দিয়ে ফেনার মত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে ভাগিরথীর স্রোত । পাহাড়ের সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নামছে অবিরাম । অসাধারণ দৃশ্য! এতক্ষণের পথের দুর্গমতা, ভয় ভুলে ছবি নেওয়া শুরু । এবার এল ভৈরোঘাঁটির প্রাচীন শিবমন্দির সেখানে রয়েছেন আনন্দ ভৈরবনাথ, মাগঙ্গার পাহারায় । লেখা "ওয়েলকাম টু গঙ্গোত্রী" । মহাদেব এখানে মাগঙ্গার সিকিউরিটি গার্ড । ততক্ষণে সেই বরফের চূড়ার বেশ কাছে এসেছি । তাপমাত্রাও কমে গেছে অনেকটা । গঙ্গোত্রীর কাছাকাছি এসে মা গঙ্গাকে দেখবার জন্য আকুলি বিকুলি প্রাণ । সেদিন কালীপুজো আর দীপাবলী । গাড়ি গিয়ে নামিয়ে দিল সমতলে। । যার পাশ দিয়ে উঠে গেছে পাহাড়ের চড়াই পথ গোমুখের দিকে । সুদীর্ঘ ১৮ কিমি ট্রেক করতে হয় । আর নীচে চোখের সামনে তখন গঙ্গোত্রী। ভাগিরথীর হৈ হৈ করে বয়ে চলা । কি প্রচন্ড গর্জন তার । কি অপূর্ব রূপ তার । কত উপন্যাস, মানচিত্র, ভূগোল তখন বর্তমান হয়ে ভাসছে চোখের সামনে । বর্ণণা পড়েছি ভাগিরথীর, ছবি দেখেছি এতদিন অবধি এখন সে আমার সামনে; ভাগিরথীকে রাজা না রাণী কি আখ্যা দেওয়া যায় সে বিচার করার ধৃষ্টতা আমার নেই তবে তার যে রাজকীয়তা আছে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না । সেই মূহুর্তে আমি তাকে রাণী ভেবে নিলাম । স্রোতস্বিনী তখন নীল ঘাগরার কুঁচি দুলিয়ে, সাদা ওড়না উড়িয়ে নেচে চলেছে আপন মনে । 
অবিরত তার কোলের কচিকাঁচা নুড়িপাথরকে চুম্বন করে চলেছে । জল নয়, নদী পান্নার কুচি বয়ে নিয়ে চলেছে । অবিরল কুলকুচি সেই পান্নাপাথরের । তার গর্জন ঢেকে ফেলেছে সবকিছু । তার সামনে রোদ্দুরকে মনে হচ্ছে কম তেজী ! দীপাবলীতেই এবছরের মত তাকে দেখে নিতে হবে । ঐদিন সন্ধ্যা থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে সব মন্দির । সেদিন পাহাড়ের শেষরাত । দীপাবলীর রাত । পরদিন ঘরে ফিরবে সকলে মিলে । কেদারনাথ ফিরে আসবেন উখীমঠে । বদ্রীবিশাল যোশীমঠে । গঙ্গোত্রীর মাগঙ্গার ডুলি-পালকিও পৌঁছে গেল আমাদের সাথে সেই এক‌রাস্তায় । সূর্যের দক্ষিণায়নের সাথে সাথে পাহাড়চূড়োয় বরফ পড়বে। তুষারপাত হবে ওপরে । রাস্তা বন্ধ তাই শীতের ছ'মাস সকলে নীচে এসে ঘর পাতবে । আবার সূর্যের উত্তরায়নের সাথে সাথে এরা ওপরে উঠবে । কালীপুজোর দিন গঙ্গাস্নান । পাথর ভেঙে জলে দাঁড়াতেই মনে হল পা দুটো শিথিল । শূণ্য ডিগ্রীর কম বৈ তো বেশি নয় জলের তাপমাত্রা । কোনোক্রমে তিনডুব দিয়ে সকলে পারমার্থিক আনন্দ লাভ করছে । আবার পাথর নুড়ি, উপল সিঁড়ি ভেঙে জল থেকে উঠে ডাঙায় পা দিয়ে চেঞ্জরুম । তারপর গঙ্গারতি, গঙ্গাপুজো আর পিতৃতর্পণ । দেবী সুরেশ্বরী তখনো নাচের ভঙ্গীমায় । মাথার ওপর দুপুর সূর্য । তার ঝলক ভাগিরথীর বুকে । উত্তরদিকে ঘন সবুজ দুইপাহাড়ের মাঝখানে বরফঢাকা গোমুখ । ভাগিরথীর তরল তরঙ্গ নেমেছে সেখান থেকে । 
 

(কিভাবে যাবেনঃ হাওড়া থেকে হরিদ্বার ও সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে গুপ্তকাশী । পরদিন গুপ্তকাশী থেকে উত্তরকাশী হয়ে গঙ্গোত্রী ।
আনন্দবাজার পত্রিকা ১৭ই ডিসেম্বর ২০১১ ওয়ান স্টপ ট্র্যাভেলগ  

 

Friday, January 18, 2013

সর্বমঙ্গলা মন্দির, কেশিয়াড়ি পশ্চিম মেদিনীপুর

 সর্বমঙ্গলা মন্দির


 শ্চিম  মেদিনীপুরের এক গ্রামের মধ্যে দিয়ে বছর শুরুর দিনে যেতে যেতে  বর্ষবরণ দেখে এলাম । খড়গপুর থেকে হিজলী ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে সালুয়া পেরিয়ে নাক বরাবর কেশিয়াড়ির পথে । সোজা গেলে সুবর্ণরেখা নদীর তীরে ভসরাঘাট না গিয়ে তার আগেই ডান দিকে মোরামের পথ, মাটীর পথ ধরে বহু পুরোণো দুর্গা মন্দির । সর্বমঙ্গলা মন্দির আর কাশীশ্বর জিউ । 
বেলা গড়িয়ে, দুপুর পেরিয়ে, বিকেলের সময় চলেছিলাম পয়লা জানুয়ারির দিন । 
শহরে তখন কত হিড়িক ধুম করে নিউইয়ার পার্টির । কত তোড়জোড় রেস্তোরাঁয়া, ক্লাবে, মাঠে ময়দানে। সার্কাসের তাঁবুতে, চিড়িয়াখানায়, শীতের মেলাপ্রাঙ্গনে তখন মানুষে মানুষে ছয়লাপ । গ্রামের মানুষের মনে সেই নিয়ে কোনো হেলদোল নেই ।  
নতুন বছরের প্রথম সূর্যাস্ত তখন রঙ ছড়িয়ে চলেছে আপনমনে । ঠান্ডার দাপটও ছিল বেশ । আর রাস্তায় যেতে যেতে চড়ুইভাতির গন্ধ । তখন বনভোজনের রসুইখানার ঝাঁপ ফেলা হচ্ছে । তারই মধ্যে জোরে মাইকে বেজে চলছে" পরাণ যায় জ্বলিয়ারে "... বড়রাস্তার একপাশে সেন্ট পলস গীর্জায় বর্ষবরণের পার্টির শেষ ঝলক । মাদল বাজছে আর সাথে ট্রাইবাল ডান্স । বিলিভার্স চার্চে নিউইয়ারের ফেস্টুন ।   
ছোটবেলায় নিয়ম করে প্রতিবছর দক্ষিণেশরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কল্পতরু উত্সবে সামিল হতাম । ভীড় ঠেলে দর্শন করাতেও কত তৃপ্তি মানুষের! এখন সেটাও খুব মিস করি । মিস করি গঙ্গার ধার, ঠাকুরের মন্দিরের নিরিবিলি নিস্তব্ধতা আর সেই একরাশ অনাবিল শান্তি নিয়ে কল্পতরুর কাছে প্রার্থনা করা । কি যে চাইতাম জানিনা । কিন্তু যেতাম ও সারাবছরের রেসোলিউশান নিয়ে চোখ বুঁজে অনেক ভাবতাম । "এই বছরে, এটা করবনা, সেটা করতে হবে"...আরো কত কিছু !   
আজ সর্বমঙ্গলাই আমার কল্পতরু, আমার উদ্যানবাটী আর আমার ভালোলাগার একটুকরো কমলালেবুর শীতের দুপুর । 
 খড়গপুরে আমাদের কোয়ার্টার ( IIT campus, C1-107)

Sunday, December 2, 2012

পটমায়া @ পিঙ্গলা


আজ খড়গপুর থেকে পশ্চিম মেদিনীপুরের পিঙ্গলা গেছিলাম । খুব খারাপ  গ্রামের রাস্তা, যেতে প্রায় ঘন্টাদুয়েক লাগল ।হাতের মুঠোয় স্মার্টফোনে উন্মুক্ত  একভর্তি গুগল ম্যাপ । দিশা দেখাল আমাদের । 
খড়গপুর আইআইটি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে ষ্টেশনের দিকে না গিয়ে ঝপেটাপুর, ছোটা ট্যাংরা দিয়ে কৌশল্যার মোড় পড়ে । সেখান দিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের বারবেটিয়া, ধরে চওড়া পিচের রাস্তা দিয়ে একে একে পেরোতে লাগলাম চাঙ্গুয়াল, দক্ষিণ গেড়িয়া, মাওয়া হাটতলা, দুজিপুর বাজার  । ডাইনে বাঁয়ে ধূ ধূ ধানজমি । অঘ্রাণের শেষের মাঝামাঝি ধান উঠেছে একপ্রস্থ । পিচের রাস্তায় ধান শুখোচ্ছে । আর পথের দুধারে স্তূপিকৃত খড়ের আঁটি । এল জামনা । তারপর আরো গিয়ে পিঙ্গলা । সেখানে নয়া নামে এক ছোট্ট গ্রামে বাংলানাটক-ডটকম আয়োজিত "পট-মায়া" দেখতে যাওয়া । 


পটশিল্পীদের গ্রাম নয়ায় আয়োজিত "পট মায়া" দেখলাম ঘুরে ঘুরে। নীল আকাশের নীচে, শীতের মিঠে রোদ্দুরে পা ছড়িয়ে  গ্রামের ঘরে ঘরে পটুয়া, চিত্রকরেরা মাটীর ঘরের দাওয়ায় মেলে বসেছিল পটশিল্পের পসরা । ঘরের ঝি, বৌ, ছেলে সকলে মিলে এঁকে চলেছে । অবলীলাক্রমে এরা আঁকে । বংশ পরম্পরায় ধরে রাখে বাংলার এই ঐতিহ্যকে ।  প্রাকৃতিক রং দিয়ে আঁকছে তারা । শীলে বেটে নিচ্ছে কাঁচা হলুদ, শিমপাতার সবুজ, অপরাজিতা ফুলের নীল, গাঁদাফুলের পাপড়ি আর জাফরন বলে একটা কাঁটাওলা ফল যার ভেতরের লাল বীজগুলো থেকে লালরং বের করছিল ওরা । রংয়ের সঙ্গে কাঁচা বেলের আঠা মিশিয়ে তুলির টানে ফুটিয়ে তুলছে অভিনব শিল্পকর্ম । আর ছবি তৈরীর পর গান গেয়ে ব্যাখ্যা করছে ছবির বিষয়বস্তু।  পটশিল্পীরা মাটীর পট, ফুলদানী হাতপাখা, টিশার্ট বানিয়ে সাজিয়ে রেখেছে । ঘরে ঘরে সকলের আজ মহামেলা ।  অনেক মানুষ এসেছিলেন কলকতা থেকে । ৩০শে নভেম্বর থেকে ২রা ডিসেম্বর অবধি চলল এই মেলা ।

Tuesday, November 13, 2012

দীপাবলী- ২০১২


কার্তিকের হিমপড়ার শুরু হয়েছে দুর্গাঠাকুর জলে যাবার ঠিক পরে পরেই । বিজয়া দশমী আর কোজাগরী উত্সবের শেষরেশটুকুনি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমাদের দেশের এক প্রাচীন শহর বারাণসীতে ।বারাণসীর পূর্বের নাম ছিল আনন্দবন । তারপর  কাশী ।   বরুণা আর অসি এই দুই নদীর সঙ্গম তীর্থ বারাণসী বা বেনারস । গঙ্গায় এসে পড়েছে এই দুই ছোটনদী ঠিক এইখানে । কত বড় বড় মানুষ ঘাট বাঁধিয়েছেন গঙ্গার ধারে ধারে । তাঁদের নামে ঘাটের অধুনা নামকরণ । সবশুদ্ধ ৩৬৫ টি ঘাট রয়েছে এখানে । নৌকা করে কিম্বা পায়ে হেঁটে হেঁটে বেশ কয়েকটি পরিক্রমা ও করা যায় নদীর ধার দিয়ে । কত কত তীর্থপ্রেমী মানুষের আনাগোনা এই চির প্রাচীন মন্দিরময় শহরে । দেশবিদেশের পর্যটকরা কিসের আকর্ষণে সমবেত হন জানা নেই তবে দেশী তীর্থযাত্রীদের ভীড় ও নেহাত কম নয় এখানে । দশাশ্বমেধ ঘাটের পাশেই রাণী অহল্যাবাঈ হোলকার  প্রতিষ্ঠিত  কাশী বিশ্বনাথ মন্দির আর পাশেই অন্নপূর্ণা মায়ের মন্দির । কথিত আছে বহুযুগের প্রাচীন বিশ্বনাথ মন্দিরটি প্রথমে মহম্মদ ঘোরী, তারপর কুতুবুদ্দিন আইবক, ফিরোজ শাহ তুঘলক ও সবশেষে   মোগল সম্রাট ঔরঙজেবের হুকুমে বিনষ্ট করে একটি মসজিদ তৈরী করা হয়েছিল । প্রাচীন শিবলিঙ্গকে পাশ্বর্বর্তী   জ্ঞান ব্যাপী কুন্ডের মধ্যে পুরোহিতরা লুকিয়ে ফেলেছিলেন কিন্তু সেটিকে আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব যায়নি । মুঘল ও মুসলমান শাসনের অবসানের পর এবং হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবনের স্বরূপ হিসেবে রাণী অহল্যাবাঈ হোলকারের সৌজন্যে নবনির্মিত বিশ্বনাথ মন্দিরে বিশ্বনাথের নতুন শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই শিবলিঙ্গই আজ চুম্বকের মত দেশ ও পৃথিবীর কোণা কোণা থেকে মানুষকে বারাণসীর এই মন্দির তলে টেনে নিয়ে আসে । হাওড়া থেকে অমৃতসর মেলে বারাণসী পৌঁছেই আমরা একটি হোটেলে মালপত্র রেখে অটোরিক্সা নিয়ে চলে যাই কালভৈরব মন্দিরে । এই কালভৈরবকে বলা হয় বারাণসীর কোতোয়াল বা বডিগার্ড যিনি বারাণসীকে বাঁচিয়ে আসছেন যুগ যুগ ধরে বহির্শত্রুর আক্রমণ থেকে । সরু গলি প্রধান এই পুরোণো শহরের পেল্লায় ষাঁড় গুলি রাজকীয় । তারা স্বমহিমায় গলির আনাচেকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দন্ডায়মান । শহরের ভীড়ভাট্টা, অটোরিক্সার হর্ণ, মোটরবাইকের ধাক্কাতেও তাদের কোনো হেলদোল নেই ।  গলি জুড়ে আর রয়েছে দর্শনার্থীদের লাইন । কোনো মতে কালভৈরবের মাথায় ফুল-বেলপাতা চড়িয়ে বেরিয়ে এসে ঘাটের দিকে রওনা দিলাম । কেদারঘাটে এসে নৌকো নিলাম । নৌকো চড়ে ওপারে রামনগর প্যালেস দেখতে যাওয়া ।  প্রায় এক ঘন্টা মোটর বোটে চড়ে ঘাট পেরোতে লাগলাম একে একে । কাশীর রাজা চৈত সিং নির্মিত ঘাট, প্রভুঘাট, নিরঞ্জনী ঘাট , পঞ্চকোট ঘাট, মহানির্বাণ ঘাট, হরিশচন্দ্র ঘাট, শ্রী নিষাদরাজ ঘাট, মীরঘাট ( যেখানে মীরাবাঈ স্বয়ং তপস্যা করেছিলেন ) দিগম্বর জৈন ঘাট, সুপার্শ্বনাথের জন্মভূমি প্রসিদ্ধ ; সুপার্শ্বনাথ ঘাট,  আনন্দময়ী ঘাট,  মাতা ভদারিণি ঘাট  হিন্দী  রামায়ণ রচয়িতা তুলসী দাসের নামে তুলসী ঘাট, রীবা ঘাট  প্রভৃতি কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘাট দেখতে দেখতে মাথায় কার্তিকের সূর্য নিয়ে গঙ্গা পরিক্রমণ করতে করতে অবশেষে পৌঁছলাম রামনগর । কার্তিক পূর্ণিমায় সব ঘাট  গুলির সিঁড়িতে মাটির প্রদীপ জ্বলে একসাথে । তখন না জানি কি সুন্দর হয় ঘাটের শোভা ! গঙ্গা উত্সব পালিত হয় তখন মহাধূম করে । গঙ্গার জলে প্রদীপের আলোর সেই প্রতিফলন কি অপূর্ব আলোর জলছবি সৃষ্টি করে তা কল্পনা করে নিলাম মনে মনে । দীপাবলীর প্রাক্কালে ঘাটের সিঁড়িগুলির মেরামতি চলছিল সেই কারণে ।

রামনগর প্যালেস ও ফোর্ট

কাশীর রাজার রাজবাড়ী এবং স্বাধীন  ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর জন্মস্থান এই রামনগর  । রাজবাড়ি, ফোর্ট এবং মিউজিয়ামটি ঘুরে দেখবার মত । 
অতি উপাদেয় পাওভাজি-চাট এবং লস্যি সহ দুপুরের আহার হল এখানে । লসিতে জল মেশায়না বারাণসীতে । টাটকা টক দৈ ফেটিয়ে তার মধ্যে রাবড়ি দেয় এবং ওপর থেকে খানিকটা ঘন ক্ষীর ছড়িয়ে মাটির ভাঁড়ে সার্ভ করে । 

কাশী-বিশ্বনাথ এবং অন্নপূর্ণা মন্দিরে

সন্ধ্যেবেলায় যাওয়া হল কাশীবিশ্বনাথ এবং অন্নপূর্ণা মন্দিরে পুজো দিতে । ফেরার পথে রাস্তার ধারে  ফুটন্ত গরম  দুধ এবং রাবড়ি খাওয়া হল । তারপর বেনারসী পান ।

সারনাথ

পরদিন সকালে অটো চড়ে সোজা সারনাথ । বুদ্ধ যেখানে প্রথম বাণী প্রচার করেছিলেন । তাই সারা বিশ্বের সকল দেশ যেমন জাপান, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা থেকে বহু মানুষের ভীড় দেখলাম সারনাথে । পরিচ্ছন্ন শহর সারনাথ ।  আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার রক্ষণাবেক্ষণে সারনাথ এবং তার সংলগ্ন মিউজিয়ামটি একটি দ্রষ্টব্য স্থান । 

মণিকর্ণিকা

বেনারসে গঙ্গার তীরে অন্যতম ঘাট হল মণিকর্ণিকা এবং তার সংলগ্ন মহা শ্মশান । এখানে চিতার আগুণ কখনো নেভে না । চব্বিশ ঘন্টা জ্বলতেই থাকে । ঘাটে ঢুকেই লক্ষ্য করলাম বেল, আম প্রভৃতি গাছের শুকনো গুঁড়ি সারেসারে রাখা রয়েছে স্তুপাকারে । আর দূর থেকে ভেসে আসছে সেই শবপোড়া গন্ধ । জ্বলছে লাল চিতা । এখানে মৃত্যু হলে নাকি পরলোকযাত্রা হয় আত্মার । তাই বুঝি পূর্বে কাশীবাসী হতেন অনেকেই বৃদ্ধ বয়সে । মৃত্যু এখানে মঙ্গলময়ের চরণে ঠাঁই দেয় আত্মাকে । তাই মণিকর্ণিকা মহাশ্মশান একটী পুণ্যতীর্থ । এখানে সতীর কুন্ডল এবং মহাদেবের মণি পড়েছিল দক্ষযজ্ঞের সময় । তাই মণিকর্ণিকা একটি একান্ন পিঠের অন্যতম পিঠস্থান ।  সতীর অপূর্ব মন্দিরটি এখন গঙ্গার জলে অনেকটাই নিমজ্জিত । কিন্তু উপরের অংশটী এখনো দৃশ্যমান । মণিকর্ণিকার ঘাট থেকে নৌকো চড়ে দীপবলীর ভূত চতুর্দশীর রাতে মাঝ গঙ্গায় গিয়ে গঙ্গারতি দেখলাম । নৌকোয় ভাসমান হয়ে লাইভ কীর্তন-ভজন কনসার্টের সাথে আরতি দেখিনি কখনো । নৌকো থেকে গঙ্গার জলে পদ্মপাতায় ফুলের ভেলায় দীপ জ্বেলে ফুল-আলোর ছোট্ট নৌকা ভাসিয়ে মা গঙ্গার পুজো দিলাম । সারে সারে অগণিত ভক্তের ভাসানো আলোর ভেলা নিয়ে তির তির করে প্রদীপ জ্বলতে জ্বলতে ধীরে ধীরে এগিয়ে চল
পুণ্যতোয়া গঙ্গার বুকে দক্ষিণ থেকে উত্তরে । 

Tuesday, October 30, 2012

গৃহনৌকা


 
-->
প্রতিবার পাহাড় না সাগর এই বিতর্কে হেরে যাই আমি । গরমের ছুটির ফাঁদে পা দিলেই হিমালয় টেনে নিয়ে যায় তার কাছে । এবারেও তার ব্যতিক্রম হল না । 
 আমরা তিনজনে দিল্লী থেকে আবার শ্রীনগরের উড়ানে ।
প্রিন্সলি স্টেট কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শহর শ্রীনগরে এলাম ঘুরতে ঘুরতে । এসে অবধি জ্যৈষ্ঠ্যের  অপ্রত্যাশিত বৃষ্টি আমাদের পথ ছাড়তে নারাজ । -->
ঝিলাম সেতু পেরিয়ে ডাল ঝিলে এলাম আমরা । একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে হয় কিছুক্ষণ । লেক যে এত বড় হয় আগে কখনো দেখিনি ।শিলং এ বড়াপানি লেক দেখেছিলাম, সুইজারল্যান্ডের লুগানো লেক দেখেছিলাম । কিন্তু তাই বলে এত হৈ হৈ হাউসবোটের পসরা আর কূলে কূলে এত শিকারা
-->
দরদস্তুর করে শিকারার মাঝির আমন্ত্রণে চড়ে বসলাম শিকারায় । এমন কাশ্মীরি নৌকোর ছবি দেখেছি । চড়িনি আগে । পড়ন্ত রোদের আলোয় ডালঝিল রমরম করছে তখন । হাউসবোটের উঠোন ঘেঁষে শিকারা চলেছে মাঝির খেয়ালে । কখনো কাশ্মীরি পশমিনার দোকানের রোয়াকে কখনো আখরোট কাঠের ওয়ার্কশপে কখনো বা মীনাকারির গয়নার শিকারার বারান্দায় । সবাই মিলে বাসছি আমরা ডাললেকের জলে । শিকারার দাঁড় কাঠের পানের গড়নের । মাঝি কি অবলীলায় না সর্বক্ষণ সে দাঁড় বাইছে আপনমনে । আমাদের নৌকার সমান্তরালে এগিয়ে এল উলের পোষাক, পাথরের গয়নার মোবাইল দোকানি । এল শুকনোফল আর কেশর । এগিয়ে এল ফোটোগ্রাফারও রাজারাজড়ার পোশাক-গয়না হাতে । একটু অনুরোধ বৈ আর কিছুই নয় । এইভাবে সেই প্রদোষে ঘন্টা দেড়েক শিকারা ভ্রমণ। মাঝে দু একটা পিটস্টপ । নেহরুগার্ডেনে অবতরণ গোলাপের বাগানে । একটু ছবি তোলা । আবার ভাসমান শিকারায় । আশপাশে ভাসমান সবজী বাগানের মধ্যে দিয়ে লিলিপুলের মধ্যে দিয়ে ।, হাউসবোটের রোয়াক ঘেঁষে । কাশ্মীরি শাল আলোয়ানের দোকানের পাশ দিয়ে একটু আধটু ছোঁক ছোঁকানি , কি কিনি কি কিনি এই ভাব নিয়ে ।
 
  আপাতত  আমরা ত্রয়ী সুবিস্তৃত ডাল-ঝিলের মধ্যে  ভাসমান এক বিলাস বহুল গৃহনৌকার মধ্যে ।  পথে দেখেছি ঝিলামের রূপ । সোনামার্গ যাওয়ার পথে সিন্ধুদর্শনও হয়েছে ।  পহেলগামে লিডার নদীকেও ছুঁয়ে এসেছি । তবে ডাল লেকের বিশালতা দেখে মনে পড়ে গেল ১৯৮৯তে স্যুইটজারল্যান্ডের লুসার্ন আর লুগানো লেকের কথা । সেখানে সুইস আল্পসের কোল জুড়ে লেকগুলি আর ভারতীয় এই ভূস্বর্গে হিমালয়ের কোল আলো করে এই ডাললেক । শিকারায় করে যে হাউসবোটটিতে আমরা বন্দী হলাম দুদিন-দুরাতের জন্য তার নাম ক্যালিফোর্নিয়া । রূপকথার গল্পে পড়া পঙ্খের কাজ করা পিঙ্ক হাউসবোট । পুরো জাহাজ বাড়িটি দেওদার বা সেডার কাঠের তৈরী । জলে ডুবে আছে বছরের পর বছর । পচ ধরেনা এই কাঠে ।যেন ছোট্ট রাজবাড়িতে ঢুকলাম । প্রবেশ দ্বার থেকে কাশ্মিরী কার্পেটে মোড়া  । প্রশস্ত বারান্দায় বসার সোফা পাতা । প্রবেশ পথ পেরিয়ে ড্রয়িংরুম বা টিভি লাউঞ্জ । দেওয়ালে কাঠের কাজ ছাদে কাঠের কারুকার্য আর চারিদিকে আখরোট কাঠের ছড়ানো ছেটানো আসবাব । এমন কি ছাদের মধ্যিখান থেকে ঝুলন্ত ঝাড়লন্ঠন ! জানলা ও দরজায় কাশ্মীরি কাজের পর্দা । এবার ডাইনিং রুম । কাঁচের বাসন সম্বলিত আলমারী, বিশাল ডাইনিং টেবিল ও চেয়ার্, ডিনার ওয়াগান । ঠিক জাহাজ বা ট্রেনের মত লবি পেরিয়ে বেডরুমে এসে বিছিয়ে দিলাম নিজেকে । আবার সেই আখরোট কাঠের পালঙ্ক, চেষ্ট অফ ড্রয়ারস্, টেবিল... ড্রেসিং রুম, ওয়াড্রোব আর সংলগ্ন বাথরুম ।    কোনো অনুষ্ঠানের ত্রুটি নেই । দেওয়ালে কাশ্মিরী কাজের ওয়াল হ্যাংগিং থেকে কাঠের সূক্ষ কাজের পেলমেট ও বাহারী ল্যাম্পশেড ।
রাতের আহার সেরে হাউসবোটের ডেকে এসে ঘুমন্ত ডালঝিলকে একঝলক দেখে ঝিম ধরে গেল মাথায় । নেশাগ্রস্তের মত একদৃষ্টে চেয়ে র‌ইলাম তার দিকে । ফুটফুটে লাল নীল সবুজ আলো জ্বলছে আশপাশের হাউসবোট থেকে আর তাদের প্রতিবিম্ব ডালঝিলের জলে দুলে বেড়াচ্ছে জলপরীদের মত, রাতপরীদের মত ।  
ঘুমিয়ে পড়লাম দেবী চৌধুরাণির বজরায় । স্বপ্নে মনে পড়ে গেল চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙার কথা । এমনটিই ছিল হয়ত সে সময় ।  মাঝরাতে বৃষ্টি ঝরল হাউসবোটের ছাদে । কাঠের ছাদে  টুপটাপ বৃষ্টিকণার শব্দ কানে লেগে র‌ইল । 
এবার পহেলগামে দুদিন । অবন্তীপুরম, কেশর ক্ষেত,  উইলো কাঠের ব্যাট,  শুকনো ফলের পসরা ফেলে এবার পহেলগামের দিকে । রাস্তা দুদিকে চলে গেছে । একদিকে জম্বু যাওয়ার রাস্তা  অন্যদিকে পহেলগামের পথ । ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর পথ ছাড়েনা ।
ঘোড়ায় চেপে বৈশরণ এডভেঞ্চার । তিনটে জবরদোস্ত ঘোড়া , দুই সহিস আর আমরা তিন মূর্তি । ঘন বাদামী আট বছরের বুলডোজার্, হালকা বাদামী দশ বছরের চেতক আর আমার সফেদ ঘোড়া মাত্র তিন বছরের বাদল । 

বুলডোজার জ্ঞানী বৃদ্ধ, সাবধানী এবং ভব্য সভ্য । বাদল খুব চালাক এবং দুষ্টুমিষ্টি স্বভাবের । আর চেতক হল সবচেয়ে পাজি এবং ওপরচালাক । ঘোড়ায় চেপে তো বসলাম তিনজনে ভয়েভয়ে  দুই সহিস পায়ে হেঁটে আমাদের পেছন পেছনে চলল । অসমতল পাহাড়ি পথ । খানাখন্দে ভরা তায় আবার বৃষ্টি পড়ে কর্দমাক্ত । চেতক শুধু ওভারটেক করায় ব্যস্ত শুরুথেকেই । বাদল ও বুলডোজার না এগিয়ে যায় ওর থেকে । চড়াই পথে আমাদের লাগাম ধরে আমাদের নীচু হয়ে যাওয়া আর উতরাই পথে লাগাম ধরে আমাদের পিছে হেলে যাওয়া । এই নিয়ে বারবার টানাপোড়েন । তার মধ্যে মেঘের বাড়ির দরজায় পৌঁছলেই বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে কেবল । সামনে আবার নীল আকাশ, পেছনে বরফচূড়ো । কিছুটা নদীর উপত্যকা তো আবার পাহাড়ী । সবুজ মেডো, দু একটা দাঁড়কাক  আবার হেলতে দুলতে চলা ঘোড়াদের মর্জিমত । কাইনমার্গ পৌঁছলাম । সবুজ মাঠ। দূষণ নেই । বৃষ্টি পড়ে আরো সবুজ লাগছে । সাজানো প্রান্তর ।  আচমকা এক চোরা নদী পাহাড় থেকে এঁকে বেঁকে নেমে এসে ঢুকে পড়ল পায়ের কাছে । ঘোড়া তার স্রোতে বেশ ন্যায়দম খেতে খেতে চলছে । কাদায় পা পড়লেই মনে হচ্ছে পা পিছলে যাবে ওদের । কিন্তু ওদের পায়ে নাল পরা থাকে বলে ওরা স্বচ্ছন্দ্যে অবলীলাক্রমে নদীর গতিপথে পা রেখে   চলতে লাগল । ততক্ষণে আমাদের জুতো আর প্যান্টে জলকাদার প্রিণ্ট । বৈশরণ এল বুঝি । পাইনগাছের সারি দিয়ে ঘেরা সবুজ প্রান্তর । দূর দিগন্তে নীল আকাশের পৃথিবী । পৃথিবীর নীচে ঐ প্রান্তর যার নাম সুইত্জারল্যান্ড পয়েন্ট । ছবি তুলে তফাত করা যাবেনা ।  ভিউপয়েন্টও বটে ।  আল্পসের বরফচূড়ো  আর হিমালয়ের বরফচূড়োয় । নো প্লাস্টিক জোন । পরিচ্ছন্ন চা-কফির ঠেক । ঘোড়া থেকে নেমে গরম চায়ে চুমুক ।  ননস্টপ ডিজিটাল ক্লিকে বন্দী হল ভারতের সুইস পয়েন্ট । 
  চা খেয়ে ওপরে উঠে এসে আবার বাদল, বুলডোজার আর চেতকের ভরসায় চেপে বসলাম ওদের পিঠে । ওরাই আমাদের একমাত্র বল ভরসা । আবার সেই ছিটেফোঁটা বৃষ্টি, এক চিলতে রোদ্দুর মেখে  পাইনবনের মধ্যে দিয়ে অন্যপথে ফেরা হোল হোটেলে ।